Zyon
By the Rivers of Babylon ...

By the Rivers of Babylon ...

বাই দ্যা রিভারস অফ ব্যাবিলন … সেদিনের সেই নিপীড়িত জায়ন আজ কি নিপীড়ক ?

মধ্যপ্রাচের বিষফোঁড়া কী ইসরাইল ? প্রায়ই তাদের হাতে নিহত হয় নিরপরাধ মানুষ। যারা নিহত হয় তাদের ধর্মীয় পরিচয় কি সেটা আমার বিবেচ্য নয়, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ সংগঠিত হচ্ছে সেখানে। আজকের একটি সংবাদ “ইসরাইলি বিমান হামলায় শিশুসহ নিহত ৯ ফিলিস্তিনি।” ইসরাইলি হামলায় যুগ যুগ ধরেই ঝরছে ফিলিস্তিনিদের রক্ত। কিন্তু ইসরাইলকে কখনো জবাবদিহির আওতায় আনতে পারেনি বিশ্ব। সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে গত সোমবার গাজায় ভয়াবহ বিমান হামলা চালায় ইসরাইল। এতে শিশুসহ ৩২ ফিলিস্তিনি নিহত হন। গুরুতর আহত হন অনেকে। ইসরাইলের এই আগ্রাসী চেহারা বহুদিনের। গত কয়েক হাজার বছর ধরে ইহুদীরা নির্যাতিত হতে হতে রাষ্ট্র ইসরাইল এখন সেই নির্যাতনের বদলা নিতে নির্দয়, নিষ্টুর আচরন করে যা মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ গণ্য করা যায়।

আলী আবু আলিয়া, ফিলিস্তিনের এই ১৫ বছরের কিশোরের নিম্নাঙ্গে শ্যুট করে ডিসেম্বরের ৪ তারিখে হত্যা করে দখলদার ইসরাইলী সেনারা। সেদিন আবার ছিল তার জন্মদিন। সে ইসরাইলের দখলদারিত্ব সম্প্রসারন বন্ধে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদে অংশ নিয়েছিল। এমন বহু অমানবিক কাজের সাক্ষী হয়ে মানবতার ইতিহাসে কলঙ্কিত হয়ে থাকবে ইসরাইলের নাম।

তবে অবাক করার মতো একটি বিষয় আছে। ফিলিস্তিনে তারা হত্যাযজ্ঞ চালালেও তাদের নিজেদের দেশে মুসলিম, খ্রীস্টান, ইহুদীদের প্রার্থনা, ধর্ম পালন, সামাজিক অবস্থানে কোন বৈষ্যম্য নেই। সেখানে একজনও মুসলিম পাবেন না যারা ইসরাইল ছেড়ে সৌদি আরব বা ইরানে যেতে চাইবে। এটাই বাস্তবতা। এ নিয়ে অনেক সোস্যাল এক্সপেরিমেন্ট ও রিসার্চ আছে। সার্চ দিয়ে দেখে নিতে পারেন।

যদি বিগত ৩০০০ বছরের ইতিহাস দেখা হয় তবে ইসরাইল অঞ্চলের মানুষ তথা ইহুদীরা পৃথিবীর সবচেয়ে নির্যাতিত মানুষ। ঐ অঞ্চলের অন্য ধর্ম-মতাদর্শের মানুষেরা ইহুদীদের শুধু ঘৃনা করাই শেখায় না তাদের সন্তানদের, নিশ্চিহ্ন করতেও উৎসাহিত করে। সাম্প্রতিক ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শরনার্থী হয়েছিল তৎকালীন ইসরাইল অঞ্চলের মানুষ বা ইহুদীরা। প্রায় ২৫০০-২০০০ বছর আগে তাদের উপর ঘটা জেনোসাইড শুরু হয়েছিল, পুরো জনগোষ্ঠীকে উচ্ছেদ করা হয়েছিল আরব অঞ্চল থেকে, এখন অবশ্য তারাও কিছু জেনোসাইডের জন্য দায়ী। হিটলারের ইহুদী নিধনের ইতিহাস তো এই সেদিনের। ইসরাই্লের তৎকালীন নাম ছিল জায়ন। নীচের গানটি আমাদের জন্মেরও অনেক আগে বিশ্বব্যাপী তুমুল জনপ্রিয় হয়েছিল। ইউটিউবেও লক্ষ লক্ষ ভিউ হয় প্রতিদিন এখনো। বাই দ্যা রিভারস অফ ব্যাবিলন …

ইসরালের সবচেয়ে বিরোধপূর্ণ স্থান হলো জেরুজালেম। একই সঙ্গে এটা ৩ টা ধর্মের পবিত্র স্থান। অনেক আগে থেকেই এই স্থান নিয়ে বিরোধ, যুদ্ধ চলে আসছে। এই সেই শহর, যে শহরের এমন কোনো স্থান নেই যেখানটায় মানুষের রক্তের ছাপ পড়েনি। যুগে যুগে রাজা বাদশাহরা এই শহরের কর্তৃত্ব পাওয়ার জন্য প্রয়োজনে লাখ লাখ নিরীহ মানুষ হত্যা করেছে। এই শহরের প্রতি দূর্বলতা যে শুধুমাত্র রাজা বাদশাদেরই ছিল তা নয়, নিরীহ মানুষরাও এই শহরের জন্য নিজেদের প্রাণ বিলিয়ে দিয়েছেন। ভাবতেই অবাক লাগে, প্রতিষ্ঠার সাড়ে তিন হাজার বছর পরেও এই শহরের চাহিদা বিন্দুমাত্র কমেনি, বরং দিনকে দিন বেড়েই চলছে ! কত কবি এই শহরকে নিয়ে কবিতা লিখেছেন, কত ঔপন্যাসিক এই শহরের দৈনন্দিন জীবন নিয়ে উপন্যাস রচনা করেছে্ন, কত শিল্পী এই শহরকে মনের মাধুরী মিশিয়ে তুলির আচড়ে ফুটিয়ে তুলেছেন ক্যানভাসে- তার কি কোনো হিসেব আছে ?

বিস্ময়কর হলেও সত্য, এই একটিমাত্র শহরই পৃথিবীতে আছে যা ৫২ বার আক্রমনের শিকার হয়েছে। এই শহরের ভাগ্য এতই মন্দ যে, তা ৪৪ বার দখল-পুনর্দখল হয়েছে, ২৩ বার অবরোধের মুখে পড়েছে। আর পুরোপুরি ধ্বংস হয়েছে কমপক্ষে ২ বার ! তবুও এই শহর টিকে আছে। শুধু টিকে আছে বললে ভুল হবে, সাড়ে তিন হাজার বছর ধরে এই শহর প্রভাবিত করে চলেছে সমগ্র পৃথিবীর মানুষকে। এই শহরকে বলা হয় এক ঈশ্বরের আবাসস্থল, দুই জাতির রাজধানী ও তিন ধর্মের উপাসনালয়। হ্যা, আমি জেরুজালেমের কথাই বলছি। যাকে নিয়ে এখনো মানুষের উন্মাদনার কমতি নেই। ঐতিহাসিকরা বলেন, এই শহর রক্তের ওপর প্রতিষ্ঠিত। এই শহরের ইতিহাস মানুষের রক্ত নিয়ে উৎসব করার ইতিহাস।

সত্যিই তাই। খ্রীষ্টপূর্ব ১১০০ সালে বাদশা ডেভিড (দাউদ) দ্বারা প্রতিষ্ঠিত এবং তাঁর মৃত্যুর পর পুত্র সলোমন (সোলায়মান) এর হাতে সুসজ্জিত জেরুজালেমের ইতিহাস আসলেই মর্মান্তিক সব ট্রাজেডিতে পরিপূর্ণ। এই শহর নিয়ে প্রথমে ইহুদী (বনি ইসরাইল), রোমান ও পারসিকদের মধ্যে দ্বন্দ্ব হয়। তারপর তাতে যোগ দেয় খ্রীষ্টানরা। সর্বশেষে সেই দখলদারিত্বের প্রতিযোগীতায় অংশ নেয় মুসলিমরা। জেরুজালেমের নিয়ন্ত্রন ইহুদীদের হাত থেকে একসময় রোমানদের অধিকারে আসে।

মুসলিমদের আগে ৫০০ বছর ধরে এই শহরের নিয়ন্ত্রন ছিল রোমানদের হাতে। রোমানরা ছিল খ্রীষ্টান। তখন ইহুদীদের জেরুজালেমে প্রবেশের অধিকার ছিল না। জেরুজালেমের ঐতিহাসিক দৃশ্যপটে যখন মুসলিমদের প্রতিনিধি হয়ে ওমর বিন খাত্তাব (হযরত ওমর) এই শহর বিজয় করেন তখন তিনি ইহুদীদের এই শহরে প্রবেশ করার অধিকার দেন। হযরত ওমর (রা:) যখন জেরুজালেমে যান, তখন সেখানকার দায়িত্বরত খ্রীষ্টান পাদ্রী সফ্রোনিয়াস তাঁকে পবিত্র উপসনালয়ে (বায়তুল মোকাদ্দাস) নামাজ পড়ার জন্য অনুরোধ করন। কিন্তু ওমর তাতে সম্মতি দেননি। কারন, তাঁর আশঙ্কা ছিল তাহলে ঐতিহাসিকভাবে স্বীকৃত এই পবিত্র স্থানটি পরবর্তীতে মুসলিমদের হাতে পড়ে নামাজের স্থান হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে।

চারশ বছর মুসলিম শাসনের পর তা পুনরায় খ্রীষ্টানদের অধিকারে আসে। উল্লেখ্য, খ্রীষ্টান শাসনামলে জেরুজালেমে কখনোই ইহুদীদের প্রবেশাধিকার ছিল না। কারন, ইহুদীরাই খ্রীষ্টানদের নবী হযরত ঈসা (আ:) [যীশু খ্রীষ্ট] কে হত্যা করেছিল। তবে এক্ষত্রে হযরত ওমর (রা:) যথেষ্ট উদারতার পরিচয় দিয়েছিলেন। ওমরের পরে সুলতান সালাহউদ্দিন পুনরায় জেরুজালেম দখল করেন। সালাউদ্দিনের পরে আবার খ্রীষ্টানরা। এভাবে দখল-পুনর্দখলের খেলা চলছিল মুসলিম ও খ্রীষ্টানদের মাঝে। সর্বশেষ ১৯৪৮ সালে জর্ডান কর্তৃক জেরুজালেম মুসলমানদের অধিকারে আসে। ১৯৬৭ সালের আরব-ইসরাইল যুদ্ধে তা পুনরায় ইহুদীদের দখলে চলে যায়।

ইতিহাস বলে, জেরুজালেমের প্রশ্নে ইহুদী, খ্রীষ্টান ও মুসলিমরা একে অন্যকে কখনো তিল পরিমাণ ছাড় দেয়নি। বর্তমানে ইব্রাহিমের পুত্র ইসহাকের বনি ইসরাইলদের বংশধর হিসেবে ইহুদীদের প্রতিনিধিত্ব করছে ইসরাইলিরা আর ইব্রাহিমের অপর পুত্র ইসমাইলের উত্তরসুরী আরবদের প্রতিনিধিত্ব করছে ফিলিস্তিনীরা। জানি না, হাজার বছরের সেই প্রতিশোধপরায়ণতা কোথায় গিয়ে শেষ হয়। শুধু এটুকুই বলবো, রক্তপাত বন্ধ হোক। জেরুজালেম আবারো ফিরে যাক তার সুসজ্জিত অতীতে।

১৯৭০ দশকের তুমুল জনপ্রিয় একটি ব্যান্ড সংগীত। যারা এর অর্থ ও প্রেক্ষিত বুঝবেন শুধু তারাই বুঝতে পারবেন জন্মভূমি থেকে বিতাড়িত একটি পুরো জনগোষ্ঠীর কষ্টগাঁথা।

Related Posts

Teachers and Students Politics

শিক্ষক ও ছাত্র রাজনীতি কি দেশের কোন কাজে লাগছে ? এগুলো কি থাকা উচিৎ ?

দেশের সচেতন, প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিক হিসাবে ছাত্ররা রাজনীতি করলে করতে পারে। তবে সেটা ক্যাম্পাসের বাইরে। ক্যাম্পাসেRead More

Society, Culture, Religion and Humanity

সমাজ, সংস্কৃতি এবং ধর্ম কিভাবে একসূত্রে গাঁথা হয়, যদি মনুষ্যত্বের মতান্তর ঘটে ?

সমাজ, সংস্কৃতি এবং ধর্ম কিভাবে একসূত্রে গাঁথা হয়, যদি মনুষ্যত্বের মতান্তর ঘটে ? কাউকে এভাবেRead More

bangabondhu-zia

‘একটি জাতির জন্ম’ – জেলারেল জিয়াউর রহমানের লেখা প্রবন্ধ

‘একটি জাতির জন্ম’ নামে জেনারেল জিয়া ‘দৈনিক বাংলা’ পত্রিকার ১৯৭২ সালের ২৬ মার্চ সংখ্যায় একটিRead More

Comments are Closed