Culture
Islam and Bengali Culture

Islam and Bengali Culture

ইসলামিস্ট মোল্লারা কেন বাঙালিদের আনন্দ উৎসবকে তাদের শত্রু মনে করে?

এবার বাংলাদেশে অন্যবারের তুলনায় বেশ শান্তিপূর্ণ, উৎসবমুখর পরিবেশে হিন্দু ধর্মের বড় ধর্মীয় উৎসব দূর্গাপূজা হয়ে গেল। বাংলাদেশে প্রতিবছরের রেওয়াজ অনুযায়ী ইসলামী ধান্দাবাজরা কিছু প্রতিমা ভাংচুর করেছে বটে তবে বড় কোন সংঘাত, রক্তাক্ত হওয়ার ঘটনা ঘটেনি। সবচেয়ে আশাপ্রদ ব্যাপার হলো, অনেক সেলিব্রেটি এবার প্রকাশ্যে শারদীয় দূর্গাপূজা উৎসবে শামিল হয়েছেন, সমর্থন জানিয়েছেন। ধর্মীয় বিশ্বাস যাই থাক উগ্রবাদী না হলে, বাঙালি রক্ত শরীরে থাকলে এই উৎসবের রঙ, রুপ, সঙ্গীত, মিলনমেলা, সংলগ্ন মেলা উপেক্ষা করা কঠিন। উৎসবের টান না থাকলে ঢাকা শহরের সীমাহীন জ্যামের যন্ত্রনা ভেদ করে এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত ঘুরে ঘুরে শৈল্পিক কারুকাজ দেখতে কেউ চাইবে না। মনের টান থেকেই সবাই এই উৎসবে শামিল হয়, এতো রঙিন উৎসব বাঙালির জীবনে আর তো নেই। আমিও যেতাম, এমনকি কোভিড, করোনাভাইরাসের সময়েও প্রতিদিন ২/৩ বারও গেছি, এখন মিস করি।

আমরা যখন ছোট ছিলাম, আমাদের এলাকায় তখন গ্রামে শবে বরাতের সন্ধ্যায় সব ছেলে–মেয়েরা মিলে সবার বাড়িতে যেত খিচুড়ি, হালুয়া, বাতাসা খেতে। ঐদিন পড়াশোনা থেকে কিছুটা বিরতি নেওয়া যেত। খুবই আনন্দের উপলক্ষ ছিল সেটা। এরপর ধীরে ধীরে মাওলানারা প্রচার চালাতে শুরু করল – শবে বরাতের রাতে আনন্দ করা নিষেধ, সারারাত ধরে আল্লাহর ইবাদত–বন্দেগি করতে হবে; আল্লাহ ঐদিন নীচের আসমানে নেমে এসে বান্দার ডাক শোনেন, দূর থেকে আল্লাহ মানুষের কান্না শুনতে পান না। বলে রাখি, আল্লাহর চেহারা মানুষের মতো; ১৪০০ বছর আগে নবী মুহাম্মদ বা তার সঙ্গের আরবের মানুষেরা মানুষের চেয়ে শক্তিমান কিছুর কল্পনা করলেই মানুষের চেহারা ভেসে উঠত। আল্লাহর মানুষের মতো হাত–পা আছে, আল্লাহ আরশ নামের চেয়ারে পশ্চাৎ দিয়ে বসেও থাকেন। কবি নজরুল আবার “খোদার আসন আরশ ছেদিয়া…” বলে আল্লাহর আরশের নীচে শুল ঢুকিয়ে আল্লাহর পশ্চাৎদেশ ছিদ্র করে মাথা দিয়ে বের করতে চেয়েছিলেন। যাই হোক, কালক্রমে র‍্যাডিক্যাল ইসলামের দাপটে শবে বরাতের রাতে গ্রামের ছেলে–মেয়েদের আনন্দ করার উপলক্ষটা বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এমনকি শহরেও এখন সেই আনন্দ উপলক্ষের পদে পদে বাঁধা!

রোজার ঈদের আগের দিন গ্রামের মাঠে দলবেঁধে চাঁদ দেখতে যাওয়া ছিল একটা রীতি। দুই ঈদে সকালে উঠে গোসল করা, সেমাই খাওয়া, ঈদগাহে যাওয়া, সেখানে পাপড় কেনা, বাড়ি ফিরে জামাকাপড় খুলে যার যার দৈনন্দিন কাজে মনোযোগ দেওয়া – এই ছিল আমাদের শৈশবের ঈদ। সেটাকে ঠিক উৎসব বলা যায় না। রোজার ঈদে ভারত–বাংলাদেশ সীমান্তের নদীতে নৌকা বাইচ হতো। দুই পাড়ের মানুষই সেই আয়োজন করত। যারা একটু বড়, তারা সাইকেল চেপে দলবেঁধে ভারত সীমান্তে চলে যেত সেই নৌকা বাইচ দেখতে। এখন সম্ভবত সেটা হয় না। সবাই যখন বলে ঈদের আনন্দ—তখন ভাবি, ঈদের আনন্দ আসলে কী?

আমাদের কাছে সবচেয়ে বড় উৎসব ছিল পহেলা বৈশাখ। পহেলা বৈশাখের পরদিন (ভারতে যেদিন পহেলা বৈশাখ হয়) আমাদের পাশের গ্রামে উপজেলার সবচেয়ে বড় বৈশাখী মেলা হয়। ছোট থাকতে আমাদের এলাকার বাচ্চারা ঐদিনের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতাম। সারাবছর ধরে সবাই ১/২/৩/৪/৫/১০/২০ টাকা জমাত বৈশাখী মেলায় কোন খেলনা কিনবে বলে। গ্রামের কিছু মুরব্বিরা বলত – ওটা হিন্দুদের মেলা, ওখানে যাওয়ার দরকার নেই। যাওয়ার পথে একটা হিন্দুপাড়া আছে বটে, তারা প্রায় সবাই বৈশাখী মেলায় যায়, কিন্তু ঐ মেলার সঙ্গে হিন্দুদের ঠিক কী সম্পর্ক সেটা মাথায় আসত না। অবশ্য কেউ সেই বারণ শুনত না। এলাকার সব বিবাহিত মেয়ে–জামাই, তাদের বাচ্চারা চলে আসত শুধুমাত্র মেলায় অংশ নেওয়ার জন্য। ১/২/৩ বার যাওয়ার চেষ্টা করতাম সবাই। এমনকি ছোট থাকতে রোজার সময়েও সেই মেলা পুরো ফুটবল মাঠ ছাড়িয়ে পাশের এলাকায় বিস্তৃত হতো। ২০২১, ২২ সালে রোজার সময় দেখলাম কোনোমতে মাঠের এক কোণায় মেলা জমেছে। সবই এখন ধর্মের মোড়কে আবৃত। ইসলাম ধর্মের নির্দেশের বাইরে কেউ যায় না, পাছে জান্নাতি হুর মিস হয়ে যায়!

পাশের পাড়ায় দুর্গাপূজা হতো প্রায় প্রতি বছর। আমরা সেই পূজার মেলায় যেতাম। গ্রামের মা, ফুফু, চাচি, চাচারা রাতে দলবেঁধে আরতি দেখতে যেত। ঢোলের তালে তালে বামু্নের হাত নাড়ানো দেখে মনে হতো উনার হাতের দুলনিতেই বুঝি ঢোলের শব্দ আসছে। পূজার সময় দেখতাম এক সপ্তাহ ধরে হিন্দুরা এ গ্রামে সে গ্রামে বেড়াতে যেত দলবেঁধে, গ্রামের কাঁচা রাস্তা তখন থাকতো ভ্যানের দখলে। আমাদের কাছে সেগুলো ছিল একেবারেই কল্পনা। আমরা চৈত্র মাসে হিন্দু পাড়ায় যেতাম সন্ন্যাসী নাচ দেখতে। অনেক মুসলমান মায়েরাও দেখতাম সন্ন্যাসী না আসা পর্যন্ত আম খেত না – কেন খেত না ঠিক জানি না। তবে হিন্দু–মুসলমানদের সদ্ভাব ছিল বেশ; সবাই সবার বিয়েতে দাওয়াত পেত, দূর গ্রামে এর–ওর আত্মীয়ের বাড়িতে দেখা করতে যেত সবাই। ইসলামের নিয়মের বেড়া দিন দিন যত স্ট্রং হচ্ছে, ততই দূরত্ব বাড়ছে এখন – ইসলামে বিধর্মীদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করা, তাদের কল্যাণ কামনা করা, তাদেরকে সাহায্য করা একেবারেই নিষেধ। আপনি কখনো কোনো মোনাজাতে অন্য ধর্মের বিপন্ন মানুষদের নিয়ে কোনো কল্যাণ কামনা করতে দেখেছেন? দেখে থাকলে জানাবেন। আপনি তাদের হেদায়েত কামনা করতে পারেন, কিন্তু তাদের কল্যাণ কামনা করতে পারেন না – এটাই ইসলাম। আগে র‍্যাডিক্যাল ইসলামের চর্চা ছিল না বলে সম্প্রীতি বজায় থাকতো, এখন সেই সম্প্রীতি মোল্লারা বারো বাজাচ্ছে দিন দিন।

আগে দেখতাম ঈদের সময় সবাই বলত – ঈদ মোবারক। এখন বলে – তাকাব্বাল্লাহু মিন্না ওয়া মিনকুম। সাহাবিরা নাকি ঈদের দিন এটাই বলত। মুসলমানদের জীবনের প্রতি সেকেন্ডে আল্লাহ ও নবী মুহাম্মদকে তোয়াজ করতে পারলে সেটা হতো সবচেয়ে ভালো। আল্লাহ যে একমাত্র সৃষ্টিকর্তা, সে ছাড়া আর কোনো সৃষ্টিকর্তা নেই – সেটা বারবার আল্লাহকে মনে করিয়ে দেওয়ার চেয়ে পুণ্যের কাজ মুসলমানদের আর কিছু নেই, সেটা যেই সময়েই হোক। এখন সেজন্য ‘ঈদ মোবারক’ বলা নিষেধ। সালামের উচ্চারণও একেবারে আরবদের মতো নির্ভুল হতে হবে; আল্লাহ আপনার মনের ইচ্ছা বুঝবেন না, আপনার মুখের উচ্চারণ আরবিতে অন্য মানে বোঝালে আপনাকে নরকের আগুনে পুড়তে হবে!

ধর্মীয় বিধান মতে ইসলাম মূলত কালচারালি আইসোলেটেড। কট্টর ইসলামিস্ট যারা, এদের জীবনে আনন্দঘন মুহূর্ত খুব কমই আসে। ধর্মীয় ভাবেই এদের সঙ্গে আনন্দ–উৎসবের সম্পর্ক নাই। ধর্মীয়ভাবে মুসলমানরা যে দুটো দিন সেলিব্রেট করে তার একটি হলো রোজার ঈদ, আর একটি কুরবানির ঈদ। এই দুটোকে উৎসব বলা হলেও, উৎসব বলতে আমরা যা বুঝি, জানি তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। মুসলমানদের জন্য যে দুটো দিন নবী মুহাম্মদ ফিক্সড করে দিয়েছেন, সেটা মূলত ইবাদতের অনুষঙ্গ। ইদানীং কালে আহলে কুরআন নামের এক শ্রেণির বাটপাড়ের উদ্ভব হয়েছে, যারা কোরআনকে মান্য করে, হাদিস অস্বীকার করে। অথচ হাদিস অস্বীকার করলে রোজার ঈদ, কুরবানির ঈদ দুটোই ইনভ্যালিড হয়ে যায়। রোজা কিংবা কুরবানি দুটোই ইবাদতের অংশ, কোনোভাবেই উৎসব না। এই দুটো ইভেন্টে কেবল মুসলমানরাই অংশগ্রহণ করে। দূর্গাপুজায় যেমন রাস্তার একজন আগন্তুক মানুষ গিয়ে অংশ নিলেও কেউ জিজ্ঞেস করবে না সে কোন ধর্মের, সেখানে কেন গিয়েছে – ঈদের কোন অনুষ্ঠানে এমন করে অন্য ধর্মের কারো অংশ নেয়ার সুযোগ আছে?

কালচারালি আইসোলেটেড হওয়ার কারণে বড় অংশ মুসলমানরা এসব দিনে খাওয়া–দাওয়ার প্রতি ফোকাস করে, অথচ এই দুটো দিন কেবল ইবাদতের। ২৯/৩০ দিন রোজা রেখে, প্রতিদিন সেহরি ও ইফতারে কী খাবে এই নিয়ে তাদের চিন্তার অন্ত থাকে না। সেহেরি, ইফতার খাওয়া তাদের কাছে মূল বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। রোজা শেষ হলে পরের দিন ভোরে উঠে গিয়ে নামাজ পড়বেন; কুরবানির ঈদে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য, তাকওয়া প্রুফ করার জন্য পশু কুরবানি করবেন। কিন্তু এটা এখন হয়ে গেছে রেড মিট ফেস্টিভ্যাল; তাকওয়া, ইবাদতের ছিটেফোঁটা নাই।

এরা যে কালচারালি আইসোলেটেড, এটা এই উগ্র ইসলামিস্টরা নিজেরাও ভালো করে রিয়েলাইজ করে। এজন্য আশেপাশের মানুষের উৎসব, নাচ–গান, পানাহার, আনন্দ–হইহুল্লোড়ে এরা পেঁচার মতো মুখ করে থাকে। কোনো সময় এরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হলে এসব বন্ধ করে দেওয়ার স্বপ্ন দেখে, কিংবা বন্ধ হয়ে যাওয়ার অপেক্ষা করে। এদের টেনডেন্সি হলো – আমাদের নাই, বাকিদেরও থাকতে পারবে না। এতে আসলে এদের দোষ নাই। ঠিক এই কারণেই এরা পহেলা বৈশাখের বিরুদ্ধে সিন্ডিকেটেড প্রচারণা চালায়, পূজার উৎসবে কোন মুসলমান অংশ নিলে তাকে গালির বন্যায় ভাসিয়ে দেয়। তারা ভয় পায় – পূজার উৎসবে মেতে বাঙালি আবার তাদের না খয়রাত দেয়া বন্ধ করে দেয়, বাংলা সালের প্রসারে আবার তাদের অবৈজ্ঞানিক চাঁদের সঙ্গে মিলানো হিজরি সাল বাংলা থেকে ভ্যানিশ হয়ে যায়! বাঙালি কালচারে ঢুকে গিয়ে বাঙালি যদি আবার তার ইতিহাস–ঐতিহ্যের শিকড়ে ফিরে যায়, তখন ধান্দাবাজি করে চলা মোল্লাদের খাওয়া নাও জুটতে পারে। সেজন্য তারা অন্য অনেক কিছু নিয়ে নীরব থাকলেও পূজার উৎসব, পহেলা বৈশাখ নিয়ে একেবারে সিন্ডিকেটেড প্রচার চালায় এটাকে বিধর্মীদের উৎসব, বিদআত প্রমাণের জন্য। তাদের এই সিন্ডিকেটেড প্রচার কাজও করে, যার প্রমাণ পাবেন – ইয়ং জেনারেশনের একটা বড় অংশ এখন তাদের সুরে সুর মিলিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় সরব, আমাদের মতো মানুষদের গালি দেয়, হুমকি দেয়।

মানুষ সুপ্রাচীন কাল থেকেই উৎসব–পার্বণে সংবেদনশীল। সুরেলা কণ্ঠ, সুর, লয়, তাল – এসবের প্রতি মানুষের বিবর্তনীয় সংবেদনশীলতা লক্ষ্য করা যায়। বাঙালির কথাই ধরুন! ট্যাগলাইন হচ্ছে – “বারো মাসে তেরো পার্বণ।” অর্থাৎ বারো মাসে গুনে গুনে তেরোটা উৎসব। বাঙালির ভাটিয়ালি আছে, ভাওয়াইয়া আছে, জারি–সারি আছে, পুঁথিপাঠ আছে, যাত্রাপালা আছে, বাংলা নববর্ষ – পহেলা বৈশাখ, দূর্গাপূজা, বর্ষা উৎসব, নবান্ন উৎসব, পৌষ মেলা, বসন্তবরণ – পহেলা ফাল্গুন, নৌকা বাইচ, বাউল উৎসব, জাতীয় পিঠা উৎসব, বায়োস্কোপ, কনসার্ট, ঘুড়ি উৎসবসহ কত শত আনন্দ উদযাপনের উপলক্ষ আছে। কিন্তু অনেক বাঙালি সামহাউ মুসলমান হয়ে গেলে ধর্মীয়ভাবেই তার জন্য এসব বন্ধ। কারণ ইসলামে সাহিত্য, সংস্কৃতি, গান–বাজনা, খেলাধুলা – সবই নিষিদ্ধ। শুধু আপনি সেই সাহিত্য, সেই সংস্কৃতির জন্য অনুমোদিত যেখানে আল্লাহ ও নবী মুহাম্মদের বন্দনা করা হয়। শুধুমাত্র স্ত্রীর সঙ্গে খুনসুটি, ঘোড়া চালনা, তীর–ধনুক নিক্ষেপ প্রশিক্ষণ – এই তিন খেলা ইসলামে অনুমোদিত; আর কোনো খেলাই করা যাবে না। ইসলামে ছবি আঁকা, ছবি তোলা, ছবি ফেসবুকে দেওয়া, ভিডিও শেয়ার করা – সবই হারাম। ভিডিও কিন্তু অনেক স্টিল ছবির সমাহার।

অনেক শহুরে মডারেট মুসলমানরা বাকিদের সঙ্গে একাত্মতা পোষণের জন্য মিলাদুন্নবী, শবে বরাত ইত্যাদির প্রচলন করার চেষ্টা করলেও সেসব ব্যর্থ হয়েছে। তারা আতশবাজি ফুটিয়ে একটা উৎসব–উৎসব ভাইব আনার চেষ্টা করে, কিন্তু সেটা ফেল করেছে। কারণ এসবের ধর্মীয় ভিত্তি নেই; নবী মুহাম্মদ কখনো এসব উৎসব হিসেবে পালন করেননি। এসব দিনে হালুয়া–রুটি খেয়ে সুগার বাড়ানো ছাড়া অন্য কোনো সিগনিফিকেন্ট ভ্যালু নাই। নবী মুহাম্মদকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল তার জন্মদিন নিয়ে। তিনি বলেছিলেন – তিনি সোমবার জন্মগ্রহণ করেন, এবং সেজন্য সোমবার রোজা রাখেন – সেটা আবার ইবাদতের অনুষঙ্গ হয়ে গেল। কিন্তু এই তথাকথিত বাঙালি মডারেট মুসলমানরা রোজা বাদ দিয়ে নবীর জন্মদিনে কবজি ডুবিয়ে খেয়ে বেড়ায়।

মূলত বাঙালির সংস্কৃতির সঙ্গে গোঁড়া মুসলমানদের বিরোধ আছে। বাঙালি কখনো গোঁড়া মুসলমান হতে পারবে না, গোঁড়া মুসলমান কখনো তার ধর্মীয় বিধিনিষেধ বাদ দিয়ে বাঙালি হতে পারবে না। অন্যদিকে বাঙালি হিন্দুদের উৎসব দেখেন – দুর্গাপূজা, কালীপূজা, সরস্বতী পূজা, রথযাত্রা, দোলযাত্রা, জন্মাষ্টমী, কোজাগরী, লক্ষ্মীপূজা, ভাইফোঁটা – সহ আরও কত কী! সবগুলো ফ্লেক্সিবল। এগুলোতে আপনি ইনস্ট্যান্ট গিয়ে অ্যাটেন্ড করতে পারবেন, তাদের আনন্দে গিয়ে সামিল হতে পারবেন, আনন্দ ভাগাভাগি করতে পারবেন। ধর্ম মেনে চলা মুসলমানদের সেই সুযোগ নাই। কলকাতায় সাজ–সাজ রবে ক্রিসমাস পালন হয়, কোনো সমস্যা করে না কেউ; দুনিয়ার হিন্দু গিয়ে সেটায় আনন্দ করে। কিন্তু আপনি মুসলমান হয়ে একটা পোস্ট দিতে পারবেন না ক্রিসমাসে উইশ করে – আপনাকে গালির বন্যায় ভাসিয়ে দেওয়া হবে, কারণ ইসলামে এটা অনুমোদিতই না।

আগেই বলেছিলাম – বাঙালির সংস্কৃতির সঙ্গে ধার্মিক মুসলমানের বিরোধ আছে। এই বিরোধটা অ্যাকনলেজ করেই বলেই অনেক মুসলমানকে দেখবেন বলবে – “সে আগে মুসলমান, তারপর বাংলাদেশি।” কারণ সে জানে – বাঙালি মুসলমান বলতে কিছু হয় না। তার প্রথম এবং একমাত্র পরিচয় – সে মুসলমান। ঠিকঠাক পর্দা করে না, ধর্মীয়ভাবে এমন অর্ধ–উলঙ্গ আপ্পিদেরও দেখবেন প্রোফাইলে লিখে রাখে – “প্রাউড মুসলিম” বা “মুসলিম বাংলাদেশি।” কারণ সে এই বিরোধ সম্পর্কে অবগত। ঠিকঠাকভাবে আমল না করলেও তার ঈমান ঠিক আছে। আর ঈমান ঠিক থাকা মানে – সে একদিন জান্নাতে যাবে। অন্য ধর্মের মানুষ সারাজীবন ধরে ভালো কাজ করে বেড়ালেও জান্নাতে যাবে না, কারণ সে একদিনের জন্যও বলেনি – আল্লাহ সৃষ্টিকর্তা, তাঁর কোনো শরিক নাই, নবী মুহাম্মদ তাঁর প্রেরিত রাসুল! এই একটি বাক্যই দুনিয়ার শীর্ষ খুনি, গণহত্যাকারী, ধর্ষক কোনো মুসলমানকে একদিন জান্নাতে নিয়ে যাবে যেখানে আগে থেকেই আব্বাসী, আজহারি, সাঈদী, গোলাম আজম, নিজামী, আহমাদুল্লাহরা থাকবেন। অন্যদিকে মাদার তেরেসা, নিউটন বা যিনি জীবনে কোনোদিন মানুষের উপকার ছাড়া অপকার করেননি – তাদের জন্য থাকছে অনন্তকাল ধরে আগুনে পোড়ার বন্দোবস্ত।

প্রাক–ইসলামী যুগেও কাবার চারদিকে কবিদের কবিতার আসর বসত; সেরা সেরা কবিতাগুলো কাবার দেয়ালে টাঙিয়ে দেওয়া হতো; গায়িকা ছিল, আসমা বিনতে মারওয়ানের মতো মহিলা কবি ছিল। কিন্তু মুহাম্মদের নব্যুয়তের পর সব শেষ। উগ্র মুসলিমরা মাইনরদের নানাভাবে অপপ্রেসড করে – এটা মূলত কালচারাল আইসোলেশনের আউটকাম। কালচারালি গোঁড়া মুসলমান পঙ্গু; দুনিয়ার সঙ্গে সে সম্পর্কহীন; তার মেইন এইম হচ্ছে আখিরাত। সেজন্য দেখবেন নবী মুহাম্মদও কাবাঘরে সংরক্ষিত দেব–দেবীদের মূর্তি ভেঙেছেন; এখনো উগ্র মোল্লারা বলে – তারা মূর্তি গড়তে আসেনি, মূর্তি ভাঙতে এসেছে। প্রকাশ্যে বলে তারা এসব বাংলাদেশে, বড় সভায় আগত লক্ষ মানুষের সামনে। যার ফলশ্রুতিতে প্রতি বছর একাধিকবার হিন্দুদের প্রতিমা ভাঙচুর চলে, এ বছর যদিও ভাংচুর একটু কম হয়েছে। রক্তাক্ত শারদের মতো নৃশংসতার সাক্ষী হতে হয়েছে তাদের, এবার একটু নিস্কৃতি পেয়েছে।

ধর্ম–বর্ণ নির্বিশেষে নারী–পুরুষ–বাচ্চা–কাচ্চা বিভিন্ন উৎসব–পার্বণে হৈ–হুল্লোড়ে মেতে উঠেছে, আর ঠিক সেই সময়ে কোনো গোঁড়া মুসলমান এই আনন্দঘন মুহূর্ত বিরস বদনে জানালায় দাঁড়িয়ে দেখছে। এটা তার উপর মনস্তাত্ত্বিক প্রেসার ফেলে; নিজের ভেতর সে কুঁকড়ে যেতে থাকে। এজন্য সে ক্ষমতা পাওয়ার পর অন্যদের ইনভেড করে, অপপ্রেসড করে, অন্যদের উপর নিজের আধিপত্য বিস্তার করতে চায়। যার কারণে তারা দূর্গা পূজা, কনসার্ট, বাউল গানের আসর, পহেলা বৈশাখের মতো উৎসব সহ্য করতে পারে না। আমি এই নিয়ে সেই ২০১৩ সাল থেকেই লিখি, কিন্তু আমি জনপ্রিয় কেউ না বলে আমার লেখা কোথাও কোনো ইমপ্যাক্ট ফেলে না।

Related Posts

Islamist cyber‑based jihad activities

Why do Islamist cyber‑jihadis insult, threaten, and file false reports against people with different opinions?

Maulana Azhari once advised Islamists that sharing his Facebook posts is also an Islamic act;Read More

Islamist cyber‑based jihad activities

ইসলামের সাইবার জিহাদিরা কেন ভিন্নমতের মানুষকে গালি দেন, হুমকি দেন, মিথ্যা রিপোর্ট করেন?

মাওলানা আজহারি একবার ইসলামিস্টদের উপদেশ দিয়ে বলেছিলেন – তার ফেসবুক পোস্ট শেয়ার করাও ইসলামের কাজ;Read More

Palestine and Gaza merging with Israel, and all of Kashmir merging with India, would lead to greater humanitarian benefit

In modern politics, independence is often considered an almost inviolable value, where leaders aim toRead More

Comments are Closed