
Bangladesh’s Corruption Nexus
সরকারী কর্মচারীদের বেতন বাড়ছে ১০০-১৪২% পর্যন্ত, দুর্নীতি কমবে? বেসরকারীদের মানবেতর জীবনযাপনের অবসান কীভাবে হবে?
আমি ইউনিভার্সিটিতে থাকতে স্বপ্ন দেখতাম পাশ দিয়ে ১০০০০ টাকা বেতনের জব নিবো। তখন সবার কাছে লোভনীয় জব ছিল গ্রামীনফোন, একটেল, সিটিসেল, বড় বড় বেসরকারী ব্যাংক, ইউএন এর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, বড় বড় এনজিও, কোম্পানি এসব। সরকারী চাকুরীকে তারাই প্রাধান্য দিতো যারা ক্ষমতা, সাধারন মানুষ থেকে সম্মান আদায় করা ও দুর্নীতিকে লক্ষ বানাতো। ক্ষমতা বলতে নিয়মের বাইরে গিয়ে কাউকে অন্যায় সুযোগ করে দেওয়ার সামর্থ্য। আমি প্রথম দিকের চাকুরিতে যখন ২০০০০+ বেতন পাই তখন আমার রুমমেট এক সরকারী প্রথম শ্রেনীর অফিসার বেতন পান ৬০০০ এর মতো। সেজন্য সমান সমান রুম হলেও আমি বাসা ভাড়াটা দিতাম ৬০% এর মতো, উনি দিতেন ৪০%। মানবতা দেখিয়ে সেটা করতাম, কারন তার পারিবারিক খরচ ছিল বেশি, আয় কম। অথচ এখন বাংলাদেশে সরকারী কর্মচারীদের বেতন এতো বেড়েছে যে সেই তুলনায় বেসরকারী কর্মচারীদের বেতন অনেকগুণ কম, বেসরকারী কর্মীরা মানবেতর জীবনযাপন করে, তাদের দুর্নীতির সুযোগও সীমিত। সরকার এবার আবার সরকারী কর্মচারীদের বেতন ১০০-১৪২% বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। কী হবে বেসরকারী কর্মীদের?
নতুন বেতনকাঠামোঃ সংখ্যা যা বলছে
সম্প্রতি প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী মন্ত্রিসভা বেসামরিক সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন জাতীয় বেতনকাঠামো অনুমোদন করেছে, যা কার্যকর হয়েছে গত ১ জুলাই থেকে। মূল তথ্যগুলো নিচের টেবিলে তুলে ধরা হলো –
| বিষয় | পুরনো কাঠামো | নতুন কাঠামো |
|---|---|---|
| সর্বনিম্ন গ্রেড (২০তম) মূল বেতন | ৮,২৫০ টাকা | ২০,০০০ টাকা (বৃদ্ধি ১৪২%) |
| সর্বোচ্চ গ্রেড (১ম) মূল বেতন | ৭৮,০০০ টাকা | ১,৫৬,০০০ টাকা (বৃদ্ধি ১০০%) |
| সর্বনিম্ন-সর্বোচ্চ বেতন অনুপাত | ১ : ১.৯৪৫ | ১ : ১.৭৮ |
| বাস্তবায়নের ধাপ | — | ৩ ধাপে: জুলাই ২০২৬-এ ৪০%, জানুয়ারি ২০২৭-এ ৩০%, জুলাই ২০২৭-এ বাকি ৩০% |
| ভাতা কার্যকর | — | ১ জানুয়ারি ২০২৮ থেকে |
| উপকৃত ব্যক্তি | — | প্রায় ২৪ লাখ কর্মরত + সোয়া ৯ লাখ অবসরপ্রাপ্ত = মোট ৩৩ লাখ |
| সরকারের বাড়তি বার্ষিক খরচ | — | আনুমানিক ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা |
| পেনশন বৃদ্ধি (মাসিক ৯,০০০ টাকা বা কম) | — | ১০০% বৃদ্ধি |
| পেনশন বৃদ্ধি (৪০,০০১ টাকার বেশি) | — | ৫৫% বৃদ্ধি |
প্রতিবেদনে বিশেষজ্ঞদের বরাত দিয়ে এটাও বলা হয়েছে যে এই বাড়তি ব্যয় মেটাতে রাজস্ব আদায়ে প্রায় ৪৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি দরকার – যেখানে গত পাঁচ বছরে সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধি হয়েছিল মাত্র ১২.৫ শতাংশ। অর্থাৎ এই সংখ্যাগুলোর পেছনে একটি অর্থনৈতিক ঝুঁকিও লুকিয়ে আছে, যা নিয়ে পরে আলোচনা করছি।
যে প্রশ্নটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ – বেতন বাড়লে কি দুর্নীতি কমে?
এই সংবাদ যে সমস্ত সরকারী কর্মী, যাঁরা সততার সঙ্গে জীবনযাপন করেন – দিনের পর দিন ন্যূনতম বেতনে সংসার চালিয়ে গেছেন, ঘুষ নেননি, তদবির করতে পারেন না, দালালি করেন না – তাঁদের জন্য নিঃসন্দেহে স্বস্তির খবর। একটি মানসম্মত জীবনযাত্রার জন্য উপযুক্ত বেতন থাকা উচিত, এটি ন্যায্য দাবি। কিন্তু বাংলাদেশের ইতিহাস বলছে অন্য কথা: বেতন বৃদ্ধি আর দুর্নীতি হ্রাসের মধ্যে সরাসরি কোনো সম্পর্ক এখানে দেখা যায়নি। বরং প্রতিটি পে-কমিশন বা বেতনকাঠামো সংশোধনের পরে দুর্নীতির পরিমাণ, তার বিস্তৃতি এবং তার “রেট” – সবই বেড়েছে বলে সাধারণ অভিজ্ঞতা সাক্ষ্য দেয়।
আপনি যদি দেখেন, তবে খুঁজে পাবেন – দুর্নীতিবাজদের বড় অংশটিই কঠিনভাবে ইসলামী ধর্মীয় আচারে জীবন কাটান, অফিস টাইমে সেবাপ্রার্থীদের বসিয়ে রেখে নামাজ পড়েন, মুখে দাঁড়ি, মাথায় টুপি। কোন ধর্মীয় অনুশাসন তাদের চরিত্রের কোন পরিবর্তন করতে পারে না। সরকারী কর্মীদের একটি বড় অংশ আবার খুবই অদক্ষ, নিজেদের দক্ষতা উন্নয়নে তাদের কোন আগ্রহও দেখা যায় না। সেবাদাতা হিসাবে অদক্ষ থেকে যাওয়াটাও এক প্রকার অযোগ্যতা, সেটা প্রতারনা তথা দুর্নীতির নামান্তর।
তবে সাধারনভাবে যেই আর্থিক দুর্নীতি দেখা যায়, তার পেছনে কয়েকটি কাঠামোগত কারণ আছেঃ
১. দুর্নীতি বেতনের অভাবজনিত সমস্যা নয়, প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতার অভাবজনিত সমস্যা। যে ব্যবস্থায় সেবাপ্রার্থীকে বিনা ঘুষে বা তদবির ছাড়া সরকারি অফিস থেকে সেবা পাওয়ার নিশ্চয়তা নেই, সেখানে বেতন যত বাড়ুক না কেন, ক্ষমতার একচেটিয়া প্রয়োগ ও জবাবদিহিতার অভাব থেকে যে “রেন্ট-সিকিং” সুযোগ তৈরি হয়, তা অক্ষত থেকে যায়। বেতন একটি প্রয়োজনীয় শর্ত হতে পারে, কিন্তু যথেষ্ট শর্ত নয়।
২. প্রত্যাশার মুদ্রাস্ফীতি। বেতন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জীবনযাত্রার মান, সামাজিক অবস্থান ও ব্যয়ের প্রত্যাশাও বেড়ে যায়। বাস্তবে দেখা গেছে, বর্ধিত বেতন নতুন ভোগবিলাসের মানদণ্ড তৈরি করে, যা মেটাতে বাড়তি আয়ের প্রয়োজন হয়ে পড়ে – আর সেই বাড়তি আয়ের সহজতম উৎস হয়ে ওঠে ক্ষমতার অপব্যবহার।
৩. জবাবদিহিতামূলক প্রতিষ্ঠানের দুর্বলতা। দুদক, বিচার বিভাগ, গণমাধ্যম, সংসদীয় তদারকি – এই প্রতিষ্ঠানগুলো যদি স্বাধীনভাবে কাজ করতে না পারে, তাহলে বেতন কাঠামোর কোনো সংস্করণই দুর্নীতির প্রণোদনা কমাতে পারে না। সম্পদের হিসাব প্রকাশ ও যাচাই বাধ্যতামূলক না হলে, শাস্তির ঝুঁকি প্রায় শূন্যের কাছাকাছি থেকে যায়।
৪. রাজনৈতিক অর্থনীতির সংযোগ। রাজনীতিবিদদের দুর্নীতি-প্রক্রিয়া বাস্তবায়িত হয় মূলত সরকারি কর্মচারীদের মাধ্যমেই – টেন্ডার, বদলি-পদায়ন, প্রকল্প অনুমোদন, প্রকল্প বাস্তবায়ন, রাজস্ব আদায় – প্রতিটি ক্ষেত্রেই প্রশাসনিক যন্ত্র লাগে। যতক্ষণ রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার এই সংযোগ অক্ষত থাকে, ততক্ষণ বেতনকাঠামো যা-ই হোক, প্রশাসনযন্ত্রকে ব্যবহার করার প্রবনতা দুই পক্ষেই থেকে যায়।
বৈষম্যের নতুন মাত্রাঃ বেসরকারি খাত ও প্রান্তিক মানুষ
প্রতিবেদনেই সতর্ক করা হয়েছে যে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ গত ১৪ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে, জিডিপির অনুপাতে ২২ শতাংশের নিচে নেমে গেছে। এমন পরিস্থিতিতে সরকারি বেতন শতভাগের বেশি বাড়লেও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের কর্মীদের বেতন সেই অনুপাতে বাড়াতে পারবে না – গবেষক সেলিম রায়হানের ভাষ্য অনুযায়ী ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি না এলে বেসরকারি উদ্যোক্তারা বেতন বাড়াতে আগ্রহী হবেন না। ফলে একটি নতুন ধরনের দ্বৈত অর্থনীতি তৈরি হচ্ছে – একদিকে রাষ্ট্রীয় বেতনভোগী শ্রেণি, অন্যদিকে বেসরকারি খাতের কর্মী, দিনমজুর, কৃষক – যাঁরা মূল্যস্ফীতির চাপ প্রথমে ও সবচেয়ে বেশি অনুভব করেন, অথচ আয় বৃদ্ধির কোনো প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া তাঁদের জন্য নেই।
আমার নিজের অভিজ্ঞতার সঙ্গে এই পরিবর্তনের একটি প্রতীকী মিল আছে। এক সময় বেসরকারি খাতের বেতন সরকারি বেতনের কয়েকগুণ ছিল বলে সততার সঙ্গে চাকরি করা সরকারি কর্মচারীর প্রতি সহানুভূতি দেখানো সহজ ছিল – বাসাভাড়ায় বেশি ভাগ নেওয়াটা তখন “মানবিক” সিদ্ধান্ত মনে হতো। আজ পরিস্থিতি উল্টে গেলে সেই সহানুভূতির জায়গাটি এখন বেসরকারি খাতের নিম্ন ও মধ্যম আয়ের কর্মীদের প্রাপ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে, কিন্তু বাস্তবে তাঁদের জন্য কোনো কাঠামোগত সুরক্ষা নেই।
প্রতিবন্ধী সন্তান ভাতাঃ মানবিক সিদ্ধান্ত, কিন্তু অসম্পূর্ণ ন্যায়বিচার
নতুন কাঠামোর একটি অংশ প্রথম দেখায় হৃদয়স্পর্শী মনে হয় – বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তানের জন্য প্রথমবারের মতো মাসে ৩,০০০ টাকা করে ভাতা চালু হচ্ছে সরকারি কর্মচারীদের জন্য। এই সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে ভালো এবং মানবিক। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই একই নীতি রাষ্ট্র বেসরকারি খাতের কর্মীদের জন্য, এমনকি যাঁরা কোনো চাকরিতেই নেই তাঁদের জন্যও, সমান পরিমাণে নিশ্চিত করছে কি না। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুর বাবা-মা সরকারি চাকরি করেন কি না – তার ওপর ভিত্তি করে রাষ্ট্রীয় সহায়তা নির্ধারিত হওয়াটা একধরনের ভয়াবহ বৈষম্য তৈরি করে। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুর প্রয়োজন তার বাবা-মায়ের চাকরির ধরনের ওপর নির্ভর করে না; এটি একটি সর্বজনীন সামাজিক নিরাপত্তার প্রশ্ন, যা রাষ্ট্রের সব নাগরিকের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হওয়া উচিত।
শুধু একটি নির্দিষ্ট পেশাগোষ্ঠীর সন্তানদের জন্য মাসিক ভাতা বরাদ্দ করে প্রকৃত পরিবর্তন আসবে না, যদি না বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের বিকাশের সুযোগ – বিশেষায়িত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, থেরাপি সুবিধা, প্রবেশগম্য অবকাঠামো, সমাজে ও রাষ্ট্রে অংশগ্রহণের সুযোগ – দেশজুড়ে সব শিশুর জন্য বিস্তৃত করা হয়। এককালীন ভাতা সমস্যার লক্ষণ প্রশমিত করতে পারে, কিন্তু কাঠামোগত সমাধান দেয় না।
আরেকটি বাস্তব ঝুঁকিও এখানে আছে – এই সুবিধা পাওয়ার জন্য অনেক সরকারি কর্মচারী তাঁদের সম্পূর্ণ সুস্থ সন্তানকেও কাগজে-কলমে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন দেখিয়ে ভাতা নেবেন না, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। যাচাই প্রক্রিয়া দুর্বল হলে এই ভাতাও দুর্নীতির আরেকটি নতুন খাত হয়ে উঠতে পারে – ঠিক যেভাবে অন্যান্য ভাতা, বদলি, পদোন্নতি ইত্যাদি অতীতে অপব্যবহারের শিকার হয়েছে।
শিক্ষকতা পেশাঃ প্রতিভা পলায়নের একটি নমুনা
শিক্ষকদের বেতন তুলনামূলকভাবে কম থাকার কারণে মেধাবী শিক্ষার্থীরা শিক্ষকতা পেশাকে প্রথম পছন্দ হিসেবে বেছে নেন না, আর যাঁরা প্রবেশ করেন তাঁদেরও অনেকে সুযোগ পেলেই অন্য পেশায় চলে যান। এর প্রত্যক্ষ ফল শিক্ষার মানের অবনতি – যা দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় উৎপাদনশীলতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ওপরেই প্রভাব ফেলে। এই বেতনকাঠামোতেও বিচার বিভাগের জন্য আলাদা কাঠামো পরে ঠিক হবে বলা হয়েছে, কিন্তু শিক্ষকদের বেতনকাঠামো নিয়ে আলাদা কোনো জোরালো আলোচনা এখনো সামনে আসেনি। যে পেশাগুলো দীর্ঘমেয়াদে জাতি গঠনে সবচেয়ে বেশি প্রভাব রাখে, সেগুলোই থেকে যাচ্ছে সবচেয়ে অবহেলিত।
প্রবাসী অভিজ্ঞতাঃ প্রভাবের রপ্তানি
প্রবাসে যাঁরা প্রতিদিন কঠোর পরিশ্রম করে সংসার চালান, তাঁদের একটি সাধারণ পর্যবেক্ষণ হলো – বাংলাদেশের কিছু সরকারি কর্মচারীর পরিবার-সদস্যরা (স্ত্রী, সন্তান) বিদেশেও কোনো কাজ ছাড়াই স্বচ্ছল জীবনযাপন করেন, এবং কখনো কখনো দেশীয় প্রভাব-প্রতিপত্তির ছায়া বিদেশের মাটিতেও বহন করেন। কানাডার তথাকথিত “বেগমপাড়া”য় বাংলাদেশের বেশ কিছু সরকারি কর্মচারীর নামে বড় বড় প্রপার্টির মালিকানার আলোচনা বহুদিন ধরেই সংবাদমাধ্যমে ও জনপরিসরে চলছে। দেশেও একই শ্রেণির অনেকের হাতে দেখা যায় অঢেল সম্পদ ও অসামঞ্জস্যপূর্ণ প্রভাব-প্রতিপত্তি, যা তাঁদের ঘোষিত আয়ের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয় বলে সাধারণ মানুষের ধারণা।
এই পর্যবেক্ষণ কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে প্রমাণ নয়, কিন্তু এটি একটি ব্যাপক জনধারণার প্রতিফলন। এর মূলে থাকা মানসিকতাটাও গুরুত্বপূর্ণ – অনেক সরকারি কর্মচারীর কাছে “ক্ষমতা” মানেই হলো নিয়মের বাইরে গিয়ে কাউকে অন্যায় সুযোগ করে দেওয়ার সামর্থ্য। এই অন্যায্য সুযোগ তৈরি করে দেওয়াটাকেই তাঁরা তাঁদের পদের প্রকৃত ক্ষমতা ও মর্যাদা হিসেবে দেখেন – আইনসম্মতভাবে সেবা দেওয়াটা নয়। যতক্ষণ এই মানসিকতা প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতির অংশ হয়ে থাকবে, ততক্ষণ বেতনকাঠামো যতই আধুনিকায়ন হোক, সম্পদ ও প্রভাবের এই অসামঞ্জস্যপূর্ণ বিস্তার থামবে না।
ভারসাম্যের জন্য অন্য দিকটাও দেখা দরকার
এই বিশ্লেষণের পাশাপাশি এটাও মনে রাখা দরকার যে বেতনবৃদ্ধির পক্ষে যুক্তিও দুর্বল নয়। প্রায় চার দশক ধরে বাংলাদেশের সরকারি বেতনকাঠামো মূল্যস্ফীতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে সংশোধিত হয়নি বললেই চলে; বেতন কমিশন গঠিত হয় বহু বছর পর পর। কম বেতনে যোগ্য জনবল ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছিল, এবং কিছু আন্তর্জাতিক গবেষণায় এটাও দেখা গেছে যে অত্যন্ত নিম্ন বেতন কাঠামোতে দুর্নীতির প্রবণতা বরং বেশি থাকে, কারণ প্রাতিষ্ঠানিক আনুগত্য ও পেশাদারিত্ব বজায় রাখার প্রণোদনা কমে যায়। সে অর্থে বেতনবৃদ্ধিকে দুর্নীতি প্রতিরোধের একটি প্রয়োজনীয় (যদিও অপর্যাপ্ত) উপাদান হিসেবে দেখার যুক্তিও আছে। পাশাপাশি, রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি ও বেসরকারি বিনিয়োগে মন্দার প্রেক্ষাপটে এই ব্যয়ভার সরকারের জন্য প্রকৃতই একটি আর্থিক চ্যালেঞ্জ, যার ঝুঁকি স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক সুরক্ষা খাতের বরাদ্দে চাপ ফেলতে পারে – এই আশঙ্কা বিশেষজ্ঞরাও করছেন।
শেষ কথা
সংখ্যাগুলো নিজেই বলে দিচ্ছে – ১০০ থেকে ১৪২ শতাংশ বেতনবৃদ্ধি একটি ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত, যা ৩৩ লাখ মানুষের জীবনে সরাসরি প্রভাব ফেলবে। কিন্তু বেতনবৃদ্ধি একা কোনো সমস্যার সমাধান নয়, যদি না তার সঙ্গে যুক্ত হয় স্বচ্ছ সম্পদের হিসাব, স্বাধীন তদারকি প্রতিষ্ঠান, দ্রুত ও নিশ্চিত শাস্তির ব্যবস্থা, এবং সেবাপ্রদানের ডিজিটাইজেশনের মতো কাঠামোগত সংস্কার। অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, বেতন বাড়ানো হলে জীবনযাত্রার মান বাড়ে ঠিকই, কিন্তু দুর্নীতির প্রবণতা কমে না – বরং সামর্থ্য বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দুর্নীতির পরিসর, কৌশল ও পরিমাণ আরও বিস্তৃত হওয়ার ঝুঁকি থেকে যায়। প্রকৃত পরিবর্তন আসবে তখনই, যখন জবাবদিহিতার কাঠামো বেতনকাঠামোর সমান্তরালে শক্তিশালী হবে।
Related Posts

Government Employees’ Salaries Are Rising by 100% to 142%: Will Corruption Decrease? How Can the Inhumane Living Conditions of Private-Sector Workers End?
When I was at university, I dreamed of getting a job with a salary ofRead More

Why is the rate of rape low in Islamic Sharia‑ruled countries? Is it real?
Because of my writing and as an outspoken activist against sexual violence against women, IRead More

ইসলামী শরিয়া শাসিত দেশে ধর্ষণের হার কম কেন? এটা কি বাস্তবতা?
লেখালিখির কারনে এবং নারীদের উপর ঘটা যৌন সহিংসতার বিরুদ্ধে একজন সোচ্চার অধিকারকরমী হিসাবে ধর্ষণের পরিসংখ্যানRead More

Comments are Closed