Hijab
Hijab is My Choice!

Hijab is My Choice!

হিজাব ইজ মাই চয়েস – এই বুলি সেক্যুলার দেশে যারা দাবী করেন তারা নিজেদের দেশে হিজাব পরতে বাধ্য করেন

ইরানি গায়িকা পারাস্তু আহমাদিকে হিজাব ছাড়া মঞ্চে পরিবেশনার অপরাধে ৭৪টি বেত্রাঘাতের সাজা দেওয়া হয়েছে। এই ঘটনাটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয় – এটি ইসলামের দীর্ঘ ইতিহাসের অংশ, যেখানে নারীর পোশাক নিয়ন্ত্রণকে রাষ্ট্রীয় ও পুরুষতান্ত্রিক ক্ষমতার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। হিজাব কীভাবে ইসলামে প্রবেশ করল, কেন এটি পুরুষতান্ত্রিক রাজনৈতিক অস্ত্রে পরিণত হলো এবং মানবাধিকারের দৃষ্টিকোণ থেকে এটিকে কীভাবে মূল্যায়ন করা উচিত – এই বিষয়গুলো জানেন?

নারী নিপীড়ক ওমর আল্লাহকে বাধ্য করেন পর্দার আয়াত পাঠাতে

হিজাব বা পর্দাপ্রথার উৎস বিশ্লেষণ করতে হলে সপ্তম শতাব্দীর আরবের সামাজিক বাস্তবতায় ফিরে যেতে হবে যেখানে একজন উচ্চাকাংখী রাজনৈতিক নেতা ধর্মীয় আবেগকে পুঁজি করে নিজের ভবিষ্যৎ গড়ছেন। ইসলামী সোর্স কী বলে? ওমর ছিল দুর্ধর্ষ ডাকাত। মোহাম্মদকে হত্যা করার জন্য সে তরবারি নিয়ে রওনা দিয়েছিল, পথে সাহাবি নাঈম বিন আবদুল্লাহ তাঁকে জানান, তাঁর বোন ও ভগ্নিপতি ইসলাম গ্রহণ করেছে। সে রাগান্বিত হয়ে তাঁদের বাড়িতে গিয়ে কুরআনের আয়াত শুনে মুগ্ধ হয় এবং তার হৃদয় পরিবর্তিত হয়। এরপর সে দারুল আরকাম-এ গিয়ে প্রকাশ্যে ইসলাম গ্রহণ করে। এই তো ইসলামী বয়ান, তাই না? এবার কমন সেন্স দিয়ে ভাবুন। ইসলামের প্রথম ৬ বছরে অনুসারী ছিল মাত্র ৪০ জন, ১০ বছরে ১০০-র মতো, ১৩ বছরে বড়জোর ৩০০! এই অনুসারী কারা ছিল? খাদিজা প্রমুখ কিছু পেশাদার মানুষ ছাড়া বেশিরভাগই ছিল ভ্যাগাবন্ড, মরু ডাকাত। যাদের মূল পেশাই ছিল চুরি, ডাকাতি, বাণিজ্য কাফেলায় লুট। এসবের আকর্ষণেই মূলত তারা ইসলামে ভিড়েছিল। ওমর ইসলামের মহান সৌন্দর্যে আকৃষ্ট হয়ে ইসলাম গ্রহণ করেছিল? সে মূলত ডাকাতি এবং জেহাদ নামের মানবতাবিরোধী যুদ্ধ করে গনিমতের মাল হিসেবে পাওয়া নারী ভোগ, লুণ্ঠিত সম্পদ প্রাপ্তি – এসবের আশায় ইসলামে ভিড়েছিল। এটাই বাস্তবতা।

ওমরের যেহেতু আগে থেকেই ডাকাতিতে হাত পাকা ছিল সেজন্য সে মুহাম্মদের টিমে প্রভাবশালী ছিল। এমনকি নবী মুহাম্মদও তাকে সমঝে চলতো। ওমর এতোটাই বেপরোয়া ছিল যে নবীর বউদের সে উত্যক্ত করতে ছাড়তো না। প্রাচীন আরবে ঘরবাড়ির ভেতরে আধুনিক শৌচাগার ছিল না। ফলে রাতের অন্ধকারে মদিনার নারীরা, বিশেষ করে নবী মুহাম্মদের স্ত্রীরা সারাদিন প্রস্রাব, পায়খানা চেপে রেখে রাতে শৌচকার্য বা মলমূত্র ত্যাগের জন্য মদিনার উন্মুক্ত মাঠ ‘আল-মানাসি’-তে যেতেন। ওমর চাইতেন নবীর স্ত্রীরা যেন পর্দার আড়ালে থাকেন এবং বাইরে বের না হন। এজন্য তিনি রাতের বেলা তাদের অনুসরণ করতেন ও উত্যক্ত করতেন।

সহীহ বুখারী (হাদিস নং ১৪৬): হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, “নবীর স্ত্রীরা রাতের বেলা শৌচকার্যের জন্য ‘মানাসি’ (একটি উন্মুক্ত স্থান)-এ বের হতেন। ওমর (রা.) নবী (সা.)-কে বলতেন, ‘আপনার স্ত্রীদের পর্দা করান।’ কিন্তু রাসুলুল্লাহ (সা.) তা করেননি। এক রাতে ওমরের কঠোর নজরদারির মধ্যে নবীপত্নী সওদা বিনতে জামআহ (যিনি ছিলেন বেশ দীর্ঘকায় নারী) এশার সময় বাইরে বের হলেন। ওমর তাঁকে চিনে ফেললেন এবং চিৎকার করে বললেন, ‘হে সওদা! জেনে রাখো, আমরা তোমাকে চিনে ফেলেছি!’ ওমরের উদ্দেশ্য ছিল যাতে এই লজ্জায় পর্দা প্রথা চালু করা হয়।”

সহীহ মুসলিম (হাদিস নং ২১৭০): এই বর্ণনায় স্পষ্ট উল্লেখ আছে যে, ওমরের এই আকস্মিক চিৎকারে ও মন্তব্যে নবীপত্নী সওদা অত্যন্ত বিব্রত ও লজ্জিত হন এবং দ্রুত মুহাম্মদের কাছে গিয়ে ওমরের এই আচরণের তীব্র অভিযোগ জানান।

হাদিসের বিবরণ অনুযায়ী, এই ঘটনার পরই পর্দার বিধান-সংক্রান্ত আয়াত নাজিল হয়। অর্থাৎ, যে বিধান আজ “আল্লাহর চিরন্তন আদেশ” হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, তার নাজিলের প্রেক্ষাপট ছিল একটি নির্দিষ্ট সময়ের, পুরুষদের ইচ্ছাকৃত উত্যক্তের হাত থেকে নারীদের রক্ষা পাওয়ার সামাজিক সমস্যার সমাধান – রাতের শৌচকার্যে যাওয়া নারীদের চিহ্নিত করা যাতে তাঁদের উত্ত্যক্ত না করা হয়। এবং মজার বিষয় হলো ওমর এই আয়াত নাজিল করতে আল্লাহকে তথা মুহাম্মদকে বাধ্য করেন।

পোশাকের ভৌগোলিক ও পরিবেশগত ভিত্তি

নৃবিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞানের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, মানুষের পোশাক কোনো অলৌকিক বা আকস্মিক বিষয় নয়, বরং তা নির্দিষ্ট অঞ্চলের জলবায়ু, আর্দ্রতা, সূর্যালোক এবং ভিটামিন ডি গ্রহণের জৈবিক প্রয়োজনীয়তার ওপর ভিত্তি করে বিবর্তিত হয়। আরবের মরুভূমির তীব্র রোদ ও ধুলোবালি থেকে বাঁচতে পুরো শরীর ঢেকে রাখার ঢিলেঢালা পোশাকরীতি সেখানকার পরিবেশের জন্য সম্পূর্ণ বিজ্ঞানসম্মত। তবে এই আঞ্চলিক ও ভৌগোলিক পোশাককে সার্বজনীন ঐশী বিধান হিসেবে বাংলাদেশের মতো আর্দ্র-গ্রীষ্মপ্রধান অঞ্চল, ইন্দোনেশিয়ার ক্রান্তীয় অরণ্য কিংবা স্ক্যান্ডিনেভিয়ার শীতপ্রধান দেশে চাপিয়ে দেওয়াটা এক ধরনের সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্যবাদ; যা স্থানীয় ঐতিহ্যকে নষ্ট করার পাশাপাশি প্রকৃতির সাথে মানুষের মানিয়ে নেওয়ার স্বাভাবিক জৈবিক প্রক্রিয়াকেও বাধাগ্রস্ত করে।

এর বিপরীত চিত্রটি দেখা যায় স্ক্যান্ডিনেভিয়াসহ বিভিন্ন শীতপ্রধান দেশে, যেখানে বছরের দীর্ঘ সময় সূর্যের আলো না থাকায় ‘ভিটামিন ডি’-এর অভাবজনিত মারাত্মক শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়। ফলে, সুস্থভাবে বেঁচে থাকার তাগিদে এবং ত্বকে সরাসরি সূর্যালোক গ্রহণের জন্য সেখানকার নারীরা রোদে স্বল্প পোশাকে বের হন – যা কোনো নৈতিক স্খলন নয়, বরং প্রকৃতির সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়ার একটি বৈজ্ঞানিক ও জৈবিক পদ্ধতি। অতএব, শীতপ্রধান অঞ্চলের এই স্বাস্থ্যগত পোশাকরীতির গুরুত্ব না বুঝে ঢালাও সমালোচনা করা যেমন অনুচিত, ঠিক তেমনি আরবের মরুভূমির পোশাক বৈচিত্র্যময় জলবায়ুর এই পৃথিবীতে সবার ওপর বাধ্যতামূলকভাবে চাপিয়ে দেওয়াটাও এক প্রকার অযৌক্তিক সাংস্কৃতিক আধিপত্যবাদ।

ইরানের উদাহরণ

১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের আগে ইরানের নারীরা পোশাক নির্বাচন, শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে স্বাধীন ছিলেন। কিন্তু বিপ্লবের পর আয়াতুল্লাহ খোমেনির শাসনে হিজাব বাধ্যতামূলক করা হয় এবং তা কার্যকর করতে নামানো হয় কুখ্যাত নৈতিকতা পুলিশ। এই আইন লঙ্ঘনের শাস্তি হিসেবে জরিমানা, কারাদণ্ড এবং জনসমক্ষে বেত্রাঘাতের মতো নিষ্ঠুর বিধান চালু করে রাষ্ট্র নারীর শরীর ও ব্যক্তিস্বাধীনতার ওপর একচ্ছত্র স্বৈরাচারী আধিপত্য চাপিয়ে দেয়।

এর জঘন্যতম সাম্প্রতিক উদাহরণ হলো সংগীতশিল্পী পারাস্তু আহমাদির মামলা। ২০২৪ সালের এক ভার্চুয়াল কনসার্টে হিজাব ছাড়া গান গাওয়ার অপরাধে ২০২৬ সালের জুনে আদালত তাঁকে ও তাঁর দলকে ৭৪টি বেত্রাঘাত ও দুই বছরের শৈল্পিক নিষেধাজ্ঞার রায় দেয়। একইভাবে অভিনেত্রী তারানেহ আলিদুস্তি, মানবাধিকার কর্মী জিনো মোহাম্মদী বা ক্রীড়াবিদ এলনাজ রেকাবির মতো নারীদেরও হিজাব না পরা বা প্রতিবাদ করার কারণে গ্রেফতার, গৃহবন্দী ও রাষ্ট্রীয় হয়রানির শিকার হতে হয়েছে; যা এই ব্যবস্থার পদ্ধতিগত ক্রূরতাকেই প্রমাণ করে।

কয়েক দশকের এই ক্ষোভ বিস্ফোরিত হয় ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে, যখন সঠিক নিয়মে হিজাব না পরার অভিযোগে আটক তরুণী মাহসা আমিনির হেফাজতে মৃত্যু হয়। এই হত্যাকাণ্ড বিশ্বজুড়ে ঐতিহাসিক “জিন, জিয়ান, আজাদি” (নারী, জীবন, স্বাধীনতা) আন্দোলনের জন্ম দেয়। লক্ষ লক্ষ ইরানি নারী রাস্তায় নেমে হিজাব পুড়িয়ে ও চুল কেটে প্রতিবাদ জানান। এটি কোনো ধর্মবিরোধিতা ছিল না, বরং নিজের শরীর ও জীবনের ওপর নিজস্ব সার্বভৌম অধিকার ফিরে পাওয়ার লড়াই ছিল, যা প্রমাণ করে যে পোশাকের স্বাধীনতা এখানে স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে বেঁচে থাকার অন্যতম বড় রাজনৈতিক প্রতিরোধ।

আফগানিস্তানের উদাহরণ

আফগানিস্তানে তালেবানদের ক্ষমতা দখলের পর থেকে দেশটির নারী অধিকার পরিস্থিতি এক চরম মানবিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়েছে, যেখানে পোশাকের কঠোর বাধ্যবাধকতাকে মূলত সমগ্র নারীজাতিকে সমাজ থেকে সম্পূর্ণ মুছে ফেলার এবং গৃহবন্দী করার প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক ধাপ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। তালেবানদের জারি করা কঠোর ডিক্রি অনুযায়ী, জনসমক্ষে নারীদের চোখ ছাড়া পুরো মুখ ও শরীর সম্পূর্ণ ঢেকে রাখা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, যার অন্যতম উদাহরণ হলো ঐতিহ্যবাহী ভারী বোরকা বা নেকাব পরিধানের কঠোর নির্দেশ। শুধু তাই নয়, ২০২৪ সালের আগস্টে প্রণীত ‘সদাচার প্রচার ও উপাচার প্রতিরোধ’ সংক্রান্ত নতুন আইনে জনসমক্ষে নারীর কণ্ঠস্বর শোনাকেও নিষিদ্ধ করা হয়েছে, যা ঘরের বাইরে নারীদের সম্পূর্ণ অদৃশ্য ও শব্দহীন বস্তুতে পরিণত করেছে। কোনো নারী যদি এই কঠোর পোশাকবিধি বা আচরণবিধি সামান্যতম লঙ্ঘন করেন, তবে তালেবানদের নৈতিকতা পুলিশের হাতে রাস্তায় প্রকাশ্য লাঞ্ছনা, আটক এবং তাদের পুরুষ অভিভাবকদের (মাহরাম) কঠোর জরিমানা ও শাস্তির মুখোমুখি হতে হচ্ছে। পোশাকের এই কৃত্রিম দেয়াল তোলার মাধ্যমেই মূলত আফগান নারীদের একটি স্বাধীন সত্তা থেকে জোরপূর্বক রাষ্ট্রের অধীনস্থ পণ্যে রূপান্তরিত করা হয়েছে।

পোশাক ও অবয়ব নিয়ন্ত্রণের এই অবরুদ্ধ প্রক্রিয়াটি নারীদের জীবনের প্রতিটি মৌলিক অধিকার কেড়ে নেওয়ার পথকে সুগম করেছে। বর্তমানে আফগানিস্তানে ষষ্ঠ শ্রেণীর পর মেয়েদের স্কুলে যাওয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ, যার ফলে এটি বিশ্বের একমাত্র দেশ যেখানে কিশোরী ও তরুণীদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেওয়ার কোনো আইনি সুযোগ নেই। পরবর্তীতে এই নিষেধাজ্ঞার পরিধি বাড়িয়ে নারীদের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়, সরকারি-বেসরকারি চাকরি, বিউটি পার্লার, বিনোদন পার্ক এবং জিমনেসিয়ামের মতো সমস্ত জনপরিসর সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, পার্ক বা জিমের মতো জায়গায় নারীদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করার পেছনে তালেবানদের অজুহাত ছিল যে, সেখানে নারীরা সঠিকভাবে হিজাব পরিধান করেন না। এভাবে একটির পর একটি অধিকার কেড়ে নিয়ে নারীদের চার দেয়ালের মাঝে এমনভাবে অবরুদ্ধ করা হয়েছে যে, পুরুষ অভিভাবক ছাড়া তাদের ঘরের বাইরে বের হওয়াও এখন প্রায় অসম্ভব। তালেবানদের এই বৈষম্যমূলক নীতি কেবল একটি পোশাকের লড়াই নয়, এটি মূলত ধর্মের নামে একটি পুরো লিঙ্গকে সমাজ, অর্থনীতি ও রাষ্ট্রকাঠামো থেকে পদ্ধতিগতভাবে অবলুপ্ত করে সম্পূর্ণ দাসত্বে নিয়োজিত করার এক ভয়ঙ্কর জেন্ডার অ্যাপার্থাইড (Gender Apartheid) বা লিঙ্গভিত্তিক বর্ণবাদ।

সৌদি আরবের ধীর পরিবর্তন

সৌদি আরবে যুগের পর যুগ ধরে জনসমক্ষে নারীদের জন্য কালো ‘আবায়া’ (পুরো শরীর ঢাকা দীর্ঘ পোশাক) পরিধান করা আইনত বাধ্যতামূলক ছিল, যা ছিল রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব ও পুরুষতান্ত্রিক অভিভাবকত্ব (উইলায়াহ) ব্যবস্থার দৃশ্যমান প্রতীক। যদিও যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের ‘ভিশন ২০৩০’ উদ্যোগের অংশ হিসেবে ২০১৯ সালের পর থেকে এই নিয়মে কিছুটা শিথিলতা আনা হয়েছে এবং নারীদের আবায়া পরিধানের বাধ্যবাধকতা তুলে নিয়ে কেবল ‘শালীন পোশাক’ পরার নিয়ম করা হয়েছে, তবুও এর মূল কাঠামোগত নিপীড়ন ও মনস্তাত্ত্বিক নজরদারি সমাজ থেকে পুরোপুরি মুছে যায়নি। এখনো পোশাকের এই নিয়ম ভাঙলে বা সমাজের রক্ষণশীল কাঠামোর চোখে তা সামান্য ‘অশালীন’ ঠেকলে নারীদের পরোক্ষ সামাজিক হয়রানি, কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য এবং আইনি জটিলতার মুখোমুখি হতে হয়। অতীতে কুখ্যাত ধর্মীয় পুলিশ ‘মুতাওয়া’ যেভাবে রাস্তায় নেমে সরাসরি নারীদের পোশাক নিয়ন্ত্রণ করত, বর্তমান আধুনিক সৌদিতে সেই দৃশ্যমান বর্বরতা কিছুটা কমলেও তার স্থান নিয়েছে ডিজিটাল নজরদারি এবং কঠোর রাষ্ট্রীয় আইনি সেন্সরশিপ; যেখানে পোশাকের স্বাধীনতা বা নারী অধিকার নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সামান্য সমালোচনা করার অপরাধেও লুজাইন আল-হাথলুল বা সালমা আল-শেহাবের মতো প্রগতিশীল অ্যাক্টিভিস্টদের বছরের পর বছর কারাদণ্ড ও কঠোর নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে, যা প্রমাণ করে যে পোশাকের এই বাহ্যিক শিথিলতার ভেতরেও নারীর শরীরের ওপর রাষ্ট্রের চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণ ও স্বাধীনতার সীমাবদ্ধতা আজও সমানভাবে বিদ্যমান।

“হিজাব ইজ মাই চয়েস” – ইসলামিস্টদের দ্বিচারিতার ভন্ডামি

ইসলামপন্থী গোষ্ঠীগুলোর বৈশ্বিক প্রচারণায় একটি চরম আদর্শিক দ্বিচারিতা ও সুবিধাবাদ বিশেষভাবে লক্ষণীয়। যখন তারা পশ্চিমা গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে অবস্থান করে, তখন সেখানে হিজাব, নেকাব বা বুর্কিনি নিষিদ্ধ করার যেকোনো আইনি প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে অত্যন্ত সোচ্চার হয়ে ওঠে। সে সময় তারা পশ্চিমা মানবাধিকারের পরিভাষা ধার করে “ব্যক্তিগত স্বাধীনতা”, “ধর্মীয় অধিকার” এবং “নিজের পোশাক নিজে বেছে নেওয়ার অধিকার”-এর পক্ষে জোরদার যুক্তি দেয়। অথচ, এই একই গোষ্ঠীগুলো যখন বিশ্বের কোনো অঞ্চলে বা রাষ্ট্রে নিজস্ব রাজনৈতিক ক্ষমতা ও আধিপত্য লাভ করে, তখন নারীর জন্য সেই একই স্বাধীনতা আর প্রযোজ্য হয় না। ক্ষমতার সমীকরণ বদলানোর সাথে সাথেই তাদের সুর বদলে যায় এবং তারা অবলীলায় নারীর ওপর নির্দিষ্ট পোশাকের বাধ্যবাধকতা চাপিয়ে দেয়; যা প্রমাণ করে যে, তাদের কাছে “পোশাকের অধিকার” কোনো নীতিগত অবস্থান নয়, বরং পশ্চিমা সমাজ থেকে নিজেদের সুবিধা আদায়ের এবং নিজস্ব ভূখণ্ডে নারীর শরীরকে নিয়ন্ত্রণের একটি দ্বিমুখী রাজনৈতিক হাতিয়ার মাত্র।

ফ্রান্সে বা অন্য কোনো পশ্চিমা দেশে হিজাব বা বোরকা নিষিদ্ধের বিরুদ্ধে প্রগতিশীল ও মানবাধিকার কর্মীরা যে অমোঘ বাক্য উচ্চারণ করেন – “আমার শরীর, আমার সিদ্ধান্ত” (My Body, My Choice) – সেই একই মানবিক ও যৌক্তিক মাপকাঠি কি ইরানের পারাস্তু আহমাদি কিংবা আফগানিস্তানের নিপীড়িত নারীদের ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রযোজ্য নয়? যদি পশ্চিমা লিবারেল সমাজে মাথার হিজাব ধরে রাখাটা একজন নারীর সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত ও স্বাধীন পছন্দ হতে পারে, তবে ইরান, আফগানিস্তান বা সৌদির মতো রক্ষণশীল সমাজে হিজাব বা আবায়া খুলে ফেলাটাও সমভাবে একজন নারীর একান্ত ব্যক্তিগত রাজনৈতিক ও সামাজিক পছন্দ হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, পশ্চিমা বিশ্বে হিজাব পরার স্বাধীনতার পক্ষে যারা গলা ফাটান, তাদের একটি বড় অংশই ইরানে হিজাব না পরার অপরাধে নারীদের ওপর রাষ্ট্রীয় বেত্রাঘাত বা মাহসা আমিনির মতো তরুণীদের নির্মম হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে সম্পূর্ণ নীরব থাকেন, যা বৈশ্বিক মানবাধিকারের ক্ষেত্রে এক লৈঙ্গিক ভণ্ডামির নিকৃষ্ট উদাহরণ।

প্রকৃতপক্ষে, কোনো সমাজে “চয়েস” বা স্বাধীন পছন্দের ধারণাটি তখনই কার্যকর হতে পারে, যখন দুটি ভিন্ন বিকল্প বা সিদ্ধান্তই সমাজ ও রাষ্ট্রের চোখে সমানভাবে মর্যাদাপূর্ণ এবং সম্পূর্ণ ঝুঁকিমুক্ত হয়। যে সমাজ বা রাষ্ট্রব্যবস্থায় হিজাব না পরার সিদ্ধান্ত নিলে একজন নারীকে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার হুমকি, সামাজিক বয়কট, চাকরি হারানো, নৈতিকতা পুলিশের লাঞ্ছনা কিংবা রাষ্ট্রীয় কারাগার ও শারীরিক নির্যাতনের ভয় তাড়া করে বেড়ায় – সেখানে কোনো নারীর হিজাব পরাকে কোনোভাবেই “স্বাধীন পছন্দ” বলা যায় না; তা মূলত জীবন বাঁচানোর এবং সমাজে টিকে থাকার এক বাধ্যতাবোধ। প্রকৃত স্বাধীনতা এবং পোশাকের চয়েস কেবল তখনই প্রতিষ্ঠিত হবে, যখন একজন নারী স্বেচ্ছায় হিজাব পরার সিদ্ধান্ত নিলে তাকে যেভাবে সামাজিক মর্যাদা দেওয়া হবে, ঠিক একইভাবে আরেকজন নারী হিজাব না পরার বা খুলে ফেলার সিদ্ধান্ত নিলেও তাকে সমমর্যাদা, নিরাপত্তা ও নাগরিক অধিকার প্রদান করা হবে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে হিজাব নিষেধাজ্ঞা – কারণ ও বিতর্ক

ইউরোপের ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রকাঠামো এবং আইনি দর্শনের আলোকেও এই পোশাকরীতির একটি সুনির্দিষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাখ্যা রয়েছে। ফ্রান্স, বেলজিয়াম ও নেদারল্যান্ডস-সহ বেশ কিছু ইউরোপীয় দেশ তাদের সরকারি প্রতিষ্ঠান, আদালত এবং স্কুল-কলেজে সব ধরনের দৃশ্যমান ধর্মীয় প্রতীকযুক্ত পোশাক বা অনুষঙ্গ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেছে। এর পেছনের মূল দার্শনিক ও রাজনৈতিক যুক্তিটি হলো রাষ্ট্রীয় ধর্মনিরপেক্ষতার (যেমন ফ্রান্সের ক্ষেত্রে Laïcité) নীতি কঠোরভাবে রক্ষা করা – যেখানে রাষ্ট্র সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ থাকবে এবং কোনো বিশেষ ধর্মকে জনপরিসরে বাড়তি সুবিধা বা অসুবিধা দেবে না। এই সমতার নীতির আওতায় কেবল মুসলিম নারীদের হিজাবই নয়, বরং খ্রিস্টানদের বড় ক্রুশবিদ্ধ চেইন, ইহুদিদের কিপা (মাথার টুপি), কিংবা শিখদের পাগড়ি – সবকিছুই সমানভাবে নিষিদ্ধ। ফলে, পশ্চিমা এই নিষেধাজ্ঞাগুলোকে ঢালাওভাবে ইসলামভীতি বা কেবল মুসলিমবিদ্বেষ হিসেবে না দেখে, রাষ্ট্রের চোখে সব নাগরিক ও সব ধর্মের পরম সমতা এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানের অসাম্প্রদায়িক চরিত্র বজায় রাখার একটি কাঠামোগত প্রয়াস হিসেবেও বিবেচনা করা প্রয়োজন।

পাশাপাশি, বেশ কয়েকটি ইউরোপীয় দেশে জনসমক্ষে নেকাব বা বোরকার মতো মুখ-ঢাকা পোশাকের ওপর যে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে, তার পেছনে রয়েছে রাষ্ট্র ও নাগরিকদের নিরাপত্তার একটি অত্যন্ত জোরালো এবং বৈধ যুক্তি। একটি আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে মানুষের পরিচয় নিশ্চিতকরণ (Identification), আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা এবং অপরাধ প্রতিরোধে প্রতিটি নাগরিকের মুখমণ্ডল দৃশ্যমান থাকা জরুরি বলে বিবেচনা করা হয়। ব্যাংক, বিমানবন্দর, সিসিটিভি নিয়ন্ত্রিত এলাকা কিংবা যেকোনো জনবহুল প্রকাশ্য স্থানে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য এটি একটি সর্বজনীন আইনি বাধ্যবাধকতা। যদিও অনেক রক্ষণশীল গোষ্ঠী বা মানবাধিকার সংস্থার পক্ষ থেকে এই সুরক্ষামূলক আইনটিকে ধর্মীয় বৈষম্য বা ব্যক্তির পোশাকের স্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপ বলে সমালোচনা করা হয়েছে; তবুও দিনশেষে জননিরাপত্তা, সামাজিক যোগাযোগে পারস্পরিক স্বচ্ছতা এবং রাষ্ট্রীয় আইন প্রয়োগের সুবিধার্থে মুখমণ্ডল উন্মুক্ত রাখার এই যুক্তিটি আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবেই বিশ্বজুড়ে গৃহীত হচ্ছে।

মানবাধিকারের দৃষ্টিকোণ থেকে মূল্যায়ন

জাতিসংঘের মানবাধিকার সনদ এবং নারীর বিরুদ্ধে সকল বৈষম্য দূরীকরণ সনদ (CEDAW) অনুযায়ীঃ

  • প্রতিটি ব্যক্তির নিজের শরীর, পোশাক এবং ব্যক্তিগত জীবনের উপর স্বায়ত্তশাসনের অধিকার আছে।
  • রাষ্ট্র পোশাক নির্ধারণ করে দিতে পারে না, বিশেষত যখন তা শুধু একটি লিঙ্গের জন্য প্রযোজ্য।
  • শারীরিক শাস্তি – যেমন বেত্রাঘাত – নির্যাতনের সংজ্ঞার অন্তর্গত এবং সর্বজনীনভাবে নিষিদ্ধ।

পারাস্তু আহমাদির ৭৪ বেত্রাঘাতের সাজা আন্তর্জাতিক আইনের একাধিক ধারা লঙ্ঘন করে – এটি নির্যাতন, এটি বৈষম্য এবং এটি মত ও অভিব্যক্তির স্বাধীনতার হরণ।

ইতিহাস জুড়ে দেখা গেছে, যখনই কোনো রাষ্ট্র বা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নিজের ক্ষমতা সংহত করতে চেয়েছে, তখন নারীর শরীরকে নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্য বানিয়েছে। পোশাক নিয়ন্ত্রণ হলো প্রথম ধাপ – তারপর আসে গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ, শিক্ষা নিয়ন্ত্রণ, সম্পত্তির অধিকার হরণ।

হিজাব বিতর্কের মূল প্রশ্নটি তাই পোশাক নিয়ে নয় – প্রশ্নটি হলো কে সিদ্ধান্ত নেবেঃ নারী নিজে, নাকি রাষ্ট্র ও পুরুষতান্ত্রিক ব্যবস্থা?

প্রকৃতি ও সংস্কৃতি বিরুদ্ধ পোশাক কী কারো চয়েস হতে পারে?

মানবাধিকারের মূল দর্শন খুবই পরিষ্কারঃ হিজাব পরা বা না পরা – উভয়ই একজন নারীর একান্ত ব্যক্তিগত অধিকার। রাষ্ট্র যখন চাবুকের ভয় দেখিয়ে, কারাদণ্ডের হুমকি দিয়ে এই পোশাক নির্ধারণ করে দেয়, তখন তা বিশ্বাসের গণ্ডি পেরিয়ে এক সর্বগ্রাসী নিপীড়নে রূপ নেয়।

“হিজাব ইজ এ চয়েস” (Hijab is a choice) বা “হিজাব একটি স্বাধীন পছন্দ” – এই আধুনিক মানবাধিকারের বুলিটি কেবল তখনই সত্য ও অর্থপূর্ণ হতে পারে, যখন হিজাব না পরা বা তা খুলে ফেলাটাও সমানভাবে একটি মর্যাদাপূর্ণ ও সম্পূর্ণ নিরাপদ চয়েস হবে। যতদিন না পরার কারণে শাস্তি বা লাঞ্ছনার ভয় থাকবে, ততদিন এই বাক্যটি কেবল ইসলাম ধর্ম ও ক্ষমতার ভণ্ডামিরই প্রতিধ্বনি।

এই একই ভণ্ডামি ও কাঠামোগত বাধ্যবাধকতার চিত্র আমরা বাংলাদেশের সমাজবাস্তবতায় অত্যন্ত প্রকটভাবে দেখতে পাই। আমাদের দেশের বিভিন্ন প্রান্তে প্রায়শই দেখা যায়, কোনো নারী হিজাব বা স্কার্ফ না পরলে তাকে রাস্তাঘাটে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বা কর্মক্ষেত্রে নানাবিধ সামাজিক কটূক্তি, মানসিক হয়রানি ও উত্যক্তকরণের শিকার হতে হয়। বাইরে থেকে এগুলোকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা মনে হলেও, গভীরভাবে দেখলে বোঝা যায় এগুলো মূলত নারীকে পরোক্ষভাবে হিজাব পরতে বাধ্য করারই সামাজিক-ধর্মীয় নোংরা কৌশল।

এর চেয়েও বড় সংকটটি লুকিয়ে আছে চার দেয়ালের ভেতর। আমাদের পুরুষতান্ত্রিক সমাজ কাঠামোয় বাবা, ভাই কিংবা স্বামী যখন পারিবারিক কর্তৃত্বের জোরে একজন নারীকে হিজাব বা বোরকা পরতে বাধ্য করেন, কিংবা না পরলে অবহেলা, পারিবারিক সহিংসতা বা মানসিক নির্যাতনের মুখোমুখি দাঁড় করান, তখন সেই নারীর হিজাব পরিধান করাকে কোনোভাবেই “চয়েস” বলা চলে না। এটি মূলত পরিবারে টিকে থাকার এবং পুরুষের তৈরি করা তথাকথিত ‘সম্মান’ রক্ষার এক বাধ্যতা। প্রকৃত চয়েস বা স্বাধীনতা তখনই প্রতিষ্ঠিত হবে, যখন সমাজ ও পরিবারে হিজাব পরা এবং না পরা – উভয় সিদ্ধান্তই সমান নিরাপত্তা, সম্মান ও আইনি সুরক্ষায় গৃহীত হবে।

Related Posts

Hijab is My Choice!

‘Hijab is my choice’ – the same people who make this claim in secular countries often force women to wear hijab in their own countries

Iranian singer Parastu Ahmadi has been sentenced to 74 lashes for the “crime” of performingRead More

Rights of Minorities in Bangladesh

Attacks by “Tawhidi Janata” in Bangladesh and Obstruction of Minority Religious Practice

In Palashbari upazila of Gaibandha, local Sanatan (Hindu) devotees had taken the initiative to buildRead More

Rights of Minorities in Bangladesh

বাংলাদেশে তৌহিদী জনতার আক্রমন ও সংখ্যালঘুদের ধর্মচর্চার অধিকারে বাঁধাদান

গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলায় শ্রীশ্রী রাধাগোবিন্দ ও কালী মন্দির প্রাঙ্গণে একটি বিশাল রাম মূর্তি নির্মাণের উদ্যোগRead More

Comments are Closed