Story
Servant of God

Servant of God

যাকে ঈশ্বর নির্দেশ দিয়ে পাঠিয়েছিলেন – জামশেদের বিচার হবে আজ

নদীর ওপারে নৌকা ভিড়তেই সাংবাদিক সাজ্জাদ হোসেন টের পেলেন, গ্রামটা আজ অন্যরকম। ঘাটে মানুষের ভিড় নেই, অথচ দূর থেকে একটা চাপা গুঞ্জন ভেসে আসছে, যেন বহু মানুষ একসঙ্গে নিঃশ্বাস চেপে রেখেছে।

বর্ষার শেষ। কাদায় জুতো গেঁথে যায়। কাঁধের ব্যাগে নোটবই আর পুরোনো ক্যামেরা নিয়ে তিনি হাঁটতে থাকলেন গুঞ্জনের দিকে। ইউনিয়ন পরিষদের উঠোনে হ্যাজাক জ্বলছে, তার ঘিরে শ’দুয়েক মানুষ। মাঝখানে একটা বাঁশের খুঁটি, আর খুঁটিতে দড়িতে বাঁধা এক শীর্ণ মানুষ। পাকা চুল, কাদামাখা পাঞ্জাবি, গালে দুটো চড়ের দাগ তখনও ফুলে আছে। লোকটা চোখ বন্ধ করে বিড়বিড় করছে।

“কী হয়েছে এখানে?” সাজ্জাদ পাশের এক বৃদ্ধকে জিজ্ঞেস করলেন।

বৃদ্ধ ফিরে তাকালেন। “আপনি কে?”

“সাংবাদিক। ঢাকা থেকে এসেছি, বন্যার রিপোর্ট করতে।”

বৃদ্ধ একটু চুপ করে থেকে বললেন, “বন্যার খবর আজ থাক বাবা। আজ আরেক খবর আছে। বসেন, বলি।”

চায়ের দোকানের বেঞ্চিতে বসে বৃদ্ধ, নাম রহমত মাস্টার, ধীরে ধীরে গল্পটা বললেন। হ্যাজাকের আলো তখন তার মুখে কাঁপছে।


নদীর মাঝখানে একটা চর আছে। মানচিত্রে তার নাম নেই, কিন্তু যারা সেখানে জন্মায় তাদের কাছে সেটাই পৃথিবী। সেই চরে এক শীতের সকালে জন্ম নিল একটা ছেলে। নাম রাখা হলো জামশেদ। অথচ তার জন্মের আগেই বাপ গত হয়েছে, আর জন্মের কয়েক মাস পরে মা। কোলের শিশুকে তুলে নিল চাচা।

চাচার ঘরে আদরের জায়গা ছিল না, কাজের জায়গা ছিল। জামশেদ ছোট থেকেই গরু-ছাগল নিয়ে মাঠে যেত। নদীর চরে ঘাসের ওপর শুয়ে আকাশ দেখত, আর কথা বলত পশুদের সঙ্গে। মানুষের সঙ্গে কম, কারণ মানুষ তার কথা শুনত না।

পঁচিশ বছর বয়সে তার বিয়ে হলো। কনের বয়স চল্লিশ, বিধবা, নাম আতর বানু। এলাকার সম্ভ্রান্ত ব্যবসায়ী ছিলেন তিনি। লোকে বলত, রাখাল ছেলের কপাল খুলেছে। কিন্তু যারা কাছ থেকে দেখেছে তারা জানে, আতর বানু ছিলেন জামশেদের জীবনের প্রথম মানুষ, যিনি তাকে খেতে বসিয়ে জিজ্ঞেস করেছিলেন, “আর একটু ভাত নেবে?”

দশ বছর কাটল। তারপর, জামশেদের বয়স যখন পঁয়ত্রিশ, একরাতে সে স্বপ্ন দেখল।

সে বলত, স্বপ্নে সৃষ্টিকর্তা নিজে এসে বলেছেন, “যাও, গ্রামের শেষ প্রান্তে চুন্নু মিয়ার পরিত্যক্ত কবরটার পাশে গিয়ে বসো। ধ্যান করো।”

চুন্নু মিয়ার কবরে বছর বছর আগাছা জমত, শেয়াল ডাকত। সেখানে গিয়ে বসল জামশেদ। প্রথমে একা। তারপর দু’চারজন কৌতূহলী, তারপর কয়েকজন বিশ্বাসী। যারা বিশ্বাস করল না, তারা নাম দিল পাগলা জামশেদ। সে গায়ে মাখল না। অনুসারীদের বলত, “ওরা বোঝে না। আমি পাগল নই। আমি তাঁর প্রতিনিধি। তিনি আমাকে পাঠিয়েছেন তোমাদের পাপ থেকে মুক্ত করতে।”

আতর বানু বেঁচে থাকতে কথাগুলো সীমার ভেতরেই ছিল। হয়তো তিনিই ছিলেন সেই বাঁধ, যা নদীকে কূল ছাড়তে দেয় না। তিনি মারা গেলেন এক ভোরে। জামশেদ কয়েকদিন কারও সঙ্গে কথা বলল না।

তারপর শুরু হলো অন্ধকার।


রহমত মাস্টার থামলেন। চায়ের কাপে চুমুক দিলেন না, শুধু হাতে ধরে রাখলেন।

“সাত মাসে সাতটা বিয়ে করল সে। বলত, এ তার ওপর সৃষ্টিকর্তার নির্দেশ। কে প্রশ্ন করবে? তার অনুসারীরা মাথা নিচু করে থাকত। আর যারা অনুসারী ছিল না, তারা ভয়ে বা অভ্যাসে চুপ থাকত।”

সাজ্জাদের কলমের ডগা নোটবইয়ের ওপর স্থির। তিনি আর কিছু লিখছিলেন না।

“তারপর একদিন,” রহমত মাস্টারের গলা নেমে গেল, “সে তার সবচেয়ে কাছের অনুচর আক্কাসকে ডেকে বলল, ‘তোমার মেয়ে পিপাসাকে আমি বিয়ে করব। এটা প্রভুর আদেশ।’ মেয়েটার বয়স তখন ছয়।”

সাজ্জাদ চোখ তুললেন।

“ছয়, বাবা। ছয় বছর। আক্কাস আপত্তি করেনি। ভেবে দেখুন, ধর্মের নামে একজন মানুষ কী করতে পারে আরেকজনের ভেতরে। বিয়ে হয়ে গেল। কাজি ছিল না, কাগজ ছিল না, ছিল শুধু একটা মানুষের দাবি, আর কয়েকজনের নীরবতা।”

নীরবতাই সবচেয়ে বড় অপরাধ, সাজ্জাদের মনে হলো। কিন্তু মুখে কিছু বললেন না।

“আরও দুটো বিয়ে হলো এরপর। পিপাসার বয়স যখন নয়, তখন তাকে পাঠানো হলো জামশেদের ঘরে। বাসর করতে।” রহমত মাস্টার কাপটা বেঞ্চের ওপর নামিয়ে রাখলেন। হাত কাঁপছিল। “নয় বছরের একটা মেয়ে। যে এখনও পুতুল নিয়ে খেলে।”

দূরে হ্যাজাকের আলোয় খুঁটিতে বাঁধা লোকটার ছায়া দীর্ঘ হয়ে মাটিতে পড়ে আছে।

“একে একে তেরোটা বিয়ে করেছিল সে। পাশের গ্রামের লোকেরা নাম দিল ‘বিয়ে পাগলা জামশেদ’। কিন্তু কেউ প্রশ্ন করেনি, মেয়েগুলো কোথায় গেল, কেমন আছে। আর তার বাড়িতে চারজন কাজের লোক ছিল, বুঝলেন? চারজন। সে নিজের মুখে বলত, তাদের সঙ্গেও সে বউয়ের মতো থাকে। কাজের লোক, আশ্রিত, অসহায় মানুষ। প্রতিবাদ করার জায়গা যাদের ছিল না।”

সাজ্জাদ ঢোক গিললেন। তার বুকের ভেতরে কিছু একটা শক্ত হয়ে উঠছিল।

“তাহলে আজ কী হলো? কেন ধরা পড়ল সে?”

রহমত মাস্টারের ঠোঁটে ক্ষীণ একটা হাসি ফুটল, কিন্তু তা হাসি নয়, বরং হাসির ভগ্নাংশ।

“একটা চড়ের জন্য।”


গতকাল দুপুরে, নদী পেরিয়ে জামশেদ পাশের গ্রামে গিয়েছিল তার কয়েকজন অনুচরকে নিয়ে। হাটের পাশে এক গাছতলায় একজন মা বসে ছিলেন, কোলে এক বছরের ফুটফুটে মেয়ে। জামশেদ থমকে দাঁড়াল। শিশুটির দিকে এমন করে তাকাল, যেভাবে মানুষ বাজারে কিছু কেনার আগে দর যাচাই করে।

“তোমার এই মেয়ে,” সে মহিলাকে বলল শান্ত গলায়, যেন আবহাওয়ার কথা বলছে, “একটু বড় হলে আমি তাকে বিয়ে করব। প্রভুর আদেশ।”

মহিলা প্রথমে বুঝতে পারলেন না। তারপর বুঝলেন। তার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।

কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে ছিলেন মেয়েটির বাবা, অমি। যাকে সবাই বলে বডিবিল্ডার অমি, কারণ সে শহরে জিম করত, গ্রামে ফিরে এসেও রোজ ভোরে লোহা তুলত। কথাটা তার কানে গেল। কয়েক সেকেন্ড সে দাঁড়িয়ে রইল, যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছে না। তারপর ছুটে এল।

ঠাস। ঠাস।

দুটো চড়। গ্রামের হাটে সেই শব্দ পিস্তলের গুলির মতো ছড়িয়ে পড়ল।

জামশেদের অনুচররা ক্ষিপ্ত হয়ে তেড়ে এল অমির দিকে। কিন্তু ততক্ষণে হাটের মানুষ ঘুরে দাঁড়িয়েছে। কেউ একজন চিৎকার করল, “ধর! ধর জামশেদ পাগলারে ধর!”

একটা ডাক যেন আরও শতটা ডাককে ডেকে আনল। মুহূর্তে ভিড় জমে গেল। অনুচররা দেখল, তাদের চারপাশে এখন শত শত চোখ। তারা পিছু হটল, তারপর দৌড়াল, যে যেদিকে পারে। ভক্তির সীমা কতদূর, সেটা সেদিন বোঝা গেল।

জামশেদ রইল একা। কেউ একজন দড়ি আনল, কেউ একজন খুঁটি। সে বাধা দিল না। শুধু একবার আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল, “প্রভু, তুমি কি দেখছ?”

কেউ উত্তর দিল না। আকাশ থেকে নয়, মাটি থেকেও নয়।


রহমত মাস্টার উঠে দাঁড়ালেন। “চলেন, দেখবেন। চেয়ারম্যান এখনই বিচার শুরু করবেন।”

উঠোনের কেন্দ্রে একটা চেয়ার পাতা। সেখানে বসে আছেন ইউনিয়নের চেয়ারম্যান, মধ্যবয়সী, ভারী গলার এক মানুষ। তার ডানপাশে মসজিদের ইমাম, বাঁ পাশে কয়েকজন মুরুব্বি। সামনে বাঁধা অবস্থায় জামশেদ।

সাজ্জাদ ভিড়ের পেছনে দাঁড়ালেন। হঠাৎ তার চোখ পড়ল ভিড়ের একপাশে, যেখানে কয়েকটা মেয়ে জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কারও বয়স তেরো, কারও পনেরো, কারও হয়তো আরও কম। তাদের চোখে কোনো স্পষ্ট অনুভূতি নেই। না ভয়, না রাগ, না স্বস্তি। শুধু একটা শূন্যতা, যা বয়সের চেয়ে অনেক পুরোনো।

রহমত মাস্টার ফিসফিস করে বললেন, “ওরাই। ওর বউরা।”

সাজ্জাদের হাত থেকে কলম পড়ে গেল। তিনি নিচু হয়ে তুললেন, কিন্তু আর লিখলেন না।

চেয়ারম্যান গলা খাঁকারি দিলেন। ভিড় নিস্তব্ধ হলো। শুধু হ্যাজাকের শোঁ শোঁ শব্দ আর দূরে নদীর ছলাৎ ছলাৎ।

“জামশেদ,” চেয়ারম্যান বললেন, “তোমার বিরুদ্ধে অভিযোগ গুরুতর। কিছু বলার আছে?”

জামশেদ চোখ খুলল। হ্যাজাকের আলোয় তার চোখ দুটো অদ্ভুতভাবে শান্ত, যেন সে এই মুহূর্তের জন্য অনেকদিন ধরে প্রস্তুত ছিল।

“আমি কোনো অন্যায় করিনি,” সে বলল। “আমি শুধু তাঁর আদেশ পালন করেছি।”

ভিড়ের ভেতর থেকে কে একজন চাপা গলায় বলে উঠল, “আদেশ!” আর শব্দটা এমনভাবে উচ্চারিত হলো, যেন থুতু ফেলা হলো।

চেয়ারম্যান হাত তুললেন। “তিনি কোথায়, যিনি আদেশ দিয়েছেন? এখানে এসে বলুক।”

জামশেদ উত্তর দিল না। তার ঠোঁট নড়ল, কিন্তু কোনো শব্দ বের হলো না।

সাজ্জাদ তখন বুঝতে পারলেন, এই বিচারে আসল প্রশ্ন একটাই। কিছু মানুষ কীভাবে নিজের লালসাকে ঈশ্বরের কণ্ঠস্বর বানিয়ে ফেলে, আর কীভাবে একটা পুরো সমাজ বছরের পর বছর সেই কণ্ঠস্বরের সামনে মাথা নিচু করে থাকে। সে মাথা নিচু করা গোটা গ্রামের, তাদেরও, যারা আজ দড়ি ধরেছে।

ভিড়ের পেছনে, একটু দূরে, অমি দাঁড়িয়ে ছিল। তার হাতের তালু তখনও লাল। তার কোলে এক বছরের মেয়ে, ঘুমে অচেতন। সে একবারও জামশেদের দিকে তাকায়নি। শুধু মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে যাচ্ছে, বারবার, যেন নিশ্চিত হতে চাইছে এই ছোট্ট শরীরটা এখনও নিরাপদ।

সাজ্জাদ নোটবইয়ের একটা নতুন পাতা খুললেন। অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকলেন সাদা পাতার দিকে। তারপর ধীরে ধীরে লিখলেন:

“আজ রাতে একটা গ্রাম বিচার করছে একজন মানুষকে। কিন্তু আসল বিচার হওয়া উচিত সেই নীরবতার, যা তাকে এতদূর আসতে দিয়েছে।”

নদীর ওপারে আকাশ ফর্সা হতে শুরু করেছে। চুন্নু মিয়ার পরিত্যক্ত কবরের পাশে এখন কেউ নেই। শুধু আগাছা, আর হাওয়ায় দুলছে কয়েকটা শুকনো ফুল, কেউ একজন কোনোদিন রেখে গিয়েছিল।

খুঁটিতে বাঁধা মানুষটা এই প্রথম মাথা নিচু করল।

আর কেউ লক্ষ্য করল না, গ্রামের শেষ প্রান্তে একটা ছোট্ট মেয়ে, পিপাসা, চুপচাপ উঠে দাঁড়িয়ে নদীর দিকে হাঁটতে শুরু করেছে, সূর্য ওঠার দিকে মুখ করে, নিজের জন্যে প্রথমবারের মতো।

Related Posts

Servant of God

The Trial of the Man Mr. Jamshed Who Said He Was Chosen by God Begins Today

As the boat touched the opposite bank, journalist Sazzad Hossain sensed that the village wasRead More

Ancient Arab vs India

When Arabia Was in Darkness, India Was Carrying the Torch of Knowledge – So What Darkness Does Islam Claim to Remove?

What Was the “Age of Jahiliyyah” in Arabia Really Like? The term “Jahiliyyah” is fundamentallyRead More

Ancient Arab vs India

আরব যখন অন্ধকারে, ইন্ডিয়ায় তখন জ্ঞানের মশাল জ্বলে – ইসলাম কিসের অন্ধকার দূর করতে চায়?

আরবে “আইয়ামে জাহেলিয়া” আসলেই কি ছিল? “জাহেলিয়া” শব্দটি মূলত একটি ধর্মতাত্ত্বিক ধারণা। ইসলামী পরিভাষায় এরRead More

Comments are Closed