
Story
রিজিক – আল্লাহর রহমত
কুলসুম বেগমের হাতের তালুতে চামড়া উঠে গেছে বহুকাল আগে। এখন যেটা আছে, সেটা যেন কাঠের মতো শক্ত এক আস্তরণ – ধানক্ষেতের কাদা, অন্যের বাড়ির থালাবাসন মাজার সোডা, আর রোদে পোড়া সময়ের ছাপ। বয়স তার পঁয়তাল্লিশের কাছাকাছি, কিন্তু চেহারায় তার চেয়ে অন্তত দশ বছর বেশি বয়সের ছাপ পড়ে গেছে। সাত সন্তানের মা তিনি – বড় ছেলে হাসমত এবার ষোলোয় পড়েছে, সবচেয়ে ছোট মেয়ে রাবেয়ার বয়স চার। মাঝখানে আরও ছয়জন, একেকজন একেক ধাপে বেড়ে উঠছে অভাবের ভেতর দিয়ে, যেন অভাবটাই তাদের ঘরের আরেকজন সদস্য, যে কখনো ঘর ছেড়ে যায় না।
গ্রামটার নাম চরকুমারিয়া, নদীর একেবারে কিনারে। বর্ষায় ভাঙে, শুকনায় জেগে ওঠে – মানুষের জীবনও এখানে অনেকটা সেরকমই, ভাঙাগড়ার মাঝে দুলতে থাকে। কুলসুমের স্বামী আব্দুল কাদের মিয়া এই গ্রামের মানুষ হলেও, গ্রামে তার উপস্থিতি বছরে হয়তো দুই-তিন মাস, কোন কোন বছরে দুই তিন দিন। বাকি সময় তিনি থাকেন তাবলিগের কাজে – কখনো চল্লিশ দিনের চিল্লায়, কখনো তিন চিল্লায়, কখনো আবার এক বছরের জন্য বিদেশ সফরে। মানুষ বলে, কাদের মিয়া বড় পরহেজগার মানুষ, নামাজ কখনো কাজা করেন না, দাড়ি আছে, টুপি আছে, মুখে সবসময় আল্লাহ-রাসূলের নাম। গ্রামের অনেকে ঝাড় ফুঁক নেয়ার জন্য গ্লাসভর্তি পানি নিয়ে আসে, কেউ কেউ যাদু, টোনা, বান, জিনের আছর কাটানোর জন্য আসেন। কাদের মিয়া খুশি মনে বিনা পারিশ্রমিকেই সেগুলো করে দেন। তার এক কথা, আলাহর কালাম বেঁচে খাওয়ার মানুষ তিনি নন।
কাদের মিয়া যখন গ্রামে ফেরেন, প্রতিবার আল্লাহ, রাসূল, নবীদের অনেক গল্প শোনান গ্রামের মানুষকে। স্ত্রী কুলসুমকে শোনান স্বামীর সেবা করার গুরুত্ব, স্বামীর অনুগত থাকার মাহাত্ব। কিন্তু কুলসুম জানেন, এই একই মুখ থেকে যে কথাগুলো বের হয়, তার আড়ালে আরও তিনটে সংসার লুকিয়ে আছে কাদের মিয়ার – বাংলাদেশের চার জেলার চার গ্রামে চারজন স্ত্রী, চার সংসার, প্রতিটাতে পাঁচ বা তারও বেশি সন্তান। কাদের মিয়া দ্বীনের পথে হাঁটেন, বলেন তিনি, আর সেই পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে তিনি একবার এখানে থামেন, একবার ওখানে। প্রতিটা থামায় জন্ম নেয় নতুন সন্তান, নতুন সংসার, নতুন এক নারীর একলা লড়াই।
কুলসুম কোনোদিন এই নিয়ে বেশি প্রশ্ন করেননি। গ্রামের মুরুব্বিরা বলতেন, স্বামীর ব্যাপারে বেশি কথা বলা গুনাহ। বাপের বাড়ির মানুষও বলত – মেয়ে মানুষের ভাগ্যে যা লেখা আছে, তাই হবে, স্বামীর অভিশাপ গায়ে লাগলে জান্নাতের দেখা পাবেন না তিনি। তাই কুলসুম মুখ বুজে সাত সন্তান নিয়ে বেঁচে থাকার লড়াইটা একাই লড়ে গেছেন। গ্রামের বিভিন্ন গৃহস্থ বাড়িতে ধানকাটা, ধান সেদ্ধ করা, গরু-ছাগলের দেখাশোনা, পুরুষদের মতো তপ্ত রোদে মাঠে কামলা খাটা – যা পাওয়া যায়, তাই করেছেন।
সেদিনও কুলসুম গিয়েছিলেন গ্রামের মাতব্বর হাশেম আলীর বাড়িতে কামলা খাটতে। ধান তোলার মৌসুম, হাতে হাতে কাজ, সারাদিনের বিনিময়ে দেড়শ টাকা আর দুবেলা ভাত, তাও টাকা পাওয়া যায় সপ্তাহান্তে। সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে দেখেন, ছোট মেয়ে রাবেয়া কাঁদছে খিদের চোটে, বড় ছেলে হাসমত চুপচাপ বসে আছে দাওয়ায়, চোখে সেই ক্লান্ত দৃষ্টি যা এই বয়সে থাকার কথা নয়। ঘরে চাল নেই, ডাল নেই। প্রতিবেশীর কাছ থেকে ধার করা এক মুঠো চাল ফুটিয়ে আট সন্তানের মধ্যে ভাগ করে দিতে দিতে কুলসুমের নিজের চোখেও পানি এসে যায়, কিন্তু সেই পানি তিনি কাউকে দেখতে দেন না।
ঠিক এই সময়টাতেই, প্রায় সাত মাস পর, কাদের মিয়া ফিরে এলেন বাড়িতে। কোনো খবর না দিয়ে, চুপিচুপি, যেমন তিনি সবসময় ফেরেন। উঠানে ঢুকে দেখলেন সন্তানরা মাটিতে বসে সামান্য ভাতের সাথে লবণ মেখে খাচ্ছে, কারো পাতে তরকারির চিহ্নমাত্র নেই। কাদের মিয়া কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলেন, তারপর ভেতরে গিয়ে জায়নামাজ বিছিয়ে বসলেন, যেন এই দৃশ্য তার কাছে নতুন কিছু নয়।
রাতে খাওয়ার পর, তিনি সন্তানদের ডেকে বসালেন উঠানে, চাঁদের আলোয়। শুরু করলেন ইসলামের গল্প – নবীজির (সাঃ) জীবনের কষ্টের কথা, সাহাবিদের ত্যাগের কথা, আল্লাহর অশেষ রহমতের কথা। ছেলেমেয়েরা মুগ্ধ হয়ে শোনে, যদিও তাদের পেট তখনও পুরোপুরি ভরেনি। কুলসুম দূর থেকে এই দৃশ্য দেখেন, ভেতরে ভেতরে রাগে ফুঁসতে থাকেন। এই মানুষটা সন্তানদের গল্প শোনাতে পারেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা, কিন্তু তাদের মুখে দুবেলা ভাত তুলে দেওয়ার দায়িত্ব যেন তার নয়।
গল্প শেষে সন্তানরা যখন ঘুমাতে গেল, কুলসুম আর নিজেকে সামলাতে পারলেন না।
“এত গল্প কও, নবীর কথা কও, আল্লাহর কথা কও – তোমার সন্তানরা যে না খাইয়া আছে, হেইডা দেখ না?” গলার স্বর তার কাঁপছিল, বহুদিনের জমানো ক্ষোভ যেন একসাথে বেরিয়ে আসছিল। “চার জায়গায় চাইরটা সংসার পাতছ, কোনোখানেই তো ঠিকমতো দায়িত্ব পালন করলা না। মানুষ তোমারে পরহেজগার কয়, আমি জানি তুমি কেমন। আরো কয়টা সংসার পাতছ আল্লাই জানে।”
কাদের মিয়া মুখে হাসি টেনে বললেন, “বউ, স্বামীর সাথে এমন উঁচা স্বরে কথা কইলে বেহেশতে যাইতে পারবা না। আল্লাহ পাক নারীদের স্বামীর অনুগত থাকতে কইছেন। স্বামীর দিলে চোট দিও না, আল্লা সইবে না।”
কুলসুম আরও ক্ষিপ্ত হয়ে বললেন, “বেহেশতের কথা কও, আর এই দুনিয়ায় য্যান জাহান্নাম বানাইয়া রাখছ! সন্তানগুলার মুখের দিকে চাইয়া দ্যাখো একবার।”
কাদের মিয়া তখন শান্ত গলায়, প্রায় গর্বের সাথে বললেন, “আল্লাহ যেই মুখ দিছেন, সেই মুখে আহারও তিনিই দিবেন। রিজিকের মালিক আল্লাহ, আমি না, তুমিও না। তিনি চাইলে আইজ রাইতেই আমরা কোরমা-পোলাও খামু।”
কুলসুম তাচ্ছিল্যভরে হেসে উঠলেন, প্রায় বিদ্রূপের সুরে বললেন, “হ, খাওয়াও তো দেখি কোরমা-পোলাও! কোথা থাইকা আনবা, আসমান থাইকা পড়ব নাকি?”
কাদের মিয়ার মুখটা সাথে সাথে ছোট হয়ে গেল। তিনি কিছু বললেন না, শুধু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তারপর ঘুমন্ত সন্তানদের মধ্যে থেকে দুই ছেলেকে ডেকে তুললেন – হাসমত আর তার ছোট ভাই করিমকে। “চল, আমার লগে একটু বাইর হই, আল্লার উপরে ভরসা রাখতে না পারলে দুনিয়ায় মাইনষের কোন দাম নাই।”
কুলসুম রাগে গজগজ করতে করতে ভেতরে ঢুকে গেলেন, ভাবলেন লোকটা রাগ করে আবার হয়তো কোনো মসজিদে গিয়ে রাত কাটাবে, এটাই তার স্বভাব, সন্তান দুইটাকে নিয়েই তার ভাবনা।
রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে কাদের মিয়া আর তার দুই ছেলে দেখলেন দূরে একটা বাড়িতে আলোর রোশনাই, হাজারো মানুষের ভিড়। কাছে গিয়ে জানা গেল, এটা একটা বিয়ে বাড়ি, প্রতিবেশী গ্রামের এক বিশাল পরিবারের অনুষ্ঠান। সেখানে বিশাল আয়োজন – বড় বড় ডেকচিতে কোরমা, পোলাও, জর্দা রান্না হয়েছে, আর অনুষ্ঠান শেষে সেসব খাবার আশেপাশের মানুষদের মধ্যে বিলিয়ে দেওয়া হচ্ছে, যাতে কিছু নষ্ট না হয়, খাবার নেয়ার দীর্ঘ সারিতে প্রায় সবাই দরিদ্র, মিসকিন টাইপের মানুষ, সবাই ফিরছে গামলা ভর্তি কোরমা, পোলাও নিয়ে।
কাদের মিয়া দুই ছেলেকে নিয়ে সেখানে দাঁড়ালেন। একজন আয়োজক তাদের ডেকে বললেন, “চাচা, বাটি নিয়া আসছেন? খাবার তো অনেক বাকি রইছে, নিয়া যান।” কাদের মিয়ার কাছে অবশ্য বাটি ছিল না, কিন্তু আয়োজকরাই একটা বড় গামলা এগিয়ে দিলেন, ভরে দিলেন কোরমা আর পোলাওয়ে। কাদের মিয়া আল্লাহর মাহত্বের এই দেখা এভাবে তাৎক্ষনিকভাবে পেয়ে যাবেন, ভাবতে পারেননি। তিনি আত্মবিশ্বাসী হলেন, তার ইবাদত বন্দেগীতে খুশি হয়ে আল্লাহপাক এই পুরষ্কার তাকে দিয়েছেন, আল্লাহর রহমত কিভাবে আসবে মানুষ জানে না। তিনি দুই সন্তানকে জানালেন, “তোর মায় মানে না আল্লাপাক রিজিকের ব্যবস্থা করেন।”
কাদের মিয়া গামলা মাথায় নিয়ে বাড়ি ফিরলেন, মুখে এক অদ্ভুত প্রশান্তির হাসি। কুলসুম দরজা খুলে যখন দেখলেন গামলা ভর্তি কোরমা-পোলাও, তার মুখ হাঁ হয়ে গেল, কথা বলার ভাষা হারিয়ে ফেললেন কয়েক মুহূর্তের জন্য।
কাদের মিয়া গামলাটা নামিয়ে রেখে শান্ত গলায় বললেন, “দেখলা তো, আল্লাহ যার রিজিক যেখানে রাখছেন, সেইটা সেখানেই আইসা পড়ে। আমরা খালি বিশ্বাস রাখুম আল্লাহর রহমতের উপর। মানুষ যতই চিন্তা করুক, রিজিকের মালিক তো তিনিই।”
ততোক্ষনে অন্য ঘুমন্ত সন্তানেরাও জেগে গেছে, কোরমা-পোলাওয়ের ঘ্রানে তাদের পেটের ক্ষুধা যেনো আরো বেড়ে গেল। সেই রাতে সাত সন্তান পেট ভরে কোরমা-পোলাও খেল, বহুদিন পর তাদের মুখে হাসি ফুটল। কুলসুমও খেলেন, কিন্তু তার মনের মধ্যে একটা অস্বস্তি রয়েই গেল, যেন কিছু একটা ঠিক মেলানো যাচ্ছে না। এত বড় কাকতালীয় ঘটনা তার বিশ্বাসকে যেমন নাড়া দিল, তেমনি ভেতরে ভেতরে একটা খচখচানিও রয়ে গেল, যার নাম তিনি তখনও দিতে পারলেন না। মনের মধ্যে তার পরহেজগার স্বামীর মনে দুঃখ দেয়ার কিছুটা অনুতাপ কাজ করছিল।
পরদিন সকালে যথারীতি কুলসুম গেলেন হাশেম আলীর বাড়িতে কামলা খাটতে। কিন্তু গিয়ে দেখেন বাড়ির উঠান শুনশান, গরুর গোয়ালে গরু আছে কিন্তু কোন মানুষ নেই নেই, রান্নাঘরে হাঁড়ি-পাতিল যেমন ছিল তেমনই পড়ে আছে, চুলায় আগুন নেই। প্রতিবেশী রহিমার মা উঠান ঝাঁট দিতে দিতে বললেন, “কুলসুম, তুমি জানো না? গতকাইলই তো হাশেম ভাইয়ের বউ পোলাপান নিয়া বাপের বাড়ি গেছে গা। উনার শালীর বিয়া আছিল, বিরাট আয়োজন। রাইতেই ফিরা আসার কথা আছিল, কিন্তু…”
কুলসুম কিছু বুঝে ওঠার আগেই রহিমার মা গলা নামিয়ে বললেন, “কিন্তু বরযাত্রী আর বিয়ে বাড়ি পন্ত যাইতে পারেনি গো বইন, আসতে আসতে পথে ভয়ানক এক্সিডেন্ট হইয়া গেল গো। বরযাত্রীর গাড়ি উল্টাইয়া নদীতে পড়ছে, হবু বর নিজে আর কয়েকজন বরযাত্রী সাথে সাথেই মারা গেছে। বিয়া বাড়িতে তখনই কান্নাকাটি শুরু হইয়া গেল, কনে মানে বেগম সাবেবার বইন তো একবারে সংজ্ঞা হারাইয়া ফেলছিল। এমন অবস্থায় হাশেম ভাইয়ের বউ, পোলাপান ক্যামনে ফেরে? সবাই এখনো ওইখানেই আছে।”
কুলসুমের বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল, একটা সন্দেহ মনে উঁকি দিচ্ছে, অন্য সবকিছুর বাইরে তার মাথায় তখন কাদের মিয়ার নিয়ে আসা কোরমা-পোলাও। “কী কও? তাইলে… তাইলে বিয়া বাড়ির যে এত রান্না হইছিল, ওই খাবারের কী হইল?”
রহিমার মা মাথা নাড়লেন, “আর কী হইব, এত রান্না, এত মানুষের লেইগা কোরমা-পোলাও – বিয়াই তো হইল না, কনে তো বিধবা হইয়া গেল বিয়ার আগেই। খাবার তো নষ্ট হইতে দেওয়া যায় না, তাই বাবুর্চিরা আশেপাশের মানুষজনরে ডাইকা ডাইকা বিলাইয়া দিছে। কার কপালে কী আছে কে জানে, কেউ কেউ তো নাকি মাথায় কইরা গামলা ভইরা নিয়া গেছে।”
কুলসুম নিশ্চুপ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন, পায়ের নিচের মাটি যেন সরে যাচ্ছে এমন অনুভূতি হলো তার। গতরাতের সেই কোরমা-পোলাও, যা নিয়ে কাদের মিয়া এত বড়াই করেছিলেন আল্লাহর রিজিকের কথা বলে, সেই খাবার এসেছিল একটা তরুণ ছেলের মৃত্যুর বিনিময়ে, একটা মেয়ের অসমাপ্ত বিয়ের কান্নার বিনিময়ে, একটা পরিবারের চিরদিনের শোকের বিনিময়ে। যে খাবার আনন্দের জন্য রান্না হয়েছিল, তা বিলি হয়েছিল শোকের ছায়ায়। কুলসুমের পেটে যাওয়া কোরমা পোলাও যেনো এক্ষুনি বেরিয়ে যাবে – শরীরটা এভাবে গুলিয়ে যেতে শুরু করলো। তবে উনি রহিমার মা’কে কিছু বুঝতে দিলেন না।
কুলসুম সেদিন আর কামলা খাটতে পারলেন না। মাথা ঘুরে বসে পড়লেন উঠানের এক কোণে। মনে মনে ভাবলেন – তার স্বামী রাতে যা বলেছিলেন, তা কি আসলেই সত্যি ছিল, নাকি শুধুই কাকতালীয়তাকে বিশ্বাসের রঙে রাঙিয়ে নেওয়া এক কৌশল? আল্লাহর রিজিকের কথা বলে যে মানুষ নিজের সন্তানদের অভুক্ত রেখে বছরের পর বছর বাইরে কাটান, সেই মানুষের মুখে এই কথাগুলো কতটা সত্য, আর কতটা নিজের দায়িত্বহীনতা ঢাকার আবরণ – এই প্রশ্ন কুলসুমের মনে গেঁথে রইল।
বাড়ি ফিরে কুলসুম দেখলেন কাদের মিয়া নামাজ পড়ছেন উঠানে, মুখে তৃপ্তির ছাপ। নামাজ শেষে তিনি কুলসুমকে ডেকে বললেন, “দেখলা তো বউ, বিশ্বাস রাখলে আল্লাহ কেমনে ব্যবস্থা কইরা দেন। মনে রাখবা, রিজিকের মালিক আল্লাহ, তোমার রিজিকে থাকলে দশ মাইল দূর থিকাও তোমার খাবার চলে আইবো, আর রিজিকে না থাকলে মুখের সামনে থাকলেও তুমি খাইতে পারবা না।”
কুলসুম আজ আর চুপ করে থাকলেন না। ধীর অথচ দৃঢ় গলায় বললেন, “হ, শুনলাম আজকে হাশেম ভাইর বাড়ির খবর। যেই কোরমা-পোলাও তুমি কাইলকা আনছ, ওইটা এক পোলার লাশের বিনিময়ে আসছে, এক মাইয়ার সারাজীবনের কান্নার বিনিময়ে আসছে। তুমি কও আল্লাহর রহমত, আমি দেখি এক মায়ের বুক খালি হওয়ার দাম দিয়া আমার পোলাপান পেট ভরছে। এক বইনের চোখের পানি এই খাবারে মিশ্যা আছে।”
কাদের মিয়া থমকে গেলেন। কী বলবেন খুঁজে পেলেন না প্রথমে। এমন চুপচাপ থাকার অভ্যাস তার আছে। কঠিন সময়েও তিনি রাগেন না।
কুলসুম আবার বললেন, “তুমি বছরের পর বছর ঘুইরা বেড়াও, চাইর জেলায় চাইরটা বউ, চাইর সংসার। প্রত্যেক জায়গায় পাঁচ-সাতটা কইরা পোলাপান, প্রত্যেক জায়গাতেই বউরা একলা টানে সংসার। তুমি আসো, নবীর গল্প কও, আল্লাহর কথা কও, তারপর আবার হারায়া যাও। এইটা কোন দ্বীনের কথা আমি জানি না, কিন্তু এইটা যে দায়িত্ব থাইকা পলায়নের একটা পথ, এইটা আমি বুঝি। রিজিকের মালিক আল্লাহ, ঠিক আছে, কিন্তু রিজিক জোগাড় করনের লেইগা মেহনত করাও তো বান্দার কাজ, তাই না? তুমি তো মেহনতটাই করলা না, খালি ভরসার কথা কইয়া গেলা।”
কাদের মিয়া মাথা নিচু করে বসে রইলেন অনেকক্ষণ। এই প্রথমবার, তার স্ত্রীর কথায় তিনি কোনো জবাব খুঁজে পেলেন না। উঠানে তখন বিকেলের আলো পড়ছে, দূরে হাসমত আর করিম গরু নিয়ে ফিরছে মাঠ থেকে, ছোট রাবেয়া উঠানে খেলা করছে অনাবিল আনন্দে, আজকের ভাতের যোগান কোথা থেকে আসবে তা কারো জানা নেই। তবে বাবার উপরে তারা খুশি, পেট ভরে কোরমা পোলাও খাইয়েছেন রাতে। আল্লাহর উপর তাদের আস্থা আরো বাড়ছে।
কুলসুম রান্নাঘরের দিকে হাঁটা দিলেন, আজ রাতের জন্য যা আছে তাই দিয়ে রান্না চড়াতে হবে। তার মনে তখনও ঘুরছিল একটা প্রশ্ন – বিশ্বাস আর দায়িত্বহীনতার মধ্যেকার সেই সূক্ষ্ম রেখাটা, যা তার স্বামী সারাজীবন পার হয়ে গেছেন, অথচ কখনো বুঝতে পারেননি যে তিনি আসলে কোন পাশে দাঁড়িয়ে আছেন। কুলসুম অনেক কিছু ভাবেন, অনেক প্রশ্ন তার মাথায় উঁকি দেয়, কিন্তু পাপ হবে মনে করে আবারো নিজের প্রশ্নগুলোর উত্তর এড়িয়ে যান।
চরকুমারিয়া গ্রামের নদী তখনও বয়ে চলছিল তার নিজের নিয়মে, কারো ভাঙাগড়ার হিসাব না রেখেই। আর কুলসুম বেগম, তার আট সন্তানকে নিয়ে, আবারও প্রস্তুত হচ্ছিলেন আরেকটা দিনের লড়াইয়ের জন্য – যেই লড়াইয়ে বিশ্বাস আছে, কিন্তু ভরসা করার মতো মানুষ বলতে আসলে তিনি নিজেই, আর কেউ নয়। আর কারো উপরে ভরসা করতে চাইলেও কুলসুম সেসবের প্রতি আস্থা রাখতে পারেন না এখন, শুধু পাপ হবে মনে করে এড়িয়ে যান।
কয়টা দিন থাকার নিয়তে বাড়িতে ফিরলেও কাদের মিয়া পরদিন বোচকা কাঁধে রওনা দিলেন আবার, গন্তব্য কোথায় তা কুলসুম জানে না। শুধু যাওয়ার সময় কুলসুম ও আট সন্তানকে বলে গেলেন, তারা যেনো কোন অবস্থাতেই আল্লাহপাকের রহমত থেকে নিরাশ না হয়।
Related Posts

Islam’s Circular‑Logic Fallacy
Place: Cabin of a Dhaka–Sylhet-bound trainCharacters: Maulana Abdur Rahman (a responsible member of Tabligh Jamaat)Read More

ইসলামের সার্কুলার লজিক ফ্যালাসি
স্থান: ঢাকা থেকে সিলেটগামী ট্রেনের কেবিনচরিত্র: মাওলানা আব্দুর রহমান (তাবলিগ জামাতের একজন দায়িত্বশীল) ও অধ্যাপকRead More


Comments are Closed