
Failure of Islamic Models
মধ্যযুগের মুসলিম শাসকেরা কেন সবাইকে মুসলমান বানাননি? নবী মুহাম্মদের ভ্রান্ত, অমানবিক নীতি ছিল অবাস্তব, অদূরদর্শী
নবী মুহাম্মদের চিন্তা ছিল খুবই সংকীর্ণ, একটা নির্দিষ্ট অঞ্চল কেন্দ্রিক যাদের আবার স্থায়ী কোন রাষ্ট্র কাঠামো ছিল না, বাইরের সভ্যতা ও সাম্রাজ্যগুলোর সঙ্গে কোন সংযোগ ছিল না। তপ্ত, রুক্ষ, দূর্ভিক্ষপীড়িত আরবের যাযাবর উপজাতিদের বসতি, খাবার-দাবার, অর্থনীতি, যৌনতার লালসা এসবের বাইরে নবী মুহাম্মদ সর্বজনীন কিছু চিন্তা করতে পারেননি। যার কারনে ইসলামী শাসকেরাই তার অনেক নীতিকে বাস্তবতার নিরিখে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিলেন এবং তার তরবারির জোরে ইসলামের প্রসারের চিন্তার বদলে তারা অমুসলিমদের টিকিয়ে রাখার ব্যাপারে মনযোগী হয়েছিলেন। মধ্যযুগীয় ইসলামী সাম্রাজ্যগুলোর ইতিহাস গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায় যে, ইসলামের নবী মুহাম্মদ ও আল্লাহর আদর্শিক বা ধর্মীয় সম্প্রসারণের নীতির চেয়ে “অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বাস্তববাদ” (Economic & Political Pragmatism) শাসকদের কাছে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। রাজস্ব (জিজিয়া) রক্ষা এবং দাস অর্থনীতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখার জন্য শাসকেরা অনেক সময় ঢালাও ধর্মান্তরকরণের নীতি থেকে দূরে সরে এসেছিলেন, সেটা ইসলামের কোন সৌন্দর্য্য বা উদারতা ছিল না – তা ঐতিহাসিক তথ্য, উপাত্ত ও নির্দিষ্ট উদাহরণ দিয়ে সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ করা সম্ভব।
উমাইয়া খিলাফতঃ ধর্মান্তরিতদের উপর জোরপূর্বক জিজিয়া আরোপ
ইসলামী তাত্ত্বিক নিয়ম অনুযায়ী, কেউ ইসলাম গ্রহণ করলে তার ওপর থেকে জিজিয়া কর মওকুফ হওয়ার কথা। কিন্তু উমাইয়া খিলাফতের সময় (৬৬১–৭৫০ খ্রিষ্টাব্দ) যখন বিজিত অঞ্চলের (মিশর, পারস্য, মেসোপটেমিয়া) অমুসলিমরা দলে দলে কর ফাঁকি দিতে ইসলাম গ্রহণ করতে শুরু করে, তখন রাষ্ট্র এক নজিরবিহীন অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে। উৎপাদনমুখী অর্থনীতির বদলে অমুসলিমদের উপর জিজিয়া আরোপ করার এই অর্থনৈতিক মডেল ফেইল করতে শুরু করলে তৎকালীন খেলাফতের লোকজনদেরই হুশ ফিরতে শুরু করেছিল।
হাজ্জাজ বিন ইউসুফের নীতি (ইরাক ও পারস্য):
ইরাকের উমাইয়া গভর্নর হাজ্জাজ বিন ইউসুফ (৬৯৪-৭১৪ খ্রিষ্টাব্দ) দেখেন যে, পারস্যের কৃষকেরা জমি ফেলে শহরে চলে আসছে এবং ইসলাম গ্রহণ করে জিজিয়া থেকে রেহাই চাচ্ছে। এতে কৃষি উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায় এবং রাজকোষ শূন্য হতে থাকে। হাজ্জাজ তখন নবী মুহাম্মদের নীতিকে বৃদ্ধাঙ্গুল দেখিয়ে আদেশ জারি করেন যে, যারা নতুন মুসলমান হয়েছে (মাওয়ালি), তাদেরও আগের মতোই জিজিয়া এবং খেরাজ (ভূমি কর) দিতে হবে এবং তাদের জোর করে আবার গ্রামে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
মিশরের গভর্নর হাইয়ান ইবনে শুরাইহঃ
অষ্টম শতাব্দীর শুরুতে মিশরে এত বিপুল পরিমাণ মানুষ ইসলাম গ্রহণ করে যে রাজস্বের ব্যাপক ঘাটতি দেখা দেয়। গভর্নর হাইয়ান খলিফা ওমর ইবনে আবদুল আজিজকে চিঠি লিখে অভিযোগ করেন, “ইসলাম গ্রহণের কারণে জিজিয়া কমে যাচ্ছে, রাজকোষ সচল রাখা অসম্ভব।” (উৎসঃ The History of the Coptic Patriarchs).
আধুনিক ইতিহাসবিদ ড. খাতিব আল-বাগদাদি এবং অন্যান্যদের গবেষণা অনুযায়ী, উমাইয়া যুগে পারস্য এবং উত্তর আফ্রিকায় প্রায় ৭০% থেকে ৮০% মানুষ প্রাথমিক শতাব্দীতে করের ভয়ে বা সামাজিক কারণে ইসলাম গ্রহণ করতে চাইলেও রাষ্ট্রীয় কোষাগার রক্ষার স্বার্থে তাদের অনেককেই আইনিভাবে পূর্ণ মুসলিমের অর্থনৈতিক সুবিধা দেওয়া হয়নি।
দিল্লি সালতানাতঃ জিয়াউদ্দিন বারানি ও “জাহানদারী” নীতি
দিল্লি সালতানাতের সময় তাত্ত্বিক উলামা (ধর্মীয় পণ্ডিতরা) সবসময় সুলতানদের চাপ দিতেন যাতে তরবারির জোরে ভারতের সমস্ত হিন্দুকে মুসলমান বানানো হয়। কিন্তু সুলতানরা খুব ভালো করেই জানতেন যে এটি করলে অর্থনীতি ধসে পড়বে।
সুলতান আলাউদ্দিন খিলজি ও কাজী মুগিসুদ্দিনের বিতর্কঃ
জিয়াউদ্দিন বারানির বিখ্যাত গ্রন্থ তারিখ-ই-ফিরুজশাহী-তে একটি ঐতিহাসিক সংলাপ রয়েছে। কাজী মুগিসুদ্দিন সুলতান আলাউদ্দিনকে বলেন শরীয়ত অনুযায়ী হিন্দুদের চরম দমন করতে। আলাউদ্দিন সরাসরি উত্তর দিয়েছিলেন যে, তিনি ধর্মীয় তত্ত্ব দিয়ে রাষ্ট্র চালান না, বরং যা রাষ্ট্রের জন্য মঙ্গলজনক (রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে) সেটাই করেন। খিলজি হিন্দুদের ওপর বিপুল কর (খেরাজ ও জিজিয়া) আরোপ করেছিলেন, কিন্তু তাদের ধর্মান্তরিত করার কোনো চেষ্টা করেননি, কারণ হিন্দু কৃষকরাই ছিল সালতানাতের আয়ের মূল উৎস।
জিয়াউদ্দিন বারানির ক্ষোভ (ফাতাওয়া-ই-জাহানদারী):
সালতানাতের প্রধান চিন্তাবিদ বারানি নিজে অত্যন্ত কট্টরপন্থী ছিলেন। তিনি তার বইতে সুলতানদের তীব্র সমালোচনা করে লিখেছেন যে, দিল্লির মুসলিম সুলতানরা কাফেরদের (হিন্দুদের) ধ্বংস করার বদলে তাদের রাজপ্রাসাদে বসবাসের অনুমতি দিচ্ছে, তাদের কাছ থেকে কর নিয়ে আনন্দ করছে এবং তাদের সুরক্ষাকে নিজেদের আয়ের উৎস বানিয়েছে। এই ঐতিহাসিক দলিলটিই প্রমাণ করে যে শাসকেরা ধর্মীয় নীতি ত্যাগ করে অর্থনৈতিক নীতি গ্রহণ করেছিলেন।
মুঘল আমলঃ রাজস্বের প্রধান স্তম্ভ এবং আওরঙ্গজেবের বৈপরীত্য
মুঘল রাজবংশ ভারতে প্রায় ৩৫০ বছর শাসন করেছে মূলত কর কাঠামোর বাস্তবসম্মত ব্যবহারের মাধ্যমে।
আকবরের কর সংস্কারঃ
সম্রাট আকবর ১৫৬৪ সালে জিজিয়া কর সম্পূর্ণ বিলুপ্ত করেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, একটি বহু-ধর্মীয় দেশে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর ওপর এই কর চাপিয়ে রাখলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নষ্ট হবে। তিনি জিজিয়ার পরিবর্তে সাধারণ রাজস্ব ব্যবস্থা জোরদার করেন।
আওরঙ্গজেবের ১৬৭৯ সালের জিজিয়া পুনরারোপ (উপাত্ত):
আওরঙ্গজেবকে অনেকে চরম কট্টরপন্থী মনে করলেও আধুনিক ইতিহাসবিদরা (যেমন হরিশচন্দ্র বা সতীশ চন্দ্র) দেখিয়েছেন যে, ১৬৭৯ সালে জিজিয়া পুনরায় চালু করার পেছনে মূল কারণ ছিল দাক্ষিণাত্যের যুদ্ধজনিত তীব্র অর্থনৈতিক সংকট।
রাজস্বের উপাত্তঃ
মুঘল নথিপত্র (যেমন মির্যাত-ই-আহমদী) অনুযায়ী, আওরঙ্গজেবের সময় জিজিয়া কর থেকে মোট রাজস্বের প্রায় ৪% থেকে ১৫% পর্যন্ত আসত (অঞ্চলভেদে)। আহমেদাবাদের মতো বাণিজ্যিক শহরে জিজিয়া থেকে যে বিপুল অর্থ আসত, তা সরাসরি সামরিক খাতে ব্যয় হতো। যদি আওরঙ্গজেব সবাইকে মুসলমান বানিয়ে ফেলতেন, তবে এই বিশাল অতিরিক্ত সামরিক তহবিল তিনি পেতেন না।
দাস ব্যবসা ও “চলমান সরবরাহের” অর্থনৈতিক বাধ্যবাধকতা
ইসলামী আইন (শরীয়ত) অনুযায়ী, কোনো স্বাধীন মুসলিমকে দাস বানানো বা ক্রীতদাস হিসেবে বাজারে বিক্রি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। দাস পাওয়ার একমাত্র বৈধ উপায় ছিল অমুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ (গনিমত) অথবা অমুসলিম অঞ্চল থেকে দাস আমদানি।
সুলতান মাহমুদ গজনভীর নিষ্ঠুর দাস ব্যবসাঃ
ইতিহাসবিদ আল-উতবি (যিনি মাহমুদের সমসাময়িক ছিলেন) তার তারিখ-ই-ইয়ামিনী-তে লিখেছেন, ১০০১-১০০২ খ্রিষ্টাব্দের পেশোয়ার অভিযানের পর প্রায় ৫,০০,০০০ (পাঁচ লাখ) ভারতীয়কে দাস হিসেবে গজনীতে নিয়ে যাওয়া হয়। গজনীর বাজারে দাসের সরবরাহ এত বেড়ে গিয়েছিল যে, একজন সাধারণ শ্রমিকের দাম মাত্র কয়েক দিরহামে নেমে এসেছিল।
দাসদের ধর্মান্তর বনাম অর্থনৈতিক মূল্যঃ
এই দাসদের একটি বড় অংশকে মধ্য এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে বিক্রি করে গজনী সাম্রাজ্য বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করত। যদি এই বিপুল জনগোষ্ঠীকে সিন্ধু বা পাঞ্জাবেই তরবারি দিয়ে মুসলমান বানিয়ে দেওয়া হতো, তবে শরীয়ত অনুযায়ী তাদের দাস বানানো বা বিক্রি করা অবৈধ হয়ে যেত। ফলে গজনী সাম্রাজ্যের দাস-ভিত্তিক বাণিজ্য অর্থনীতি সম্পূর্ণ পঙ্গু হয়ে পড়ত।
ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত
এই সমস্ত উদাহরণ ও তথ্য উপাত্ত প্রমাণ করে যে, নবী মুহাম্মদের প্রাথমিক যুগের তরবারির মাধ্যমে সামরিক সম্প্রসারণের যে তাত্ত্বিক নীতি ছিল, তা মধ্যযুগীয় বিশাল ও স্থায়ী সাম্রাজ্য পরিচালনার ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ অবাস্তব ও অসম্ভব প্রমাণিত হয়েছিল। ইসলামের সুবিধা এই যে এর শাসকেরা সময়ের প্রয়োজনে রাজনীতির স্বার্থে ইসলামের ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা দাঁড় করাতে পারে। ইসলাম যতোটা না একটা আধ্যাত্মিক ধর্ম তার চেয়ে বেশি একটা রাজনৈতিক কাল্ট। যার প্রধান লক্ষ থাকে যে কোন মূল্যে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করা ও ধরে রাখা।
একটি স্থায়ী সাম্রাজ্য চালাতে গেলে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার রাজস্ব, লক্ষ লক্ষ শ্রমিকের শ্রম এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রয়োজন হয়। মুসলিম শাসকেরা খুব দ্রুতই বুঝে গিয়েছিলেন যে, “সবাইকে মুসলমান বানিয়ে ফেলার” ধর্মীয় আবেগের চেয়ে, “অমুসলিমদের উৎপাদন ও করের ওপর চড়ে সাম্রাজ্য টিকিয়ে রাখা” অনেক বেশি লাভজনক এবং বাস্তবসম্মত। আর এই অর্থনৈতিক স্বার্থেরই জয় হয়েছিল তরবারির নীতির ওপর।
Related Posts

The Birth of Conscience: How Humans Became Moral Without Allah or Religion
It was almost seventy-five thousand years ago. A group of Neanderthals lived in the ShanidarRead More

বিবেকের জন্মঃ আল্লাহ ও ধর্ম ছাড়াই মানুষ কীভাবে নৈতিক হয়ে উঠল?
প্রায় পঁচাত্তর হাজার বছর আগের কথা। ইরাকের শানিদার গুহায় বাস করত এক দল নিয়ান্ডারথাল। সেইRead More

Why Do People Become Pedophiles? Why and How Does Islam Support Pedophilia and Severe Child Abuse?
The news that an 11-year-old child in a madrasa in Madan Upazila of Netrokona becameRead More

Comments are Closed