
Glory Driven Illusion
গ্লোরি-ড্রিভেন ইলিউশনঃ বাংলাদেশের মিডিয়ার তৈরি করা বিভ্রম এবং মানুষের চিন্তাশক্তির ধ্বংস
বাংলাদেশের মিডিয়া, বিশেষ করে ইউটিউব-নির্ভর সংবাদ পরিবেশ, এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে তথ্য নয়, বরং আবেগই প্রধান পণ্য। দর্শক কী শুনতে চায়, কী দেখতে চায়, কোন গল্পে তারা আবেগে ভাসে—এই সবকিছুর ওপর ভিত্তি করে কনটেন্ট তৈরি হয়। এর ফলে জন্ম নেয় গ্লোরি-ড্রিভেন ইলিউশন, অর্থাৎ এমন এক গৌরব-নির্ভর বিভ্রম যেখানে বাস্তবতা যতই ভয়াবহ হোক না কেন, মিডিয়া এমনভাবে খবর সাজায় যেন “আমাদের পক্ষ” সবসময় জিতছে, প্রতিপক্ষ দুর্বল হয়ে পড়ছে, আর বিশ্ব রাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটছে। এই বিভ্রম শুধু ভুল তথ্য নয়—এটি মানুষের চিন্তাশক্তি, সহানুভূতি এবং বাস্তবতা-বোধকে ধীরে ধীরে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
ইসরায়েল–গাজা যুদ্ধ এবং সাম্প্রতিক ইরান–ইসরায়েল সংঘাত এই প্রবণতার সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ। গাজায় যখন হাজার হাজার মানুষ মারা যাচ্ছিল, শহর ধ্বংস হয়ে যাচ্ছিল, তখন বাংলাদেশের অনেক ইউটিউব চ্যানেল এমনভাবে খবর পরিবেশন করছিল যেন প্রতিটি ছোট প্রতিরোধই একটি “ঐতিহাসিক বিজয়”। একটি ট্যাংক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া, একটি ড্রোন ভূপাতিত হওয়া, বা কয়েকজন সৈন্য হতাহত হওয়া—এসব ঘটনাকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয় যেন যুদ্ধের মোড় ঘুরে গেছে। একইভাবে ইরানের ওপর ব্যাপক হামলার পরও অনেক মিডিয়া এমন বর্ণনা দেয় যে ইরান নাকি “মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্য বদলে দিয়েছে”, যদিও বাস্তবে দেশটির সামরিক অবকাঠামো, অর্থনীতি এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই ধরনের কনটেন্ট দর্শকের আবেগকে উসকে দেয়, কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি বোঝার ক্ষমতাকে দুর্বল করে।
এই প্রবণতা নতুন নয়। ১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধ এবং ২০০১ সালের ইরাক যুদ্ধের সময়ও বাংলাদেশের মিডিয়া একই ধরনের বিভ্রম তৈরি করেছিল। তখন সংবাদপত্র ও টিভি চ্যানেলগুলো এমনভাবে খবর পরিবেশন করত যে মনে হতো ইরাক নাকি যুক্তরাষ্ট্রকে প্রায় হারিয়েই ফেলেছে। অনেক মানুষ সত্যিই বিশ্বাস করেছিল যে ইরাক “জিতে যাচ্ছে”, যদিও বাস্তবে দেশটি কয়েক দিনের মধ্যেই ভেঙে পড়েছিল। আজকের ডিজিটাল যুগে সেই পুরোনো প্রবণতা আরও শক্তিশালী হয়েছে, কারণ এখন মিডিয়ার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অ্যালগরিদম—যা মানুষের আবেগকে লক্ষ্য করে কনটেন্ট সাজায়। ফলে মানুষ যা দেখতে চায়, মিডিয়া সেটাই দেখায়; আর যা দেখা উচিত, তা অদৃশ্য হয়ে যায়।
বাংলাদেশের মিডিয়া এই বিভ্রম তৈরি করে মূলত ভিউ, সাবস্ক্রাইবার, জনপ্রিয়তা এবং বিজ্ঞাপনের আয় বাড়ানোর জন্য। সত্য দেখালে ভিউ কমে, কিন্তু গৌরবের গল্প দেখালে ভিউ বাড়ে। ফলে মিডিয়া সত্য নয়, ভিউয়ের পেছনে দৌড়ায়। এই দৌড়ের মধ্যে তারা দর্শকের আবেগকে পুঁজি করে, তাদের অজ্ঞতাকে ব্যবহার করে, এবং তাদের চিন্তাশক্তিকে ধীরে ধীরে দুর্বল করে। মিডিয়া জানে—মানুষ বাস্তবতা দেখতে চায় না; তারা এমন গল্প চায় যা তাদের পরিচয়, ধর্মীয় আবেগ, বা রাজনৈতিক পক্ষপাতকে তৃপ্ত করে। তাই মিডিয়া সেই গল্পই পরিবেশন করে, যদিও তা বাস্তবতার সঙ্গে সামান্যতম সম্পর্কও না থাকতে পারে।
এই গ্লোরি-ড্রিভেন ইলিউশন মানুষের চিন্তাশক্তিকে গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। প্রথমত, এটি ক্রিটিক্যাল থিংকিং ধ্বংস করে। যখন মানুষ বারবার “আমরা জিতছি” ধরনের গল্প দেখে, তখন তারা আর প্রশ্ন করে না—কী সত্য, কী মিথ্যা, কোন তথ্য যাচাই করা উচিত, কোনটি আবেগ দিয়ে সাজানো। তারা তথ্য নয়, আবেগের ওপর ভিত্তি করে মতামত গঠন করে। দ্বিতীয়ত, এটি মানুষকে বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন করে। গাজা বা ইরানের সাধারণ মানুষের দুর্দশা, মানবিক বিপর্যয়, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা—এসব মানুষের চোখে পড়ে না, কারণ মিডিয়া তাদের সামনে শুধু “বিজয়ের গল্প” তুলে ধরে। তৃতীয়ত, এটি মানুষের সহানুভূতি কমিয়ে দেয়। যখন যুদ্ধকে “বিজয়” হিসেবে দেখানো হয়, তখন মানুষের মন যুদ্ধের ভয়াবহতা নয়, বরং প্রতীকী প্রতিরোধে আনন্দ খুঁজে পায়। ফলে অন্যের কষ্ট অনুভব করার ক্ষমতা কমে যায়।
সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো—এই বিভ্রম মানুষকে সহজে নিয়ন্ত্রণযোগ্য করে তোলে। যখন জনগণ বাস্তবতা দেখতে পায় না, তখন তারা নীতিনির্ধারকদের সিদ্ধান্ত, আন্তর্জাতিক রাজনীতি বা মানবিক সংকট সম্পর্কে সঠিক মূল্যায়ন করতে পারে না। তারা আবেগের ওপর ভিত্তি করে মতামত গঠন করে, যুক্তির ওপর নয়। মিডিয়া এই দুর্বলতাকে ব্যবহার করে ভিউ, সাবস্ক্রাইবার এবং জনপ্রিয়তা বাড়ায়। কারণ সত্য দেখালে ভিউ কমে, কিন্তু গৌরবের গল্প দেখালে ভিউ বাড়ে। ফলে মিডিয়া সত্য নয়, ভিউয়ের পেছনে দৌড়ায়—আর মানুষ ধীরে ধীরে বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে।
এই বিভ্রমের আরেকটি ভয়াবহ দিক হলো—এটি সমাজে বিভাজন তৈরি করে। যখন সবাই “আমরা জিতছি” ন্যারেটিভে বিশ্বাস করে, তখন ভিন্নমতকে শত্রু মনে করে। যুক্তি, তথ্য, বিশ্লেষণ—এসবের জায়গায় আবেগ, রাগ, এবং পরিচয়-নির্ভর প্রতিক্রিয়া জায়গা করে নেয়। ফলে সমাজে যুক্তিনির্ভর আলোচনা কমে যায়, আর আবেগ-নির্ভর চিৎকার বাড়ে। এই পরিবেশে সত্য বলা বিপজ্জনক হয়ে ওঠে, কারণ সত্য মানুষের আবেগকে আঘাত করে। তাই মানুষ সত্য এড়িয়ে চলে, আর মিডিয়া সত্য লুকিয়ে রাখে।
শেষ পর্যন্ত, গ্লোরি-ড্রিভেন ইলিউশন শুধু ভুল তথ্য নয়—এটি একটি মানসিক কাঠামো, যা মানুষের চিন্তা, সহানুভূতি, বাস্তবতা-বোধ এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। বাংলাদেশের মিডিয়া যখন ভিউ ও জনপ্রিয়তার জন্য এই বিভ্রমকে পণ্য হিসেবে বিক্রি করে, তখন তারা শুধু দর্শককে ভুল তথ্য দেয় না—তারা দর্শকের মস্তিষ্ককে এমনভাবে গড়ে তোলে যাতে সত্য আর মিথ্যার পার্থক্য করার ক্ষমতাই ধীরে ধীরে হারিয়ে যায়। এই প্রবণতা যতদিন চলবে, ততদিন জনগণ বাস্তবতা থেকে আরও দূরে সরে যাবে, আর মিডিয়া আরও বেশি ক্ষমতাশালী হয়ে উঠবে।
Related Posts

Islam and the Qur’an must go through reform, otherwise Islam will be pushed aside
Historically, Islamic jurisprudence or classical fiqh developed within a specific social and political context, whichRead More

ইসলাম ও কোরআনকে রিফর্মের মধ্য দিয়ে যেতে হবে অথবা ইসলাম ছিটকে পড়বে
ঐতিহাসিকভাবে ইসলামি আইনশাস্ত্র বা ক্লাসিক্যাল ফিকহ একটি নির্দিষ্ট সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে গড়ে উঠেছিল, যাRead More

Reading the Qur’an, its translations, tafsir, sirah and hadith – no person with common sense can remain in Islam
Will you continue to remain a blind believer? Blind faith prevents a person from seeingRead More

Comments are Closed