
Islamic Cyber Jihad
ইসলামের সাইবার জিহাদিরা কেন ভিন্নমতের মানুষকে গালি দেন, হুমকি দেন, মিথ্যা রিপোর্ট করেন?
মাওলানা আজহারি একবার ইসলামিস্টদের উপদেশ দিয়ে বলেছিলেন – তার ফেসবুক পোস্ট শেয়ার করাও ইসলামের কাজ; সেটাও আল্লাহর রাস্তায় আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষ সওয়াব পাওয়ার উপায়। অথচ ইসলামে জীবের ছবি আঁকা, ধারণ করা, ভিডিও ধারণ করা, সেগুলো প্রদর্শন করা, বেগানা নারীর শরীর দেখা – এসব সম্পূর্ণ হারাম। কিন্তু যেহেতু সেখানে ইসলাম প্রচার হয়, শেয়ার–ভিউ বাণিজ্য করে তাদের আয়ও হয়, সেহেতু তারা সেটাকে এখন হালাল করে দিয়েছেন।
আজহারি দাবি করেন, মিশর (কায়রো) থেকে কাতার যাওয়ার পথে বিমান থেকে তিনি হিমালয় পর্বত দেখেছেন। তিনি আরও দাবি করেন, নীল আর্মস্ট্রং চাঁদে গিয়ে নবী মুহাম্মদের চন্দ্র দ্বিখণ্ডিত করার ফাটল দেখেছেন, আজান শুনেছেন, পৃথিবীতে ফিরে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছেন। এসব গাঁজাখোরি কেচ্ছা যতই মিথ্যা হোক, আপনাকে শেয়ার করে আজহারির বয়ান ভাইরাল করতে হবে – এতে তার ইনকাম বাড়বে, আপনারও ইসলামের সেবা হবে। যখন আপনি ভিন্ন ধর্মের মানুষ, মুরতাদ, নাস্তিকদের হত্যা করার জন্য জিহাদ করতে পারছেন না, তখন তাদের ফেসবুক পোস্ট–প্রোফাইল তাকিয়াবাজির আশ্রয় নিয়ে ডিজেবল করে দেওয়াও ইসলামী জিহাদ। প্রয়োজনে আপনি সমপ্রেমী, ভিন্ন ধর্ম, নাস্তিক পরিচয় দিয়েও ইসলামের সেবা করার জন্য এমন কোনো নৃশংস পদ্ধতি নেই যা করবেন না – সেগুলো সব ইসলামের সেবা, আপনার ইসলামের জান্নাত প্রাপ্তির রাস্তা।
বাংলাদেশের উঠতি বয়সী অনেক তরুণ – এমনকি অনেকে যারা সেক্যুলার দেশগুলোর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন – তারাও ইসলাম, নবী মুহাম্মদ ও আল্লাহর সমালোচনা দেখলে খুবই বিচলিত হয়ে যায়। ইসলামে সেই অন্ধকার অধ্যায় আছে কিনা সেটা যাচাই না করেই তারা শুরু করে দেয় সমালোচনাকারীকে অশ্রাব্য গালিগালাজ, বাবা–মায়ের নামে গালি, জন্মপরিচয় নিয়ে গালি, এমনকি মা–বোনকে ধর্ষণ, সমালোচনাকারীকে হত্যা, পুড়িয়ে মারা, গুলি করা, পিটানো – এমন অসংখ্য গালি ও হুমকির বন্যা। এই দলে থাকেন তারাও যারা ব্যক্তিগত জীবনে ধর্মচর্চা তেমন করেনই না; এমনকি অনেকে মদ, নারী, জুয়া নিয়ে পড়ে থাকেন – ইসলামে নিষেধ করা আছে এমন অনেক কিছুই তারা ব্যক্তিজীবনে চালু রাখেন। মহা দুর্নীতিবাজ লোক, যিনি ঘুষ ছাড়া কথা বলেন না; ভেজালকারী, ধর্ষণকারী – সবাই সেই সমালোচনাকারীর পিছনে লেগে যাবে। গানের অনেক শিল্পী, যাত্রাপালার অনেক নর্তকী, সিনেমার কত কাটপিস নায়ক–নায়িকা, শিশুকামী ধর্ষক, পতিতালয়ের নারী, দালাল – সবাই সেই দলে শামিল হবে। বিম্পি, আম্লিক, জামাত, চর্মনাই, কমিউনিস্ট, এঞ্চিপি, প্রগতিশীল সবাই বিভেদ ভুলে সেই মিছিলে শামিল হবে। খুব কম মানুষ প্রতিবাদ জানাবে আমাদের জন্য, যারা চাইবেন আমরা কথা বলি – তাও অন্যরা ভারতের দালাল, রাসূলের দুষমন বলে তাদের তাড়া করবে!
ধরুন, তসলিমা নাসরিন আগামীকাল বেনাপোল বর্ডার দিয়ে তার জন্মভূমি বাংলাদেশে ঢুকবেন – তাকে প্রতিরোধ, প্রতিহত, হত্যা করার জন্য কে কে যেতে চাইবেন না, কে কে উগ্রবাদ সমর্থন দেবেন না? কারা তারা? সংখ্যায় কতজন? অন্যদিকে প্রতিরোধের জন্য উগ্রবাদী মানুষের অভাব হবে না। যে লোকটি সারাজীবন নামাজ-রোজা করেন না, কিন্তু ইসলামী জাতীয়তাবাদের জন্য জীবন দিতে তারও দুবার চিন্তা হবে না। উপরের রাজনীতি, ব্যবসা, সাধারন মানুষ, মৌলভীর তালিকা থেকে কাকে পাবেন না সেখানে?
এই যে আমার ফেসবুক প্রায় প্রতিদিন ‘এডাল্ট সেক্সুয়াল কন্টেন্ট’ প্রচারের মিথ্যা অভিযোগে মুমিনরা শত শত রিপোর্ট করে সাসপেন্ড করাচ্ছে, আমাকে আবার প্রতিদিন সেলফি দিয়ে আপিল করতে হচ্ছে – আমাকে এই ভোগান্তি দিয়ে তারা তাদের জিহাদি কাজ করছে। আমার আগের ২০১০ সালের ২৭০০০ ফলোয়ার, ১৩০০০ পোস্টের আইডি একেবারেই গেছিল গত জুন মাসে। এই যে ফেসবুক আইডিতে ফলস রিপোর্ট তারা কেন করে? কারণ তারা আমাকে হাতের কাছে পায় না, আমার আত্মীয়–স্বজনকে পায় না। আমেরিকার অ্যারিজোনার Arizona Cultural Academy & College Prep (ACA) মসজিদে আজান দেন ও নামাজ পড়ান এক লোক, আহসান হাবীব – এক বুড়া লোক – উনিও হুমকি দেন আমাকে সামনে পেলে তিনি গুলি করে মারবেন। কানাডার ইউনিভার্সিটি অব ম্যানিটোবা থেকে পড়াশোনা করা, কানাডার ব্রিটিশ কলম্বিয়ায় স্ত্রী–সন্তান নিয়ে বসবাস করা এক লোক মোহাম্মদ আসিফুল হোসাইন হুমকি দেন দেশে আমার আত্মীয়–স্বজনকে খুঁজে বের করে ব্যবস্থা নেবেন; তিনি সিন্ডিকেট করে আমার ফেসবুকে রিপোর্ট করাচ্ছেন। এমন আরও আছে – ফ্লোরিডার একজন হুকুমি ধমকি–গালি দিতেন। এই যে এমন শত শত লোক আছেন যারা আমেরিকা, কানাডা, ইউরোপের মতো দেশে থাকলেও, সেখানে পড়াশোনা করলেও সেসব দেশের সোশ্যাল ভ্যালুজ তাদের মাথার অন্ধকার দূর করতে পারেনি; ওসব দেশের বাক ও ব্যক্তি স্বাধীনতার মর্ম এর ধার ধারেন না তারা। তাদের লক্ষ্য থাকে জনসংখ্যা বিস্ফোরণ, মিথ্যা পরিচয়ে – এমনকি সমপ্রেমী হিসাবে দেখিয়েও – বিদেশে ইসলামিস্টদের এনে সব দেশ ইসলাম দিয়ে দখল করা।
আপনারা জানেন, ইংল্যান্ডে সম্প্রতি অনেকে ধরা পড়েছেন যারা সমপ্রেমী হওয়ার মিথ্যা কাগজ দিয়ে সেখানে আশ্রয়প্রার্থী হয়েছেন। সর্বোচ্চ সংখ্যা পাকিস্তানিদের, এরপর বাংলাদেশি। তারা সবাই কিন্তু ইসলামিস্ট, ধার্মিক। সমপ্রেমীদের ইসলাম হত্যা করতে বলেছে। অথচ সমপ্রেমী সেজে সেক্যুলার দেশ দখলে নেওয়া ইসলামিস্টদের জন্য বৈধ।
আমেরিকা, কানাডা, ইউরোপের মতো দেশগুলোতে বাক স্বাধীনতা, ব্যক্তি স্বাধীনতা খুবই গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয়। তাদের আইনে আছে – ধর্ম, ধর্মীয় মহাপুরুষ, ধর্মীয় গ্রন্থ, স্রষ্টা – সবাইকে সমালোচনা, এমনকি মিথ্যা সমালোচনা করা, গালি দেওয়াও মানুষের বাক স্বাধীনতার অধিকার। আমেরিকার সংবিধানের ফার্স্ট অ্যামেন্ডমেন্টের আওতায় মানুষকে কথা বলার অবারিত সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এই জিনিস যে মানুষের খুবই মৌলিক অধিকার – সেটা বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর মৌলবাদী চেতনা ধারণ করা মানুষগুলোর মাথায় কাজ করে না। তারা ইসলামের ব্লাসফেমির মতো কালাকানুন দেখে, জেনে অভ্যস্ত, তাদের ধারনা ধর্মীয় অনুভূতি নামক বায়বীয় জিনিসে আঘাত কেউ দিতে পারবে না! অন্য ধর্মের সমালোচনা করলে কেউ সচারাচর আক্রান্ত হয় না, শুধুমাত্র ইসলামের টেরোরিস্টরা আক্রমন করে বসে।
কিন্তু এই প্রবৃত্তি কেন তাদের? গবেষণা কী বলে? মুক্তচিন্তা ও মুক্তমত প্রকাশের অবারিত ভূমিতে বসেও কেন তারা তাদের গোঁড়ামি ত্যাগ করতে পারে না? কেন বাংলাদেশের অনেক তরুণ ইন্টারনেটে এত অবারিত তথ্যপ্রবাহের যুগে বাস করেও মানুষের বাক স্বাধীনতার অধিকারকে গলা টিপে ধরতে চায়? ফেসবুকে এই যে মিথ্যা রিপোর্ট করে আইডি খেয়ে দেওয়ার প্রবণতা – এই চেষ্টা আসলে কোন ধরনের মনোবৃত্তি থেকে মানুষের মাথায় আসে?
ক. বিশ্বাস ও পরিচয়ের মনস্তত্ত্ব
১. পবিত্র মূল্যবোধ (sacred values)
কিছু বিশ্বাস মানুষের কাছে দরকষাকষির অতীত। অন্য বিষয়ে মানুষ আপস করতে পারে, কিন্তু পবিত্র বিষয়ে আপস করাকেই নৈতিক পতন মনে হয়। তাই এসবের সমালোচনা তাদের কাছে “ভিন্নমত” নয়, বরং “আক্রমণ” বা “অপবিত্রকরণ” হিসেবে ধরা পড়ে। এর ফলে সংলাপের জায়গায় প্রতিরোধই একমাত্র নৈতিক প্রতিক্রিয়া মনে হয়।
সূত্র: Atran & Axelrod, “Reframing Sacred Values”, Negotiation Journal, 2008; Jonathan Haidt, The Righteous Mind, 2012 (পবিত্রতা ও আনুগত্যের নৈতিক ভিত্তি)।
২. “আঘাত পাওয়া”র ভিন্ন ধারণা
ধর্মনিরপেক্ষ চিন্তায় ধর্ম একটি মতাদর্শ, যার সমালোচনা বাকস্বাধীনতার অংশ। কিন্তু অনেক বিশ্বাসীর কাছে নবী বা ধর্মের সঙ্গে সম্পর্ক ব্যক্তিগত ও আবেগগত, কিছুটা পরিবারের সদস্যকে অপমানের মতো। Talal Asad ও Saba Mahmood এই ব্যবধানটিই তুলে ধরেন: একপক্ষ দেখে “মতপ্রকাশ”, অন্যপক্ষ অনুভব করে “ব্যক্তিগত আঘাত”। এটি হুমকি বা মিথ্যা রিপোর্টকে বৈধ করে না, শুধু প্রতিক্রিয়ার উৎস বোঝায়।
সূত্র: Talal Asad, Formations of the Secular, 2003; Saba Mahmood, Is Critique Secular?, 2009।
৩. পরিচয়-সুরক্ষামূলক চিন্তা ও “আমরা বনাম ওরা”
কোনো বিশ্বাস গোষ্ঠী-পরিচয়ের অংশ হয়ে গেলে তার সমালোচনাকে ব্যক্তি নিজের ও গোষ্ঠীর উপর হামলা মনে করে। তখন যুক্তি যাচাইয়ের চেয়ে গোষ্ঠী রক্ষাই অগ্রাধিকার পায়। Tajfel ও Turner-এর সামাজিক পরিচয় তত্ত্ব বলে, মানুষের আত্মসম্মান অনেকটাই গোষ্ঠীর মর্যাদার সঙ্গে বাঁধা, তাই গোষ্ঠী আক্রান্ত মনে হলে প্রতিরক্ষা নৈতিক কর্তব্য হয়ে দাঁড়ায়।
সূত্র: Dan Kahan-এর identity-protective cognition বিষয়ক গবেষণা (২০১২-পরবর্তী); Tajfel & Turner, “An Integrative Theory of Intergroup Conflict”, 1979।
৪. প্রবাসে ধর্মীয় পরিচয়ের কড়া রূপ
সংস্কৃতি ও সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে অভিবাসী পরিবেশে অনেকের ধর্মীয় পরিচয় “স্থানীয় ঐতিহ্য” থেকে সরে “শুদ্ধ, আদর্শভিত্তিক” রূপ নেয়। নতুন দেশে সংখ্যালঘু হওয়ার অনিরাপত্তা ও সাংস্কৃতিক টানাপোড়েন এই কড়াকড়ি বাড়াতে পারে। তাই কেউ সেক্যুলার দেশে থেকেও সেখানকার মূল্যবোধ আত্মস্থ না করে বরং নিজের পরিচয়কে আরও শক্ত করে আঁকড়ে ধরতে পারেন।
সূত্র: Olivier Roy, Globalized Islam, 2004।
৫. দূরবর্তী জাতীয়তাবাদ (long-distance nationalism)
প্রবাসীরা দেশের রাজনীতি ও সামাজিক বিতর্কে দূর থেকে অনেক সময় দেশে থাকাদের চেয়েও তীব্রভাবে যুক্ত থাকেন। তাঁদের কোনো স্থানীয় পরিণতি ভোগ করতে হয় না, তাই অবস্থান নেওয়া সহজ ও চরম হয়। ডিজিটাল মাধ্যমে এই সংযোগ আরও সহজ।
সূত্র: Benedict Anderson, “The New World Disorder”, New Left Review, 1992।
খ. তথ্য ও প্রযুক্তিঃ কেন তথ্যের প্রাচুর্যেও সহনশীলতা বাড়ে না
৬. যাচাইকৃত পক্ষপাত ও প্রেরণাভিত্তিক যুক্তি
মানুষ নতুন তথ্য নিরপেক্ষভাবে বিচার করে না। যে তথ্য নিজের বিশ্বাসকে সমর্থন করে তা সহজে গ্রহণ করে, আর যা বিরুদ্ধে যায় তা সন্দেহ করে বা এড়িয়ে যায়। তাই ইন্টারনেটে সব তথ্য থাকলেও নিজের বিশ্বাসের বাইরের উৎস পড়ার তাগিদ কম, আর পড়লেও প্রত্যাখ্যানের যুক্তি খুঁজে নেওয়া হয়।
সূত্র: Ziva Kunda, “The Case for Motivated Reasoning”, Psychological Bulletin, 1990; Raymond Nickerson, “Confirmation Bias”, Review of General Psychology, 1998।
৭. ইকো চেম্বার ও অ্যালগরিদম
ফেসবুকের মতো প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারকারীর পছন্দ অনুযায়ী কনটেন্ট সাজায়, ফলে সমমনাদের মধ্যে মত আরও জোরালো ও মেরুকৃত হয়। তবে গবেষণা বলে ভিন্নমত দেখলেই মানুষ নরম হয় না। Bail-এর গবেষণায় দেখা গেছে বিপরীত মতের কনটেন্ট দেখে কিছু মানুষ আরও কট্টর হয়েছে। ফিল্টার বাবলের প্রভাব কতটা, তা নিয়ে গবেষকদের মধ্যে মতভেদ আছে।
সূত্র: Cass Sunstein, Republic.com, 2001; Chris Bail et al., PNAS, 2018।
৮. ক্ষোভের ডিজিটাল সংক্রমণ (moral outrage)
অনলাইনে নৈতিক ক্ষোভ প্রকাশে খরচ প্রায় শূন্য, অথচ প্রতিদানে গোষ্ঠীর প্রশংসা ও “আমি ধর্ম বা মূল্যবোধ রক্ষা করছি” অনুভূতি মেলে। গবেষণায় দেখা গেছে, নৈতিক-আবেগপূর্ণ বার্তা সোশ্যাল নেটওয়ার্কে বেশি ছড়ায়। অর্থাৎ ক্ষোভ দেখানো সামাজিকভাবে পুরস্কৃত হয়, আর রিপোর্ট বাটন চাপা সেই ক্ষোভ প্রকাশের সহজতম পথ।
সূত্র: Molly Crockett, “Moral Outrage in the Digital Age”, Nature Human Behaviour, 2017; William Brady et al., PNAS, 2017।
৯. রিপোর্টিং ব্যবস্থার অপব্যবহার (brigading)
প্ল্যাটফর্মের “ফ্ল্যাগ” টুল তৈরি হয়েছে ক্ষতিকর কনটেন্ট ধরার জন্য, কিন্তু ভলিউমের উপর নির্ভরশীল স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা সহজেই বিভ্রান্ত হয়। অনেক রিপোর্ট জমা পড়লে একটি অ্যাকাউন্ট সাময়িক সাসপেন্ড হতে পারে, ফলে সমন্বিত মাস রিপোর্টিং একটি কার্যকর অস্ত্রে পরিণত হয়। এই কৌশল শুধু ধর্মীয় গোষ্ঠী নয়, রাজনৈতিক দল, জাতীয়তাবাদী ও অন্যান্য মতাদর্শের গোষ্ঠীও ব্যবহার করে।
সূত্র: Kate Crawford & Tarleton Gillespie, “What Is a Flag For?”, New Media & Society, 2016।
১০. অনলাইন নিঃসংকোচ আচরণ ও নৈতিক বিযুক্তি
পরিচয় আড়াল থাকা, মুখোমুখি না হওয়া ও ফল না দেখার কারণে মানুষ অনলাইনে এমন কাজ করে যা সামনাসামনি করত না। এর সঙ্গে Bandura-র “নৈতিক বিযুক্তি” যুক্ত হয়: নিজের কাজকে মহৎ উদ্দেশ্যে ন্যায্য বলে ভাবলে (যেমন “ওরা ধর্ম অবমাননা করছে”) মিথ্যা রিপোর্টও অনৈতিক মনে হয় না, বরং কর্তব্য মনে হয়।
সূত্র: John Suler, “The Online Disinhibition Effect”, CyberPsychology & Behavior, 2004; Albert Bandura, “Moral Disengagement in the Perpetration of Inhumanities”, 1999।
গ. সামাজিক চাপ ও মনোবৃত্তি
১১. সামাজিক চাপ ও পছন্দ গোপন করা
সামাজিক খরচের ভয়ে অনেকে ব্যক্তিগত মতের বিপরীতে প্রকাশ্য অবস্থান নেন। এ কারণেই ব্যক্তিজীবনে ধর্মচর্চা কম করা মানুষও জনসমক্ষে “ধর্মরক্ষক” সাজতে পারেন: দলে না থাকলে নিজেই সন্দেহের মুখে পড়ার ভয় থাকে। অর্থাৎ অনেক ক্ষেত্রে এটি বিশ্বাসের চেয়ে সামাজিক টিকে থাকার কৌশল।
সূত্র: Timur Kuran, Private Truths, Public Lies, Harvard UP, 1995।
১২. কর্তৃত্ববাদী প্রবণতা
কিছু মানুষের মধ্যে শৃঙ্খলা, ঐক্য ও প্রচলিত নিয়মের প্রতি তীব্র পক্ষপাত থাকে। সমাজ হুমকির মুখে আছে এমন অনুভূতি এলে এই প্রবণতা সক্রিয় হয় এবং ভিন্নমত দমনের সমর্থন বাড়ে। এটি ধর্মভিত্তিক বা ধর্মনিরপেক্ষ, উভয় ধরনের গোষ্ঠীতেই দেখা যায়, অর্থাৎ ধর্মের চেয়ে মনোভঙ্গিই এখানে মুখ্য।
সূত্র: Bob Altemeyer, Right-Wing Authoritarianism, 1981 ও The Authoritarian Specter, 1996; Karen Stenner, The Authoritarian Dynamic, 2005।
১৩. সংগঠিত উস্কানি
ডেনিশ কার্টুন বিতর্কে বৈশ্বিক ক্ষোভের বড় অংশ স্বতঃস্ফূর্ত ছিল না, বরং রাজনৈতিক ও ধর্মীয় নেতাদের সংগঠিত প্রচারের ফল ছিল। অনলাইনে সিন্ডিকেটেড মাস রিপোর্টিংও একই ধরনের সমন্বিত আচরণ হতে পারে, যেখানে একজন বা কয়েকজন সংগঠক বহু মানুষকে সক্রিয় করেন।
সূত্র: Jytte Klausen, The Cartoons That Shook the World, Yale UP, 2009।
ঘ. আইন, রাজনীতি ও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট
১৪. ব্লাসফেমি-সংস্কৃতির উত্তরাধিকার
যে সমাজে ধর্মের অবমাননা আইনত শাস্তিযোগ্য ছিল বা সামাজিকভাবে কঠোরভাবে দমন করা হতো, সেখান থেকে আসা মানুষ সেই নিয়মকেই “স্বাভাবিক” মনে করতে পারেন। অভিবাসনের পর নতুন দেশের আইন বদলায়, কিন্তু অভ্যস্ত নৈতিক ধারণা সঙ্গে যায়।
সূত্র: Paul Marshall & Nina Shea, Silenced, Oxford UP, 2011; ২০১৫ সালে অভিজিৎ রায়সহ ব্লগারদের হত্যা নিয়ে Human Rights Watch ও Article 19-এর প্রতিবেদন।
১৫. আইন ও রাষ্ট্রীয় আচরণের বার্তা
দণ্ডবিধির ২৯৫এ ধারা এবং আইসিটি আইনের ৫৭ ধারা ও পরবর্তী ডিজিটাল/সাইবার নিরাপত্তা আইনে “ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত”কে অপরাধ গণ্য করা হয়েছে। এতে সমাজে বার্তা যায় যে সমালোচনা দমন করা বৈধ ও রাষ্ট্রসমর্থিত, ফলে সাধারণ মানুষও নিজেকে এই দমনের অংশীদার ভাবতে পারে। (এসব আইনের বর্তমান অবস্থা পরিবর্তনশীল, তাই হালনাগাদ তথ্য যাচাই করে নেবেন।)
সূত্র: Human Rights Watch ও Article 19-এর বাংলাদেশ-বিষয়ক প্রতিবেদন।
১৬. ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহার ও বিচারহীনতা
ধর্মকে রাজনৈতিক সমর্থন জোগাড়ের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের দীর্ঘ ইতিহাস আছে। ২০১২ সালের রামু ও ২০১৬ সালের নাসিরনগরের মতো ঘটনায় ফেসবুক পোস্টের অভিযোগ থেকে সহিংসতা হয়েছে, আর অনেক ক্ষেত্রে বিচার হয়নি বা দুর্বল হয়েছে। এতে ধারণা তৈরি হয় যে অভিযোগ তুললে সমাজের সমর্থন মিলবে, শাস্তি হবে না।
সূত্র: Ali Riaz, Bangladesh: A Political History Since Independence, I.B. Tauris, 2016; Passage to Authoritarianism, 2021।
১৭. জরিপে সমর্থনের মাত্রা ও বৈচিত্র্য
Pew-এর জরিপে দেখা যায়, বিভিন্ন দেশে শরিয়া-ভিত্তিক আইনের প্রতি সমর্থনের মাত্রা ভিন্ন, আর বাংলাদেশে সমর্থন তুলনামূলকভাবে বেশি। তবে একই জরিপে ব্যাপক বৈচিত্র্যও ধরা পড়ে, তাই “সবাই এক রকম” বলা তথ্যসম্মত নয়। জরিপ থেকে মতামতের প্রবণতা বোঝা যায়, কারও আচরণ নয়।
সূত্র: Pew Research Center, The World’s Muslims: Religion, Politics and Society, 2013।
১৮. সমালোচনামূলক চিন্তার প্রশিক্ষণের ঘাটতি (অনুমান)
মুখস্থনির্ভর শিক্ষা ও বিতর্কের সংস্কৃতির অভাব ভিন্নমত মোকাবিলার দক্ষতা কমাতে পারে। বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতা নিয়ে বিভিন্ন গবেষণা আছে, কিন্তু এই নির্দিষ্ট সংযোগের সরাসরি সমীক্ষা সীমিত। তাই এটি প্রমাণিত কারণ নয়, যুক্তিসংগত অনুমান।
সারসংক্ষেপ
মিথ্যা রিপোর্টের মনোবৃত্তির পেছনে সাধারণত কয়েকটি কারণ একসঙ্গে কাজ করেঃ
পরিচয় রক্ষার তাগিদ (১-৫) + ক্ষোভের সামাজিক পুরস্কার ও কম ঝুঁকি (৮-১০) + গোষ্ঠীচাপ বা সংগঠিত উস্কানি (১১-১৩) + আইনি ও রাজনৈতিক সমর্থনের অনুভূতি (১৪-১৬)।
ইন্টারনেটে তথ্যের প্রাচুর্য এই কারণগুলোর কোনোটিকেই দূর করে না, বরং ৬ ও ৭ নম্বর পয়েন্ট দেখায় যে অনেক ক্ষেত্রে বাড়িয়ে তোলে।
Related Posts

Why do Islamist cyber‑jihadis insult, threaten, and file false reports against people with different opinions?
Maulana Azhari once advised Islamists that sharing his Facebook posts is also an Islamic act;Read More

Palestine and Gaza merging with Israel, and all of Kashmir merging with India, would lead to greater humanitarian benefit
In modern politics, independence is often considered an almost inviolable value, where leaders aim toRead More

ফিলিস্তিন ও গাজা ইসরায়েলের সঙ্গে, পুরো কাশ্মীর ভারতের সঙ্গে মিশে গেলেই মানবতার বৃহত্তর কল্যান হবে
আধুনিক রাজনীতিতে স্বাধীনতাকে প্রায় অলঙ্ঘ্য মূল্য ধরা হয়, সেখানে নেতাদের লক্ষ থাকে দেশের নেতৃত্ব বাRead More

Comments are Closed