
Salton Sea - Development Disaster
উন্নয়ন যখন বিপর্যয়ঃ বিল ডাকাতিয়া থেকে স্যালটন সী
আন্ডারগ্র্যাজুয়েট পড়ার সময় আমার এক বান্ধবী খুলনার বিল ডাকাতিয়া অঞ্চলের মানুষের ওপর থিসিস করেছিল – যেখানে এককালের সোনালী ফসলের মাঠ কীভাবে তথাকথিত ‘ডেভেলপমেন্ট ডিজাস্টার’-এ পরিণত হয়েছে এবং তা কৃষকদের জীবিকা বদলে বাধ্য করেছে, সেই নির্মম সংগ্রামের গল্প উঠে এসেছিল; পরবর্তীতে মাস্টার্স করার সময় তার থিসিসটি আমার পুরোটা পড়ার প্রয়োজন হয়। বিল ডাকাতিয়া কিন্তু একক কোনো ঘটনা নয়, বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে এমন উচ্চাকাঙ্ক্ষী বিলিয়ন ডলারের প্রকল্প কালক্রমে ‘গলার কাঁটা’ হয়ে দাঁড়ানোর অগণিত উদাহরণ রয়েছে, যার অন্যতম নমুনা ক্যালিফোর্নিয়ার ‘স্যালটন সী’—একদা উপচে পড়া পর্যটকে জমজমাট ও আকাশছোঁয়া দামের জমিতে ঘেরা এই শহরটি ভুল পরিকল্পনার বলি হয়ে আজ এক নিস্তব্ধ ‘মৃতনগরী’, যেখানে বিলাসী জীবনের ধ্বংসাবশেষ কঙ্কালের মতো দাঁড়িয়ে আছে আর জমিগুলো পরিণত হয়েছে ক্যালিফোর্নিয়ার সবচেয়ে সস্তা ঠিকানায়।
বিল ডাকাতিয়াঃ বাঁধ যখন বন্দিশালা
খুলনা জেলার ডুমুরিয়া ও ফুলতলা উপজেলার সীমানায় অবস্থিত বিল ডাকাতিয়া একদা ছিল উর্বরতার প্রতীক। প্রায় সাড়ে নয় হাজার হেক্টর জমির এই বিলে আশির দশক পর্যন্তও বছরে তিনটি করে ফসল ফলত। কিন্তু এই সমৃদ্ধির পেছনের গল্পটা জটিল, এবং সেই জটিলতার শুরু ষাটের দশকে।
সেসময় ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের হাত থেকে উপকূলীয় জনপদকে রক্ষা করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড কোস্টাল এমব্যাংকমেন্ট প্রজেক্টের আওতায় খুলনা অঞ্চলের নদী-খালগুলোকে বাঁধ দিয়ে ঘিরে অসংখ্য পোল্ডার তৈরি করে। ডাচ প্রকৌশল-দর্শন থেকে ধার করা এই পোল্ডার পদ্ধতি নেদারল্যান্ডসে সমুদ্র থেকে জমি পুনরুদ্ধারের জন্য কার্যকর হলেও, বদ্বীপের জোয়ারভাটা-নির্ভর নদীব্যবস্থায় এর ফল হলো সম্পূর্ণ ভিন্ন। বিল ডাকাতিয়া হয়ে গেল ২৫ নম্বর পোল্ডার।
স্বল্পমেয়াদে বাঁধ কাজ করল ঠিকই – লবণাক্ত জোয়ারের পানি ঢুকতে না পারায় জমি চাষযোগ্য থাকল, বন্যার প্রকোপও কমল। কিন্তু বাঁধের ভেতরে আটকে পড়া নদীগুলো, যাদের স্বাভাবিক কাজ ছিল উজান থেকে নেমে আসা পলি বহন করে নিয়ে যাওয়া, তারা জোয়ারের সংস্পর্শ হারিয়ে ধীরে ধীরে পলি জমে ভরাট হতে শুরু করল। নদীর তলদেশ উঁচু হতে হতে একসময় আশপাশের চাষজমির চেয়েও উঁচু হয়ে গেল। ফলে বর্ষার পানি নামার আর কোনো পথ রইল না। ১৯৮৪ সালের বন্যায় বিল ডাকাতিয়া পুরোপুরি প্লাবিত হয়, প্রায় ছিয়াত্তর হাজার একর জমির ফসল নষ্ট হয়ে যায়, এবং সেই জলাবদ্ধতা টানা বারো বছর স্থায়ী হয়। মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে বাঁধের ওপর আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়।
এই সংকট থেকে বেরোনোর চেষ্টায় প্রকৌশলীরা যে সমাধান নিয়ে এলেন, তা ছিল আরও প্রকৌশল – আরও বাঁধ, আরও রেগুলেটর, আরও পাম্প। কিন্তু নদীর প্রাকৃতিক জোয়ারভাটা প্রক্রিয়াকে ফিরিয়ে না দিয়ে যান্ত্রিক সমাধান দিয়ে সমস্যা মেটানোর চেষ্টা একটার পর একটা ব্যর্থ হতে থাকল। পরবর্তীতে স্থানীয় জনগণ ও বিশেষজ্ঞদের দাবির মুখে কিছু এলাকায় “টাইডাল রিভার ম্যানেজমেন্ট” পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়—সাময়িকভাবে বাঁধ কেটে নদীকে আবার জোয়ারভাটার সংস্পর্শে ফিরিয়ে দেওয়া, যাতে পলি প্রাকৃতিকভাবে জমা হয়ে বিলের ভেতরের ভূমি উঁচু হয়। এই পদ্ধতি কিছুটা সুফল দিলেও তা ছিল ব্যয়বহুল, দীর্ঘমেয়াদী এবং রাজনৈতিকভাবে জটিল, কারণ যে জমি সাময়িকভাবে পলি জমানোর জন্য ব্যবহার করতে হয় তার মালিকদের ক্ষতিপূরণ দিতে হয়।
ফলাফল যা দাঁড়িয়েছে, তা হলো গত দেড়-দুই দশক ধরে প্রায় স্থায়ী জলাবদ্ধতা। যে কৃষক একদা তিন ফসলি জমিতে চাষ করতেন, তিনি আজ হয় সেই জমি ছেড়ে দিয়ে চিংড়ির ঘেরে পরিণত করেছেন, নয়তো মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করছেন, নয়তো শহরে গিয়ে দিনমজুরি করছেন। কৃষক থেকে জেলে হয়ে যাওয়া এই পেশা বদল কোনো স্বেচ্ছাচারিতা নয় – এটি একটি প্রকৌশল-সিদ্ধান্তের দীর্ঘমেয়াদী মূল্য, যা বহন করছেন তারা, যাদের সঙ্গে সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার কোনো সম্পর্কই ছিল না।
স্যালটন সীঃ দুর্ঘটনা থেকে রিসোর্ট, রিসোর্ট থেকে ভুতুড়ে শহর
স্যালটন সীর গল্প শুরু হয় আরেকটি প্রকৌশল-বিপর্যয় দিয়ে। ১৯০৫ সালে ক্যালিফোর্নিয়ার ইম্পেরিয়াল ভ্যালিতে কৃষিজমিতে সেচ দেওয়ার জন্য কলোরাডো নদী থেকে খাল কাটা হচ্ছিল। কিন্তু বসন্তের বন্যায় সেই খাল-ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে, এবং প্রায় দুই বছর ধরে কলোরাডো নদীর পুরো প্রবাহ অনিয়ন্ত্রিতভাবে গিয়ে পড়ে সল্টন সিংক নামের একটি প্রাকৃতিক অববাহিকায়, যা বহু শতাব্দী ধরে শুকনো ছিল। এভাবেই দুর্ঘটনাক্রমে জন্ম নেয় ক্যালিফোর্নিয়ার সবচেয়ে বড় হ্রদ, স্যালটন সী।
শুরুতে এটি ছিল নিছক একটি প্রকৌশল-ভুল। কিন্তু চল্লিশ ও পঞ্চাশের দশকে এই হ্রদকে ঘিরে গড়ে ওঠে এক বিশাল স্বপ্ন। বিনিয়োগকারী ও নগর-পরিকল্পনাবিদরা একে রূপান্তরিত করতে চাইলেন “ক্যালিফোর্নিয়ার রিভিয়েরা”-য়। ঝলমলে মোটেল, ইয়ট ক্লাব, গলফ কোর্স, ওয়াটার-স্কি প্রতিযোগিতা—হলিউড তারকা থেকে শুরু করে মধ্যবিত্ত আমেরিকান পরিবার পর্যন্ত সবাই ভিড় জমাতে শুরু করলেন এই মরুভূমির বুকে গড়ে ওঠা কৃত্রিম সমুদ্রতীরে। স্যালটন সিটির মতো নতুন নতুন জনপদ গড়ে উঠল, জমির দাম আকাশ ছুঁলো, বিজ্ঞাপনে একে তুলনা করা হলো ফ্লোরিডার মায়ামির সঙ্গে।
কিন্তু এই স্বপ্নের ভিত্তি ছিল একটি মৌলিক ভুল বোঝাবুঝির ওপর দাঁড়ানো। স্যালটন সী কোনো প্রাকৃতিক নদী-প্রবাহিত হ্রদ ছিল না; এর একমাত্র পানির উৎস ছিল আশপাশের কৃষিজমি থেকে আসা সেচের বাড়তি পানি, যাতে মিশে থাকত সার ও কীটনাশকের রাসায়নিক অবশেষ। হ্রদের কোনো প্রাকৃতিক নির্গমন-পথ ছিল না, ফলে পানি কেবল বাষ্পীভবনের মাধ্যমেই বেরোতে পারত—আর তার সঙ্গে সঙ্গে হ্রদে জমা হতে থাকত লবণ ও রাসায়নিক দূষণ। দশকের পর দশক ধরে হ্রদের লবণাক্ততা বাড়তেই থাকল, এমনকি সমুদ্রের চেয়েও বেশি লবণাক্ত হয়ে উঠল এর পানি। কৃষি-দূষণে পুষ্টি উপাদানের আধিক্য (ইউট্রফিকেশন) ঘটিয়ে বারবার শৈবালের বিস্ফোরণ ও অক্সিজেন-সংকট তৈরি হতে লাগল, যার ফলে লাখ লাখ মাছ একসঙ্গে মরে ভেসে উঠত পাড়ে, আর দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ত মাইলের পর মাইল।
ষাটের দশকের শেষ থেকেই পর্যটকরা মুখ ফিরিয়ে নিতে শুরু করলেন। মৃত মাছ আর পাখির পচা গন্ধ, দূষিত পানি, আর ধীরে ধীরে সংকুচিত হতে থাকা জলাশয় – এই মরুভূমির রিভিয়েরা রূপকথা থেকে হয়ে উঠল এক পরিত্যক্ত দুঃস্বপ্ন। যে মোটেল আর বিলাসবহুল বাড়িগুলো একদা অতিথিদের ভিড়ে গমগম করত, সেগুলো আজ ভাঙা জানালা আর বালিতে ঢাকা কঙ্কালের মতো দাঁড়িয়ে আছে। স্যালটন সিটিতে যে জমি একসময় হাজার হাজার ডলারে বিক্রি হতো, আজ তা ক্যালিফোর্নিয়ার সবচেয়ে সস্তা জমির তালিকায় – তবু ক্রেতা মেলা ভার। জলবায়ু পরিবর্তন ও কৃষি-ব্যবহারের পরিবর্তনের কারণে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে হ্রদের পানি আরও দ্রুত সংকুচিত হচ্ছে, উন্মুক্ত হচ্ছে বিষাক্ত ধুলোয় ভরা হ্রদতল, যা আশপাশের বাসিন্দাদের জন্য শ্বাসকষ্টের নতুন উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দুই বিপর্যয়ের অভিন্ন সুর
ভৌগোলিকভাবে দুটো ঘটনা পৃথিবীর দুই প্রান্তে, সংস্কৃতি ও প্রেক্ষাপটেও ভিন্ন। তবু বিল ডাকাতিয়া আর স্যালটন সীর গল্পে একটা গভীর মিল আছে: দুটোই প্রকৃতির প্রবাহ-ব্যবস্থাকে থামিয়ে দেওয়ার বা তার বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর চেষ্টার ফল। বিল ডাকাতিয়ায় নদীর জোয়ারভাটা বন্ধ করে পলি-প্রবাহকে থামানো হয়েছিল; স্যালটন সীতে একটি বদ্ধ অববাহিকাকে জলাধারে পরিণত করা হয়েছিল যার কোনো প্রাকৃতিক নির্গমন-পথ নেই। দুটো ক্ষেত্রেই স্বল্পমেয়াদী প্রকৌশল-সাফল্য দীর্ঘমেয়াদী পরিবেশগত পতনকে ঢেকে রেখেছিল, যতদিন না প্রকৃতি নিজের হিসাব বুঝে নিতে শুরু করে।
এই ধরনের প্রকল্পের আরেকটি অভিন্ন বৈশিষ্ট্য হলো, সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যারা এর ফল ভোগ করবেন তাদের বাইরে থেকে। বিল ডাকাতিয়ার পোল্ডার-পরিকল্পনা করেছিলেন দূরের প্রকৌশলীরা, স্থানীয় কৃষকের নদী-নির্ভর জীবনযাত্রার অভিজ্ঞতাকে বিবেচনায় না রেখে। স্যালটন সীর রিসোর্ট-স্বপ্ন গড়েছিলেন বিনিয়োগকারীরা, হ্রদের পানি-রসায়নের দীর্ঘমেয়াদী গতিপথ বিশ্লেষণ না করেই। উভয় ক্ষেত্রেই প্রকৃতির নিজস্ব ভারসাম্য রক্ষার প্রক্রিয়াকে বাধা দেওয়া হয়েছিল স্বল্পমেয়াদী মানুষের সুবিধার জন্য, আর যখন সেই ভারসাম্য ভেঙে পড়ল, তার মাশুল গুনতে হলো সবচেয়ে দুর্বল অবস্থানে থাকা মানুষদের – কৃষক, জেলে, সাধারণ বাসিন্দা।
এই প্যাটার্ন নতুন কিছু নয়। আরাল সাগরের সংকোচন, মিসিসিপি নদীর বদ্বীপ-ক্ষয়, তিন গিরিখাত বাঁধের পলি-জমাট সমস্যা, কিংবা বাংলাদেশেরই ফারাক্কা বাঁধ-পরবর্তী নদী-ব্যবস্থার পরিবর্তন – প্রতিটি উদাহরণে দেখা যায় একই ভুলঃ প্রকৌশল-বিজয়কে চূড়ান্ত সমাধান ভেবে নেওয়া, অথচ বাস্তুতন্ত্র কোনো স্থির বস্তু নয়, তা একটি চলমান প্রক্রিয়া, যাকে থামালে সে অন্যভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায়।
শেষ কথা
বিল ডাকাতিয়া আর স্যালটন সী আমাদের মনে করিয়ে দেয়, উন্নয়ন-প্রকল্পের সাফল্য মাপার আসল মাপকাঠি নির্মাণের দিনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান বা প্রথম কয়েক বছরের ফলাফল নয় – আসল পরীক্ষা হয় দশক পেরিয়ে, যখন প্রকৃতি তার নিজস্ব নিয়মে সাড়া দিতে শুরু করে। যে প্রকল্প বাস্তুতন্ত্রের স্বাভাবিক প্রবাহ, পলি-চক্র বা পানি-রসায়নকে উপেক্ষা করে গড়ে ওঠে, তা যত বিলিয়ন ডলারের হোক না কেন, শেষ পর্যন্ত হয় ভেঙে পড়ে, নয়তো টিকে থাকার জন্য অন্তহীন কৃত্রিম রক্ষণাবেক্ষণের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। আর ততদিনে, যারা সবচেয়ে কম দায়ী – স্থানীয় কৃষক, জেলে, সাধারণ বাসিন্দা – তাদের জীবনই বদলে যায় অপরিবর্তনীয়ভাবে। উন্নয়নের ইতিহাস তাই কেবল অগ্রগতির গল্প নয়, বরং তা মানুষের অহংকার আর প্রকৃতির ধৈর্যের এক দীর্ঘ, নিরন্তর দ্বন্দ্বেরও গল্প।
Related Posts

When Development Becomes Disaster: From Beel Dakatia to the Salton Sea
During my undergraduate years, a friend of mine wrote her thesis on the people ofRead More

Two hundred years of the camera have passed, and although we all enjoy its priceless benefits, how many of us actually know this?
In 2012 I bought a DSLR camera. Of course, long before that, around 2000, IRead More

ক্যামেরার ২০০ বছর চলে এখন, আমরা সবাই এর অমূল্য উপকার ভোগ করলেও ক’জন জানি এটা?
২০১২ সালে আমি একটা ডিএসএলআর ক্যামেরা কিনেছিলাম। অবশ্য তার অনেক আগে ২০০০ সালের দিকে আমারRead More

Comments are Closed