Planning
Indonesia Bangladesh and Islam

Indonesia Bangladesh and Islam

ইন্দোনেশিয়া, বাংলাদেশ ও ইসলামঃ ইসলাম কি কোথাও শান্তিতে থাকতে দেয়?

গত পরশু ১১ তারিখে ইন্দোনেশিয়া থেকে আমার (ও পরে আমার বন্ধু আবু সাঈদের) এক বান্ধবী এসেছে ঢাকায়। ইলেন আমার চেয়ে বয়সে কয়েক বছরের বড়। দীর্ঘদিন ধরে উনি আমার সোস্যাল মিডিয়া ফ্রেন্ড। সঙ্গে উনার আর এক কলিগ সুরি এসেছেন। ইলেন খ্রিস্টান, সুরি হিজাবী মুসলিম, ইন্দোনেশিয়ার মুসলিম নারীরা যেমন হিজাব করেন তেমন বেশ। উনারা ইন্দোনেশিয়ার সরকারী কর্তা, জাকার্তা সিটির ট্রান্সপোর্ট প্ল্যানার। জাতিসংঘের আয়োজনে এক ট্রান্সপোর্ট বিষয়ক ট্রেনিং এ এসেছেন ঢাকাতে।

যথারিতী বিদেশীরা বাংলাদেশে আসলে সাধারনত আড়ংয়ে যায়। আমি ও আমার এক সাবেক কলিগ বন্ধু গেলাম গুলশান আড়ং এ তাদের সঙ্গে দেখা করতে। ঢাকা শহরের যে জ্যাম, মিটিং টাইমের অনেক পরে পৌঁছাতে পেরেছিলাম।

ইলেন কোন একজনের সঙ্গে ফোনে কথা বলছিলেন, তাকে বলছেন – ঢাকা হলো তেমন, জাকার্তা ৩০ বছর আগে যেমন ছিলো। শুনে একটু ধাক্কা খেলাম। মাত্র এক দিনেই এই অর্জার্ভেশান? কিন্তু যেহেতু আরবান প্ল্যানারের চোখ, এ্যাভয়েড করার তো উপায় নেই। আমার জন্য বিষয়টা ছিলো লজ্জার, তুলনামূলক কিছুটা পিছিয়ে থাকা অর্থনীতির দেশের রাজধানী তাদের রাজধানী থেকে ব্যবস্থাপনায় ৩০ বছর পিছিয়ে? সে বারিধারা ডিপ্লোম্যাটিক জোনের মতো অভিজাত এলাকায় থাকছে। তবে বসুন্ধরা সিটি, আড়ং এসব যাওয়ার কারনে ট্র্যাফিকে বসে তার উপলব্ধি হয়েছে ঢাকা এখন ৩০ বছর আগের জাকার্তার মতো। জাকার্তা ইন্দোনেশিয়ার রাজধানী, আর ঢাকা বাংলাদেশের। আমি ইউটিউবে জাকার্তার বিভিন্ন সময়ের বেশ কিছু ভিডিও দেখলাম। ১৯৮০ এর দশকে জাকার্তার ট্র্যাফিক ছিলো ঢাকার মতো, কিন্তু এখন আর তেমনটি নেই। অথচ আমাদের ঢাকা ? কমপক্ষে ২০/৩০ গুণ ট্র্যাফিক জ্যাম বেড়েছে ঢাকাতে, কিন্তু ব্যবস্থাপনার মান দিন দিন খারাপ হচ্ছে আরো। ওরা এগিয়ে যাচ্ছে আর আমরা পিছিয়ে যাচ্ছি। আপনি যদি এখান থেকে ৫০/৬০ বছরের আগের কোন ভিডিও দেখেন তবে ইন্দোনেশিয়ার বিস্তৃর্ণ অঞ্চলে দেখবেন মেয়েরা কোমরের উপরে কোন পোশাকই পরত না। সেই ইন্দোনেশিয়াও আজ বাংলাদেশের চেয়ে সম্পদে, সিস্টেমে, উন্নতিতে আমাদের পিছনে ফেলে দিয়েছে কয়েকগুণ। এই ভিডিওটি ১৯৮৬ সালের জাকার্তা – https://fb.watch/HA27OTtKwm/

যেহেতু দূরদেশ থেকে অনেকদিনের পরিচিত বন্ধু এসেছে, বাঙালি আতিথেয়তা তো দিতেই হয়। পরদিন, গতকাল সারাদিন ছিল ঢাকার বিভিন্ন স্পটে ঘোরানোর প্ল্যান, দুপুরে খাবে আমার বাসায়। বাসার খালাকে বললাম সরিষা ইলিশসহ কিছু কিছু রান্না করতে। ঢাকা ইউনিভার্সিটি ছিল মিটিং পয়েন্ট, এরপর ঢাকেশ্বরী, লালবাগ কেল্লা, নিউমার্কেট, গাউসিয়া, তাজমহাল রোড, টোকিও স্কয়ার হয়ে বাসায় ফিরতে ফিরতে দুপুরের খাওয়ার সময় শেষ! আবার আব্বা আবার খুব কৌতুহলী, আবার ইসলাম প্রিয় মানুষ, উনি মুসিলিম মেয়ে সুরির সঙ্গে আড্ডা জমিয়ে দিয়েছেন। ইন্দোনেশিয়ায় মুসলমানরা কেমন আছে, তারা কি করেন, কিভাবে করেন – এসব। আমি ওয়াশরুমে গিয়ে হাত মুখ ধুয়ে খেয়ে নিতে বলার পর সুরি বলে ওর পিরিয়ড চলছে, এখন সে বাথ নিবে না। ইংরেজি মনে হয় ঠিকমতো বুঝতে পারেনি। তবে একটি জিনিস বুঝলাম, এরা যে কারো সামনে অবলীলায় বলে দিতে পারে যে পিরিয়ড চলছে।

এখানেই ইসলামী সংস্কৃতির পার্থক্য বাংলাদেশ ও ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশে। নারীর একটা খুব রেগুলার বায়োলজিক্যাল ফ্যাক্টর তাদের কাছে কোন ট্যাবু না। বাংলাদেশে যেমন সেগুলো গোপন বিষয়। নারীরা অফিসে, স্কুলে, কলেজে, বিশ্ববিদ্যালয়ে, কর্মক্ষেত্রে, যানবাহনে কোথাও এই কথা বলতে পারে না যে তার এক্সট্রা সেফটি ও কেয়ার দরকার, মুখ বুঝে অনেক অসুবিধা মেনে নেয়। কারন সমাজের দৃষ্টিভঙ্গিটাই এমন। কোন নারী ফার্মেসিতে গিয়ে সরাসরি সেনিটারী প্যাড চাইতে পারে না, তার সেফটি ইকুইপমেন্ট চাইতে পারে না, তাকে পরিবারের অন্য কারো দারস্থ হতে হয় সাধারনত। আবার বাসে, ট্রেনে, অফিসে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে একটু এক্সটা সুবিধা দাবী করলে কিছু পুরুষ সঙ্গে সঙ্গে বলবে – নারীরা না পুরুষের সমান অধিকার চায়, নারী অধিকার চায়, তাহলে তারাও পুরুষের মতো একইভাবে যাক বা কাজ করুক। কিন্তু এই বোধটা তাদের হয় না, নারীদের এই বাড়তি বায়োলজিক্যাল সমস্যা বয়ে বেড়াতে হয় মনুষ্য প্রজাতির ধারাবাহিকতা রক্ষার তাগিদেই।

খ্রিস্টান ইলেন ও মুসলিম সুরির মধ্যে চমৎকার সম্পর্ক থাকলেও ইন্দোনেশিয়ায়ও ইসলামী উগ্রবাদ বাড়ছে। ইন্দোনেশিয়া বিশ্বের সবচেয়ে বড় মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হলেও সাংখিকভাবে এটি একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র, যেখানে ৬টি প্রধান ধর্মকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে (ইসলাম, প্রোটেস্ট্যান্ট, ক্যাথলিক, হিন্দু, বৌদ্ধ এবং কনফুসীয় ধর্ম)। দেশটির জাতীয় নীতি হলো “ভিন্নতার মধ্যে ঐক্য” (Bhinneka Tunggal Ika)। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইন্দোনেশিয়ায় রক্ষণশীল ইসলামের প্রভাব বৃদ্ধি পেয়েছে। কিছু কট্টরপন্থী দল অন্য ধর্মের মানুষদের প্রতি এবং ইসলামেরই অন্যান্য উপদলের (যেমন: শিয়া বা আহমদিয়া) প্রতি অসহিষ্ণুতা প্রদর্শন করে থাকে।

ইসলাম থাকলে সমস্যা তো থাকবেই। দেশটিতে যথারীতি বিতর্কিত ধর্ম অবমাননা আইন রয়েছে। সমালোচকদের মতে, এই আইনটি প্রায়শই ধর্মীয় সংখ্যালঘু বা ভিন্নমতাবলম্বীদের কণ্ঠরোধ করতে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ ছিল জাকার্তার সাবেক খ্রিস্টান গভর্নর ‘আহক’ (Basuki Tjahaja Purnama)-এর কারাদণ্ড, যা আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। ২০১৭ সালের গভর্নর নির্বাচনের প্রচারণার সময় জাকার্তার কাছে একটি দ্বীপে কথা বলার সময় আহক একটি মন্তব্য করেন। তিনি ভোটারদের উদ্দেশ্যে বলেন যে, কিছু লোক রাজনৈতিক ফায়দা তুলতে কোরআনের সূরা আল-মায়িদাহ-র ৫১ নম্বর আয়াত ব্যবহার করে মুসলমানদের বিভ্রান্ত করছে, যাতে বলা হয়েছে মুসলমানরা যেন অমুসলিমদের নেতা হিসেবে গ্রহণ না করে। এই সামান্য কথায় ইসলামিস্টদের অনুভূতিতে আঘাত হানে!

এই ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর ইন্দোনেশিয়ার কট্টরপন্থী ইসলামিক দলগুলো, বিশেষ করে ‘ইসলামিক ডিফেন্ডার্স ফ্রন্ট’ (FPI), আহকের বিরুদ্ধে দেশজুড়ে তীব্র আন্দোলন শুরু করে। • ২ ডিসেম্বর, ২০১৬ জাকার্তার ইতিহাসে অন্যতম বৃহত্তম গণবিক্ষোভ ঘটে, যা ‘২১২ আন্দোলন’ নামে পরিচিত। প্রায় ২ লক্ষাধিক ইসলামিস্ট জাকার্তার রাস্তায় নেমে আসে এবং আহকের গ্রেপ্তার ও বিচারের দাবি জানায়। এই আন্দোলন এতটাই তীব্র ছিল যে তা তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জোকো উইদোদোর সরকারের ওপর বিশাল রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করে। এই তীব্র ধর্মীয় ও রাজনৈতিক মেরুকরণের সরাসরি প্রভাব পড়ে জাকার্তার গভর্নর নির্বাচনে। ব্যাপক জনপ্রিয়তা থাকা সত্ত্বেও ২০১৭ সালের এপ্রিলের নির্বাচনে আহক বিপুল ভোটে পরাজিত হন। তার পরাজয়ের মাত্র কয়েক সপ্তাহ পর, ৯ মে ২০১৭ তারিখে ইন্দোনেশিয়ার একটি আদালত তাকে বিতর্কিত ব্লাসফেমি (ধর্ম অবমাননা) আইনে দোষী সাব্যস্ত করে ২ বছরের কারাদণ্ড দেয়। রায়ের পরপরই তাকে সরাসরি কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়। ইন্দোনেশিয়া আপাত উদার গনতান্ত্রিক দেশ হলেও সেখানে মুসলমানরা থাকবে আর তাদের অনুভূতি আহত হবে না, তা কি হয়?

ইন্দোনেশিয়ায় নতুন কোনো গির্জা বা মন্দির নির্মাণ করতে গেলে স্থানীয় বাসিন্দাদের একটি বড় অংশের স্বাক্ষর এবং সরকারের বিশেষ অনুমতির (PBM) প্রয়োজন হয়। সংখ্যালঘু খ্রিস্টান বা হিন্দু সম্প্রদায়ের জন্য এই অনুমতি পাওয়া প্রায়শই বেশ কঠিন হয়ে পড়ে, এবং অনেক সময় অবৈধভাবে উপাসনালয় বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনাও ঘটে। মূলধারার সুন্নি মুসলিমদের বাইরে থাকা আহমদিয়া এবং শিয়া সম্প্রদায়কে অনেক সময় “বিপথগামী” আখ্যা দিয়ে তাদের ওপর সামাজিক ও আইনি চাপ সৃষ্টি করা হয়। কিছু এলাকায় তাদের মসজিদ ভাঙচুর বা তাদের এলাকা ছাড়তে বাধ্য করার নজির রয়েছে।

যদিও পুরো দেশ ধর্মনিরপেক্ষ আইনে চলে, তবে আচেহ (Aceh) প্রদেশকে বিশেষ স্বায়ত্তশাসন দেওয়া হয়েছে যেখানে কঠোর শরিয়া আইন চালু আছে। সেখানে জুয়া খেলা, মদ্যপান বা সমকামিতার জন্য প্রকাশ্যে বেত্রাঘাতের মতো শাস্তি দেওয়া হয়, যা অনেক সময় মানবাধিকার ও ধর্মীয় স্বাধীনতার পরিপন্থী হিসেবে সমালোচিত হয়। এই প্রদেশে আবার ধর্ষণের হার সর্বোচ্চ। শরিয়া আইনে ধর্ষিতাকেই ধর্ষণ প্রমানের দায়িত্ব নিয়ে হয়, না হলে উল্টো তাকে শাস্তি পাওয়ার অসংখ্য রেকর্ড আছে।

Related Posts

Is the Earth and the universe orderly? Has everything been created only for humans?

Many Muslim people argue by saying, look, how orderly the earth and the universe are,Read More

পৃথিবী ও মহাবিশ্ব কি সুশৃঙ্খল? সব কিছু কী মানুষের জন্যই সৃষ্টি করা হয়েছে?

অনেক মুসলিম লোকেরা যুক্তি দিয়ে বলেন, দেখ, পৃথিবী ও মহাবিশ্ব কত সুশৃঙ্খল, কি নিখুঁতভাবে সবRead More

Islamic Clothing for Women is Harmful

Hijab, niqab and burqa: these restrictive garments for women offer no benefit except harm

Among the roughly 1.8 to 2 billion Muslims in the world, a significant portion ofRead More

Comments are Closed