
Sexual Orientation and Child Rape
মাদ্রাসা শিক্ষক শিশু ধর্ষণে অভিযুক্ত হয়ে গ্রেফতারের পরে জানালেন – তার নারীদের ভাল লাগে না
সম্প্রতি বাংলাদেশে একজন মাদ্রাসা শিক্ষক শিশু ধর্ষণের অভিযোগে আটক হওয়ার পর তিনি নিজের সম্পর্কে যে মন্তব্য করেছেন – ‘নারীদের ভাল লাগে না’, তা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে আলোচনা-সমালোচনা চলছে, তা আসলে দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়কে একসঙ্গে গুলিয়ে ফেলার একটি বড় উদাহরণ। শিশু নির্যাতন বা ধর্ষণ একটি ভয়াবহ ফৌজদারি অপরাধ, যার সঙ্গে ভুক্তভোগীর সম্মতি নেওয়ার কোনো সুযোগই নেই – শিশু আইনত ও নৈতিকভাবে সম্মতি দেওয়ার ক্ষমতা রাখে না। অন্যদিকে, একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের যৌন প্রবণতা – তিনি নারী, পুরুষ, উভয় লিঙ্গ নাকি কারও প্রতিই যৌন আকর্ষণ বোধ করেন না – এটি সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি বিষয়, যার মূলে রয়েছে জীববিজ্ঞান, মনোবিজ্ঞান এবং ব্যক্তিস্বাধীনতা। এই দুটি বিষয়কে এক করে ফেলা শুধু বৈজ্ঞানিক ভুলই নয়, বরং অপরাধের গুরুত্বকেও লঘু করে ফেলে।
যৌন প্রবণতাঃ একটি বৈজ্ঞানিক বাস্তবতা
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) ১৯৯০ সালে সমকামিতাকে রোগের তালিকা থেকে বাদ দিয়েছে। এর আগে আমেরিকান সাইকিয়াট্রিক অ্যাসোসিয়েশন ১৯৭৩ সালেই সমকামিতাকে মানসিক রোগের তালিকা (DSM) থেকে অপসারণ করে। এই সিদ্ধান্তগুলো রাজনৈতিক চাপে নয়, বরং কয়েক দশকের গবেষণার ভিত্তিতে নেওয়া হয়েছিল, যেখানে দেখা গিয়েছিল যে সমকামী ব্যক্তিদের মানসিক স্বাস্থ্যে কোনো সহজাত অস্বাভাবিকতা নেই – বরং তাদের মানসিক সমস্যা, যদি থাকে, তার মূল কারণ সামাজিক বৈষম্য, বৈরিতা ও গোপনীয়তার চাপ।
জেনেটিক ও নিউরোবায়োলজিক্যাল গবেষণাও যৌন প্রবণতার জৈবিক ভিত্তি সমর্থন করে। ২০১৯ সালে সায়েন্স সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি বড় জিনোম-ওয়াইড অ্যাসোসিয়েশন স্টাডি (প্রায় সাড়ে চার লাখ মানুষের নমুনা নিয়ে) দেখিয়েছে যে সমকামী আচরণের সঙ্গে যুক্ত একাধিক জেনেটিক মার্কার রয়েছে, যদিও কোনো একক “সমকামী জিন” নেই। গবেষকরা বলছেন, যৌন প্রবণতা জিন, প্রাক-জন্মকালীন হরমোনের প্রভাব এবং পরিবেশগত উপাদানের জটিল মিথস্ক্রিয়ার ফল – ঠিক যেমন উচ্চতা বা বুদ্ধিমত্তার মতো বহু-জিনঘটিত (polygenic) বৈশিষ্ট্য।
প্রকৃতিতে সমকামিতাঃ ব্যতিক্রম নয়, বরং সাধারণ
মানুষ ছাড়াও প্রাণিজগতে সমকামী আচরণ ব্যাপকভাবে নথিভুক্ত। জীববিজ্ঞানী ব্রুস বাগেমিলের বিখ্যাত গ্রন্থ Biological Exuberance-এ ১৫০০-রও বেশি প্রজাতির মধ্যে সমকামী বা উভকামী আচরণের প্রমাণ তুলে ধরা হয়েছে – পেঙ্গুইন, ডলফিন, বনোবো, শিম্পাঞ্জি, সিংহ, রাজহাঁস থেকে শুরু করে অসংখ্য পাখি ও স্তন্যপায়ী প্রাণীর মধ্যে। বনোবো, শিম্পাঞ্জিদের মধ্যে সমলিঙ্গ যৌন মিলন সামাজিক বন্ধন দৃঢ় করার একটি স্বাভাবিক অংশ হিসেবে কাজ করে। জার্মানির একটি চিড়িয়াখানায় পুরুষ পেঙ্গুইন জুটি বেঁধে ডিম পালন করার ঘটনাও ব্যাপক আলোচিত হয়েছিল। এই তথ্যগুলো প্রমাণ করে যে সমকামিতা “অপ্রাকৃতিক” নয় – বরং প্রকৃতির বৈচিত্র্যেরই একটি অংশ, যা যৌন প্রজননের বাইরেও সামাজিক বন্ধন, চাপ প্রশমন কিংবা জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখতে পারে বলে বিজ্ঞানীরা মনে করেন।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটঃ গোপন যন্ত্রণা
বাংলাদেশের মতো রক্ষণশীল সমাজে সমকামী নারী-পুরুষদের একটি বড় অংশ নিজের প্রকৃত পরিচয় গোপন রেখে সামাজিক প্রত্যাশা মেনে বিপরীত লিঙ্গের সঙ্গে সংসার করতে বাধ্য হন। এমন বহু নারী আছেন, যাঁরা প্রকৃতপক্ষে লেসবিয়ান হয়েও পারিবারিক ও সামাজিক চাপে পুরুষকে বিয়ে করেন, সন্তানের জন্ম দেন – কিন্তু ভেতরে ভেতরে দীর্ঘমেয়াদি মানসিক কষ্টের মধ্য দিয়ে যান। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় “মাইনরিটি স্ট্রেস” – নিজের সত্যিকারের পরিচয় লুকিয়ে রাখা এবং সমাজের প্রত্যাশা অনুযায়ী জীবনযাপনের কারণে সৃষ্ট দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ, যা বিষণ্নতা, উদ্বেগ এমনকি আত্মহত্যাপ্রবণতা পর্যন্ত বাড়িয়ে দিতে পারে বলে বহু আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা গেছে।
এই বাস্তবতা বোঝার জন্য একটি সহজ তুলনা করা যায়ঃ যাদের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি, ধরেন – আমি কিংবা আপনি, একজন বিষমকামী (heterosexual) ব্যক্তি যেমন কোটি টাকার বিনিময়েও সমলিঙ্গের কারও সঙ্গে যৌন সম্পর্কে জড়াতে আগ্রহী হবেন না, ঠিক তেমনি একজন সমকামী ব্যক্তিও বিপরীত লিঙ্গের কারও প্রতি প্রকৃত যৌন আকর্ষণ অনুভব করতে পারেন না – এটি ইচ্ছার বিষয় নয়, বরং সহজাত প্রবণতার বিষয়, প্রকৃতির খেয়ালেই তাদের শরীর এভাবেই তৈরি হয়েছে। জোর করে এই প্রবণতা পরিবর্তনের চেষ্টা (যাকে “কনভার্শন থেরাপি” বলা হয়) আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যাত এবং ক্ষতিকর বলে প্রমাণিত – আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনসহ বিশ্বের প্রায় সব প্রধান চিকিৎসা সংস্থা এই পদ্ধতিকে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
উভকামিতাঃ দুই দিকেই আকর্ষণ
উভকামী (bisexual) ব্যক্তিরা একই সঙ্গে বা বিভিন্ন সময়ে সম ও বিপরীত লিঙ্গের মানুষের প্রতি আকৃষ্ট হন। আলফ্রেড কিনসের বিখ্যাত ১৯৪৮ সালের গবেষণায় প্রস্তাবিত “কিনসি স্কেল” যৌন প্রবণতাকে একটি বর্ণালী (spectrum) হিসেবে উপস্থাপন করে – সম্পূর্ণ বিষমকামী থেকে সম্পূর্ণ সমকামী পর্যন্ত, যেখানে অধিকাংশ মানুষই দুই প্রান্তের মাঝামাঝি কোথাও অবস্থান করতে পারেন। আধুনিক গবেষণাও দেখায় যে উভকামিতা কোনো “দ্বিধা” বা “পর্যায়” নয়, বরং এটি নিজস্ব বৈধতাসম্পন্ন একটি স্বতন্ত্র যৌন প্রবণতা। তবে সামাজিক স্বীকৃতির অভাবে উভকামী ব্যক্তিরা প্রায়ই উভয় সম্প্রদায় থেকেই বিচ্ছিন্নতা অনুভব করেন, যা তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করে।
অযৌনতা (Asexuality): আকর্ষণের অনুপস্থিতি
অযৌন বা এসেক্সুয়াল ব্যক্তিরা অন্যের প্রতি যৌন আকর্ষণ অনুভব করেন না বা খুবই কম অনুভব করেন। এটি কোনো রোগ, দমন বা আঘাতজনিত সমস্যা নয় – বরং একটি স্বতন্ত্র যৌন প্রবণতা, যাকে অনেক গবেষক “চতুর্থ যৌন প্রবণতা” হিসেবে অভিহিত করেন। AVEN (Asexual Visibility and Education Network)-এর মতো সংগঠন এবং কানাডার গবেষক অ্যান্টনি বোগার্টের গবেষণা অনুযায়ী, জনসংখ্যার প্রায় ১ শতাংশ মানুষ এই বর্গে পড়তে পারেন। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, অযৌন ব্যক্তিরাও রোমান্টিক সম্পর্কে আগ্রহী হতে পারেন – যৌনতা ও রোমান্টিক আকর্ষণ যে ভিন্ন দুটি বিষয়, তা এই ক্ষেত্রে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আপনি ও অন্য একজন নারী-পুরুষ প্রেমের সম্পর্কে জড়ালেন, কিন্তু দেখা গেল একজন শারীরিক সম্পর্কে আগ্রহী নয়, সেটা উনার কোন রোগ নয়, বা তিনি অন্য কারো সঙ্গে প্রেমও করছেন না, তিনি হলেন এসেক্সুয়াল। বাংলাদেশের মতো সমাজে, যেখানে বিয়ের পর শারীরিক সম্পর্ককে দাম্পত্য জীবনের অপরিহার্য অংশ মনে করা হয়, সেখানে অযৌন ব্যক্তিদের জোরপূর্বক বিবাহ প্রায়ই দুই পক্ষের জন্যই দীর্ঘমেয়াদি অসুখী দাম্পত্য জীবনের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
সেপিওসেক্সুয়ালিটিঃ বুদ্ধিমত্তার প্রতি আকর্ষণ
সেপিওসেক্সুয়ালিটি এমন একটি প্রবণতা, যেখানে ব্যক্তি কারও শারীরিক সৌন্দর্যের চেয়ে তার বুদ্ধিমত্তা, মেধা ও সৃজনশীলতার প্রতি বেশি আকৃষ্ট হন। একটি বিষয় স্পষ্ট করে বলা দরকার – সেপিওসেক্সুয়ালিটি এখনো WHO বা আমেরিকান সাইকিয়াট্রিক অ্যাসোসিয়েশনের মতো প্রধান চিকিৎসা সংস্থাগুলোর দ্বারা আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃত একটি ক্লিনিক্যাল যৌন-প্রবণতার শ্রেণি নয়; এটি মূলত জনপ্রিয় মনোবিজ্ঞান ও অনলাইন সংস্কৃতিতে ব্যবহৃত একটি পরিভাষা, যা একধরনের আকর্ষণের ধরন বর্ণনা করে। তবে এর পেছনের অভিজ্ঞতা বাস্তব – অনেক মানুষ, বিশেষত যাঁরা বুদ্ধিবৃত্তিক উদ্দীপনাকে গুরুত্ব দেন, তাঁরা সাধারণ দাম্পত্য জীবনে থেকেও কোনো সৃজনশীল বা মেধাবী মানুষের প্রতি গভীর মানসিক টান অনুভব করতে পারেন। এই অতৃপ্তি থেকে সৃষ্ট মানসিক দূরত্ব পারিবারিক সম্পর্কে অশান্তির জন্ম দিতে পারে, যদিও এর মূল কারণ সঙ্গীর প্রতি অনীহা নয়, বরং সংযোগের ধরনে ভিন্নতা।
পার্থক্য বোঝা জরুরি
এই আলোচনার মূল কথা হলো – মানুষের যৌন প্রবণতার বৈচিত্র্য বিজ্ঞানসম্মতভাবে স্বীকৃত একটি বাস্তবতা, যার সঙ্গে অপরাধ বা নৈতিক বিচ্যুতির কোনো সম্পর্ক নেই, যতক্ষণ তা দুই সম্মতিসম্পন্ন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। অন্যদিকে, শিশু নির্যাতন বা ধর্ষণ সম্মতির প্রশ্নই ওঠে না এমন একটি জঘন্য অপরাধ, যার বিচার হওয়া উচিত পূর্ণ কঠোরতায়। বাংলাদেশের মাদ্রাসাগুলোতে এই শিশু বলাৎকার বা ধর্ষণের মহামারি চলে, যদিও কোন সরকারই ধর্মীয় অনুভূতির দোহায় দিয়ে ধর্ষকদের নজরদারি ও শাস্তির আওতায় আনতে পারে না। তবে বাংলাদেশের মানুষের কাছে অপরাধের চেয়ে, ভিন্ন বিষয় যেমন নারী পছন্দ করেন না, এগুলো বেশি রসালো ও আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। এই দুটি বিষয়কে গুলিয়ে ফেলে যখন একজন অপরাধীর “নারী পছন্দ না করা”কে নিয়ে ট্রোল করা হয়, তখন আসল অপরাধ – শিশু নির্যাতন – তুলনামূলকভাবে আড়ালে চলে যায়, যা ভুক্তভোগী শিশুদের প্রতি অবিচার। সমাজ হিসেবে আমাদের প্রয়োজন বৈজ্ঞানিক সাক্ষরতা বৃদ্ধি করা – যাতে আমরা প্রাপ্তবয়স্কদের সম্মতিভিত্তিক যৌন প্রবণতাকে শ্রদ্ধা করতে শিখি, এবং একই সঙ্গে শিশু নির্যাতনের মতো অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে পারি – এই দুটি ভিন্ন নৈতিক প্রশ্নকে কখনো একসূত্রে না গেঁথে।
Related Posts

Humans cannot even see 1% of the beauty and colors of Earth and the universe! Are humans really the best of creation?
The human eye can generally detect visible light or color in the wavelength range ofRead More

পৃথিবী ও মহাবিশ্বের সুন্দর জিনিসের ১% সৌন্দর্যের রঙও মানুষ দেখতে পায় না! মানুষ কি সৃষ্টির সেরা?
মানুষের চোখ সাধারণত ৩৮০ থেকে ৭৪০ ন্যানোমিটার (nm) তরঙ্গদৈর্ঘ্যের (wavelength) দৃশ্যমান আলো বা রঙের রেঞ্জRead More

Why does Allah show such preference for women with large breasts and large buttocks? Do men feel the same way? Does this give women any advantage?
If you leave Prophet Muhammad in Pattaya’s Walking Street and Beach Road after evening, inRead More

Comments are Closed