work for pleasure

Work for Pleasure

আমি কাজ করি আমার নিজের আনন্দের জন্য, টাকা আয় করার জন্য নয় বা যশ, খ্যাতি, ক্ষমতা এসবের জন্য তো নয়ই

সে সময়ের প্রায় ডজনখানিক সংবাদপত্রে এসেছিল এই সংবাদ। ২০০৩ সাল। তখন ইন্টারনেট ছিল দুঃষ্প্রাপ্য। আর আমার নিজের কোন কম্পিউটারও ছিল না। ইউনিভার্সিটির ল্যাবে লাঞ্চ ব্রেকে ও আবাসস্থলে এক সহৃয়বান মানুষ ( Lutfor Rahman ) এর কম্পিউটারে শুরু করেছিলাম। ক্লাসের অন্য সবার নিজের কম্পিউটার ছিল, শুধু আর্থিক অসংগতির কারনে আমার আর অন্য ২/১ জনের ছিল না। অনেক কষ্টে নিজের কম্পিউটার কেনা হলে রাতের পর রাত জেগে এই সফটওয়্যার বানিয়েছিলাম। সেই সময়ে এটা একেবারে ফেলনা ছিল না। ২০০৪ বা ২০০৫ এ একবার এটি আইটি ইনোভেশান সার্চ প্রোগ্রামে নির্বাচিত হয়েছিল। তখন আজকের আইসিটি মন্ত্রী জনাব মোস্তাফা জব্বারের সামনে প্রদর্শন করেছিলাম। তখনো পর্যন্ত আমি ল্যাপটপ ব্যবহার করিনি কোনদিন। একদিন শুধু ইউনিভার্সিটির এক জাপান ফেরৎ স্যারের কাছে দেখেছিলাম টাচ প্যাডে কাজ করতে। সেই দেখাই কাজে দিয়েছিল প্রেজেন্টেশনের সময়।

তখন ইন্টারনেট একেবারেই দুঃষ্প্রাপ্য ছিল, আর যাইবা ছিল সাইবার ক্যাফেতে , এত রিসোর্স ছিল না। আমার এই প্রোজেক্টে ইন্টারনেট কোন কাজেই লাগেনি। সবটাই নিজের প্রচেষ্টা ছিল। আমার সহপাঠীরা সবাই জানে, আমি একাডেমিক পড়াশুনা করতামই না। অনেক দিন ক্লাসে গিয়ে শুনেছি আজ একটু পরে ক্লাস টেস্ট। ভাই ইমরানের ( Imran Hossain ) কাছে কৃতজ্ঞ। তার কাছে একটু ব্রিফিং নিয়ে পরীক্ষা দিয়েছি কত ! বাসায় আমি কখনোই পড়িনি, ক্লাসে স্যারের লেকচার দিয়েই আমার একাডেমিক পাঠ চুকিয়েছি। রেজাল্ট একেবারে খারাপও করিনি, সবটাই ফার্স্টক্লাস লেভেলের সিজিপিএ।

বরাবরের মতই মুখস্ত ছিল আমার খুবই অপ্রিয়। এখনো আমি সবাইকে বলি মুখস্ত না করতে। আমাদের দেশের শিশুদের সকল সম্ভাবনার প্রথম নষ্টটা হয় তাদের মুখস্ত করার জন্য চাপ দিয়ে।

আন্ডার গ্রাজুয়েশান শেষ করার পর সবাই যখন একে একে ঢাকায় চলে গেল আমি তখনো পড়ে রইলাম খুলনায়। বাবার সামর্থ্য নেই খরচ দেয়ার। তাই চাকুরি যোগাড় করেই যেতে হবে। কয়েকমাস পরে আমার এক হৃদয়বান বড় ভাই ( Kamruzzaman Palash ) সে ব্যবস্থা করে দিলে তবেই আমি যেতে পেরেছিলাম। এরপর সেই চাকুরি থেকে অন্য একটা নিয়ে কক্সবাজারে ছিলাম প্রায় ৩ মাস শুধুই এ্যাডভেঞ্চারের জন্য।

আমি বরাবরই ছিলাম স্বাধীনচেতা। কারো অধীনে থেকে তার নির্দেশমত কাজ করা আমার স্বভাবে ছিল না কখনোই। তাই চাকুরী নেয়ার সময় বলেছিলাম অন্যরা ৫ দিনে যা করবে আমি ১ দিনে তাই করব। বিনিময়ে বাকী ৪ দিন আমি আমার মত থাকব। অবশ্য আমি যে অফিসে ছিলাম তারাও আমাকে অনেক সুযোগ দিয়েছিল, বিশেষ করে সেই অফিসের প্রধান নির্বাহী আমাকে সবিনয় স্নেহ দিয়ে রেখেছিলেন, আমার জন্য তার অনেকখানি অবদান কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরন করতেই হবে।

টপ ম্যানেজমেন্টে থাকার পরও চাকুরিটা ছেড়েছিলাম। সেও ৫ বছর আগের কথা। এই ৫ বছর ধরে আমি বেকার ! প্রচলিত অর্থে আমি বেকার। তবে আমি বলি আমি নাইট লেবার – রাতমজুর। এখন আমার যা খরচ তা দেশের কোন প্রতিষ্ঠান আমাকে বেতন হিসাবে দিবে না। ইচ্ছামত ঘুরি ফিরি। গতবছর শুধু ৩ বার ১৫ দিন করে ইন্ডিয়া গিয়েই প্রায় নষ্ট করলাম … যাক সে হিসাব না হয় নাইবা দিলাম! আমি আবার একটু বেশীই সৎ থাকার চেষ্টা করি, মানুষকে বার বার বিশ্বাস করি, ঠকি, অনুরোধে ঢেঁকি গিলি। এজন্য জীবনে কিছুই করতে পারলাম না হয়ত। তবে আমার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ অনুপ্রেরনায় আজ অনেকে কিছু ক্ষেত্রে বিশ্বকে লিড করছে।

আমি কাজ করি আমার নিজের আনন্দের জন্য, টাকা আয় করার জন্য নয় বা যশ, খ্যাতি, ক্ষমতা এসবের জন্য তো নয়ই। আমার নিজের ভাল লাগার জন্য প্রতিবছর শুধু শেখার পিছনে ও কিছু এক্সপেরিমেন্টাল প্রোজেক্টে যা খরচ করি সেটা না করলে হয়ত একটি ফ্ল্যাটের মালিক থাকতাম এতদিন! আমি জানি আমার কাজ হল শুধু ক্রিয়েটিভ কিছু করে যাওয়া, টাকা আসল না আসল না সেটা দেখা নয়। তবে দিনশেষে আমার টেবিলেও খাবার যোগাতে হয়। আমার উপরে অনেকেই নির্ভরশীল। তাদের খাবারও যোগাতে হয়। তবে কিভাবে কিভাবে যেন আমার কাজের বিনিময়ে এগুলো এসে যায়। অনেক পরিবার/মানুষ আছে সারা বিশ্বে যারা আমার কাজের উপর নির্ভরশীল। আমার তৈরি জিনিস তারা সেল করে চলে।

আমি স্বাধীন মানুষ, কাউকে কোন কৈফিয়ৎ দিতে হয় না। কারো নির্দেশ পালন করতে হয় না। কোনদিন সারাদিন শুয়ে বসে কাটাই আবার কোনদিন ২/৩ ঘন্টা ঘুমাই। এই স্বাধীনতাটাই আমার কাছে আমার সফলতা। সারা বিশ্বে লক্ষ ওয়েবসাইট চলে আমার থিমে। দিনশেষে এগুলোই আমার প্রাপ্তি। অনেক দেশের সরকারী অনেক সাইট চলে আমার থিমে। যদিও অনেকেই ডিজাইন কাস্টমাইজ করে বিশ্রী করে ফেলে।

আজ দেখে ভাল লাগল, দক্ষিন আমেরিকার দেশ গায়ানার অর্থ মন্ত্রনালয় বা মিনিস্ট্রি অফ ফাইন্যান্স ( https://finance.gov.gy ) চলছে আমার একটা থিমে। বেলিজের ফরেস্ট ডিপার্টমেন্ট ( http://forest.gov.bz ) চলছে আর একটি থিমে। এমন হাজার হাজার আছে সরকারী, বেসরকারী সাইট, ইউনিভার্সিটি, চ্যারিটি, ব্যবসা, কোম্পানি! আপনার হয়ত জানেন .gov যুক্ত সব ডোমেইনই সরকারী প্রতিষ্ঠানের। অস্ট্রেলিয়া মহাদেশের দ্বীপরাষ্ট্র টোঙ্গার মানুষ হয়ত জানবে না তাদের দেশের একমাত্র ব্রডকাস্টিং কর্পোরেশনের সাইট, রেডিও, টেলিভিশিনের ওয়েব প্রযুক্তি করে দিয়েছে বিশ্বে নাম না জানা এক দেশ বাংলাদেশের সামান্য একজন মানুষ।

রকেট সায়েন্টিস্ট হতে পারিনি কিন্তু আমেরিকার রকেট সায়েন্টিস্টদের একটা প্রতিষ্ঠানের সাইট চলছে আমার থিমে ! এটাই বা কম কি ? নিজে কিছু করতে পারিনি, যারা করছে তাদের অনুপ্রেরনা হতে পেরেছি।

Related Posts

no border, no nation

দেশের সীমানা ও কাঁটাতার উঠিয়ে দেয়া দরকার, মানুষের চলাচল হোক অবাধ, স্বাধীন

এই ভিডিওটি দুই নিকট প্রতিবেশী দেশের সীমিত সম্পদের সঠিক ব্যবহার না করতে পারা ও জনগনেরRead More

Gratefulness of Life

মানুষ মানুষের জন্য ভাবে বা কারো স্বপ্নের পাশে দাঁড়ায় এটাই তো মানুষের সৌন্দর্য্য

প্রায় ১০ বছর আগের কথা। আমার তখন কোন ক্রেডিট কার্ড ছিল না, এখনো নেই। একটিRead More

Human and Dog Friendship

এই প্রাণীটাকে ব্যাখ্যা করা সহজ, মানুষকে ব্যাখ্যা করা সম্ভব না

মানব সভ্যতার সূচনালগ্ন থেকে মানুষের সঙ্গে কুকুরের বন্ধুত্ব। ভাই, বোন, আত্মীয়, স্বজন, পাড়া, প্রতিবেশী, স্বধর্মী,Read More

Comments are Closed