Creator
Is a creator essential for our existence?

Is a creator essential for our existence?

স্রষ্টা যদি না থাকে তাহলে আমি, আপনি, আমরা কিভাবে সৃষ্টি হলাম?

এই প্রশ্নটা আসলে মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাসের সবচেয়ে পুরোনো, সবচেয়ে গভীর, আর সবচেয়ে সুন্দর প্রশ্নগুলোর একটি। আর এর উত্তর এক লাইনে দেওয়া যায় না – কারণ প্রশ্নটি নিজেই দুই স্তরে কাজ করে:

  1. বৈজ্ঞানিক স্তর – “জীবন কীভাবে শুরু হলো?”
  2. দার্শনিক স্তর – “এই শুরু হওয়ার পেছনে কি কোনো উদ্দেশ্য বা স্রষ্টা থাকা দরকার?”

বিজ্ঞান বলে, জীবন শুরু হয়েছিল ধাপে ধাপে, কোনো পরিকল্পনা ছাড়া, প্রাকৃতিক নিয়মের ফল হিসেবে।

  • প্রায় ৩৮০ কোটি বছর আগে পৃথিবীর উষ্ণ জলাশয়ে কিছু জটিল অণু তৈরি হয়।
  • তারা পরিবেশের প্রভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাতে শুরু করে।
  • তারপর নিজেদের অনুলিপি বানাতে শেখে।
  • বড় অণু ভেঙে ছোট অণু হয়, ছোট অণু আবার বড় অণু তৈরি করে।
  • ধীরে ধীরে এটি এক ধরনের স্বয়ংক্রিয় জৈব-রাসায়নিক চক্রে পরিণত হয়।
  • সময়ের সাথে সাথে এককোষী জীব → বহুকোষী জীব → প্রাণী → মানুষ।

এই পুরো প্রক্রিয়ায় কোথাও “পরিকল্পনা” বা “উদ্দেশ্য” দেখা যায় না। এটা ছিল প্রকৃতির নিয়ম + সময় + পরিবেশ + সম্ভাবনার খেলা। এটাই বিজ্ঞানের ব্যাখ্যা।

কিন্তু বিজ্ঞান কি বলে “স্রষ্টা নেই”? না। বিজ্ঞান কখনো বলে না “স্রষ্টা নেই।” বিজ্ঞান শুধু বলে –
“আমরা এখন পর্যন্ত যা দেখেছি, তাতে জীবন সৃষ্টি হতে কোনো অতিপ্রাকৃত হস্তক্ষেপের প্রয়োজন দেখা যায়নি।”
এটাই সব।

আপনি, আমি – আমরা সবাই শুরু হয়েছি এক আদিম কোষ থেকে, যা আমাদের পিতা ও মাতার দুটি অর্ধকোষ মিলিত হয়ে সৃষ্টি করেছিল। সেই ক্ষুদ্র কোষটি মাতৃগর্ভে পুষ্টি নিয়ে বেড়ে উঠেছে, তারপর জন্মের পর পরিবেশ থেকে খাদ্য, শক্তি ও জীবনধারণের উপাদান সংগ্রহ করে আজকের আমরা হয়েছি।

যে দুই মানুষ আমাদের জন্ম দিয়েছেন, তারাও একসময় একই প্রক্রিয়ায় জন্মেছিলেন। তাদের আগের প্রজন্মও ঠিক একইভাবে এসেছে। লক্ষ লক্ষ বছর ধরে এই ধারাই অব্যাহত। এমনকি যখন মানুষ নিজের জন্মের প্রক্রিয়া সম্পর্কে কিছুই জানত না, তখনও প্রকৃতির স্বাভাবিক টানে তারা বংশবৃদ্ধি করে গেছে – যেমন গাছপালা করে, যেমন পশুপাখি করে। ব্যক্তিগত পর্যায়ে আমাদের অস্তিত্বও সেই একই প্রাকৃতিক ধারাবাহিকতার অংশ।

এই বিষয়গুলো আজ বৈজ্ঞানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত এবং সাধারণ জ্ঞানের অংশ। কিন্তু এতক্ষণ যা বললাম, তা আসলে এক বিশাল গল্পের কেবল শুরু। পৃথিবীর প্রতিটি প্রাণীর মধ্যেই কিছু সার্বজনীন প্রবৃত্তি রয়েছে – যেগুলোকে আমরা সাধারণত জৈবিক বলি, কিন্তু এগুলোর পেছনে কাজ করে জটিল রাসায়নিক প্রক্রিয়া। আর প্রতিটি রাসায়নিক প্রক্রিয়ার গভীরে রয়েছে পরমাণু ও অণুর বিজ্ঞান, যার ভিত্তি আবার কোয়ান্টাম তত্ত্ব।

আমরা মৌলিক কণিকা থেকে পরমাণুর সৃষ্টি জানি, পরমাণু থেকে অণুর গঠন জানি, অণুর প্রকৃতি ও পরিবেশের প্রভাব সম্পর্কেও জানি। কোন পরিস্থিতিতে কী ঘটতে পারে – এ সম্পর্কেও আমাদের জ্ঞান বিস্তৃত। কিন্তু যা এখনো অজানা, তা হলো – এই বিশাল কর্মযজ্ঞ কোন ধারাবাহিক ঘটনার মাধ্যমে সম্পন্ন হয়েছে। ইতিহাসের বইয়ে তার বিবরণ নেই, কারণ ইতিহাস মানুষের লেখা। কিন্তু ইতিহাসের বাইরেও আরেক ধরনের ইতিহাস আছে – যা পৃথিবীর স্তরে স্তরে লুকিয়ে আছে, আর আছে আমাদের জিনের ভেতরে। সেখান থেকেই আমরা পৃথিবীতে প্রথম প্রাণের উদ্ভব সম্পর্কে ধারণা পাই।

এই অজানার বাইরে আমাদের জ্ঞান সীমিত – এটা দোষ নয়। প্রাণের সৃষ্টি ও টিকে থাকার জন্য মানুষের প্রচলিত জ্ঞানের ভূমিকা খুবই সামান্য। যে প্রশ্নের উত্তর আমরা জানি না, তাকে “জানি না” বলা সততার পরিচয় – আর জানার চেষ্টা করাই বুদ্ধিমানের কাজ।

অন্যদিকে, যে প্রশ্নের উত্তর জানা নেই, তার জন্য হঠাৎ করে কল্পনা থেকে উত্তর বানিয়ে ফেললে তা সঠিক হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় শূন্য। কারণ প্রশ্নগুলো অত্যন্ত জটিল, আর আপনি যে তথ্য পেয়েছেন তার বিপরীতে গিয়ে কল্পনা করলে তা বাস্তবতার সঙ্গে মিলবে না।

বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রা এখন পর্যন্ত এতটুকুই এসেছে। বাকিটা যুক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায়। আর সেই যুক্তির পথ ধরেই আপনার প্রশ্নটিকে একটু ঘুরিয়ে বলা যায় –

☀ আমি যে আছি, বা আমার অস্তিত্ব আছে – এটা কি নিজে থেকেই প্রমাণ করে যে কোনো সর্বশক্তিমান সত্তা আমাকে নিজ হাতে সৃষ্টি করেছেন?
☀ আমরা জানি না আমাকে কে সৃষ্টি করেছে। বিজ্ঞানও এখনো সেই প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর দিতে পারেনি। কিন্তু “বিজ্ঞান জানে না, তাই নিশ্চয়ই ঈশ্বর করেছেন” – এটা কি যুক্তির নিয়মে গ্রহণযোগ্য?
☀ যেহেতু আমরা জানি না A = B কি না, তাই কি শুধু অজানার ফাঁক গলেই বলা যায় A = C?
এ ধরনের সিদ্ধান্ত যুক্তির মানদণ্ডে টেকে না।

আপনি যেহেতু যুক্তির আশ্রয় নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, তাই বলছি – যুক্তি দিয়ে কথা বলতে হলে যুক্তির নিয়মও মানতে হয়। সমস্যা হলো, যুক্তি দিয়ে ঈশ্বরের অস্তিত্ব প্রমাণ করা যায় না। এটি সম্পূর্ণই বিশ্বাসের ক্ষেত্র। পৃথিবীতে হাজার হাজার সৃষ্টিতত্ত্ব আছে – কোথাও স্রষ্টাকে প্রত্যক্ষ কর্মী হিসেবে দেখানো হয়েছে, কোথাও তাকে আদি কারণ হিসেবে ধরা হয়েছে। কিন্তু কোনটিকেই কঠোর যুক্তির কাঠামোয় পুরোপুরি মিলিয়ে ফেলা সম্ভব নয়।

সুতরাং “স্রষ্টা না থাকলে আমি কিভাবে সৃষ্টি হলাম?” – এই প্রশ্নের উত্তর আমরা পুরোপুরি জানি না।

বিজ্ঞান যা বলছে, তা হলো – মানুষের আবির্ভাব একটি দীর্ঘ, বহুস্তরীয় প্রক্রিয়ার ফল। ইউভাল নোয়া হারারির Sapiens বইয়ের ভাষায় সেই ধাপগুলোকে এভাবে দেখা যায় –

১৩৭২ কোটি বছর আগে আমাদের পরিচিত মহাবিশ্বের জন্ম। সময়েরও শুরু সেখান থেকেই। তার আগে “আগে” বলে কিছু ছিল না – কারণ সময়ই ছিল না। এই অংশগুলো কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানের বিষয়, এবং আমাদের জ্ঞান এখনো সীমিত।

মহাবিশ্ব জন্মের কয়েক লক্ষ বছর পর তৈরি হয় প্রথম সরল পরমাণু – হাইড্রোজেন, হিলিয়াম, লিথিয়াম। আরও অনেক পরে সেই গ্যাসমেঘ থেকে জন্ম নেয় নক্ষত্র। এই প্রক্রিয়া এখনো চলছে, এবং আমরা তা পর্যবেক্ষণ করতে পারি।

আমাদের দেহের উপাদান – কার্বন, নাইট্রোজেন, অক্সিজেন, আয়রন – এসব ভারী মৌল কোথাও-সেখানে তৈরি হয় না। এগুলো জন্মায় নক্ষত্রের গভীরে, তাদের জীবনের শেষ পর্যায়ে। নক্ষত্র বিস্ফোরিত হলে সেই মৌলগুলো মহাকাশে ছড়িয়ে পড়ে। প্রথম নক্ষত্রগুলো তৈরি হতে লেগেছে কোটি কোটি বছর, বিস্ফোরিত হতেও লেগেছে আরও কোটি বছর।

এগুলো পদার্থবিদ্যা ও ভৌত রসায়নের বিষয়। এই মৌলগুলো ছড়িয়ে পড়ার পর বহু নক্ষত্রমণ্ডলের জন্ম হয়। তারপর ধীরে ধীরে ধাতব ও পাথুরে গ্রহ তৈরি হয় – যেমন আমাদের সৌরজগতের গ্রহগুলো। সেখানে মৌল থেকে যৌগ গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয় – এটা রসায়নের ক্ষেত্র।

এই দীর্ঘ প্রক্রিয়ার ফলেই প্রায় ৪৫০ কোটি বছর আগে আমাদের সৌরজগতের জন্ম। পৃথিবী ধীরে ধীরে স্থিতিশীল কক্ষপথে আসে। তার অবস্থান, তাপমাত্রা, তরল পানির উপস্থিতি, পরিবেশ – সবই ধাপে ধাপে গড়ে ওঠে।

এখানে অসংখ্য জৈব-রাসায়নিক প্রক্রিয়া অবিরাম চলতে থাকে, যা শেষ পর্যন্ত জীবনের সম্ভাবনা তৈরি করে।

প্রায় ৩৮০ কোটি বছর আগে পৃথিবীতে এমন কিছু জটিল অণুর উদ্ভব ঘটে, যেগুলো পরিবেশের পরিবর্তনে প্রতিক্রিয়া দেখাতে সক্ষম ছিল। সময়ের সাথে সাথে তারা নিজেদের অনুলিপি তৈরি করতে শুরু করে। বড় অণু ভেঙে ছোট অণুর জন্ম হয়, আর সেই ছোট অণুগুলো পর্যাপ্ত পুষ্টি পেলে নিজেরাই নিজেদের বিকাশে অনুঘটকের ভূমিকা নেয়। ধীরে ধীরে এই প্রক্রিয়া এক ধরনের পুনরাবৃত্ত জৈব-রাসায়নিক চক্রে পরিণত হয়। পরিবেশ বদলালে এই চক্রও বদলায়, আর সেই পরিবর্তনের মধ্যেই নতুন সম্ভাবনার জন্ম হয়। এখান থেকেই জীববিজ্ঞানের প্রথম অধ্যায় শুরু।

প্রথম যুগে পৃথিবীর উষ্ণ জলাশয়গুলোতে অসংখ্য এককোষী জীব জন্ম নিত, বিভাজিত হতো, আবার বাড়ত। বাইরে থেকে কেউ দেখলে হয়তো এটাকে নিছক রাসায়নিক প্রতিক্রিয়া বলেই ভাবত – কেউই বুঝতে পারত না যে এখানেই প্রাণের বীজ রোপিত হচ্ছে।

সময়ের সাথে সাথে কিছু কোষ একত্রে চলতে শুরু করে। একসাথে চলার ফলে স্বাভাবিকভাবেই কোষগুলোর মধ্যে কাজের ভাগাভাগি তৈরি হয় – বাইরের কোষগুলো এক ধরনের কাজে দক্ষ হয়, ভেতরেরগুলো অন্য কাজে। এখান থেকেই বহুকোষী জীবের অঙ্গসংস্থান ও জটিলতার সূচনা।

এরপর কোটি কোটি বছর ধরে পৃথিবীতে অসংখ্য প্রাণীর আগমন ও বিলোপ ঘটেছে। কে এসেছে, কে হারিয়ে গেছে – পৃথিবীর কাছে এর কোনো গুরুত্ব নেই। যেমন আমাদের শরীরে কোটি কোটি অণুজীব বাস করে অথচ আমরা টের পাই না, তেমনি পৃথিবীও জানে না তার পৃষ্ঠে কারা বেঁচে আছে, কারা ভূত্বকের নিচে চাপা পড়ে গেছে, বা কারা নিজেদের মধ্যেই লড়াই করছে। প্রতিটি গ্রহের মতো পৃথিবীরও নিজস্ব নিয়ম আছে, আর সেই নিয়মের মধ্যেই এমন পরিবেশ তৈরি হয়েছে, যাকে আমরা “জীবন” বলে চিনি।

বিজ্ঞানের দাবি হলো – এই সবকিছুই প্রাকৃতিক নিয়মের ফল, এবং এর পক্ষে প্রচুর প্রমাণও রয়েছে। মহাবিশ্বের মৌলিক নিয়মগুলো খুবই সরল, কিন্তু সেই সরল নিয়মের মধ্যেই অসংখ্য সম্ভাবনা লুকিয়ে থাকে। কোনো সম্ভাবনা দ্রুত নিভে যায়, কোনোটি দীর্ঘ সময় ধরে টিকে থাকে। পৃথিবীতে প্রাণের উদ্ভবও সেই সম্ভাবনাগুলোরই একটি।

সূর্যের যেমন জন্ম ও মৃত্যু আছে, পৃথিবীরও আছে, মহাবিশ্বেরও আছে। এরা সবাই প্রকৃতির নিয়ম মেনে চলে। ভাবুন তো – যদি হাইড্রোজেন থেকে হিলিয়াম না তৈরি হতো, যদি নক্ষত্র বিস্ফোরিত না হতো, যদি মহাকর্ষের মান সামান্য ভিন্ন হতো – তাহলে কি আজকের পৃথিবী বা আমরা থাকতাম? সবকিছুই হতো সম্পূর্ণ ভিন্ন। আর সেই ভিন্নতাকেই হয়তো আমরা “স্বাভাবিক” বলে মেনে নিতাম। মানুষও প্রকৃতির বাইরে নয় – আমাদের নৈতিকতা, বিবেক, ভালোবাসা, সুখ-দুঃখ – সবই জৈব-রাসায়নিক প্রতিক্রিয়ার ফল।

এখানেই বিজ্ঞানের ব্যাখ্যা শেষ। কিন্তু আলোচনা এখানেই থেমে যায় না। অসংখ্য প্রশ্ন এখনো অজানা। যেগুলোর উত্তর বিজ্ঞান দিতে পেরেছে, সেগুলো যুক্তির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু তাতে কি সব জানা হয়ে গেছে? নিশ্চয়ই না। পরিচিত জগতের বাইরেও অজানা জগত থাকতে পারে – এটা অস্বীকার করার উপায় নেই।

এবার যুক্তির সীমা নিয়ে ভাবা যাক। মানুষ একসময় জানত না মেঘ কীভাবে তৈরি হয়, তাই বৃষ্টি হওয়াকে ঈশ্বরের সরাসরি হস্তক্ষেপ মনে করত। পরে আমরা জানলাম – সূর্যের তাপে জল বাষ্পীভূত হয়, বাতাসে উঠে ঠান্ডা হয়ে মেঘ হয়, তারপর বৃষ্টি নামে। এই জ্ঞান আমাদের বুঝিয়ে দিল – ঈশ্বর যদি থাকেনও, তিনি এসব ক্ষুদ্র প্রক্রিয়া নিজ হাতে পরিচালনা করেন না। বরং তিনি এমন নিয়ম স্থাপন করেছেন, যার ফলে প্রকৃতি নিজেই নিজের কাজ করে।

জ্ঞান যত বাড়ে, ঈশ্বরের ভূমিকা তত বদলায়। আগে যাকে আমরা প্রতিটি ঘটনার সরাসরি নিয়ন্ত্রক ভাবতাম, এখন তাকে দেখি নিয়মের স্রষ্টা হিসেবে – যিনি কাঠামো তৈরি করে দিয়েছেন, আর সেই কাঠামোর মধ্যেই সবকিছু ঘটে চলেছে।

আগে মানুষ ভাবত ভূমিকম্প ঈশ্বরের ইচ্ছায় হয়। পরে জানা গেল – টেকটোনিক প্লেটের গতির ফল। আগে ভাবত গ্রহের গতি ঈশ্বরের হাতে। এখন জানি – মহাকর্ষ ও গতির নিয়মই এগুলো চালায়।

প্রাণের উৎপত্তি এখনো রহস্যময়, কিন্তু এককোষী প্রাণ থেকে বৈচিত্র্যময় জীবজগতের বিবর্তন আমরা মোটামুটি বুঝতে পেরেছি। অতীতে জ্ঞান কম ছিল বলে গাছের পাতা পড়াকেও “ঈশ্বরের কাজ” ভাবা হতো।

মানুষের জ্ঞান যত কম, তার ঈশ্বরও তত ছোট – খুচরা কাজে ব্যস্ত। জ্ঞান যত বাড়ে, ঈশ্বরের ধারণাও তত বিস্তৃত হয় – তিনি তখন নিয়মের স্রষ্টা, ক্ষুদ্র ঘটনার পরিচালক নন।

যেমন ৪৯টি অক্ষর আর একটি ব্যাকরণ বই দিয়ে পুরো বাংলা সাহিত্য গড়ে ওঠে, তেমনি কয়েকটি মৌলিক নিয়ম দিয়ে পুরো মহাবিশ্বের জটিলতা তৈরি হতে পারে। ঢালু পথে পানি ছেড়ে দিলে নদী, ঝর্ণা, সাগর – সবই তৈরি হয়। আলাদা করে প্রতিটি ঢেউকে নির্দেশ দিতে হয় না।

তাই জ্ঞান অর্জন জরুরি। অজ্ঞানতা দূর করা জরুরি। যুক্তি দিয়ে ঈশ্বরকে পাওয়া যাবে না, কিন্তু জ্ঞান আপনাকে তাঁর ধারণাকে আরও গভীর ও পরিণতভাবে বুঝতে সাহায্য করবে।

তবু প্রশ্ন রয়ে যায় – কেউ ঈশ্বরের অস্তিত্বে শতভাগ নিশ্চিত, কেউ আবার সম্পূর্ণ অনিশ্চিত। কেন এই একটিমাত্র বিষয় নিয়ে এত বিতর্ক, এত সংঘর্ষ?

দ্বন্দ্ব আসলে বাইরে নয় – আমাদের মাথার ভেতরেই। আমাদের সীমাবদ্ধ চিন্তা, সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি, আর অহংকারের কারণে আমরা নিজেরাই নিজেদের ফাঁদে আটকে যাই। যারা জ্ঞানহীন অথচ আত্মবিশ্বাসে টইটম্বুর, তারা নিজেদের ছোট্ট বোধের আয়নাটাকেই মহাবিশ্বের শেষ সত্য ভেবে বসে থাকে। আমরা ক্ষুদ্র প্রাণী, অথচ আচরণ করি যেন পৃথিবী আমাদের ইশারায় চলে। এই আত্মম্ভরিতা দেখতে সত্যিই বিব্রত লাগে – যেমন কারো গায়ে যা মানায় না, তেমন কিছু জোর করে চাপিয়ে দিলে যেমন হাস্যকর লাগে।

অনেকে বলেন – “দুই পক্ষই দোষী, এক হাতে তো তালি বাজে না।” কিন্তু তালি বাজানো আর সংঘর্ষ – দুটো এক জিনিস নয়। দুটি হাত যখন মিলেমিশে শব্দ তোলে, সেটা আনন্দের প্রকাশ। কিন্তু একটি হাত স্থির, আর অন্যটি যদি আঘাত করে – সেটা তালি নয়, সেটা সংঘাত।

এভাবেই তর্কের নামে দুই পক্ষ একে অপরকে আঘাত করে, আর তাতে আনন্দ বা শ্রদ্ধা কিছুই জন্মায় না – শুধু বিরোধ বাড়ে। যেমন ফুটবল সমর্থকদের অন্ধ উন্মাদনা – ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা নিয়ে গলা ফাটানো, অথচ আসল সমস্যার সমাধান কোথাও নেই।

আজকের পৃথিবীতে তিন ধরনের মানুষ দেখা যায় যারা সৃষ্টিকর্তার বিষয়ে –

  • একদল দৃঢ়ভাবে বলে “আছে”, তারা বিশ্বাস থেকে বলেন, বিশ্বাস কোন যুক্তি মানে না।
  • আরেকদল সমান জোরে বলে “নেই”, তারা অজ্ঞানতা ও ভয় থেকে জন্ম নেওয়া ঈশ্বর-ধারণাকে প্রত্যাখ্যান করেন।
  • আর মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে একদল যারা বলে – “এখনো জানি না, জানতে চাই।” এরা সবচেয়ে সৎ, সবচেয়ে বুদ্ধিমান অবস্থানে থাকে। কারণ সত্যিকারের জ্ঞান শুরু হয় এখান থেকেই।

এই তৃতীয় দলটিকে আমি সবচেয়ে বেশি সম্মান করি। কারণ তারা নিজেদের সীমা বোঝে, অজানাকে স্বীকার করে, আর জানার চেষ্টা চালিয়ে যায়। যখন জানে না, তখন সোজাসুজি বলে – “জানি না।” এরা কারো কথা নকল করে না, অর্ধসত্য দিয়ে চালিয়ে দেয় না। এদের সততা ও আত্মসম্মানই তাদের বড় শক্তি।

দ্বিতীয় দলটিকে আমি দোষ দেই না। তারা মূলত প্রথম দলের সরলীকৃত ঈশ্বর-ধারণাকে প্রত্যাখ্যান করে।
তাদের যুক্তি – যে ধারণার জন্ম ভয় ও অজ্ঞতা থেকে, তাকে মহৎ করে তোলার প্রয়োজন নেই। সময় ও অভিজ্ঞতার সাথে সাথে এদের অনেকেই তৃতীয় দলের দিকে এগিয়ে যায়।

প্রথম দলটি সবচেয়ে বেশি সমস্যার সৃষ্টি করে। কারণ তারা জ্ঞানচর্চায় আগ্রহী নয়, কিন্তু নিজেদের বিশ্বাস অন্যের উপর চাপিয়ে দিতে খুবই উৎসাহী। কে কোন বই পড়ছে, কে কোন আচার মানছে – এসব নিয়ে তারা অযথা নাক গলায়। এটা ব্যক্তিস্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ ছাড়া আর কিছুই নয়।

তবে বাস্তবতা এত সরল নয়। মানুষ তিনটি আলাদা বাক্সে ভাগ হয়ে থাকে না। অনেকেই মাঝামাঝি জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে, আবার দুই মেরুর মানুষও একসাথে সংসার করে ফেলে। প্রথম দলের মধ্যেও অসংখ্য উপদল আছে, যারা আবার একে অপরকে নাকচ করে।

মানুষের বিশ্বাস, মত, অবস্থান – সবই পরিবর্তনশীল। এ কারণেই মানবসভ্যতা এখনো টিকে আছে। ৮০০ কোটি মানুষের ৮০০ কোটি বিশ্বাস – এটাই স্বাভাবিক। যেমন ভাষা, পোশাক, খাদ্যাভ্যাস, ত্বকের রং, ভৌগলিক অবস্থান ভিন্ন – তেমনি বিশ্বাসও ভিন্ন। একজন গোঁড়া ধার্মিকের মনেও কোথাও না কোথাও লালনের মানবতাবাদ লুকিয়ে থাকে।

মানুষ একে অপরের দ্বারা প্রভাবিত হয় – এটাই প্রকৃতির নিয়ম। জীবন এভাবেই চলে – তারপর একদিন সব শেষ হয়ে যায়। আমরা ভাবি আমরা বড় কিছু, অথচ সত্য হলো – আমরা কেউই পৃথিবীতে এমন কিছু রেখে যেতে পারি না যা নিয়ে গর্ব করা যায়।

শেষে সবাই মিশে যায় প্রকৃতির অন্ধকারে – নাম-চিহ্নহীন, স্মৃতিহীন। ধুলিকণার চেয়েও ক্ষুদ্র আমাদের মূল্য। তবুও জীবন চলে – আনন্দ, বেদনা, আশা, হতাশা নিয়ে।

আমরা জানিই না আমাদের তিন-চার পুরুষ আগের পূর্বপুরুষ কারা ছিলেন। তারা কী সংগ্রাম করে আমাদের অস্তিত্ব তৈরি করেছেন – সেসব নিয়ে ভাবার সময়ও নেই।

আমাদের পরেও অসংখ্য প্রজন্ম আসবে। তারা নতুন রোগ, নতুন দুর্ভোগ, নতুন সংকটের মুখোমুখি হবে। আর আমরা তাদের জন্য রেখে যাচ্ছি জঞ্জালের পাহাড় – দূষণ, বনহানি, জলবায়ু বিপর্যয়। আমরা ভবিষ্যতের খাবার, পানি, বাতাস – সবকিছু আগেভাগেই খেয়ে শেষ করে দিচ্ছি।

আমরা নিজেদের বুদ্ধিমান ভাবি, অথচ সেই বুদ্ধি দিয়ে পৃথিবীকে ধ্বংস করছি। বন কেটে সোলার প্যানেল বসাই – যেখানে গাছই তো সূর্যের আলোকে শক্তিতে রূপান্তর করত। জঙ্গল ভেঙে রাস্তা বানাই, প্রাণীদের আবাসস্থল ধ্বংস করি।

আমাদের সামর্থ্য ছিল – কিন্তু আমরা তা অপব্যবহার করেছি। পৃথিবীর ক্ষুদ্রতম অনুজীবেরও বেঁচে থাকার অধিকার আছে। মাত্র এক লক্ষ বছরে মানুষ যা করেছে, তাতে পৃথিবী যেকোনো সময় প্রতিশোধ নিতে পারে।

একটি বিশাল সিস্টেম যখন ভেঙে পড়তে শুরু করে, তখন মানুষ তাকে থামাতে পারে না।
আর ভেঙে পড়ার আগের দিন পর্যন্তও মনে হয় – “কিছুই হবে না।”

বিশ্ব ও পৃথিবীর বয়সের তুলনায় মানুষের অস্তিত্ব খুব অল্প সময়ের। এর আগে পৃথিবীতে কত পরিবর্তন হয়েছে, কত প্রাণী প্রজাতি চিরতরে হারিয়ে গেছে। বিবর্তনের ধারায় আবার হয়তো নতুন কোন প্রজাতি আসবে, হয়তো মানুষেরই একাধিক প্রজাতি এক সময় পৃথিবীতে বিরাজ করবে, কয়েক হাজার বছর আগে যেমনটি ছিল – বেশ কয়েক মানুষ্য প্রজাতি।

তাহলে সত্যটা কী?

সত্য হলো – আমরা এখনো জানি না মহাবিশ্বের চূড়ান্ত কারণ কী।

  • হয়তো কোনো স্রষ্টা আছে।
  • হয়তো নেই।
  • হয়তো আছে, কিন্তু আমাদের ধারণার মতো নয়।
  • হয়তো মহাবিশ্ব নিজেই স্বয়ংসম্পূর্ণ।
  • হয়তো এমন কোনো নিয়ম আছে যা আমরা এখনো বুঝিনি।

অজানা মানেই “স্রষ্টা নেই” নয়।
অজানা মানেই “স্রষ্টা আছেন” – এটাও নয়।
অজানা মানে শুধু অজানা।

Related Posts

The Ongoing Aggression of Islam

From Somnath to Joypurhat – The Shadow of a Thousand‑Year‑Old Destruction Still Exists Today

The first blow On the Saurashtra coast of Gujarat, where the waves of the ArabianRead More

The Ongoing Aggression of Islam

সোমনাথ থেকে জয়পুরহাট – এক সহস্রাব্দের পুরনো ধ্বংসের ছায়া আজও বিদ্যমান

প্রথম আঘাত গুজরাটের সৌরাষ্ট্র উপকূলে, যেখানে আরব সাগরের ঢেউ এসে আছড়ে পড়ে পাথুরে তটে, সেখানেRead More

For 125 years, the Islamic world has been spinning on the basis of a single false key!

Once I was listening to a sermon by Professor Mufti Kazi Ibrahim Huzur where heRead More

Comments are Closed