Human
Is the human a descendant of the monkey

Is the human a descendant of the monkey

বানর থেকে মানুষ – ভুল সবই ভুল!

First they came for the atheists. If you did not speak up then, it is high time you speak up now. এই ইংরেজীটার সারমর্ম হলো – আপনি এখনো কথা না বললে ওরা একদিন আপনাকেসহ সব গিলে খাবে।

বিবর্তনবাদকে ভুলভাবে “বানর থেকে মানুষ” হিসেবে দেখা হয়, অথচ আসলেই এটি জীববিজ্ঞানের এক সুপ্রতিষ্ঠিত সত্য যা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। আধুনিক চিকিৎসা, ওষুধ উদ্ভাবন ও ভ্যাকসিন গবেষণা – সবই এই তত্ত্বের ভিত্তিতে এগিয়ে চলছে এবং এর সুফল সবাই ভোগ করছে, এমনকি যারা প্রকাশ্যে এর বিরোধিতা করে তারাও। বাংলাদেশের শিক্ষাক্রম থেকে বিবর্তনবাদ বাদ দেওয়া মানে বিজ্ঞানে অন্তত দুই শতাব্দী পিছিয়ে পড়া, আর এতে ছাত্রদের মান আন্তর্জাতিকভাবে অগ্রাহ্য হবে। তাই বিজ্ঞানের অগ্রগতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হলে বিবর্তনবাদকে পাঠ্যক্রমে রাখা অপরিহার্য।

অনেকে অজ্ঞতার কারণে এখনো বলে বেড়ায় যে বিবর্তনবাদ মানে নাকি “বানর থেকে মানুষ,” অথচ এ ধারণা সম্পূর্ণ ভুল এবং বিজ্ঞানের মৌলিক সত্যকে বিকৃত করে। এই ভুল ধারণা ভাঙতে প্রয়াত অনন্ত বিজয় দাস একসময় অসাধারণ একটি নিবন্ধ লিখেছিলেন, যেখানে তিনি স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছিলেন বিবর্তনের প্রকৃত বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, ঠিক এই ধরনের লেখার জন্যই তিনি জঙ্গিদের হাতে প্রাণ হারান, আর আমার মতো অনেককেই দেশ ছেড়ে যেতে হয়েছিলো মুক্ত চিন্তার চর্চার কারণে। ভাবুন তো, যদি অভিজিৎ রায় কিংবা অনন্ত বিজয় দাসরা আজও বেঁচে থাকতেন এবং অবাধে লিখে যেতে পারতেন, তবে তারা বাংলাদেশের বৌদ্ধিক অগ্রগতিতে কতটা গভীর প্রভাব ফেলতে পারতেন – সমাজে যুক্তিবাদ, বিজ্ঞানমনস্কতা ও মানবিক মূল্যবোধের প্রসার ঘটাতে পারতেন। কিন্তু সেই সম্ভাবনা আজ আর নেই, কারণ তারা আমাদের মাঝে নেই। ফলস্বরূপ বাংলাদেশ ক্রমশ পিছিয়ে পড়ছে, অগ্রগতির পথে এগোতে পারছে না, আর মুক্ত চিন্তার আলো নিভে যাচ্ছে অন্ধকারের ভিড়ে।

মানুষ প্রাইমেট বর্গের অন্তর্ভুক্ত হলেও সরাসরি ‘বানর’ নয়। প্রাইমেট শ্রেণীতে মানুষ, বানর এবং এপ – যেমন গরিলা, শিম্পাঞ্জি ও ওরাঙওটাং—সবাই একসাথে অবস্থান করে। বিবর্তনের দৃষ্টিতে মানুষ এপদের সাথে অনেক বেশি ঘনিষ্ঠ আত্মীয়, আর বানর তুলনামূলকভাবে দূরের আত্মীয়। এপদের মধ্যে শিম্পাঞ্জি মানুষের সবচেয়ে কাছের আত্মীয়, এরপর গরিলা এবং শেষে ওরাঙওটাং। প্রায় ষাট থেকে সত্তর লক্ষ বছর আগে মানুষের বংশধারা ও শিম্পাঞ্জির বংশধারা এক সাধারণ পূর্বপুরুষ থেকে আলাদা হয়ে যায়। বিজ্ঞানীরা এই সত্য নিশ্চিত করেছেন তিনটি উপায়ে – বর্তমান প্রাইমেটদের সাথে মানুষের অঙ্গসংস্থান তুলনা, অতীতের ফসিল বিশ্লেষণ এবং ডিএনএ ও প্রোটিন গবেষণা। আধুনিককালে জৈবঅণু বিশ্লেষণ সবচেয়ে নির্ভুল তথ্য দিচ্ছে, তবে ফসিল গবেষণাও মানব-সদৃশ বিবর্তনের গতি বোঝার জন্য অপরিহার্য।

চার্লস ডারউইন তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ Origin of Species-এ মানব-বিবর্তন নিয়ে সরাসরি কিছু বলেননি, তবে ১৮৭১ সালে প্রকাশিত Descent of Man-এ তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে মানুষ ও এপরা এক সাধারণ পূর্বপুরুষ থেকে এসেছে, আর সেই পূর্বপুরুষরা মোটেও আধুনিক মানুষ ছিল না। তাঁর এই বক্তব্য নিয়ে ধর্মীয় গোষ্ঠী থেকে শুরু করে অনেক বিজ্ঞানী প্রশ্ন তুলেছিলেন – মানুষ ও এপের মধ্যবর্তী জীব কোথায়, সেই ‘মিসিং লিংক’ কীভাবে খুঁজে পাওয়া যাবে ইত্যাদি। ডারউইন প্রাকৃতিক নির্বাচনের আলোকে মানুষের বিবর্তন ব্যাখ্যা করেছিলেন এবং অনুমান করেছিলেন যে ভবিষ্যতে হোমিনিড ফসিল আবিষ্কৃত হবে। তাঁর মৃত্যুর সময় পর্যন্ত কোনো হোমিনিড ফসিল জানা ছিল না, তবে তিনি সঠিকভাবে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে একদিন এ ধরনের প্রমাণ অবশ্যই মিলবে।

ডারউইনের মৃত্যুর কয়েক বছর পর, ১৮৮৯ সালে ইন্দোনেশিয়ার জাভা দ্বীপে ডাচ শারীরবিদ ইয়োজিন ডিবোয়া প্রথম হোমিনিড ফসিল আবিষ্কার করেন। তিনি একটি ঊরুর হাড় এবং ছোট্ট একটি মাথার খুলি উদ্ধার করেন। পরীক্ষায় দেখা যায়, ফিমারটি দ্বিপদী প্রাণীর, আর খুলির আয়তন ছিল মাত্র ৮৫০ সি.সি., যা আধুনিক মানুষের তুলনায় অনেক ছোট। ফসিলটির বয়স নির্ধারণ করা হয় প্রায় ১.৮ মিলিয়ন বছর। এই আবিষ্কারকে প্রথমে ‘জাভা-মানব’ বলা হলেও পরে শ্রেণীবিন্যাসবিদরা একে Homo erectus নামে স্বতন্ত্র প্রজাতি হিসেবে চিহ্নিত করেন। আধুনিক মানুষকে বলা হয় Homo sapiens, আর এই আবিষ্কার প্রমাণ করে যে মানুষের বিবর্তন দীর্ঘ সময় ধরে ধাপে ধাপে ঘটেছে এবং আমাদের পূর্বপুরুষরা একসময় পৃথিবীতে ভিন্ন রূপে বাস করতেন।

জার্মানির ফেন অঞ্চলের চুনাপাথরের খনি থেকে বহু বছর ধরে আর্কিওপটেরিক্সের বেশ কয়েকটি ফসিল উদ্ধার হয়েছে। প্রথম নমুনাটি আবিষ্কৃত হয় ১৮৬০ সালে এবং সর্বশেষটি পাওয়া যায় ২০০৫ সালে। আকারে এটি প্রায় কাকের সমান ছোট্ট প্রাণী ছিল। এর ফসিলে একদিকে পাখির বৈশিষ্ট্য যেমন খুলি, ঠোঁট ও পালক স্পষ্টভাবে দেখা যায়, অন্যদিকে কঙ্কালতন্ত্রে দ্বিপদী ডায়নোসরের বৈশিষ্ট্যও বিদ্যমান। ফলে আর্কিওপটেরিক্সকে বিজ্ঞানীরা সরীসৃপ ও পাখির মধ্যবর্তী এক গুরুত্বপূর্ণ জীবাশ্ম হিসেবে বিবেচনা করেন।

মানব-বিবর্তনের প্রাচীনতম প্রমাণ হিসেবে ছয় থেকে সাত মিলিয়ন বছর আগের হোমিনিড ফসিল আফ্রিকা মহাদেশে আবিষ্কৃত হয়েছে। এদের মধ্যে Sahelanthropus ও Orrorin উল্লেখযোগ্য। এনাটমি বিশ্লেষণে দেখা যায়, এরা দ্বিপদী প্রাণীদের মধ্যে প্রথম ভূমিতে আধিপত্য বিস্তার করেছিল, যদিও তাদের মস্তিষ্ক আধুনিক মানুষের তুলনায় অনেক ছোট ছিল। প্রায় ৫.৫ মিলিয়ন বছর আগে আফ্রিকায় Ardipithecus নামের হোমিনিডরা বাস করতো।

আফ্রিকায় অস্ট্রেলোপিথেকাসের প্রচুর ফসিল পাওয়া গেছে, যা প্রমাণ করে তারা প্রায় ৪০ লক্ষ বছর আগে বসবাস করতো। এরা সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারলেও তাদের করোটির ধারণ ক্ষমতা ছিল মাত্র এক পাউন্ড, যা গরিলা ও শিম্পাঞ্জির সমান এবং আধুনিক মানুষের তুলনায় অনেক কম। তাদের খুলিতে একসাথে এপ ও মানুষের বৈশিষ্ট্য দেখা যায় – যেমন নিচু কপাল, এপ-সদৃশ মুখমণ্ডল, আবার দাঁতের অবস্থান মানুষের মতো। একই সময়ে Kenyanthropus ও Paranthropus নামের অন্যান্য হোমিনিডও ছিল। Paranthropus-এর কিছু প্রজাতির শরীর লম্বা হলেও তাদের মস্তিষ্ক ছোট ছিল। শেষ পর্যন্ত এই শাখার প্রাণীরা বিলুপ্ত হয়ে যায়, আর মানব-বিবর্তনের মূল ধারায় টিকে থাকে অন্য হোমিনিডরা।

মানবজাতির হোমো (Homo) জিনাসের প্রাচীনতম সদস্য হলো Homo habilis। প্রত্নতাত্ত্বিক ও নৃবিজ্ঞানীদের গবেষণায় দেখা যায়, এরা প্রথম হোমিনিড যারা পাথর দিয়ে সাধারণ হাতিয়ার ও ব্যবহার্য বস্তু তৈরি করতে সক্ষম ছিল। এ কারণেই তাদের নামকরণ করা হয়েছে habilis, যা ল্যাটিন ভাষায় “হাতের কাজে দক্ষ” অর্থে ব্যবহৃত হয়। Homo habilis-এর মাথার খুলির ধারণক্ষমতা ছিল প্রায় ৬০০ সি.সি. – পূর্ববর্তী হোমিনিডদের তুলনায় বড় হলেও আধুনিক মানুষের তুলনায় অর্ধেক। প্রায় ২৫ থেকে ১৫ লক্ষ বছর আগে আফ্রিকার গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলে তারা বসবাস করতো। এদের মধ্যেই মানব প্রযুক্তির প্রাথমিক সূচনা দেখা যায়।

এরপর আসে Homo erectus, যারা প্রায় ১৮ লক্ষ বছর আগে আফ্রিকায় বাস করতো। তাদের মস্তিষ্কের আয়তন ছিল ৮০০ থেকে ১১০০ সি.সি. (প্রায় ২–২.৫ পাউন্ড)। এরা Homo habilis-এর তুলনায় উন্নতমানের হাতিয়ার তৈরি করতে পারতো। এই প্রজাতির দুটি বৈশিষ্ট্য বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য: প্রথমত, দীর্ঘ সময় ধরে (১৮ লক্ষ থেকে ৪ লক্ষ বছর পর্যন্ত) বিভিন্ন স্থানে বসবাস করলেও তাদের অঙ্গসংস্থানগত পরিবর্তন ছিল খুবই সামান্য; দ্বিতীয়ত, তারাই প্রথম হোমিনিড যারা আফ্রিকা ছেড়ে ইউরোপ ও এশিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে। প্রায় ১৬ থেকে ১৮ লক্ষ বছর আগে তারা ইউরোপ, এশিয়া, এমনকি চীন ও ইন্দোনেশিয়া পর্যন্ত পৌঁছে যায়। ইন্দোনেশিয়ার জাভা দ্বীপে ইয়োজিন ডিবোয়া প্রথম Homo erectus-এর ফসিল আবিষ্কার করেন।

আধুনিক মানুষের পূর্বপুরুষদের মধ্যে অন্যতম Australopithecus afarensis, যার বিখ্যাত ফসিল “লুসি” প্রায় ৩৫ লক্ষ বছর পুরনো। ১৯৭২ সালে ইথিওপিয়া থেকে লুসির কঙ্কালের প্রায় ৪০ শতাংশ উদ্ধার করা হয়েছিল, যা দ্বিপদী হলেও ছোট মস্তিষ্ক ও খর্বাকৃতি দেহের প্রমাণ দেয়।

Homo erectus-এর পর বিবর্তিত হয় দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রজাতি – Homo neanderthalensis এবং Homo sapiens। নিয়ান্ডার্থালদের প্রচুর ফসিল ইউরোপে পাওয়া গেছে। গবেষণায় জানা যায়, তারা প্রায় দুই লক্ষ বছর আগে উদ্ভব হয়েছিল এবং প্রায় ত্রিশ হাজার বছর আগে বিলুপ্ত হয়। সর্বশেষ নিয়ান্ডার্থাল ফসিল স্পেনে আবিষ্কৃত হয়েছে। তাদের মস্তিষ্ক আধুনিক মানুষের মতো বড় ছিল, শরীরও অনেকটা মানুষের মতো হলেও কিছুটা খাটো ও মোটা।

ধারণা করা হয়, আফ্রিকাতেই Homo erectus থেকে Homo sapiens প্রজাতির উদ্ভব ঘটে প্রায় চার লক্ষ বছর আগে। আধুনিক মানুষের বিবর্তন আফ্রিকায় শুরু হয় প্রায় দুই লক্ষ থেকে দেড় লক্ষ বছর আগে, এবং পরবর্তীতে তারা পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে উপনিবেশ স্থাপন করে অন্য হোমিনিডদের স্থান দখল করে নেয়। যদিও অনেক গবেষক মনে করেন এশিয়া ও ইউরোপে বসতিস্থাপনকারী Homo erectus কোনো নতুন প্রজাতি রেখে যায়নি, তবুও ২০০৪ সালে ইন্দোনেশিয়ার ফ্লোর্স দ্বীপে আবিষ্কৃত Homo florensiensis ফসিল থেকে ধারণা করা হয় তারা সম্ভবত Homo erectus-এর উত্তরসূরি। এই প্রজাতি প্রায় ১২ থেকে ১৮ হাজার বছর আগে সেখানে বাস করতো। তবে এ বিষয়ে গবেষণা এখনো চলমান এবং নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়নি।

আধুনিক Homo sapiens প্রজাতির পৃথিবীর বিভিন্ন মহাদেশে বসতি স্থাপন আসলে তুলনামূলকভাবে সাম্প্রতিক ঘটনা। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও চীনে মানুষের আগমন ঘটে প্রায় ৬০ হাজার বছর আগে, অস্ট্রেলিয়ায় তার কিছু পরেই। ইউরোপে তারা পৌঁছায় প্রায় ৩৫ হাজার বছর আগে, আর আমেরিকায় সাইবেরিয়া থেকে অভিবাসনের মাধ্যমে বসতি স্থাপন হয় মাত্র ১৫ হাজার বছর আগে। মানবজাতির মধ্যে সাংস্কৃতিক ও নৃতাত্ত্বিক বৈচিত্র্যের সূচনা হয়েছে খুব বেশি দিন আগে নয়; আসলে ভৌগলিক বিচ্ছিন্নতা শুরু হয়েছিল প্রায় ৬০ হাজার বছর আগে। ইউরোপে পৌঁছাতে দেরি হওয়ার একটি কারণ ছিল নিয়ান্ডার্থালদের দীর্ঘকালীন উপস্থিতি, যারা প্রায় দুই লক্ষ বছর আগে থেকেই সেখানে বসবাস করছিল এবং তাদের বিলুপ্তি ঘটে মাত্র ৩০ হাজার বছর আগে।

গত শতাব্দীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক উদ্যোগ ছিল ‘মানব জিনোম প্রকল্প’, যা শুরু হয় আমেরিকায় ১৯৮৯ সালে। এই প্রকল্পে অর্থায়ন করে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব হেলথ ও ডিপার্টমেন্ট অব এনার্জি। কিছুদিন পর বেসরকারি প্রতিষ্ঠান Celera Genomics একই ধরনের গবেষণা শুরু করে। লক্ষ্য ছিল ১৫ বছরের মধ্যে মানুষের সম্পূর্ণ জিনোম সিকুয়েন্স নির্ধারণ করা। প্রকল্পের বাজেট ধরা হয়েছিল ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার – প্রতিটি ডিএনএ অক্ষরের জন্য প্রতীকীভাবে ১ ডলার। ২০০১ সালে প্রথম খসড়া প্রতিবেদন প্রকাশিত হয় এবং ২০০৩ সালে প্রকল্পের একটি বড় পর্ব সম্পন্ন হয়। মানুষের জিনোমে তিন বিলিয়ন নিউক্লিওটাইড রয়েছে, যা ছাপানো হলে হাজার ভলিউমের সমান হতো। পরবর্তী সময়ে প্রযুক্তিগত উন্নতির ফলে ব্যক্তিগত জিনোম সিকুয়েন্সিং অনেক দ্রুত ও সস্তায় সম্ভব হয়েছে – মাত্র এক মাসে এবং প্রায় এক লক্ষ ডলারে।

মানুষ ছাড়াও অন্যান্য প্রজাতির জিনোম সিকুয়েন্স বিশ্লেষণ করা হয়েছে। বিশেষ করে শিম্পাঞ্জির (Pan troglodytes) জিনোম প্রথম প্রকাশিত হয় ২০০৫ সালে। মানুষের সাথে শিম্পাঞ্জির জিনোমের তুলনামূলক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, উভয়ের মধ্যে প্রায় ৯৯% মিল রয়েছে। পার্থক্য মাত্র ১%, কিন্তু এই সামান্য পার্থক্যই মানুষের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য ও ফিনোটাইপ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। মানুষের তিন বিলিয়ন ডিএনএ অক্ষরের মধ্যে প্রায় ৩০ মিলিয়ন অক্ষরে শিম্পাঞ্জির সাথে পার্থক্য রয়েছে। এই তথ্য একদিকে মানুষের সাথে অন্যান্য প্রাইমেটের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককে তুলে ধরে, অন্যদিকে আমাদের বিবর্তনীয় স্বাতন্ত্র্যকেও স্পষ্ট করে।

মানুষ ও শিম্পাঞ্জির জিনোমে বিস্ময়কর মিল রয়েছে। প্রায় ২৯ শতাংশ এনজাইম ও অন্যান্য প্রোটিন একই ধরনের জিন দ্বারা গঠিত হলেও বাকি ৭১ শতাংশ প্রোটিনে পার্থক্য দেখা যায়, যা গড়ে মাত্র দুটি অ্যামিনো অ্যাসিডের পরিবর্তনের কারণে হয়েছে। ডিএনএ সিকুয়েন্সের তুলনায় দেখা যায়, উভয় প্রজাতির জিনোম প্রায় ৯৬ শতাংশ অভিন্ন। তবে প্রায় তিন শতাংশ জিনেটিক উপাদান – প্রায় ৯০ মিলিয়ন ডিএনএ অক্ষর – গত ছয় থেকে সাত মিলিয়ন বছরে পরিবর্তিত হয়েছে, যখন মানুষ ও শিম্পাঞ্জি সাধারণ পূর্বপুরুষ থেকে আলাদা পথে বিবর্তিত হয়। উল্লেখযোগ্য যে, অনেক ডিএনএ অংশ প্রোটিন তৈরির জন্য জিন ধারণ করে না, যেগুলোকে বলা হয় ‘জাঙ্ক ডিএনএ’।

জিনোম সিকুয়েন্সের তুলনা থেকে বোঝা যায় কোন জিন দ্রুত বিবর্তিত হয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষের মস্তিষ্কে সক্রিয় জিনগুলো শিম্পাঞ্জির তুলনায় বেশি পরিবর্তিত হয়েছে। মোট ৫৮৫টি জিনের মধ্যে কিছু জিন যেমন ম্যালেরিয়া প্রতিরোধে ভূমিকা রাখে, সেগুলো মানুষের মধ্যে দ্রুত বিবর্তিত হয়েছে। গত আড়াই লক্ষ বছরে মানুষের জন্য উপকারী জিনগুলির দ্রুত পরিবর্তন ঘটেছে। ভাষার উদ্ভবের সাথে সম্পর্কিত FOXP2 জিনও মানুষের মধ্যে দ্রুত বিবর্তিত হয়েছে, যা আমাদের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের অন্যতম ভিত্তি।

মানুষের স্বতন্ত্র অবস্থান বোঝাতে বড় মস্তিষ্ক ও কিছু জিনের দ্রুত বিবর্তনীয় হারকে বিশেষভাবে উল্লেখ করা যায়। তবে কোন জিনেটিক পরিবর্তন আমাদের প্রকৃত অর্থে মানুষ বানিয়েছে, সে বিষয়ে জ্ঞান এখনও সীমিত। আগামী কয়েক দশকে গবেষণা আরও বিস্তৃত হলে হয়তো জানা যাবে কিভাবে আমরা স্বতন্ত্র মানুষে পরিণত হয়েছি। মানুষের বিশেষ বৈশিষ্ট্যগুলির বিকাশ শুরু হয় ভ্রূণ অবস্থায়, যেখানে জিনোমে সংযুক্ত তথ্য ধাপে ধাপে প্রকাশিত হয় এবং সময়ের সাথে ব্যক্তির মধ্যে পরিবর্তন ঘটে। মানুষের চিন্তা ও আত্মিক পরিচয় গঠনে মস্তিষ্কের বিকাশই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

মানুষ অন্যান্য প্রাইমেট থেকে আলাদা হয়েছে মূলত মস্তিষ্কের অসাধারণ অগ্রগতির কারণে। প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে অন্যান্য প্রাণী পরিবেশের সাথে অভিযোজিত হলেও মানুষ প্রযুক্তির সাহায্যে পরিবেশকে নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী পরিবর্তন ও নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হয়েছে। আগুনের ব্যবহার, পোশাক, বাসস্থান – এসবই মানুষকে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়তে সাহায্য করেছে। এমনকি তীব্র ঠাণ্ডা আবহাওয়া মোকাবিলা করার জন্য জিনগত পরিবর্তনের অপেক্ষা না করে মানুষ প্রযুক্তি ব্যবহার করে অভিযোজন করেছে। জাহাজ ও বিমান আবিষ্কার করে মানুষ সমুদ্র ও আকাশে ভ্রমণ করতে পেরেছে, যা তার চিন্তা ও মস্তিষ্কের বিকাশের ফল।

গত দুই দশকে নিউরোবায়োলজিতে অভাবনীয় অগ্রগতি হয়েছে। আলো, শব্দ, গন্ধ ইত্যাদি ইন্দ্রিয় কিভাবে স্নায়ুর মাধ্যমে তথ্য মস্তিষ্কে পাঠায় এবং শরীরের বিভিন্ন অঙ্গকে নিয়ন্ত্রণ করে, তা এখন অনেক স্পষ্টভাবে জানা গেছে। তবে নিউরোবায়োলজি এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে, যেমন একসময় জিনেটিক্স ছিল। মানুষের আবেগ, অনুভূতি ও সচেতনতার মতো জটিল অভিজ্ঞতা কিভাবে উদ্ভূত হয় তা এখনো রহস্যময়। তবুও বিশ্বাস করা যায়, আগামী অর্ধশতাব্দীর মধ্যে দার্শনিক বিশ্লেষণ ও বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের মাধ্যমে এসব ধাঁধার উত্তর পাওয়া যাবে। তখন মানুষ নিজেকে জানার মধ্য দিয়েই আরও ভালোভাবে বেঁচে থাকতে পারবে।

Related Posts

Religious Barriers on the Path of Science

Even in this era, religious fanaticism stands as a barrier to the spread of science!

For being ahead of his time, Socrates had to drink the cup of poison 2,400Read More

Religious Barriers on the Path of Science

এই যুগেও বিজ্ঞান প্রসারের পথে ধর্মীয় উন্মাদনা বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়!

তার সময়ের চেয়ে এগিয়ে থাকার জন্য ২৪০০ বছর আগে সক্রেটিসকে বিষের পেয়ালা পান করতে হয়েছিল।Read More

WordPress and the Dreams of Bangladeshis

In the light of open‑source, a new horizon: How WordPress is showing Bangladesh’s young generation the path to self‑reliance

If you walk along the roads of villages and small towns in Bangladesh, you willRead More

Comments are Closed