
The Influence of Ancient India
প্রাচীন ভারতের সফট পাওয়ার (Soft Power) বা সাংস্কৃতিক প্রভাব ছিল ব্যাপক
আন্ডারগ্রাড করার সময় এক শিক্ষক একবার প্রজেক্টরে একটা ডকুমেন্টারি দেখিয়েছিলেন। অংকর ওয়াট, কম্বোডিয়ার জঙ্গলে হারিয়ে যাওয়া একটি প্রাচীন মন্দির। আবার ভাইবেন না শিক্ষক হিন্দু ছিলেন, উনি অনেক আগে থেকেই ইসলাম ধর্মের মহা ধার্মিক। তবে এই ঐতিহাসিক স্থাপনার মূল্য বোঝাতে ও আমাদের পঠিত বিষয়ের সঙ্গে প্রাসঙ্গিক হওয়ায় উনি এটা দেখিয়েছিলেন, আর ঐ সময়ে শিক্ষকরা ক্লাসে এতো হারাম-হালাল, ইসলামিক-অনৈসলামিক চর্চা করতেন না। এতো দূরের দেশ, যেখানে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীর সংখ্যাই বেশি, সেখানে হিন্দু মন্দির এলো কোথা থেকে? বৌদ্ধ ধর্মের উৎপত্তিও তো ভারতীয় উপমহাদেশে। আসলে এই সবগুলো দিয়ে প্রাচীন ভারত ও এর মানুষদের এশিয়ার অন্য দেশগুলোর উপর কত প্রভাব ছিল সেটা বোঝা যায়।
দুই হাজার বছর আগে থেকে কয়েক শতক ধরে ভারতীয় বণিক, অভিবাসী ও পণ্ডিতেরা চীন, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, কম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড সহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে যাওয়া-আসা করতেন। সেই সম্পর্কের গভীর প্রভাব আজও ওই দেশগুলোর ভাষা, সাহিত্য ও স্থাপত্যে স্পষ্ট। যেমন তারাও আমাদের মতো করে পহেলা বৈশাখের সময়েই তাদের নববর্ষ পালন করেন। ইন্দোনেশিয়ার বালি দ্বীপ তো একই সংস্কৃতির ধারল। কম্বোডিয়ার ঐতিহ্য অংকর ওয়াট (Angkor Wat) সেই ভারতীয় সংস্কৃতির এক্সটেনশান আজও, এটি পৃথিবীর বৃহত্তম ধর্মীয় উপাসনালয়, যা দ্বাদশ শতাব্দীতে রাজা দ্বিতীয় সূর্যবর্মণ হিন্দু ভগবান বিষ্ণুর উদ্দেশ্যে নির্মাণ করেছিলেন (পরবর্তীতে এটি বৌদ্ধ মন্দিরে রূপান্তরিত হয়)। ইতিহাসের পাতায় এই গৌরবময় অধ্যায়টিকে “বৃহত্তর ভারত” (Greater India) বা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার “ভারতীয়করণ” (Indianization) বলা হয়ে থাকে। থাইল্যান্ডের জাতীয় মহাকাব্য ‘রামাকিয়েন’ (Ramakien) মূলত ভারতীয় রামায়ণেরই থাই সংস্করণ। দেশটির প্রাচীন রাজধানী ছিল ‘অয়ুথ্যায়া’ (Ayutthaya), যা ভারতের ‘অযোধ্যা’ শব্দের থাই উচ্চারণ। এমনকি বর্তমান থাই রাজাদের উপাধিও হয় ‘রামা’ (যেমন বর্তমান রাজা হলেন রামা দশম)। ইসলাম বা ইউরোপের মতো কোনো সামরিক আক্রমণ বা জোরপূর্বক সাম্রাজ্য বিস্তার ছাড়াই, কেবল বাণিজ্য, ধর্ম (হিন্দু ও বৌদ্ধ) এবং সংস্কৃতির মাধ্যমে এই বিশাল অঞ্চলের মানুষের মন জয় করেছিল ভারতীয় উপমহাদেশের মানুষেরা। প্রাচীন ভারতের সেই সফট পাওয়ার (Soft Power) বা সাংস্কৃতিক প্রভাব কতটা শক্তিশালী ও স্থায়ী ছিল, যা হাজার বছর পরেও আজ স্বমহিমায় টিকে আছে।
বাঙালি অতীশ দীপঙ্কর আজও তিব্বতের ইতিহাসে এক চিরন্তন এবং অবিস্মরণীয় ‘আলোকবর্তিকা’ (Light of Asia)। আজ থেকে প্রায় এক হাজার বছর আগে তিব্বতের অন্ধকারাচ্ছন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক পরিস্থিতিতে তিনি যে সংস্কারের আলো জ্বালিয়েছিলেন, তার প্রভাব আজও সেখানে অম্লান। বাঙালির এই মহান সন্তানকে তিব্বতীয়রা বুদ্ধের পরেই দ্বিতীয় সবচেয়ে শ্রদ্ধেয় আসন দেন এবং তাকে ভালোবেসে ডাকেন ‘জোবো জে’ (Jowo-je) বা ‘মহাপ্রভু’ নামে।
আগেই উল্লেখ করেছি, অংকর ওয়াট মূলত একটি হিন্দু মন্দির হিসেবেই নির্মিত হয়েছিল। মন্দিরের দেয়ালজুড়ে হিন্দু পুরাণের বিভিন্ন দেব-দেবী এবং ক্ষীরোদসমুদ্র মন্থনের মতো বিখ্যাত কাহিনীর ভাস্কর্য খোদাই করা রয়েছে। তবে দ্বাদশ শতাব্দীর শেষের দিকে খেমার রাজারা বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করলে এটি ধীরে ধীরে একটি বৌদ্ধ মন্দিরে রূপান্তরিত হয় এবং আজ পর্যন্ত এটি একটি বৌদ্ধ তীর্থস্থান হিসেবেই ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
ঐতিহাসিক সত্য হলো, অংকর ওয়াট কখনোই সম্পূর্ণ ‘অনাবিষ্কৃত’ বা জনমানবহীন ছিল না। স্থানীয় কম্বোডিয়ান এবং বৌদ্ধ ভিক্ষুরা সবসময়ই এই মন্দিরের অস্তিত্ব জানতেন এবং সেখানে নিয়মিত প্রার্থনা করতেন। তবে ১৫শ শতাব্দীর দিকে খেমার রাজারা যখন তাদের রাজধানী অন্য জায়গায় স্থানান্তরিত করেন, তখন এই বিশাল কমপ্লেক্সটি রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতা হারায়। ফলে রাজপ্রাসাদ ও তার চারপাশের এলাকাগুলো ধীরে ধীরে ঘন জঙ্গলে ঢেকে যায় এবং দীর্ঘ প্রায় ৪০০ বছর এটি বাইরের বিশ্বের চোখ থেকে এক প্রকার আড়ালে ও অবহেলিত অবস্থায় পড়ে থাকে।
আধুনিক বিশ্বের লোকচক্ষুর সামনে এই মন্দিরটি আসার পেছনে মূল ভূমিকা ছিল ফরাসি অভিযাত্রী অঁরি মুও-র। ১৮৬০ সালে কম্বোডিয়ার জঙ্গলে প্রাকৃতিক গবেষণার সময় তিনি স্থানীয়দের সহায়তায় এই বিশাল এবং বিস্ময়কর প্রাচীন শহরটির সন্ধান পান। ১৮৬১ সালে তার মৃত্যুর পর, ১৮৬৩ সালে তার চমৎকার স্কেচ ও ভ্রমণ ডায়েরি প্রকাশিত হলে তা পুরো ইউরোপে আলোড়ন সৃষ্টি করে। জঙ্গল ঘেরা এক হারিয়ে যাওয়া সভ্যতার সেই রোমাঞ্চকর বিবরণ পড়ে ফরাসি প্রত্নতাত্ত্বিকরা এটি উদ্ধারের কাজ শুরু করেন এবং এভাবেই অংকর ওয়াট নতুন করে বিশ্বমঞ্চে আত্মপ্রকাশ করে।
Related Posts

Jinnah was a thoroughly secular atheist, yet by playing the religious card he divided the country!
The first killing in India over writing and accusations of hurting religious sentiments took placeRead More

জিন্নাহ ছিলেন আপদমস্তক একজন সেকুল্যার নাস্তিক, অথচ ধর্মীয় কার্ড খেলে তিনি দেশ ভাগ করেন!
ভারতবর্ষে লেখালিখির কারনে ও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেয়ার অভিযোগে প্রথম কোন হত্যাকান্ড ঘটে কলকাতায়, ১৯২৪Read More

Bengali Women and Their Love for Jewelry: History, Modern Trends, and the Culture of Excess
When the first gold bangle was put on Nalini Devi’s wrist, she was only seven.Read More

Comments are Closed