
Operation Thunderbolt and an Islamic Murder
অপারেশান এন্টেবে – এক রাতের গল্প এবং নজরুল ইসলাম ও সুইটি আক্তারের ইসলামি হত্যার শিকার হওয়া!
একটি রাষ্ট্র বিদেশে তার নাগরিকদের জীবন বাঁচাতে কী করতে পারে? এর কোন টেক্সটবুক উদাহরণ আছে? সাম্প্রতিক সময়ে তো দেখেছেন স্রেফ নর-নারীর মানবীয় ভালবাসার সামান্য প্রকাশ করার জন্য সৌদি আরবের বর্বর শরিয়া আইন নৃশংস উপায়ে বাংলাদেশের দুইজন নাগরিকের জীবন নিলো! বাংলাদেশ কিছুই করতে পারেনি তার নাগরিকদের জন্য, বাংলাদেশকে নাকি জানানোই হয়নি!
অপারেশান এন্টেবে – এক রাতের গল্প
আকাশের নীল ফাঁদ
১৯৭৬ সালের ২৭ জুন। ভূমধ্যসাগরের ওপর দিয়ে যে সকালটা ভেসে আসছিল, তাতে কোনো অশুভ ইশারা ছিল না। তেল আবিবের বেন গুরিয়ন বিমানবন্দর থেকে এয়ার ফ্রান্সের ১৩৯ নম্বর ফ্লাইট আকাশে উঠেছিল, গন্তব্য প্যারিস। মাঝপথে এথেন্সে থামল। সেখানে আরও যাত্রী উঠল। নিরাপত্তা-তল্লাশি ছিল ঢিলেঢালা, কারণ গ্রিসের বিমানবন্দরে তখন কেউ কল্পনাও করেনি, ট্রানজিট লাউঞ্জের নরম আলোর ভেতর দিয়ে চারটি পিস্তল আর গ্রেনেড পেরিয়ে যেতে পারে।
বিমান আবার উড়ল। ভেতরে প্রায় আড়াইশো মানুষ। কেউ ঘুমোচ্ছেন, কেউ জানালা দিয়ে মেঘ দেখছেন। এক মা তাঁর শিশুর মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিলেন। এক বৃদ্ধ পুরোনো খবরের কাগজের ভাঁজ খুলে পড়ছিলেন। একটু দূরে সদ্য বিবাহিত এক দম্পতি আইফেল টাওয়ারকে সাক্ষী রেখে হানিমুনে যাচ্ছিলেন প্যারিসে। এক বাচ্চা মায়ের সঙ্গে অভিমান করে চিৎকার দিয়ে কাঁদছিল। তখনই চারজন যাত্রী আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়াল।
পিস্তল উঁচিয়ে একজন চিৎকার করে বলল, কেউ নড়বে না। তারা চারজন জিহাদী, দুজন ফিলিস্তিনি, দুজন জার্মান। ককপিটের দরজা ভেঙে তারা ভেতরে ঢুকল। ক্যাপ্টেন মিশেল বাকোস সামনে বন্দুকের নল দেখে বুঝে গেলেন, এই বিমানের হাল আর তাঁর হাতে নেই। যে আকাশ এতক্ষণ তাঁর কাছে এক পরিচিত দিগন্ত ছিল, সেটা হঠাৎ করে হয়ে উঠল এক অন্ধকার সুড়ঙ্গ। নীল আকাশের সাদা মেঘের মাঝে হঠাৎ অন্ধকার চারিদিকে।
বিমান মুখ ঘুরিয়ে দক্ষিণে চলল। লিবিয়ার বেনগাজিতে নেমে জ্বালানি নিল, তারপর আবার উড়াল। পরিশেষে সূর্য যখন পশ্চিম আফ্রিকার আকাশ লাল করছে, তখন চাকা ছুঁল এক অচেনা রানওয়েতে। ফলকে লেখা ছিল উগান্ডা, এন্টেবে। পাইলট বুঝে গেল তার বিমানের শেষ গন্তব্য ইদি আমিনের দেশ উগান্ডা।
নাম ডাকার সময়
এন্টেবের বাতাস ছিল ভেজা আর ভারী। বিমানের দরজা খুলে যাত্রীদের নামানো হলো এক পুরোনো টার্মিনালের হলঘরে, যার দেয়ালের রং চটে গিয়েছিল, জানালার কাচ ঘোলা। বাইরে উগান্ডার সৈন্যরা রাইফেল হাতে পাহারা দিচ্ছিল। দেশের একনায়ক ইদি আমিন সশরীরে এসে অপহরণকারীদের সঙ্গে কথা বললেন, এবং তাঁর মুখে দেখা গেল সেই ধরনের হাসি, যা বলে দেয় কার পক্ষে তিনি আছেন। ফিলিস্তিনের পক্ষে ইসরায়েল ও ইহুদিদের নিধনের জন্য এই বিমান ছিনতাইকে উগান্ডার প্রেসিডেন্ট ইদি আমিন স্বাগত জানালেন।
পরদিন এল সেই মুহূর্ত, যার কথা বেঁচে থাকা মানুষগুলো পরে কোনোদিন ভুলতে পারেননি। একজন অপহরণকারী হাতে একটি তালিকা নিয়ে হলঘরের মাঝখানে দাঁড়াল এবং নাম ডাকতে লাগল। যাদের পাসপোর্ট ইসরায়েলের, যাদের পরিচয় ইহুদি, তাদের আলাদা করা হলো। বাকিরা এক পাশে সরে গেলেন।
হলঘরের এক কোণে বসে ছিলেন এক বৃদ্ধা। তাঁর হাতের কবজিতে নীল কালিতে খোদাই করা ছিল কয়েকটি সংখ্যা, ত্রিশ বছর আগের এক নাৎসি বন্দিশিবিরের স্মারক। তিনি নিঃশব্দে সেই সংখ্যাগুলোর দিকে তাকিয়ে রইলেন। যে অন্ধকার থেকে একদিন পালিয়ে এসেছিলেন, সেটা যেন ভিন্ন এক আকাশে ঘুরে এসে আবার তাঁর সামনে দাঁড়িয়েছে। তাঁর ঠোঁট নড়ল, কিন্তু কোনো শব্দ হলো না।
মুক্তি পেলেন যাঁরা, তাঁরা ফিরে গেলেন প্যারিসে। কিন্তু এয়ার ফ্রান্সের ক্যাপ্টেন বাকোস আর তাঁর ক্রুরা একটি ঐতিহাসিক মানবিক ও সাহসী সিদ্ধান্ত নিলেন, যা তাঁদের মুক্তির পথ বন্ধ করে দিল। তাঁরা বললেন, অপহৃত যাত্রীদের ফেলে তাঁরা যাবেন না। সেই মুহূর্তে এক বিমানের ক্রু আর কয়েকটি দেশের যাত্রীর মধ্যে এমন এক বন্ধন গড়ে উঠল, যা কোনো আইনের বইয়ে লেখা নেই, যা কখনো কেউ বর্ডার নামক কাঁটাতার বা ধর্ম নামক মানব বিদ্বেষী কেচ্ছাতে কেউ প্রশ্রয় দেয় না।
অপহরণকারীদের দাবি পরিষ্কারঃ ইসরায়েল ও আরও কয়েকটি দেশের কারাগারে বন্দি ৫৩ জনকে মুক্তি দিতে হবে। নইলে ১ জুলাই দুপুরের মধ্যে একে একে জিম্মিদের হত্যা করা হবে।
জেরুজালেমের ঘরে
জেরুজালেমে, প্রধানমন্ত্রী ইতজাক রবিনের দপ্তরে, সেই রাতে আলো নিভল না। দেয়ালে ঝোলানো মানচিত্রে আঙুল রেখে কেউ একজন বলছিলেন, এন্টেবে এখান থেকে প্রায় চার হাজার কিলোমিটার। মাঝখানে শত্রুভাবাপন্ন আকাশ, আর শেষ প্রান্তে এক বন্ধুহীন একনায়ক যিনি চাচ্ছেন জিহাদীদের দাবী পূরণ হোক।
ইসরায়েলের নীতি ছিল, সন্ত্রাসীদের সঙ্গে দরকষাকষি করা হবে না। কিন্তু সেই নীতির পেছনে এখন একশো জন মানুষের মুখ ঝুলছে। প্রতিরক্ষামন্ত্রী শিমন পেরেস আর সেনাপ্রধান মোরদেখাই গুরের সামনে প্রশ্নটা সরল আর নিষ্ঠুর ছিলঃ কূটনীতি যদি ব্যর্থ হয়, তখন কী?
সেনাবাহিনীর পরিকল্পনাকারীরা একে একে বিকল্প বাতিল করছিলেন। সমুদ্রপথ বহু দূর, প্যারাশুটে নামা ঝুঁকিপূর্ণ। বিমানে করে কমান্ডো নামানোই একমাত্র পথ, কিন্তু সেটাও প্রায় অসম্ভব। রাডারে ধরা পড়লে বিমানগুলো ভূপাতিত হতে পারে, আর আমিনের সৈন্যদের সংখ্যা অনেক।
সময় কেনার জন্য ইসরায়েল আলোচনায় রাজি হওয়ার ভান করল। অপহরণকারীরা সেই ফাঁদে পা দিল, সময়সীমা ১ জুলাই থেকে বাড়িয়ে করল ৪ জুলাই। এই তিনটি দিন ইসরায়েলের কাছে ছিল সোনার চেয়েও দামি।
ওদিকে মোসাদ নিঃশব্দে কাজ করছিল। মুক্তি পাওয়া যাত্রীদের একজন একজন করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলোঃ অপহরণকারী কজন, কোথায় দাঁড়ায়, ঘুমোয় কোথায়, হলঘরের দরজা কোন দিকে। আর এন্টেবের টার্মিনাল যে ইসরায়েলি নির্মাণ সংস্থা বানিয়েছিল, তাদের কাছ থেকে পাওয়া গেল ভবনের সম্পূর্ণ নকশা। সেই নকশার ওপর ভিত্তি করে সৈন্যরা ইসরায়েলের মাটিতেই এক হুবহু প্রতিলিপি বানিয়ে মহড়া দিল, বারবার, অন্ধকারে, চোখ বেঁধে।
৩ জুলাই বিকেলে মন্ত্রিসভা বসল। সিদ্ধান্ত হলো, অভিযান চলবে। নিজ দেশের নাগরিকদের জীবিত উদ্ধারের জন্য ৪০০০ কিলোমিটার দূরের দেশ উগান্ডায় অভিযানে যাবে ইসরায়েলের দূর্ধর্ষ কমান্ডোরা। প্ল্যান হলো প্লেন যাবে নিচ দিয়ে যেনো উগান্ডার রাডার ফাঁকি দেয়া যায়। রাতারাতি একটি মার্সিডিজ গাড়িকে পরিবর্তন করে এমন বানানো হলো যেনো সেটা উগান্ডার প্রেসিডেন্টের গাড়ির মতো হয় হুবুহু, তার গাড়িবহরের অন্য গাড়িগুলোর আদলে আরো কিছু গাড়ি বানিয়ে পরিবহন বিমানে উঠানো হলো সেগুলো।
নিচু আকাশে ডানা
সূর্য ডুবছে, ইসরায়েলের দক্ষিণের এক ঘাঁটিতে চারটি দানবাকৃতি হারকিউলিস পরিবহন বিমান সার বেঁধে দাঁড়িয়েছে। প্রথম বিমানের পেটের ভেতরে ছিল সেই কালো মার্সিডিজ গাড়ি, ঠিক আমিনের গাড়ির মতো। উদ্দেশ্য ছিল, বিমানবন্দরের উগান্ডীয় প্রহরীরা দূর থেকে দেখে ভাববে স্বয়ং রাষ্ট্রপ্রধান ইদি আমিন ফিরছেন।
গাড়ির কাছাকাছি বসে ছিলেন লেফটেন্যান্ট কর্নেল ইয়োনাতান নেতানিয়াহু, বন্ধুরা যাঁকে ডাকত ইয়োনি, বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বড় ভাই। তিনি ছিলেন সেই দলের নেতা, যারা সবার আগে টার্মিনালে ঢুকবে। তাঁর পাশে সৈন্যরা বসে ছিল, কেউ চোখ বুজে, কেউ অস্ত্র মুছতে মুছতে। কেউ কিছু বলছিল না।
বিমানগুলো উড়ল। রাডার এড়াতে তারা ওড়ার উচ্চতা রাখল সমুদ্রের প্রায় ছোঁয়া দূরত্বে। লোহিত সাগরের নিস্তব্ধ কালো জলের ওপর দিয়ে, ডানার ডগা প্রায় ঢেউ ছুঁয়ে, ঘণ্টার পর ঘণ্টা। ভেতরে ইঞ্জিনের গর্জন এত তীব্র যে কথা বলা যায় না। শুধু একে অপরের চোখে চোখ রেখে সৈন্যরা বসে রইল, জানত না কে ফিরবে আর কে ফিরবে না, কিন্তু সবার একটাই লক্ষ – দেশের নাগরিকদের জীবিত উদ্ধার করে নিয়ে আসা।
আফ্রিকার মাটির ওপর রাত ঘন হলো। নিচে ভিক্টোরিয়া হ্রদের কালো জল চকচক করছিল, আর দূরে, বহু দূরে, এন্টেবে বিমানবন্দরের টিমটিমে আলো।
রানওয়ের নিস্তব্ধতা
রাত এগারোটা পেরোনোর কিছু পরে প্রথম হারকিউলিস রানওয়ে ছুঁল। কোনো আলো জ্বলেনি, কোনো ঘোষণা নেই। বিশাল চাকাগুলো মাটিতে নামার সঙ্গে সঙ্গে পেছনের র্যাম্প নেমে এল, আর সেই কালো মার্সিডিজ আর তার পেছনের ল্যান্ড রোভারগুলো ধুলো উড়িয়ে ছুটল পুরোনো টার্মিনালের দিকে।
আলোহীন রাস্তায় দুজন ইউগান্ডীয় প্রহরী গাড়ির সামনে এসে হাত তুলল। তারা মার্সিডিজ চিনেছিল, কিন্তু কোথাও একটা কিছু মিলছিল না। ইসরায়েলিরা নিঃশব্দে সাইলেন্সার লাগানো পিস্তল চালাল। এক প্রহরী লুটিয়ে পড়ল। কিন্তু অন্যজন এক মুহূর্তের জন্য টিকে গেল, এবং তার চিৎকার ছড়িয়ে পড়ল। গোপনীয়তা শেষ হয়ে গেল। গাড়ি থামিয়ে ইসরায়েলের সৈন্যরা লাফিয়ে নামল, আর ছুটল।
হলঘরের ভেতরে জিম্মিরা তখন ক্লান্ত দেহে মেঝেতে শুয়ে। গুলির শব্দে ঘুম ভাঙল। অন্ধকারে কেউ হিব্রুতে চিৎকার করছিল, মেগাফোনে ভেসে আসছিল ভাষাটা, যে ভাষায় তাঁরা সারাজীবন কথা বলেছেন। “শুয়ে পড়ুন! সবাই শুয়ে পড়ুন!” মায়েরা শিশুদের বুকের নিচে চেপে ধরলেন, বৃদ্ধরা কাঁপতে কাঁপতে মেঝেতে মুখ গুঁজলেন।
কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে অপহরণকারীরা নিহত হলো। কিন্তু সেই ভয়ংকর সেকেন্ডগুলোতে কয়েকজন জিম্মি গুলিবিদ্ধ হলেন। জ্যাঁ-জ্যাক মাইমোনি, পাসকো কোহেন আর ইদা বরোচোভিচ আর কোনোদিন সেই ঘর থেকে বেরোতে পারলেন না।
বাইরে তখন তুমুল গোলাগুলি চলছিল। টার্মিনালের ছাদ আর কন্ট্রোল টাওয়ার থেকে উগান্ডীয় সৈন্যরা গুলি ছুড়ছিল। অন্ধকারে সৈন্যদের নেতৃত্ব দিতে দিতে ইয়োনি নেতানিয়াহু এক মুহূর্তের জন্য ভবনের বাইরে এসে দাঁড়ালেন। ঠিক তখন একটি গুলি তাঁকে আঘাত করল। তিনি পড়ে গেলেন। সঙ্গীরা তাঁকে ধরাধরি করে বিমানের দিকে নিয়ে গেলেন, কিন্তু সেই রাতে তিনিই ছিলেন এই অভিযানে নিহত একমাত্র ইসরায়েলি সৈন্য এবং তিনিই ছিলেন কমান্ডার। আগেই বলেছি তিনি ছিলেন ইসরায়েলের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বড় ভাই।
ফেরার পথ
মাটিতে কাটানো সময় ছিল এক ঘণ্টারও কম। এর মধ্যে জিম্মিদের টেনে এনে বিমানে তোলা হলো। কেউ কাঁদছিলেন, কেউ হাসছিলেন, কেউ তখনও বুঝতে পারছিলেন না ঠিক কী ঘটে গেছে। এক সৈনিক একটি শিশুকে কোলে নিয়ে ছুটছিল, আরেকজন এক বৃদ্ধকে পিঠে তুলে।
বিমানবন্দরে ইসরায়েলিরা উগান্ডার বিমানবাহিনীর বেশ কয়েকটি মিগ যুদ্ধবিমান ধ্বংস করে দিল, যাতে ফেরার পথে তাদের কেউ তাড়া করতে না পারে। তারপর হারকিউলিসগুলো একে একে রানওয়ে ছেড়ে আকাশে উঠল।
ফেরার পথে তারা কেনিয়ার নাইরোবিতে নামল জ্বালানি ভরার জন্য, আর সেখানে আহতদের চিকিৎসা দেওয়া হলো। তারপর আবার উত্তরে। ভোরের আলো তখন ফুটছে। ৪ জুলাই সকালে বিমানগুলো যখন তেল আবিবে নামল, বিমানবন্দরের বাইরে হাজার হাজার মানুষ অপেক্ষা করছিল। যে ১০২ জনকে বাঁচিয়ে আনা হয়েছিল, তাঁদের দেখে সেই ভিড় কেঁদে ফেলল।
কিন্তু গল্পের এক অংশ ফিরতে পারেনি। বৃদ্ধা ডোরা ব্লোখ অসুস্থ হয়ে আগেই কাম্পালার এক হাসপাতালে ছিলেন, তাই উদ্ধার দলের সঙ্গে ফিরতে পারেননি। পরে তাঁকে হত্যা করা হয়, এ কথা জানা গেল অনেক পরে। অভিযানের সাফল্যের পাশে তাঁর অনুপস্থিতি রয়ে গেল এক নীরব ক্ষত হয়ে।
যে প্রতিশ্রুতি রাষ্ট্র দিয়েছিল
এন্টেবের রাতকে অনেকে বলেন সামরিক ইতিহাসের এক অনন্য অধ্যায়। কিন্তু এর গভীরতর অর্থ সম্ভবত সামরিক নয়, বরং রাজনৈতিক ও নৈতিক। ইসরায়েল সেদিন নিজের নাগরিকদের কাছে একটি বার্তা পৌঁছে দিয়েছিলঃ তুমি যেখানেই থাকো, রাষ্ট্র তোমাকে ছেড়ে দেবে না। পৃথিবীর যে প্রান্তেই ইসরায়েলের নাগরিক আক্রান্ত হবে, সেখানেই তারা রাষ্ট্রের সর্বশক্তি প্রয়োগ করে তাকে উদ্ধার করবে।
অবশ্য ইতিহাসের হিসাব এখানেই শেষ নয়। এই অভিযান উগান্ডার ভূখণ্ডের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করেছিল, আর বহু উগান্ডীয় সৈন্য মারা গিয়েছিল। জাতিসংঘে ঘটনাটি নিয়ে তীব্র বিতর্ক হয়েছিল। ইসরায়েলের সমর্থকরা বলে, এটি ছিল নাগরিকদের প্রাণরক্ষায় আত্মরক্ষার বৈধ পদক্ষেপ। সমালোচকরা বলেন, আন্তর্জাতিক আইন এভাবে ভাঙা যায় না। দুটি যুক্তিই ইতিহাসের অংশ।
নজরুল ইসলাম ও সুইটি আক্তারঃ রাষ্ট্র জানলই না তার নাগরিকের অন্তিম পরিনতি!
এন্টেবের গল্পে একটি রাষ্ট্র তার নাগরিককে ফেরাতে সব শক্তি ব্যবহার করেছিল। এবার একটি ভিন্ন গল্প, যেখানে রাষ্ট্র নাগরিকের মৃত্যুর খবর পেল সংবাদমাধ্যম থেকে। এখানে যা নিশ্চিত আর যা অনিশ্চিত, দুটোই আলাদা করে বলা দরকার।
যা নিশ্চিত
সৌদি আরব ১৪ অক্টোবর মক্কার একটি মসজিদের ভেতরে অনৈতিক কাজের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত দুজন বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছে। সৌদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাঁদের নাম জানিয়েছে। সৌদি কর্তৃপক্ষ বলেছে, তাঁদের “তাজির” আইনে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। অনেকে মানুষের সামনে প্রকাশ্যে সৌদির অমানবিক শিরোচ্ছেদের মাধ্যমে তাদের মৃত্যুদন্ড কার্যকর করে তারা। বর্বর শরীয়া আইনের এই মানবতা বিরোধী কাজে উল্লসিত হয়ে সেখানে উপস্থিত মানুষ ‘আল্লাহু আকবর’ বলে চিৎকার দিচ্ছিলো – যে স্লোগানকে বিশ্বের অনেক মানুষ ভয় পায়।
পরিবারের বক্তব্য অনুযায়ী, ২৫ বছর বয়সী নজরুল ২০২২ সালের ১০ নভেম্বর পরিবারের আর্থিক অবস্থা ফেরাতে সৌদি আরবে যান। ছয় মাস পরে সৌদি পুলিশ তাঁকে ও সুইটি আক্তার নামের এক তরুণীকে মক্কার একটি মসজিদ থেকে “অশালীন কাজের” অভিযোগে গ্রেপ্তার করে। নজরুলের পরিবার জানিয়েছে, তিনি মক্কার মসজিদুল হারামে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করতেন, এবং পরিবারের দাবি, তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ তাঁর চরিত্রের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। বাবা আব্দুল বশির ছেলেকে পাঠাতে আত্মীয়দের কাছ থেকে ছয় লাখ টাকা ধার করেছিলেন।
দুইজনই মক্কায় পরিচ্ছন্নতা কর্মীর কাজ করার সময় তাদের মাঝে প্রেমের আদান প্রদান হয়। একদিন কোন এক মসজিদের কম্পাউন্ডে সামান্য হাগ দিয়ে নজরুল সুইটি আক্তারের কপালে একটা চুমুর ছোঁয়া দেন। এক পাকিস্তানি আবার তা ভিডিও করে। পরে সেই ভিডিও দেখে সৌদি বর্বর শরিয়া আইনের অধীনে তাদের এই মর্মান্তিক শাস্তি হয়, যা সভ্য দুনিয়ার কেউ কল্পনায়ও নিয়ে আসতে পারবে না কখনো! এমনকি বাংলাদেশের মতো ধর্মভীরু সংখ্যাগরিষ্ট দেশের মানুষও এই তথাকথিত অপরাধের শান্তি মৃত্যুদন্ড তা মেনে নিতে পারছেন না।
বাংলাদেশ জানত না
বাংলাদেশ সরকারের জানার কথা ছিল, এমনটাই হওয়ার কথা। কিন্তু জেদ্দায় বাংলাদেশ কনস্যুলেটের একটি সূত্র জানিয়েছে, সৌদি কর্তৃপক্ষ আগে থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশকে কিছুই জানায়নি। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, ১৪ অক্টোবর তাঁরা জানতে পারেন যে দুজন বাংলাদেশিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে ও তা কার্যকর হয়েছে। ঢাকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বা সৌদি আরবে বাংলাদেশ মিশন, কাউকেই আগে জানানো হয়নি। জেদ্দা কনস্যুলেট পরে সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি লিখে বিস্তারিত চেয়েছে।
এখানে একটা কঠিন প্রশ্ন আছে। বাংলাদেশ ও সৌদি আরব দুজনেই ভিয়েনা কনভেনশন অন কনসুলার রিলেশনসের পক্ষ। সেই কনভেনশনের আওতায় বিদেশে আটক নাগরিকের সঙ্গে কনস্যুলার যোগাযোগের অধিকার আছে। আরও উদ্বেগজনক হলো, তাঁরা আইনি সহায়তা পেয়েছিলেন কি না বা আপিলের সুযোগ পেয়েছিলেন কি না, সে তথ্যও এখনও জানা যায়নি। আমি এটা বলতে পারছি না যে সৌদি আরব “প্রয়োজন মনে করেনি,” কারণ সেই কারণ তারা এখনও জানায়নি। যা বলা যায়, তারা বাংলাদেশকে আগে জানায়নি, এবং বাংলাদেশ সেটা জেনেছে পরে, সংবাদমাধ্যমের মাধ্যমে।
সৌদির বর্বর শরিয়া আইনের অবিচার থেকে নিজ দেশের নাগরিকদের বাঁচাতে অন্য দেশগুলো কী করেছে?
কয়েকটি দেশের ঘটনা খুঁজে দেখলাম। শ্রীলঙ্কা, ফিলিপাইন ও ইন্দোনেশিয়া কেউই সৌদি আরবের বর্বর মৃত্যুদণ্ড থেকে তাদের সব নাগরিককে বাঁচাতে পারেনি। তবে প্রত্যেকে আলাদা ধরনের তৎপরতা দেখিয়েছে, এবং কয়েকটি ক্ষেত্রে সফল হয়েছে।
ইন্দোনেশিয়াঃ সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক তুলনা
ইন্দোনেশিয়ার অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি মেলে, কারণ ঠিক একই সমস্যায় তারা পড়েছিলঃ আগাম না জানিয়ে মৃত্যুদণ্ড।
সাতিনাহ (২০১৪): সফল উদাহরণ
সাতিনাহ বিনতি জুমাদি আহমদ ছিলেন গৃহকর্মী, যাঁকে নিয়োগকর্তার স্ত্রীকে হত্যার দায়ে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। রিয়াদে ইন্দোনেশিয়ার দূতাবাস ২০০৭ সাল থেকে তাঁর ক্ষমার জন্য লড়ছিল এবং নিহতের পরিবারের সঙ্গে আলোচনা চালাচ্ছিল। সৌদি আইনে নিহতের পরিবার রক্তমূল্যের বিনিময়ে মামলা মিটিয়ে নিতে পারে। পরিবার দাবি করেছিল ৭০ লাখ রিয়াল (প্রায় ১৯ লাখ ডলার), আর ব্যবসায়ী ও অন্যদের অনুদানে তিন মিলিয়ন রিয়াল কম পড়েছিল। শেষ পর্যন্ত ইন্দোনেশিয়া সরকার বাকি তিন মিলিয়ন রিয়াল দিতে রাজি হয় এবং এর আগে পাঁচবার মৃত্যুদণ্ড স্থগিত করাতে পেরেছিল। গণমাধ্যমে ও জনসমাজে প্রচারণা এতে বড় ভূমিকা রেখেছিল। সরকার প্রথমে বলেছিল, ফৌজদারি মামলায় রাষ্ট্রীয় তহবিল ব্যবহার করবে না, কিন্তু জনচাপের মুখে শেষ পর্যন্ত সেই অবস্থান বদলাতে হয়েছিল। এটি লক্ষণীয় যে প্রক্রিয়াটি এক-দুই মাসে হয়নি, সাতিনাহর ক্ষেত্রে কাজ চলছিল বহু বছর ধরে।
রুয়াতি (২০১১): ব্যর্থ উদাহরণ, বাংলাদেশের ঘটনার মতোই
রুয়াতি বিনতি সাবুবি ২০১১ সালের জুনে খুনের স্বীকারোক্তির পর শিরশ্ছেদ হন। সৌদি কর্তৃপক্ষ জাকার্তাকে আগে জানায়নি, যা ইন্দোনেশিয়াকে ক্ষুব্ধ করেছিল, এবং ইন্দোনেশিয়া নতুন গৃহকর্মী পাঠানোয় স্থগিতাদেশ (মরাটোরিয়াম) দেয়।
টুটি তুরসিলাওয়াতি (২০১৮): একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি
রাষ্ট্রপতি জোকোউই বলেছিলেন, আগাম বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে এবং আগের ঘটনাগুলোতেও তাই হয়েছে। মাইগ্রেন্ট কেয়ার জানায়, অন্তত পাঁচজন ইন্দোনেশীয় কর্মীকে সরকারি বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। জাকার্তার প্রতিক্রিয়া ছিল তাৎক্ষণিক: সরকার “গভীর উদ্বেগ” জানায় এবং সৌদির সঙ্গে বাধ্যতামূলক কনস্যুলার বিজ্ঞপ্তি চুক্তির জন্য চাপ দেয়। রাষ্ট্রদূতকে তলব করা হয়, সৌদি রাষ্ট্রদূতকেও ডাকা হয়। তবে অধিকারকর্মীরা বলেন, সৌদি আরব আগের আলোচনায় দেওয়া অনুরোধ উপেক্ষা করেছে। একটি বিষয় নিয়ে মতভেদ আছে: টুটি আত্মরক্ষায় হত্যা করেছিলেন কি না, সে বিষয়ে প্রতিবেদনগুলোর বক্তব্য একরকম নয়, তাই আমি সেই দাবির ওপর জোর দিচ্ছি না।
ফিলিপাইনঃ সফল ও ব্যর্থ, দুটোই
জোসেলিতো জাপান্তা (২০১৫)
তিনি এক সুদানি বাড়িওয়ালাকে হত্যার দায়ে অভিযুক্ত ছিলেন। ফিলিপাইনের প্রচেষ্টা ছিল ব্যাপক। রাষ্ট্রপতি আকিনো সৌদি রাজাকে চিঠি লিখে পরিবারকে সময় দিতে অনুরোধ করেন এবং রক্তমূল্যের জন্য একটি বড় অঙ্ক নিজেও দেন। বারবার আবেদনের ফলে সৌদি কর্তৃপক্ষ রক্তমূল্য ৫০ লাখ রিয়াল থেকে ৪০ লাখে নামিয়ে আনে, কিন্তু পর্যাপ্ত অর্থ জোগাড় হয়নি। এ ছাড়া সৌদি সরকার সময়সীমা দুবার বাড়িয়েছিল। তবু মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়, কারণ পরিবার ও সরকার মোট ২ কোটি ৩০ লাখ পেসো তুলতে পেরেছিল, অথচ দাবি ছিল প্রায় ৪ কোটি ৮০ লাখ। এই ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল: ফিলিপাইনের পররাষ্ট্র সচিব বলেছিলেন, নিহত ব্যক্তি সৌদি নাগরিক না হওয়ায় রাজপরিবারের হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা কম। একই লেখায় আছে, আরেক ফিলিপিনো, লানুজার ক্ষেত্রে সৌদি রাজা নিজেই ৩০ লাখ রিয়ালের মধ্যে প্রায় ২৩ লাখ রিয়াল (২ কোটি ৫০ লাখ পেসো) দিয়েছিলেন, যার ফলে তিনি মুক্তি পেয়ে দেশে ফেরেন। অর্থাৎ ফলাফল নির্ভর করেছে মামলার ধরন, নিহতের জাতীয়তা, এমনকি রাজার ইচ্ছার ওপরও।
তবে জাপান্তার মৃত্যুর পরেও সমালোচনা হয়েছে। সরকার বলেছিল তারা সবকিছু করেছে, আবার সমাজকর্মী সুসান ওপল রক্তমূল্য মামলার জন্য একটি বিশেষ ইউনিট গঠনের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। আরও লক্ষণীয়, ফিলিপাইনের পররাষ্ট্র দপ্তর বলেছিল, সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ডের কথা আগে ঘোষণা করা হয় না।
শ্রীলঙ্কাঃ সর্বোচ্চ পর্যায়ের চেষ্টা, তবু ব্যর্থ
রিজানা নাফিক (২০১৩)
এক সদ্যজাত শিশুর মৃত্যুর দায়ে শ্রীলঙ্কার এই গৃহকর্মীর শিরশ্ছেদ করা হয়। তিনি মাত্র ছয় সপ্তাহের কম কাজ করেছিলেন, ২০০৫ সালে। তাঁর বয়স নিয়ে বিতর্ক ছিল, কারণ অপরাধের সময় তিনি নাবালক ছিলেন বলে মানবাধিকার সংস্থাগুলো দাবি করে। সরকারি তৎপরতা কম ছিল না: রাষ্ট্রপতি মাহিন্দা রাজাপাকসে দুবার ব্যক্তিগতভাবে ক্ষমার আবেদন করেন, মন্ত্রী পর্যায়ের কয়েকটি প্রতিনিধিদল পাঠানো হয়, এবং ২০০৮ ও ২০১১ সালে তাঁর বাবা-মাকে সৌদি আরবে নিয়ে যাওয়া হয়। এ ছাড়া হংকংভিত্তিক এশিয়ান হিউম্যান রাইটস সংস্থার সহায়তায় আপিলও করা হয়েছিল।
তবু ফল হয়নি। শিশুটির মা ক্ষমা করতে রাজি হননি, যা সৌদি আইনে মুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। মৃত্যুদণ্ডের পর শ্রীলঙ্কা সৌদি আরব থেকে নিজের রাষ্ট্রদূতকে প্রত্যাহার করে নেয়। সমালোচকদের অভিযোগ আরও কঠিন: একটি স্থানীয় অধিকার সংস্থা বলেছিল, সরকার আপিলের আইনজীবীর ফিও দিতে অস্বীকার করেছিল। সরকার ও সমালোচকদের এই দুই বক্তব্য পরস্পরবিরোধী, আমি কোনোটিকেই চূড়ান্ত সত্য বলে নিতে পারছি না।
এই তুলনা থেকে কী বোঝা যায়
প্রথমত, অন্য দেশগুলো তৎপরতার কারণে নাগরিকদের ছাড়িয়ে এনেছে, আংশিক সত্য। সাতিনাহ বেঁচেছেন এবং লানুজা মুক্তি পেয়েছেন। কিন্তু রিজানা, জাপান্তা, রুয়াতি, টুটির মতো অনেকে মারা গেছেন, এমনকি তাঁদের দেশ ব্যাপক চেষ্টা করার পরও। তৎপরতা সাফল্যের নিশ্চয়তা নয়।
দ্বিতীয়ত, বেঁচে যাওয়া ঘটনাগুলোতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে নিহতের পরিবারের ক্ষমা, আর সেই ক্ষমা কেনার মতো টাকা। এই সব ক্ষেত্রেই ছিল ব্যক্তিগত হত্যার মামলা, যেখানে সৌদি আইন নিহতের পরিবারকে ক্ষমার সুযোগ দেয়।
তৃতীয়ত, নজরুল ও সুইটির ক্ষেত্রে সৌদি কর্তৃপক্ষ বলেছে, দণ্ড “তাজির” আইনে দেওয়া হয়েছে। সেখানে ব্যক্তিগত নিহত কোনো পরিবার নেই, যাদের কাছে রক্তমূল্য দিয়ে ক্ষমা চাওয়া যায়। এটা আমার বিশ্লেষণ, প্রতিবেদনে এমন স্পষ্ট বিবৃতি আমি পাইনি, তাই এটিকে সম্ভাবনা হিসেবে ধরুন। যদি এটা সঠিক হয়, তাহলে ইন্দোনেশিয়া বা ফিলিপাইনের রক্তমূল্য-ভিত্তিক সাফল্যের মডেল এই মামলায় খাটত না, এবং তুলনাটি ততটা সরল নয়। এখানে হত্যার মতো কোন গুরুতর অপরাধের নজির নেই, যা আছে সেটা স্রেফ ইসলাম নামক এক মনস্টার কাল্ট এর ইজ্জত রক্ষার খেলা।
চতুর্থত, আগাম বিজ্ঞপ্তি না দেওয়ার ব্যাপারটি বাংলাদেশের একার সমস্যা নয়। ইন্দোনেশিয়া অন্তত পাঁচ-ছয়বার এমন পরিস্থিতিতে পড়েছে। ফিলিপাইন ও শ্রীলঙ্কার ক্ষেত্রেও সৌদি আরব মৃত্যুদণ্ডের তারিখ আগে জানায়নি বলে ফিলিপাইনের পররাষ্ট্র দপ্তর বলেছে। অর্থাৎ সৌদি আরব বাংলাদেশকে বিশেষভাবে উপেক্ষা করেছে, এমন প্রমাণ এখানে নেই। এটা সৌদির একটি সাধারণ আচরণ বলেই মনে হচ্ছে।
পঞ্চমত, তবু ফারাক আছে। ইন্দোনেশিয়া ও ফিলিপাইন বছরের পর বছর দূতাবাসের মাধ্যমে মামলায় যুক্ত ছিল, আইনজীবী ও জনসমর্থন জোগাড় করেছিল, এবং ব্যর্থতার পর কঠোর পদক্ষেপ (মরাটোরিয়াম, রাষ্ট্রদূত প্রত্যাহার, বাধ্যতামূলক বিজ্ঞপ্তি চুক্তির দাবি) নিয়েছিল। নজরুল ও সুইটির ক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত জানা যায় যে তাঁরা আইনি সহায়তা বা আপিলের সুযোগ পেয়েছিলেন কি না, তা অজানা। সরকারের প্রতিক্রিয়াও এখনও চিঠি আর রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বৈঠকের মধ্যে সীমাবদ্ধ। তবে প্রক্রিয়া সবে শুরু হয়েছে, তাই এখনই চূড়ান্ত বিচার করা ঠিক হবে না।
নারী গৃহকর্মীরা যে ধর্ষণের শিকার হন, তার বিচার কি সৌদিতে হয়?
হাজার হাজার নারী শ্রমিক সৌদি থেকে ফিরে নিজ নিজ দেশে যেয়ে জানিয়েছেন তাদের বীভৎস সব অভিজ্ঞতার কথা। প্রতিদিন তারা ধর্ষিত হয়েছেন গৃহকর্তার কাছে, বারংবার, বাবা-ছেলে একসাথে ধর্ষণ করেছে, বন্ধুরা মিলে ধর্ষণ করেছে, শারিরীক মানসিক নির্যাতন করেছে, এসবে সেইসব পরিবারের মেয়ারাও কোন বাঁধা দেয় নি। বাংলাদেশের সৌদি ফেরত সহস্র নারী তাদের আহাজারি তুলে ধরেছে গণমাধ্যমে, সকল মেইনস্ট্রিম মিডিয়ায় আমরা এসব খবর দেখেছি। যারা ফিরে আসতে পেরেছে তারা জানিয়েছে যারা ফিরে আসতে পারে নি তারা আছে জলজ্যান্ত নরকে। তারা বাঁচতে চায়, কূটনৈতিক হস্তক্ষেপ চায়। তারপরেও দেখা যাচ্ছে পরিসংখ্যান বলছে সৌদিতে ধর্ষণ নাই। কারন সেগুলো ধর্ষণ হিসাবে রেকর্ড হয়নি। সৌদির অনেক গৃহকর্তা মনে করে দাসীদের সঙ্গে সেক্স করা তাদের অধিকার, কারন তাদের তারা কিনে নেয়, ইসলামে দাসীর সঙ্গে সেক্স অনুমোদিত, দাসীর সম্মতির দরকার হয় না।
সৌদি আরবে খাতা কলমে ধর্ষণের হার খুবই কম, নেই বললেই চলে। ২০১৯ সালে ধর্ষনের অভিযোগে সেখানে মাত্র ৮ জনের শাস্তি কার্যকর করা হয়, এবং সেটা অবধারিতভাবে জিনার শাস্তি মৃত্যুদন্ড। অর্থাৎ ২০১৯ সালে সেখানে খাতা কলমে ধর্ষনের সংখ্যা মাত্র ৮। সৌদি আরবে কি ২০১৯ সালে মাত্র ৮ টি যৌন সহিংসতা হয়েছিল? সিরিয়াসলি?
ওদিকে সৌদি আরব থেকে যেসব প্রবাসী বাংলাদেশি নারী বাধ্য হয়ে বা পালিয়ে দেশে ফিরে আসেন, তাদের প্রায় ৬০% থেকে ৭০% নারী শারীরিক, মানসিক বা যৌন নির্যাতনের কথা উল্লেখ করেছেন। ৩০% পেটে বাচ্চা নিয়ে ফেরেন। ২০১৯ সালে সৌদি থেকে যৌন নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশে ফেরেন প্রায় ১৬০০ নারী। এটা শুধু বাংলাদেশের হিসাব, আরো কত দেশ থেকে সেখানে নারী কর্মীরা যান, তাদের নিজদের দেশের নারীরা আছেন, আবার কত নারী নির্যাতনের সঙ্গে কম্প্রোমাইজ করে নেন। এখন যদি আপনার মনে হয় সৌদির ধর্ষনের পরিসংখ্যান সত্য – তবে কিছু বলার নেই।
ইসলামী শাসনের দেশে ধর্ষণের বিচার চাওয়ার সাহসই করে না নারীরা। এটাই বাস্তবতা। সেটা প্রমান না করতে পারলে উলটো নারীকেই কঠিন শাস্তি পেতে হয়, ধর্ষক উল্টো নারীকে দোষ দিতে পারে যে – সে উক্ত পুরুষকে পর্দা না করে প্রভোক করেছে। সৌদি আরব, ইরান, ইন্দোনেশিয়ার আচেহ প্রদেশের নারীদের অবস্থা যাচাই করলে এর ভুরি চুরি প্রমান আছে, যার সহজ নাম বিচারহীনতার পরিবেশ। গত ৪ জুন ২০২৬ ডেইলি স্টার রিপোর্ট করেছিল – বাংলাদেশি এক নারী সৌদি আরবে একাধিকবার যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, বিভিন্ন ফর্মে। গৃহকর্তা তাকে জানিয়ে দেয় তারা তাকে কিনে নিয়েছে। গৃহকর্তার ছেলের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ দিলেও উল্টো তাকে দোষী করা হয়। পুলিশও তাকে কোন হেল্প করেনি। এমনকি পরে আরো ধর্ষণের শিকার হওয়ার পরে, তাকেই পুলিশ জেলে দেয়। এমন নজির শত শত, হাজার হাজার।
অনেক গর্ভবতী নারীকে বাংলাদেশে তাদের পরিবার ত্যাগ করেছে। ২০১৮ সালের প্রতিবেদনে ব্র্যাকের প্রধান বলেছিলেন, বাংলাদেশি নারীদের ওপর নির্যাতনের জন্য কোনো নিয়োগকর্তাকে বিচারের আওতায় আনার কোনো নজির নেই। অন্য একটি প্রতিবেদনে একজন কর্মকর্তা বলেছিলেন, অভিযুক্ত কোনো নিয়োগকর্তা সৌদি কর্তৃপক্ষের হাতে অভিযুক্ত বা গ্রেপ্তার হননি। সাম্প্রতিক এক মামলায় ব্র্যাকের কর্মকর্তা প্রশ্ন তুলেছেন, দূতাবাস কেন সৌদি কর্তৃপক্ষকে তদন্ত করতে বলেনি, এবং বলেছেন “একজন নারী নির্যাতিত হলে সেটা পুরো বাংলাদেশের আঘাত। জবাবদিহি বাস্তব হতে হবে।” এমজেএফ বলেছে, দূতাবাসের উচিত ছিল নিয়োগকর্তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া এবং ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করা।
Related Posts

Operation Entebbe – the story of one night, and the Islamic execution suffered by Nazrul Islam and Sweety Akter
What can a state do to save the lives of its citizens abroad? Are thereRead More

A random page from Muhammad’s self‑made book Qur’an and its unscientific statements
Sometimes I flip through random pages of Muhammad’s self‑made book Qur’an, and today this pageRead More

মুহাম্মদের বানানো কোরআন বই এর একটা র্যান্ডম পৃষ্ঠা ও সেখানকার অবৈজ্ঞানিক বক্তব্য
আমি মাঝে মাঝে মুহাম্মদের বানানো কোরআন বই এর র্যান্ডম পৃষ্ঠা উল্টাই, আজ এই পৃষ্ঠা হাতেRead More

Comments are Closed