Justice
Is Allah Just?

Is Allah Just?

চিরন্তন শাস্তি ও ঐশ্বরিক ন্যায়বিচারঃ আল্লাহ কি ন্যায়পরায়ণ?

ইসলাম ধর্মের কেন্দ্রীয় একটি দাবি হলো আল্লাহ সম্পূর্ণ ন্যায়পরায়ণ – আরবিতে যাকে বলা হয় আল-আদল। কিন্তু একই সঙ্গে কোরআন ঘোষণা করে যে অবিশ্বাসীরা জাহান্নামে চিরকাল দগ্ধ হবে। এই দুটি দাবির মধ্যে একটি গভীর দার্শনিক বিরোধ লুকিয়ে আছে যা সহজে উপেক্ষা করা যায় না। একই সঙ্গে অনন্তকালের শাস্তির সঙ্গে ন্যায়পরায়ণতা ও অসীম দয়ালুর ধারনা যায় না। প্রশ্নটি সরল – সসীম অপরাধের জন্য অসীম শাস্তি কি ন্যায়সংগত?


যুক্তিটি নিম্নলিখিতভাবে উপস্থাপন করা যায়ঃ

ন্যায়বিচারের সর্বজনগ্রাহ্য নীতি অনুযায়ী, শাস্তি অবশ্যই অপরাধের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। এটি কেবল ধর্মীয় নয়, মানবিক নৈতিকতার একটি মৌলিক ভিত্তি। কেউ যদি একটি আপেল চুরি করে, তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া স্পষ্টতই অবিচার – এই ধারণাটি বোঝার জন্য কোনো ধর্মগ্রন্থের প্রয়োজন নেই।

মানুষ সসীম সত্তা। তাদের জীবন সীমিত, তাদের কর্মকাণ্ড সীমিত, এবং তাই তাদের অপরাধও অনিবার্যভাবে সসীম। এমনকি ইতিহাসের সবচেয়ে নৃশংস অপরাধী, যেমন হিটলার, যিনি কোটি মানুষের মৃত্যুর জন্য দায়ী – তিনিও সসীম সংখ্যক মানুষকে কষ্ট দিয়েছেন। সেই কষ্টও ছিল সসীম কালের মধ্যে। অতএব যদি অসীম শাস্তি ন্যায়সংগত হতে হয়, তবে অপরাধটিও অসীম হতে হবে – যা কোনো মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়।

কোরআন সুরা আন-নিসার ৪০ নং আয়াতে বলেঃ “নিশ্চয়ই আল্লাহ অণু পরিমাণও জুলুম করেন না।” সুরা আল-আম্বিয়ার ৪৭ নং আয়াতে বলা হয়েছেঃ “কেয়ামতের দিন আমি ন্যায়বিচারের দাঁড়িপাল্লা স্থাপন করব।” এই আয়াতগুলো আল্লাহর ন্যায়বিচারকে একটি নিখুঁত ও পরিমাপযোগ্য ধারণা হিসেবে উপস্থাপন করে। কিন্তু তাহলে প্রশ্ন ওঠে – সেই দাঁড়িপাল্লায় সসীম অপরাধের বিপরীতে অসীম শাস্তি কীভাবে “ভারসাম্যপূর্ণ” হয়?


ইসলামী পণ্ডিতদের প্রচলিত জবাব এবং তাদের দুর্বলতা

এই প্রশ্নের সামনে ইসলামী ধর্মতাত্ত্বিকরা বেশ কয়েকটি যুক্তি উপস্থাপন করেন। এগুলো পরীক্ষা করা দরকার।

প্রথম যুক্তিঃ অবিশ্বাস নিজেই অসীম অপরাধ

একটি প্রচলিত জবাব হলো – অবিশ্বাস বা কুফর কোনো সাধারণ পাপ নয়। অসীম, চিরন্তন আল্লাহকে প্রত্যাখ্যান করা অসীম মাত্রার অপরাধ, তাই অসীম শাস্তি ন্যায়সংগত।

কিন্তু এই যুক্তিতে একটি মৌলিক সমস্যা রয়েছে। একটি কাজের গুরুত্ব নির্ধারণ করা হয় সাধারণত তার প্রভাব দিয়ে, কর্তার পরিচয় দিয়ে নয়। যদি কেউ কোনো অত্যন্ত ক্ষমতাশালী রাজার বিরুদ্ধে মিথ্যা বলে, সেই মিথ্যা বলার ক্রিয়াটি নিজেই পরিবর্তিত হয় না – রাজার মহত্ত্ব বাড়লেই অপরাধ “অসীম” হয়ে যায় না। একজন ক্ষমতাশালী শাসক যদি বলেন, “আমার বিরুদ্ধে সামান্য অসম্মানও অসীম শাস্তির যোগ্য,” তাহলে আমরা সেটিকে স্বৈরাচার বলব – ন্যায়বিচার নয়।

দ্বিতীয় যুক্তিঃ জাহান্নামে মানুষ চিরকাল পাপ করতে থাকে

কেউ কেউ বলেন যে জাহান্নামবাসীরা সেখানে গিয়েও আল্লাহকে অস্বীকার করতে থাকে, তাই শাস্তি অব্যাহত থাকে।

এই যুক্তিটি একটি বৃত্তাকার সমস্যায় পড়ে। মানুষ যদি জাহান্নামে পাপ করতে থাকে কারণ তাদের সংশোধনের কোনো সুযোগ নেই বা তারা মানসিকভাবে বিকৃত হয়ে পড়েছে – তাহলে সেই পরিস্থিতির জন্য দায়ী কে? একজন ন্যায়বান সত্তা কি ইচ্ছাকৃতভাবে এমন পরিবেশ তৈরি করবেন যেখানে মানুষ আরও বেশি পাপ করতে বাধ্য হয়, তারপর সেই অতিরিক্ত পাপের জন্য আরও শাস্তি দেবেন?

তৃতীয় যুক্তিঃ আল্লাহর ন্যায়বিচার মানুষের ধারণার ঊর্ধ্বে

এটি সবচেয়ে প্রচলিত এবং সবচেয়ে সমস্যাজনক যুক্তি। বলা হয় – আল্লাহর ন্যায়বিচার মানবিক যুক্তি দিয়ে বোঝা সম্ভব নয়।

কিন্তু এই যুক্তি গ্রহণ করলে পুরো ধর্মীয় কাঠামোটিই ভেঙে পড়ে। কারণ ইসলাম একই সঙ্গে দাবি করে যে আল্লাহ আদিল (ন্যায়বান) এবং মানুষ এই গুণটি বুঝতে পারে – এটিই মানুষকে আল্লাহর প্রতি আকৃষ্ট করার কথা। যদি “ন্যায়বিচার” শব্দটির অর্থ মানুষের বোধের সাথে সম্পূর্ণ অসম্পর্কিত হয়, তাহলে আল্লাহকে “ন্যায়বান” বলার কোনো অর্থ থাকে না – এটি একটি শব্দ হয়ে যায় যার কোনো বোধগম্য বিষয়বস্তু নেই।


নৈতিক দায়িত্ব ও স্বাধীন ইচ্ছার প্রশ্ন

চিরস্থায়ী শাস্তির সমস্যাটি আরও গভীর হয় যখন আমরা স্বাধীন ইচ্ছার প্রশ্নটি তুলি।

কোরআন বলে আল্লাহ সর্বজ্ঞ – তিনি জানেন কে বিশ্বাস করবে এবং কে করবে না। সুরা আল-আনআমের ১০৭ নং আয়াতে বলা হয়েছে: “আল্লাহ চাইলে তারা শিরক করত না।” যদি আল্লাহ পূর্ব থেকেই জানেন যে একজন মানুষ অবিশ্বাসী হবে, এবং তবুও তাকে সৃষ্টি করেন, তাহলে সেই মানুষটির চিরস্থায়ী শাস্তির নৈতিক দায় কার?

এটি ধর্মতত্ত্বের একটি ক্লাসিক সমস্যা – “পূর্বনির্ধারণ ও নৈতিক দায়িত্বের বিরোধ।” ইসলামী ধর্মতত্ত্বে এ নিয়ে মুতাজিলা ও আশআরি সম্প্রদায়ের মধ্যে শতাব্দীব্যাপী বিতর্ক হয়েছে – কিন্তু কোনো সন্তোষজনক সমাধান এখনও পাওয়া যায়নি।


তুলনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি

এই সমস্যাটি শুধু ইসলামের নয়, তবে ইসলামে এটি বিশেষভাবে তীব্র।

খ্রিস্টধর্মেও চিরস্থায়ী নরকের ধারণা বিদ্যমান, এবং অনেক খ্রিস্টান ধর্মতাত্ত্বিক এই প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছেন। ইউনিভার্সালিজম বা সর্বজনীন মুক্তির মতবাদ (যা বলে শেষ পর্যন্ত সবাই মুক্তি পাবে) এই নৈতিক সমস্যার একটি সমাধান হিসেবে কিছু খ্রিস্টান চিন্তাবিদ গ্রহণ করেছেন। হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মে “চিরস্থায়ী” নরকের ধারণা নেই – কর্মফলের মাধ্যমে পুনর্জন্মের ধারণা নৈতিক সামঞ্জস্যতার একটি ভিন্ন সমাধান উপস্থাপন করে।

ইসলামে তবে এই প্রশ্নটি বিশেষভাবে তীক্ষ্ণ কারণ ইসলাম একই সঙ্গে আল্লাহর পরিপূর্ণ ন্যায়বিচারের দাবি করে এবং অবিশ্বাসীদের চিরস্থায়ী শাস্তির কথা বলে – এই দুটি দাবি যৌক্তিকভাবে একসাথে ধরে রাখা অত্যন্ত কঠিন।


দার্শনিক যুক্তির নিরিখে বিচার করলে ইসলামের চিরস্থায়ী শাস্তির ধারণা এবং আল্লাহর পরিপূর্ণ ন্যায়বিচারের দাবির মধ্যে একটি সত্যিকারের, অমীমাংসিত দ্বন্দ্ব রয়েছে। ইসলামী পণ্ডিতরা এই প্রশ্নের মুখে বেশ কয়েকটি উত্তর দিয়েছেন – কিন্তু প্রতিটি উত্তরই নতুন প্রশ্নের জন্ম দেয়। কোনো বিশ্বাসী মুসলমান যিনি নৈতিক গভীরতার সাথে তার ধর্ম পালন করতে চান, তাকে এই প্রশ্নটি এড়িয়ে যাওয়া উচিত নয়। “এটা আল্লাহর বিষয়, আমরা বুঝব না” – এই উত্তর একটি নৈতিকভাবে সচেতন মানুষের জন্য যথেষ্ট নয়। যদিও ইসলাম তার অনুসারীদের জন্য এমন প্রশ্ন করার সুযোগ রাখেনি।

ন্যায়বিচার যদি সত্যিই আল্লাহর একটি মৌলিক গুণ হয়, তাহলে সেই ন্যায়বিচার মানুষের নৈতিক অনুভূতির সাথে সংগতিপূর্ণ হওয়া উচিত – অন্তত মূলনীতিতে। আর সেই পরীক্ষায় চিরস্থায়ী নরকের ধারণা এখনও উত্তীর্ণ হতে পারেনি।

Related Posts

Prophet Muhammad or Allah?

Allah reveals verses about something as trivial as a piece of clothing, yet does not answer the fundamental questions of the universe

A being who is claimed to be the creator of the vast universe, whose scopeRead More

Prophet Muhammad or Allah?

আল্লাহ সামান্য কাপড়ের বিষয় নিয়ে আয়াত নাজিল করে, কিন্তু মহাবিশ্বের মৌলিক প্রশ্নগুলোর উত্তর দেয় না

যে সত্তাকে বিশাল মহাবিশ্বের স্রষ্টা বলে দাবি করা হয় – যার ব্যাপ্তি আমাদের ধারণার সীমানাRead More

Prophet Muhammad and OCD

Did Prophet Muhammad have OCD along with other mental issues, which is why he used to do and say everything three times?

In Islamic rituals and practices, a clear pattern of three or odd numbers can beRead More

Comments are Closed