
Islam Destroys Heritage
পাথরের ভেতর বুদ্ধ জেগে ছিলেন দেড় হাজার বছর, ইসলাম তাকে মেরে ফেলে এক সপ্তাহে
এক
হিন্দুকুশের কোলে, বামিয়ান উপত্যকার বুকে, একটা নদী বয়ে যেত নিঃশব্দে। তার দুই পাশে বিস্তীর্ণ বেলেপাথরের পাহাড় – রোদে পোড়া, হাওয়ায় ক্ষয়ে যাওয়া, কিন্তু ভেতরে এক ধরনের নরম দৃঢ়তা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা পাথর। ষষ্ঠ শতাব্দীর কোনো এক সময়ে, যখন পৃথিবীর অনেক জায়গায় মানুষ লিখতেই শেখেনি ভালো করে, তখন এই পাহাড়ের গায়ে কিছু মানুষ ছেনি হাতে দাঁড়িয়েছিল। তারা পাথরের ভেতর থেকে বের করে আনতে চেয়েছিল একজন মানুষকে – যিনি মানুষ থেকে বুদ্ধ হয়েছিলেন।
বছরের পর বছর, হয়তো দশকের পর দশক ধরে, সেই ছেনির আঘাত পড়েছিল পাথরের গায়ে। ধীরে ধীরে জেগে উঠেছিল দুটি বিশাল অবয়ব। একটি পঞ্চান্ন মিটার উঁচু, আরেকটি আটত্রিশ মিটার – সেই সময়ের পৃথিবীতে দাঁড়িয়ে থাকা সবচেয়ে উঁচু বুদ্ধমূর্তি। তাদের গায়ে লাগানো হয়েছিল রঙ, সোনা, মূল্যবান রত্ন – সপ্তম শতাব্দীতে এই পথ দিয়ে যাওয়া চীনা পরিব্রাজক জুয়ান জাং (হিউয়েন সাং) লিখে গিয়েছিলেন, কীভাবে সূর্যের আলোয় ঝলমল করত সেই স্বর্ণমণ্ডিত অবয়ব, কীভাবে দশটি বৌদ্ধবিহারে হাজারো ভিক্ষু জপতেন তাদের সামনে। সিল্ক রোডের ক্লান্ত বণিকেরা, পাহাড় পেরিয়ে আসা তীর্থযাত্রীরা, সবাই থমকে দাঁড়াত এই উপত্যকার মুখে। দূর থেকে দেখা যেত দুটি ছায়ামূর্তি, পাথরের গায়ে খোদাই করা, যেন পাহাড়টাই নিজে চোখ মেলে তাকিয়ে আছে।
দুই
দেড় হাজার বছর। ভাবা যায়, এই সংখ্যাটা কতটা বিশাল? রোম সাম্রাজ্যের পতনের পর থেকে, মানুষ যখন খুঁজছিল কীভাবে গড়ে তুলবে নতুন পৃথিবী, তখন থেকে এই দুই মূর্তি দাঁড়িয়েছিল। তাদের চোখের সামনে দিয়ে কেটে গেছে কত সাম্রাজ্যের উত্থান-পতন। আরবের মরুভূমি থেকে উঠে আসা নতুন ধর্মের ঢেউ, মঙ্গল আক্রমণের ঝড়, মুঘল সাম্রাজ্যের বিস্তার, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকতার ছায়া, সোভিয়েত ট্যাংকের গর্জন – সব কিছু পার হয়ে গেছে এই উপত্যকার ওপর দিয়ে। আর সেই সব ঝড়ের ভেতরেও পাথরের বুদ্ধ দুজন দাঁড়িয়ে ছিলেন, নির্বিকার, যেন সময় তাদের স্পর্শ করতেই পারে না।
ইতিহাসবিদদের কাছে এই মূর্তিদ্বয় ছিল এক জীবন্ত দলিল – গান্ধার শিল্পরীতির শেষ মহান নিদর্শন, যেখানে গ্রিক ভাস্কর্যের কারুকাজ মিশে গিয়েছিল ভারতীয় আধ্যাত্মিকতার সঙ্গে। নৃতাত্ত্বিকদের কাছে তারা ছিল সিল্ক রোডের সাংস্কৃতিক মিলনের প্রমাণ – কীভাবে বৌদ্ধধর্ম ভারত থেকে মধ্য এশিয়া হয়ে চীনে পৌঁছেছিল, তার নীরব সাক্ষী। ইউনেস্কো তাদের ঘোষণা করেছিল বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে। তারা ছিল কেবল আফগানিস্তানের নয়, গোটা মানবজাতির স্মৃতির অংশ – এমন এক সময়ের সাক্ষ্য, যখন এই উপত্যকা ছিল ধর্ম, ভাষা ও সংস্কৃতির এক মহাসংগমস্থল।
তিন
কিন্তু পাথর যত শক্তই হোক, মানুষের ঘৃণার সামনে তা অসহায়।
২০০১ সালের মার্চ মাস। তালিবান নেতা মোল্লা মোহাম্মদ ওমর এক নির্দেশ জারি করলেন – এই মূর্তি দুটিকে মুছে ফেলতে হবে পৃথিবীর বুক থেকে। যুক্তি দেওয়া হলো ধর্মীয় – মূর্তি মানেই পৌত্তলিকতা, আর পৌত্তলিকতা মানেই ধ্বংসযোগ্য। অথচ এই একই মূর্তি দাঁড়িয়ে ছিল শত শত বছর ধরে, এমনকি অতীতের বহু মুসলিম শাসকের আমলেও, কেউ তাদের ছুঁয়ে দেখেনি। ইতিহাস সাক্ষী, একসময় এক মুসলিম শাসকও এই মূর্তির কোনো ক্ষতি করেননি। তাহলে দেড় হাজার বছর পর হঠাৎ কেন এই তাড়না?
আসলে এই ধ্বংস ধর্মীয় অনুভূতির চেয়েও বেশি ছিল ক্ষমতা প্রদর্শনের ভাষা। তালিবান তখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছ থেকে স্বীকৃতি চাইছিল, আর বিশ্ব তাদের প্রত্যাখ্যান করছিল। সেই প্রত্যাখ্যানের জবাবে তারা বেছে নিল এমন কিছু ধ্বংস করার পথ, যা গোটা পৃথিবী ভালোবাসে অথচ রক্ষা করতে পারবে না। মূর্তি দুটি হয়ে উঠল এক নিষ্ঠুর বার্তাবাহক – “তোমাদের সবচেয়ে প্রিয় ঐতিহ্যও আমাদের হাতের মুঠোয়, আর তোমরা কিছুই করতে পারবে না।”
চার
প্রথমে আনা হলো কামান। গোলাবর্ষণ করা হলো সেই পাথরের শরীরে, যে শরীর হাজার বছরের রোদ-বৃষ্টি সয়ে এসেছিল। কিন্তু পাথর তবু ভাঙল না সহজে। মূর্তি যেন কামানের আঘাতেও জেগে থাকল, যেমন কোনো প্রাচীন সন্ন্যাসী মার-বিক্ষোভের মধ্যেও স্থির থাকেন ধ্যানে।
তখন আনা হলো ট্যাংক, বিমান বিধ্বংসী কামান। তাতেও কাজ না হলে শেষে প্রয়োগ করা হলো ডিনামাইট – মূর্তির শরীরে গর্ত করে, ভেতরে বিস্ফোরক পুঁতে, টুকরো টুকরো করে উড়িয়ে দেওয়া হলো সেই অবয়ব, যা একদিন সোনায় মোড়ানো ছিল, যার সামনে মাথা নত করেছিল হাজারো তীর্থযাত্রী। কয়েক সপ্তাহ ধরে চলল এই ধ্বংসযজ্ঞ। বিস্ফোরণের ধোঁয়া যখন কাটল, পাহাড়ের গায়ে রয়ে গেল শুধু দুটি ফাঁকা কুলুঙ্গি – দুটি ক্ষত, যেন পাহাড়টারই দুটি চোখ উপড়ে নেওয়া হয়েছে।
বিশ্ব তখন তাকিয়ে দেখেছিল, প্রতিবাদ করেছিল, কিন্তু থামাতে পারেনি। শোনা যায়, এমনকি তালি*বানের ভেতরেও কোনো কোনো তরুণ সদস্য পরবর্তীতে এই ধ্বংসকাণ্ডের কথা মনে করে কিছুটা হলেও দ্বিধাগ্রস্ত বোধ করেছিলেন।
পাঁচ
আজ বামিয়ানের সেই পাহাড়ে গেলে দেখা যায় দুটি বিশাল শূন্যতা। মানুষ এখনও যায় সেখানে, দাঁড়ায় সেই ফাঁকা কুলুঙ্গির সামনে, আর সেই শূন্যতার দিকে তাকিয়ে যা দেখে তা আসলে একটি অনুপস্থিতি – কিন্তু সেই অনুপস্থিতিও কথা বলে। পাথর যা পারেনি, শূন্যতা তা পেরেছে – মনে করিয়ে দিতে যে সভ্যতা কতটা ভঙ্গুর, আর অসহিষ্ণুতা কতটা ধ্বংসাত্মক হতে পারে।
দেড় হাজার বছর ধরে যে মূর্তি টিকে ছিল রোদে, বৃষ্টিতে, ভূমিকম্পে, সাম্রাজ্যের পতনে – সেই মূর্তি মুছে গেল মাত্র কয়েক সপ্তাহের বিস্ফোরণে। ইতিহাস যা গড়ে তোলে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে, ঘৃণা তা ভেঙে ফেলতে পারে কয়েক দিনে। আর সেই ফাঁকা কুলুঙ্গি দুটি আজও দাঁড়িয়ে আছে হিন্দুকুশের কোলে – মানবসভ্যতার স্মৃতির গায়ে একটি স্থায়ী ক্ষত হয়ে, এক নীরব প্রশ্ন হয়ে: যা মানুষ ভালোবেসে গড়ে, তা ভাঙার অধিকার কার আছে? কিন্তু মানুষের ভালোবাসা, ইতিহাস, ঐতিহ্যের প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়ায় একটি হিংসা, ঘৃনা, ধ্বংসের স্লোগান – “আল্লাহু আকবর।” ধারনা করি, পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষ এই স্লোগানকে ভয় পায়, সভ্য মানুষ এই স্লোগান শুনলে দূরত্ব বাড়িয়ে দেয়।
Related Posts

Religious education does not bring any sustainable change in a person’s moral character
The LAUSD is the second-largest school district in the United States. In America, education fromRead More

ধর্মীয় শিক্ষা দিয়ে মানুষের নৈতিক চরিত্রের কোন টেকসই পরিবর্তন হয় না
আমেরিকার দ্বিতীয় বৃহত্তম স্কুল ডিস্ট্রিক্ট LAUSD. আমেরিকায় কিন্ডারগার্টেন টু টুয়েলভ ক্লাস পর্যন্ত সবার জন্য শিক্ষাRead More


Comments are Closed