Letter
Humanity’s endless waiting

Humanity’s Endless Waiting

“অপেক্ষায় …নাজির”, “কষ্টে আছে আইজুদ্দিন” থেকে ফেসবুক ম্যাসেঞ্জারে প্রতীক্ষা মানুষের

এখান থেকে প্রায় আড়াই দশক আগে ঢাকা শহরের দেয়ালে দেখা যেতো কিছু আবেগীয় পংতির দেয়াল লিখন – “অপেক্ষায় …নাজির”, “কষ্টে আছে আইজুদ্দিন”, “প্রতীক্ষায় … নাজির” এমন কিছু। যারা নব্বই দশক ও তার পরে প্রায় অর্ধ দশক ঢাকা শহরকে দেখেছেন, তাদের এই দেয়াল লিখনগুলো চোখে পড়ার কথা। এগুলো কাগজে লেখা চিঠি না হলেও আসলে দেয়ালে লেখা মানুষের চিঠি। শহরের ইটের গায়ে চুনকাম করা সেই হাহাকার, যার প্রাপক নির্দিষ্ট কেউ নয়, অথচ যেন গোটা শহরকেই সাক্ষী রেখে একজন মানুষ তার অপেক্ষার কথা জানান দিয়ে যেতো। কে জানে, নাজির বা আইজুদ্দিনের সেই প্রতীক্ষার শেষ পর্যন্ত কী হয়েছিল! হয়তো তারা নিজেরাও জানতেন না তাদের এই আকুতি কার চোখে পড়বে, কার মন গলাবে। কিন্তু লিখে রাখাটাই ছিল জরুরি – যেন লেখার মধ্য দিয়েই অপেক্ষাটা কিছুটা সহনীয় হয়ে ওঠে।

আজ নাকি হাতে লেখা চিঠি দিবস। এই একটি দিন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, একসময় একটি চিঠির জন্য প্রিয়জন, বাবা-মা, ভাই-বোন, আত্মীয়, বন্ধু, প্রেমিক-প্রেমিকা কত অপেক্ষা করতো। হাতের লেখায় ফুটে উঠতো তাদের অব্যক্ত পংতিমালা – যে কথাগুলো মুখে বলা যেতো না, যেগুলো বলতে গেলে গলা কেঁপে যেতো বা লজ্জায় মাথা নিচু হয়ে যেতো, সেগুলোই কলমের ডগায় নিরাপদে ঝরে পড়তো সাদা কাগজে। বুদ্ধদেব গুহ একটি উপন্যাসই লিখে ফেলেন ‘সবিনয় নিবেদন’ এই চিঠি নিয়ে। সেখানে ঋতি ও রাজর্ষী চিঠির মাধ্যমে কথা বলেন। কিন্তু সে ছিল দিনের পর দিন প্রতীক্ষার পালা, ডাকপিয়নের দিকে পথ চেয়ে থাকা। ডাকপিয়নের সাইকেলের ঘণ্টি বাজলে বুকটা ধক করে উঠতো – আজ কি আসবে সেই চিঠি? সেই অপেক্ষার মধ্যে একধরনের মাধুর্য ছিল, যা আজকের তাৎক্ষণিকতার যুগে প্রায় অকল্পনীয়। জনপ্রিয় সিনেমা ‘হঠাৎ বৃষ্টি’ও সেই চিঠি নিয়ে। সেখানে ‘একদিন স্বপ্নের দিন…’ এর মতো চিঠির প্রতীক্ষায় থাকতেন দুইজন যুবক-যুবতী।

এক সময় পত্রিকায় পত্রমিতালির জন্য মানুষ নিজের ঠিকানা ছাপাতো, বিজ্ঞাপন দিয়েও ছাপাতো। শুধু পত্রমিতালির জন্যই আলাদা করে ম্যাগাজিন, বই বের হতো, যেখানে শুধু থাকতো মানুষের ঠিকানা – নাম, ঠিকানা, বয়স, শখ, এইটুকু পরিচয়ের ভিত্তিতেই গড়ে উঠতো সুদূরের বন্ধুত্ব। আমার দুইজন আত্মীয় এভাবে চিঠি লিখে বাংলাদেশের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত বন্ধুদের বাড়িতে বেড়িয়েও এসেছিল। ভাবতে অবাক লাগে, না দেখা না জানা একজন মানুষের সঙ্গে শুধু হাতের লেখা আর কাগজের গন্ধের মধ্য দিয়ে গড়ে উঠতো এমন সম্পর্ক, যা শেষ পর্যন্ত গড়াতো সরাসরি সাক্ষাতে। আজকের দিনে যেখানে অচেনা মানুষকে বিশ্বাস করাটাই কঠিন, সেখানে সেই সময়ের এই সারল্য এক অন্য পৃথিবীর গল্প বলে মনে হয়।

আবার চিঠি পাঠিয়ে প্রতারনাও কম হতো না, গ্রামের গৃহস্ত বাড়িতে হঠাৎ দুইজন অচেনা লোক এসে হাজির,হাতে চিঠি, লিখেছেন দূর গ্রামে বিয়ে দেয়া গৃহস্থ বাড়ির মেয়ে, সেখানে লেখা তার স্বামী বিপদে পড়েছে, পত্রবাহকের কাছে যেনো হাজার দশেক টাকা পাঠান তার বাবা। আসলে সেই দুইজন আগন্তুক আদতে প্রতারক। আমার এক আত্মীয় একবার এমন প্রতারনার শিকার হয়েছিলেন, গ্রাম্য ভাষায় বলা হতো হুন্ডি।

গ্রামের শিক্ষক তার ঢাকা শহরে বসবাসরত ছাত্রের উদ্দেশ্যে চিঠি পাঠিয়ে গ্রামের কোন যুবককে আশ্রয় ও চাকুরীর ব্যবস্থা করে দিতে বলতেন। নাটক সিনেমায় এই দৃশ্য দেখে থাকবেন। আমার আব্বাও এমন চিঠি লিখেছেন অনেকের জন্য, তার সাবেক ছাত্রদের উদ্দেশ্যে। কেউ কেউ সেই ডাকে সাড়া দিতেন, কেউ হয়তো উপেক্ষা করতেন। সেই সময় এখন আর নেই।

এরপর চিঠির জায়গা নিলো মোবাইল ফোনের ভয়েস টক, ৭ টাকা মিনিট কথা বলা। চালু হয়েছিল গ্রামীণফোনের ডিজুস, একটেলের এইজেস, সিটিসেলের কী একটা যেনো – নানান নামে নানান সার্ভিস, রাত ১২টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত ফ্রি টক টাইম, ফ্রি টেক্সট চালাচালি। উঠতি বয়সীরা রাত জেগে কথা বলা শুরু করলো, পড়াশোনা, ঘুম গেল গোল্লায়। বালিশের নিচে চাপা পড়ে থাকা মোবাইল ফোনের স্ক্রিনের আলোয় কতশত রাত কেটে গেছে কিশোর-কিশোরীদের, বাবা-মায়ের অগোচরে। সরকার বাধ্য হয়ে এই সমস্ত সার্ভিস বন্ধ করে দিল। প্রযুক্তি যত দ্রুতগামী হলো, প্রতীক্ষার সেই দীর্ঘ পরিধিও তত সংকুচিত হয়ে এলো – এখন আর দিনের পর দিন অপেক্ষা করতে হয় না, রাত জেগে সরাসরি কণ্ঠস্বর শোনা যায়।

এরপর চালু হয়েছিল ইয়াহু ম্যাসেঞ্জার, বিডি চ্যাট, নানান নামে পার্সোনাল ও গ্রুপ চ্যাটের কারবার। সেই সময়ে আমার এক পুলিশ অফিসার বন্ধু এক গ্রুপ চ্যাটে ঢুকে গান শোনাতেন সবাইকে। সেই সময়ের কিছু বিদেশি বন্ধু এখনো আমার সঙ্গে যুক্ত আছেন। আমার এক ইন্দোনেশিয়ান নারী সিনিয়র বন্ধু তার কলিগকে নিয়ে ঢাকায় আমার বাসায়ও এসেছিলেন। ভার্চুয়াল জগতের সেই বন্ধুত্ব বাস্তবের মাটিতে পা রাখতে পেরেছিল, যা আজকের দিনে ভাবাই কঠিন – এত এত ফলোয়ার আর ‘বন্ধু’ তালিকা থাকা সত্ত্বেও কজনের সঙ্গে সত্যিকারের দেখা হয়, বিশ্বস্ত বন্ধুত্ব হয়?

সেই যুগ পার হয়ে এলো সোশ্যাল মিডিয়ার যুগ। হাই ফাইভ, অরকুট ফেলে ফেসবুক! এখন মানুষ যোগাযোগ বলতে বোঝে – ম্যাসেঞ্জার! সেখানে আবার কত রিঅ্যাকশন, সুপার রিঅ্যাকশন! একটা লাভ রিঅ্যাকশন না দিলে অভিমান, একটা মেসেজ ‘সিন’ হয়ে অনুত্তরিত থাকলে অস্থিরতা। এখন মানুষ ফেসবুকে এসে অপেক্ষা করে কখন তার প্রতীক্ষার মানুষ তাকে নক করবেন, কথা বলবেন। ‘অনলাইন’ স্ট্যাটাসের সবুজ বিন্দুটাই যেন এখনকার সময়ে সেই দেয়াল লিখনের বিকল্প – নীরব এক ঘোষণা, “আমি অপেক্ষায় আছি।”

কিন্তু এতো কিছুর পরেও সেই চিঠির আবেদন কি সত্যিই ফুরিয়েছে? প্রযুক্তি বদলেছে, মাধ্যম বদলেছে, কিন্তু মানুষের ভেতরের সেই মৌলিক তাড়না – কারো জন্য অপেক্ষা করার, কাউকে কিছু বলার, কারো কাছ থেকে সাড়া পাওয়ার আকুতি – তা কি আদৌ বদলেছে? হয়তো মাধ্যম বদলেছে বলেই আজ চিঠির জায়গায় এসেছে ইমোজি, ভয়েস নোটের জায়গায় এসেছে ভিডিও কল। কিন্তু অপেক্ষা করার সেই মানবিক প্রবৃত্তি একই রয়ে গেছে, শুধু তার প্রকাশভঙ্গি বদলেছে।

মানুষ অনেক কিছু ফিরবে না জেনেও প্রতীক্ষা করে। একবার ‘আমাদের গল্প’ নামে এক নাটক হয়েছিল, সেখানে এক গান ছিল – কিছু কিছু নাম্বার থেকে আর আসবে না কোনো ফোন। এই একটি লাইনের মধ্যেই যেন ধরা আছে সেই না-ফুরানো অপেক্ষার এক গভীর বেদনার সুর। মেহজাবিন একটা নাটকে অভিনয় করেছিল, যেখানে সে বাড়িতে ফিরতো, কেউ তার জন্য অপেক্ষা করে থাকে না, তবুও সে ফিরতো। মানুষের এই অপেক্ষা শেষ হয় না। ফেরার মতো কেউ না থাকলেও ফেরার অভ্যাসটা থেকে যায়, অপেক্ষা করার মানুষ না থাকলেও অপেক্ষা করার প্রবৃত্তিটা থেকে যায়। এটাই বোধহয় মানুষের সবচেয়ে করুণ অথচ সবচেয়ে মানবিক দিক।

এক সময় মানুষ চিঠির জন্য দিনের পর দিন অপেক্ষা করতো, আর এখন ৫ মিনিটের অপেক্ষা একটু বেশি হলেই কত সম্পর্ক এলোমেলো হয়ে যায়। এই বৈপরীত্যটাই বোধহয় সবচেয়ে বেশি ভাবায়। যে যুগে চিঠি লিখে মাসের পর মাস উত্তরের জন্য বসে থাকা যেতো, সেই যুগের মানুষের ধৈর্য আর আজকের ‘ব্লু টিক’ দেখেও উত্তর না পাওয়ার অস্থিরতার মধ্যে এক আকাশ-পাতাল ফারাক। হয়তো আমরা দ্রুততর হয়েছি, কিন্তু সেই দ্রুততার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের সহনশীলতাও কমে এসেছে। যোগাযোগের মাধ্যম যত সহজলভ্য হয়েছে, সম্পর্কের গভীরতা যেন ততই ভঙ্গুর হয়ে পড়েছে।

তবু, দেয়ালের সেই ম্লান হয়ে আসা লেখাগুলোর মতো, চিঠির সেই আবেদন হয়তো সত্যিই ফুরিয়ে যায়নি – শুধু রূপ বদলেছে। আজ আর কেউ দেয়ালে লিখে রাখে না “প্রতীক্ষায় … নাজির”, কিন্তু কেউ না কেউ আজও ফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে থাকে, কারো একটা মেসেজের অপেক্ষায়। প্রতীক্ষার ভাষা বদলেছে, প্রতীক্ষা বদলায়নি। আর যতদিন মানুষ থাকবে, মানুষের ভালোবাসা থাকবে, ততদিন হয়তো এই প্রতীক্ষাও থেকে যাবে – কখনো কাগজে, কখনো দেয়ালে, কখনো বা নিঃশব্দ এক স্ক্রিনের আলোয়।

Related Posts

Islam’s Circular‑Logic Fallacy

Place: Cabin of a Dhaka–Sylhet-bound trainCharacters: Maulana Abdur Rahman (a responsible member of Tabligh Jamaat)Read More

ইসলামের সার্কুলার লজিক ফ্যালাসি

স্থান: ঢাকা থেকে সিলেটগামী ট্রেনের কেবিনচরিত্র: মাওলানা আব্দুর রহমান (তাবলিগ জামাতের একজন দায়িত্বশীল) ও অধ্যাপকRead More

i need a break

A Break

1 When the morning sun falls on the tin roof of the Ulipur post office,Read More

Comments are Closed