
The Brutality of Imam Mahdi in Iran
১২০০ বছর আগে হারিয়ে যাওয়া শিশু ইমাম মাহদীর নামে ইরানে হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করা হয়
ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্র আধুনিক বিশ্বের এমন এক বিরল রাষ্ট্র, যার ক্ষমতাকাঠামোর কেন্দ্রে একজন অনুপস্থিত, অদৃশ্য ইমামের ধারণা বসানো আছে। বারো-ইমামি শিয়া বিশ্বাস অনুযায়ী দ্বাদশ ইমাম মুহাম্মদ ইবনে হাসান আল-মাহদি ২৫৫ হিজরিতে (৮৬৮ খ্রিষ্টাব্দের কাছাকাছি) জন্মেছিলেন। তাঁর পিতা একাদশ ইমাম হাসান আল-আসকারির মৃত্যুর সময় তাঁর বয়স ছিল মাত্র পাঁচ বছরের মতো। এরপর তিনি জনসমক্ষ থেকে অন্তর্হিত হন, যাকে বলা হয় গায়বাত বা অন্তর্ধান। প্রথম পর্বে, প্রায় সত্তর বছর, চারজন প্রতিনিধির মাধ্যমে তিনি অনুসারীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন বলে বিশ্বাস করা হয়। ৯৪১ খ্রিষ্টাব্দের কাছাকাছি সময়ে শেষ প্রতিনিধির মৃত্যুর পর শুরু হয় বৃহত্তর অন্তর্ধান। সেই হিসাবে তাঁর অন্তর্ধানের পর এগারো শতকেরও বেশি সময় পেরিয়েছে, যদিও জনপ্রিয় ভাষ্যে প্রায়ই “প্রায় বারোশো বছর” বলা হয়। শিয়াদের বিশ্বাস, একদিন তিনি ফিরে আসবেন এবং অন্যায়ে ভরা পৃথিবীকে ন্যায়বিচারে পূর্ণ করবেন।
ইতিহাসের বড় অংশ জুড়ে শিয়া আলেমদের প্রধান ধারা ছিল রাজনৈতিক নিষ্ক্রিয়তা বা অপেক্ষার নীতি। অনেকের মতে, ইমাম ফিরে না আসা পর্যন্ত কোনো মানুষের শাসনই পুরোপুরি বৈধ হতে পারে না, তাই আলেমদের কাজ ধর্মীয় নির্দেশনা দেওয়া, রাষ্ট্র চালানো নয়। এই ধারণা উল্টে দেন আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি। ১৯৭০ সালে ইরাকের নাজাফে নির্বাসনে থাকা অবস্থায় তিনি যে বক্তৃতামালা দেন, তাতে তিনি “ওয়ালায়াতে ফকিহ” বা ইসলামি আইনবিদের অভিভাবকত্বের তত্ত্ব হাজির করেন। যুক্তি ছিল, ইমামের অনুপস্থিতিতে সমাজকে অনৈসলামিক শাসকদের হাতে ছেড়ে দেওয়া যায় না, বরং যোগ্য ও ন্যায়নিষ্ঠ ফকিহকেই ইমামের পক্ষ থেকে শাসনের দায়িত্ব নিতে হবে। ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর এই তত্ত্বই রাষ্ট্রীয় রূপ পায়।
বিপ্লবের পর গণভোটে ইসলামি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব বিপুল ব্যবধানে অনুমোদিত হয় এবং ১৯৭৯ সালের শেষ দিকে নতুন সংবিধান গৃহীত হয়। এই সংবিধানের প্রস্তাবনা ও পঞ্চম অনুচ্ছেদে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, “ওয়ালি-এ-আসর” বা যুগের অধিপতি দ্বাদশ ইমামের অন্তর্ধানকালে নেতৃত্বের দায়িত্ব থাকবে ন্যায়নিষ্ঠ, ধার্মিক ও যোগ্য ফকিহর হাতে। এই ফকিহই সর্বোচ্চ নেতা বা রাহবার। ১৯৮৯ সালে খোমেনির মৃত্যুর পর আলী খামেনি এই পদে বসেন এবং প্রায় সাঁইত্রিশ বছর তা ধরে রাখেন। সর্বোচ্চ নেতা সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান সেনাপতি, বিচার বিভাগের প্রধান নিয়োগ করেন এবং গার্ডিয়ান কাউন্সিলের সদস্যদের একটি অংশ সরাসরি বা পরোক্ষভাবে তাঁরই মনোনীত। সংসদ, প্রেসিডেন্ট ও বিশেষজ্ঞ পরিষদের প্রার্থীদের যোগ্যতা যাচাইয়ের ক্ষমতাও এই কাউন্সিলের হাতে। ফলে নির্বাচন হলেও প্রতিযোগিতার সীমানা আগেভাগেই ঠিক হয়ে যায়।
এই কাঠামোর ধর্মীয় তাৎপর্য গভীর। সর্বোচ্চ নেতা যেহেতু অদৃশ্য ইমামের প্রতিনিধি হিসেবে দাবি করা হয়, তাই তাঁর প্রতি আনুগত্যকে শুধু রাজনৈতিক নয়, ধর্মীয় কর্তব্য হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। এর অনিবার্য পরিণতি হলো, শাসকের বিরোধিতা সহজেই ধর্মবিরোধিতার রূপ পায়। ইরানি আইনে “মোহারেবে” (আল্লাহর বিরুদ্ধে যুদ্ধ), “ইফসাদ ফিল আরদ” (পৃথিবীতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি) কিংবা “নেতাকে অবমাননা”-র মতো অভিযোগ ঠিক এই যুক্তিরই আইনি প্রকাশ। রাষ্ট্রীয় সংস্কৃতিতেও মাহদির উপস্থিতি স্পষ্ট। কোমের জামকারান মসজিদ মাহদি-ভক্তির কেন্দ্র হিসেবে বিখ্যাত, আর মাহমুদ আহমাদিনেজাদের আমলে মাহদির আসন্ন প্রত্যাবর্তনের কথা সরকারি বক্তৃতায় বারবার উঠে এসেছিল। তবে এটাও মনে রাখা দরকার, সব শিয়া আলেম ওয়ালায়াতে ফকিহ তত্ত্ব মানেন না। ইরানের ভেতরে ও বাইরে বহু প্রভাবশালী আলেম এই তত্ত্বের সমালোচক।
প্রতিবাদ দমনের ইতিহাস ইসলামি প্রজাতন্ত্রের জন্মলগ্ন থেকেই চলে আসছে। বিপ্লবের প্রথম বছরগুলোতে বিরোধী বামপন্থী, মুজাহিদিনে খালকসহ নানা গোষ্ঠীর হাজার হাজার মানুষকে কারাগারে পাঠানো ও মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। ১৯৮৮ সালে ইরান-ইরাক যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর কারাগারে বন্দিদের গোপন বিচারে ব্যাপক হারে ফাঁসি দেওয়া হয়, যাকে মানবাধিকার সংস্থাগুলো গণহত্যার সমতুল্য বলে বর্ণনা করে এবং যার শিকারের সংখ্যা তাদের হিসাবে কয়েক হাজার। এরপর ১৯৯৯ সালের ছাত্র আন্দোলন, ২০০৯ সালের গ্রিন মুভমেন্ট, ২০১৭-১৮ সালের অর্থনৈতিক বিক্ষোভ, ২০১৯ সালের জ্বালানি-মূল্যবিরোধী আন্দোলন এবং ২০২২ সালে মাহসা আমিনির মৃত্যুর পর “নারী, জীবন, স্বাধীনতা” আন্দোলন, প্রতিটি ক্ষেত্রেই রাষ্ট্র কঠোর দমননীতির আশ্রয় নিয়েছে।
২০২৬ সালের জানুয়ারির বিক্ষোভ সেই ধারাবাহিকতারই সবচেয়ে রক্তাক্ত অধ্যায়গুলোর একটি। অধিকারকর্মীদের মতে, এই দমন-পীড়নে হাজার হাজার মানুষ নিহত এবং কয়েক হাজার মানুষ গ্রেফতার হয়েছেন। মৃত্যুদণ্ডের পরিসংখ্যানও উদ্বেগজনক। নরওয়ে-ভিত্তিক ইরান হিউম্যান রাইটস ও প্যারিস-ভিত্তিক ইসিপিএম-এর যৌথ প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০২৫ সালে অন্তত ১,৬৩৯ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে, যাদের মধ্যে ৪৮ জন নারী। ২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসেই ৬৫৬টি ফাঁসির তথ্য নথিভুক্ত হয়েছে, যদিও মার্চে ইরান প্রায় অফলাইন থাকায় প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হয়। এপ্রিলের দিকে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, জানুয়ারির বিক্ষোভ সংক্রান্ত মামলায় সাতজনকে ইতিমধ্যে ফাঁসি দেওয়া হয়েছে এবং আরও অন্তত ২৬ জনের মৃত্যুদণ্ড হয়েছে, আর কয়েকশো মানুষের বিরুদ্ধে মামলা চলছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর অভিযোগ, এসব বিচার তড়িঘড়ি করে, যথাযথ প্রক্রিয়া ও স্বাধীন আইনজীবীর সুযোগ ছাড়া হয়েছে এবং নির্যাতনের মাধ্যমে আদায় করা স্বীকারোক্তিকে প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। Woman among four more Iranians sentenced to death over protests +4
এই প্রেক্ষাপটেই এসেছে তেহরানের দম্পতি মোহাম্মদরেজা মাজিদি-আসল ও বিতা হেমাতির মামলা। তেহরান রেভল্যুশনারি কোর্টের ২৬ নম্বর শাখা, বিচারক ইমান আফশারির নেতৃত্বে, তাঁদের এবং আরও দুজন বন্দি বেহরুজ ও কুরোশ জামানিনেজাদকে মৃত্যুদণ্ড, পাঁচ বছরের কারাদণ্ড এবং সমস্ত সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার সাজা দেয়। মৃত্যুদণ্ডের অভিযোগটি ছিল “বৈরী মার্কিন সরকার ও বৈরী গোষ্ঠীর পক্ষে সক্রিয় কাজ”। অন্য প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল একটি আবাসিক ভবন থেকে নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর কংক্রিটের ব্লক ছুড়ে মারা, আর তাঁরা একই ভবনের বাসিন্দা ছিলেন। হেমাতিকে বিক্ষোভ সংক্রান্ত মামলায় মৃত্যুদণ্ড পাওয়া প্রথম নারী বলে মনে করা হয়। তবে পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ আশার আলো দেখিয়েছে। হ্রানার (HRANA) প্রতিবেদন অনুযায়ী ইরানের সুপ্রিম কোর্ট দম্পতির মৃত্যুদণ্ড বাতিল করে মামলাটি পুনর্বিচারের জন্য সমান্তরাল একটি শাখায় পাঠিয়েছে, আর জামানিনেজাদ পিতা-পুত্রের মৃত্যুদণ্ডও বাতিল হয়েছে। বিতা হেমাতি এখনো এভিন কারাগারের নারী ওয়ার্ডে বন্দি, আর মাজিদি-আসলের অবস্থান সম্পর্কে হ্রানা তখনো অনুসন্ধান চালাচ্ছিল। পুনর্বিচারের অর্থ হলো, ঝুঁকি পুরোপুরি কাটেনি। Tehran Revolutionary Court Sentences Four Protest Detainees to Death +6
এর মধ্যেই ইরানের ক্ষমতার শীর্ষে নাটকীয় পরিবর্তন ঘটেছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে যৌথ হামলা শুরু করে এবং সেই হামলায় সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন। ৮৮ সদস্যের বিশেষজ্ঞ পরিষদ ৮ মার্চ তাঁর ৫৬ বছর বয়সী ছেলে মোজতবা খামেনিকে নতুন সর্বোচ্চ নেতা ঘোষণা করে। এই নির্বাচন বিতর্কিতও, কারণ ১৯৭৯ সালের বিপ্লব বংশানুক্রমিক শাসনকে প্রত্যাখ্যান করেছিল, অথচ এই নিয়োগ কার্যত বংশানুক্রমিক উত্তরাধিকারের চেহারা নিয়েছে। একজন বিশ্লেষকের মতে, মোজতবা তাঁর পিতার মতো রাজনৈতিক ও ধর্মীয় প্রভাব পুরোপুরি পাননি এবং ক্ষমতার সিদ্ধান্ত এখন একাধিক কেন্দ্রে ছড়িয়ে পড়েছে। ৮ এপ্রিল ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়, তবে উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে। অর্থাৎ ইমাম মাহদির প্রতিনিধিত্বের দাবি এখন আরেকজনের কাঁধে, আর যুদ্ধের চাপে রাষ্ট্র নিজের নিরাপত্তা নিয়ে আরও সতর্ক ও আরও কঠোর হয়ে উঠতে পারে। Live Updates: War returns to Iran with Israel, US strikes – DAWN.COM +4
তবে দমননীতির পুরো ব্যাখ্যা কেবল মাহদি-তত্ত্বে খোঁজা পূর্ণাঙ্গ হবে না। ইসলামি বিপ্লবী রক্ষীবাহিনী (আইআরজিসি), বিচার বিভাগ ও গোয়েন্দা সংস্থার স্বার্থ, অর্থনৈতিক সংকট, নিষেধাজ্ঞা এবং শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়ার ভয়, সবই এখানে কাজ করে। তেহরান নিজে সাধারণত বিক্ষোভকারীদের বিদেশি শক্তির এজেন্ট বা সন্ত্রাসী হিসেবে বর্ণনা করে, ধর্মীয় তত্ত্বের চেয়ে “জাতীয় নিরাপত্তা”-র ভাষাই বেশি ব্যবহার করে। তবু ধর্মীয় বৈধতার ভিত্তি যে রাষ্ট্রের কাঠামোয় গাঁথা, সেখানে রাজনৈতিক ভিন্নমত স্বাভাবিকভাবেই বিপজ্জনক মনে হয়, কারণ তা শুধু সরকার নয়, একটি পবিত্র দায়িত্বকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে। বিতা হেমাতি ও মাজিদি-আসলের মতো মানুষের ভাগ্য তাই কেবল দুটি ব্যক্তির গল্প নয়, বরং একটি বিশ্বাসভিত্তিক রাষ্ট্র এবং তার নাগরিকদের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষার মধ্যকার দীর্ঘ টানাপোড়েনের প্রতিচ্ছবি। তাঁদের পুনর্বিচারের ফল কী হয়, তা এখন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মহলের নজরে থাকবে।
Related Posts

Thousands of people have been killed in Iran in the name of the Child Imam Mahdi, who disappeared around 1,200 years ago
The Islamic Republic of Iran is one of the rare states in the modern worldRead More

Ayisha and Arpita: A Story of Free Expression and Honesty Between Two Sisters, One Muslim and One Hindu
Ayisha and Arpita’s parents had dated for several years before marrying under Bangladesh’s Special MarriageRead More

আয়িশা ও অর্পিতা – মুসলিম ও হিন্দু দুই বোনের মুক্তবাক ও সততার গল্প
আয়িশা ও অর্পিতার বাবা-মা কয়েক বছর প্রেম করে বাংলাদেশের বিশেষ বিবাহ আইনে বিয়ে করেছিলেন। কেউRead More

Comments are Closed