Moon Landing
Pakhi Mian

Pakhi Mian

মানুষের চন্দ্রজয়ের একজন নেপথ্য কারিগর সিলেটের পাখি মিয়া

চাঁদে প্রথম মানুষের পা রাখার সেই অবিস্মরণীয় মুহূর্তটি বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল। ১৯৬৯ সালের ২০ জুলাই, নীল আর্মস্ট্রং ও বাজ অলড্রিনের সেই ঐতিহাসিক চন্দ্রজয়ের পেছনে কাজ করেছিলেন কয়েক হাজার বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলী। কিন্তু সেই বিশাল কর্মযজ্ঞের নেপথ্যে যে একজন খাঁটি বাঙালিও জড়িয়ে ছিলেন, তা হয়তো অনেকেরই অজানা। তিনি সিলেটের দক্ষিণ সুরমার গঙ্গানগর গ্রামের সন্তান রফিক উদ্দিন আহমেদ, যিনি তাঁর চেনা মহলে ‘পাখি মিয়া’ নামেই বেশি পরিচিত ছিলেন।

ছোটবেলা থেকেই অসম্ভব প্রতিভাবান ও স্বপ্নবাজ ছিলেন পাখি মিয়া। সিলেট সরকারি পাইলট উচ্চবিদ্যালয় এবং পরে বিখ্যাত এমসি কলেজ থেকে পড়ালেখা শেষ করে, ১৯৫৪ সালেই তিনি পাড়ি জমান সুদূর যুক্তরাষ্ট্রে। সেখানে ইন্ডিয়ানা টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউট থেকে তড়িৎ প্রকৌশলে উচ্চশিক্ষা নিয়ে তিনি যোগ দেন তৎকালীন বিখ্যাত বিমান নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ‘গ্রুম্মান অ্যারোস্পেস করপোরেশন’-এ। সেখানে এফ-১৪ জঙ্গি বিমান তৈরির প্রকল্পে কাজ করার সময় তাঁর মেধা ও দক্ষতার কারণে মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার ‘অ্যাপোলো ১১’ মিশনের একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ অংশের জন্য তিনি ও তাঁর দল মনোনীত হন।

নাসা পুরো অভিযানের কাজগুলোকে ছোট ছোট ভাগে ভাগ করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দিয়েছিল। রফিক উদ্দিন আহমেদের প্রতিষ্ঠান গ্রুম্মান অ্যারোস্পেসের ওপর দায়িত্ব পড়েছিল ‘লুনার মডিউল’ তৈরির, যা মূলত নভোচারীদের মূল মহাকাশযান থেকে বিচ্ছিন্ন করে চাঁদের মাটিতে নামিয়ে আনবে এবং কাজ শেষে আবার ফিরিয়ে নিয়ে যাবে। তড়িৎ প্রকৌশলী হলেও মহাকাশবিজ্ঞানের ওপর বিশেষ প্রশিক্ষণ নিয়ে রফিক উদ্দিন আহমেদ এই লুনার মডিউলের নকশা ও কারিগরি দিক সুচারুভাবে সম্পন্ন করেন। কেবল নকশাই নয়, নীল আর্মস্ট্রং ও বাজ অলড্রিনের মতো কিংবদন্তি নভোচারীদের এই মডিউল পরিচালনার দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণ দেওয়ার গুরুদায়িত্বও পড়েছিল তাঁর ওপর, যার ফলে তাঁদের মধ্যে এক নিবিড় আত্মিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে।

১৬ জুলাই ১৯৬৯ সালে যখন অ্যাপোলো ১১ পৃথিবীর মাটি ছেড়ে রওনা হয়, তখন আটলান্টিকের ওপারে রফিক উদ্দিন ও তাঁর সহকর্মীদের বুক দুরুদুরু কাঁপছিল গভীর উৎকণ্ঠায়। অবশেষে ২০ জুলাই যখন লুনার মডিউলটি সফলভাবে চাঁদের পিঠ স্পর্শ করে এবং দুই মানবসন্তান ইতিহাস গড়েন, তখন যেন রফিক উদ্দিনের হাত ধরেই রচিত হয়েছিল বাংলাদেশের এক গৌরবের অধ্যায়। মহাকাশ জয়ের এই অনন্য কীর্তির পর তিনি নাসার কাছ থেকে প্রশংসাপত্র ও স্বীকৃতি লাভ করেন। বর্তমানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের স্মিথটাউন শহরে তাঁর পরিবার নিয়ে অবসর জীবন যাপন করছেন, যেখানে তাঁর বড় মেয়ে মল্লিকা কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো নামকরা প্রতিষ্ঠানে তড়িৎ প্রকৌশলের অধ্যাপনা করছেন।

মহাকাশের সীমানা জয় করলেও রফিক উদ্দিনের মনটি চিরকাল পড়ে থাকতো তাঁর মাতৃভূমি বাংলাদেশে। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় সুদূর প্রবাসে থেকেও তিনি জাতিসংঘের সামনে মানববন্ধনে দাঁড়িয়েছেন, বিশ্ববাসীর বিবেককে নাড়া দিয়েছেন দেশের স্বাধীনতার জন্য। কাকতালীয়ভাবে, মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি জেনারেল এম এ জি ওসমানী ছিলেন তাঁর খালাতো ভাই, যাঁর সাথে যুদ্ধের পুরোটা সময় চিঠির মাধ্যমে যোগাযোগ রেখেছিলেন এই দেশপ্রেমিক বিজ্ঞানী। আজ দূর প্রবাসে বসেও ঝাপসা স্মৃতি হাতড়ে পাখি মিয়া দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন – যে দেশের মানুষ এত প্রতিভাবান, সমস্ত প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে সেই বাংলাদেশ একদিন বিশ্বমঞ্চে অনন্য উচ্চতায় মাথা উঁচু করে দাঁড়াবেই।

Related Posts

Is the Earth and the universe orderly? Has everything been created only for humans?

Many Muslim people argue by saying, look, how orderly the earth and the universe are,Read More

পৃথিবী ও মহাবিশ্ব কি সুশৃঙ্খল? সব কিছু কী মানুষের জন্যই সৃষ্টি করা হয়েছে?

অনেক মুসলিম লোকেরা যুক্তি দিয়ে বলেন, দেখ, পৃথিবী ও মহাবিশ্ব কত সুশৃঙ্খল, কি নিখুঁতভাবে সবRead More

Islamic Clothing for Women is Harmful

Hijab, niqab and burqa: these restrictive garments for women offer no benefit except harm

Among the roughly 1.8 to 2 billion Muslims in the world, a significant portion ofRead More

Comments are Closed