
No Azan on Loudspeakers
আজানের নামে ধারাবাজিক শব্দ সন্ত্রাস সভ্য সমাজ আর কতদিন মুখ বুঁজে মেনে নিবে?
এ বছরের মে মাসে দেখেছিলেন তো সাতক্ষীরাতে এক হিন্দু গণিতের শিক্ষক মিস্টার গৌরাঙ্গ সরকারকে নাজেহাল করে পুলিশে দিলো উন্মত্ত তৌহিদী জনতা। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল তিনি বলেছিলেন ভোর বেলা মাইকে খুব জোরে আজান বাজালে অনেকের ঘুমের সমস্যা হয়। উন্মত্ত তৌহিদী জনতা পুলিশকে বলছিল তাকে যেনো ইন্ডিয়া পাঠিয়ে দেয়া হয়। এগুলো খুবই পরিকল্পিত সামাজিক আক্রমন, এভাবে বার্তা দেয়া হয় – তোমরা এসব পেশায় এসো না, পারলে ইন্ডিয়া চলে যাও, এ দেশ তোমাদের না। বাংলাদেশে থেকে আজানের প্রক্রিয়ার সমালোচনা করে মাথা ধড়ে রাখা ভাগ্যের ব্যাপার বটে!
সোনু নিগম-বিতর্কঃ প্রতিবাদটি কি যৌক্তিক ছিল?
২০১৭ সালের এপ্রিলে ভারতের জনপ্রিয় গায়ক সোনু নিগম টুইট করে বলেছিলেন, তিনি মুসলিম নন, অথচ ভোরে আজানের শব্দে তাঁর ঘুম ভাঙতে হয়। প্রশ্ন তুলেছিলেন, এই “জোর করে ধার্মিকতা চাপানো” কবে শেষ হবে। এরপর তাঁর বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিক্রিয়া শুরু হয়। পশ্চিমবঙ্গের এক মৌলভী তাঁর মাথা ন্যাড়া করে জুতোর মালা পরালে ১০ লক্ষ রুপি পুরস্কারের ঘোষণা দেন (ঘটনাটি আমার স্মৃতি থেকে লেখা; চাইলে আপনি সংবাদসূত্রে মিলিয়ে নিতে পারেন)। সোনু শেষ পর্যন্ত নিজেই মাথা ন্যাড়া করেন।
ইসলামিস্টদের এই প্রতিবাদ যৌক্তিক ছিল না, তিনটি কারণে।
১. সোনু আজান নিষিদ্ধ করতে বলেননি। তাঁর আপত্তি ছিল লাউডস্পিকারের বিরুদ্ধে। আজান আর মাইক এক জিনিস নয়।
২. মৃত্যুদণ্ডের মতো হুমকি বা অপমানজনক পুরস্কার ঘোষণা যুক্তির জবাব নয়, ভীতি প্রদর্শন। ভিন্নমত আছে বলেই তো আলোচনা দরকার।
৩. তাঁর মূল প্রশ্নটি পরে আদালতেও উঠেছে। ভারতের এলাহাবাদ হাইকোর্ট ২০২০ সালে এই মর্মে রায় দিয়েছে বলে জানা যায় যে আজান ইসলামের অপরিহার্য অংশ হলেও লাউডস্পিকারে আজান অপরিহার্য নয়।
অর্থাৎ প্রশ্নটি ছিল নাগরিক অধিকার ও পরিবেশের, ধর্মবিদ্বেষের নয়। এই প্রশ্নই এখন বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আরও জরুরি, এমনকি আমেরিকা, ইউরোপের মতো দেশেও যেখানে ইসলাম মসজিদে লাউড স্পিকারে আজান দেয়ার সুযোগ করে নিয়েছে।
তুলনামূলক চিত্রঃ কোন ধর্মীয় আহ্বান কতটা সময় ও শব্দ নেয়
নিচের সারণিটি সাধারণ ধারণা ও পর্যবেক্ষণভিত্তিক আনুমানিক চিত্র। বাংলাদেশে বিভিন্ন ধর্মের আহ্বানের শব্দমাত্রা তুলনা করে কোনো নিরপেক্ষ, পদ্ধতিগত জরিপ আমি খুঁজে পাইনি। তাই সংখ্যাগুলো প্রবণতা বোঝানোর জন্য, নির্ভুল পরিমাপ হিসেবে নয়।
| প্রথা | সাধারণ দৈর্ঘ্য | দিনে কতবার | সাধারণ বিস্তার |
|---|---|---|---|
| আজান (ইসলাম) | প্রায় ২–৩ মিনিট (ফজরে সামান্য বেশি) | ৫ বার, ভোর থেকে রাত | অধিকাংশ ক্ষেত্রে মাইকে, বহু মসজিদে একসাথে বা একটু পরে পরে |
| শাঁখ (সনাতন) | প্রায় ১ মিনিটের কাছাকাছি | সাধারণত সন্ধ্যায় ১ বার | মূলত ঘরোয়া/মন্দির-সংলগ্ন, মাইক ছাড়া |
| মন্দিরের ঘণ্টা/আরতি | কয়েক মিনিট | দিনে ১–২ বার | স্থানীয়; তবে কীর্তন-পূজায় মাইকের ব্যবহারও আছে |
| গির্জার ঘণ্টা (খ্রিস্টান) | কয়েক মিনিট | মূলত রবিবার ও বিশেষ দিনে | সীমিত, কম গির্জা |
| বৌদ্ধ বিহারের ঘণ্টা/গং | অল্প সময় | ভোরে/সন্ধ্যায় | খুবই স্থানীয় |
| ইহুদি | বাংলাদেশে প্রকাশ্য আহ্বানের প্রচলন নেই | — | ঐতিহ্যগতভাবে প্রকাশ্য মাইক-আহ্বান নেই |
এখানে সবচেয়ে বড় পার্থক্য সময়ের নয়, মাত্রা ও ঘনত্বের। একটি শাঁখ বা ঘণ্টার শব্দ একটি পাড়ার ভেতরেই মিলিয়ে যায়। বাংলাদেশের জনসংখ্যার প্রায় ৯১ শতাংশ মুসলিম, আর মসজিদের সংখ্যা সাধারণত প্রায় তিন লক্ষ বলে উল্লেখ করা হয় (আনুমানিক)। দেশের আয়তন ১.৪৭ লক্ষ বর্গকিলোমিটারের মতো, তাই গড়ে প্রতি বর্গকিলোমিটারে প্রায় ২টি মসজিদ পড়ে। শহরে, বিশেষ করে ঢাকায়, এই ঘনত্ব বহুগুণ বেশি। ফলে একটি মসজিদের ২–৩ মিনিট নয়, কয়েক মিনিট ধরে একের পর এক ভিন্ন ভিন্ন মসজিদ থেকে ওভারল্যাপ হওয়া আজান কানে আসে। কিছু মসজিদে আজানের আগে কোরআন তেলাওয়াত বা ঘোষণাও মাইকে চলে, যা মোট সময় আরও বাড়ায়।
শব্দদূষণঃ আইন কী বলে, বাস্তবতা কী
বাংলাদেশের শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা, ২০০৬ অনুযায়ী নীরব এলাকায় দিনে ৫০ ডেসিবেল ও রাতে ৪০ ডেসিবেল পর্যন্ত অনুমোদিত। মসজিদ, হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে সংবেদনশীল এলাকা হিসেবে ধরা হয়। অথচ বাস্তবতা হলো, ঢাকার ক্ষেত্রে একটি গবেষণায় ৭০টি এলাকার প্রতিটিতেই শব্দ অনুমোদিত মাত্রার চেয়ে বেশি পাওয়া গেছে। স্ট্যামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় দেখা গেছে, পর্যবেক্ষিত স্থানগুলোর ৮২ শতাংশে শব্দ ধারাবাহিকভাবে ৬০ ডেসিবেল ছাড়িয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের মতে ঢাকার শব্দমাত্রা গ্রহণযোগ্য সীমার দ্বিগুণেরও বেশি। agonising noise pollution poses serious health risk in dhaka study 1611497231 +3
এখানে একটি স্পষ্ট কথা বলা দরকারঃ ঢাকার শব্দদূষণের সিংহভাগ আসে যানবাহনের হর্ন থেকে, আজান থেকে নয়। কিন্তু কর্তৃপক্ষ নিজেই স্বীকার করেছে যে সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানের অনিয়ন্ত্রিত লাউডস্পিকারও পরিস্থিতি খারাপ করছে। আজানের বিশেষত্ব হলো, এটি দিনের সবচেয়ে সংবেদনশীল সময়ে, অর্থাৎ ভোরের ঘুমের সময়, রাতের ঘুমের আগে এবং দুপুরের বিশ্রামের সময়ে আসে যা সাধারন মানুষের জন্য অধিক ভোগান্তি ও বিরক্তির। বিশেষ করে শিশু, রোগী, বয়স্ক, গর্ভবতী নারীদের জন্য তা বিভিষীকা নিয়ে আসতে পারে। যাদের বাড়ি মসজিদের মাইকের লাগোয়া, তাদের কোয়ালিটি লাইফ হেল হয়ে যাওয়ার কথা। thedailystar
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশিকা অনুযায়ী ঘুমের সময় বাইরের শব্দ ৪০ ডেসিবেলের মধ্যে থাকা বাঞ্ছনীয়। নিকটবর্তী মসজিদের স্পিকার থেকে ভোরে যে শব্দ আসে তা এই সীমার অনেক ওপরে যেতে পারে, যদিও আমি নির্দিষ্ট কোনো মসজিদের মাপা সংখ্যা নিশ্চিতভাবে দিতে পারছি না।
মোবাইল, ঘড়ি, অ্যালার্মঃ মাইকের আজান কি এখনো দরকার?
সমালোচকদের মূল যুক্তি হলো, আজানের প্রচলিত উদ্দেশ্য ছিল সময়সচেতনতা। নবী মুহাম্মদের যুগে ঘড়ি, মোবাইল বা মাইক কিছুই ছিল না। আজ একজন মুসল্লি স্মার্টফোনের অ্যাপে নামাজের সঠিক সময়, আজানের নোটিফিকেশন, কিবলার দিক সবকিছু পান। ইসলামিক ফাউন্ডেশন ও বিভিন্ন সংস্থা প্রতিদিনের সময়সূচি প্রকাশ করে। মসজিদের ভেতরে মাইক ছাড়া আজান দিলে কাছের মুসল্লিরা শুনতে পান। যাঁরা দূরে, তাঁদের জন্য অ্যাপ বা ঘড়ি আছে।
আরও যুক্তি, ধর্মীয় আহ্বান সবার জন্য বাধ্যতামূলক শ্রবণ হতে পারে না। যে ব্যক্তি নামাজ পড়েন না, তিনি যেমন কোনো ধর্মীয় বার্তা শুনতে বাধ্য নন, তেমনি যিনি অন্য ধর্মের বা নাস্তিক, তাঁর ঘুম নষ্ট হওয়ার অধিকার থাকা উচিত নয়। সমালোচকরা এটিকে মত ও বিশ্বাসের স্বাধীনতার সঙ্গে সম্পর্কিত বলে মনে করেন, কারণ বিশ্বাসের স্বাধীনতার মধ্যে “কোনো বিশ্বাস না শোনার স্বাধীনতা”-ও পড়ে।
কাদের ওপর কী প্রভাব পড়ে
শিশুঃ শিশুদের ঘুম ও মনোযোগ শব্দের প্রতি বেশি সংবেদনশীল। গবেষণায় বারবার দেখা গেছে, দীর্ঘস্থায়ী শব্দের সংস্পর্শে থাকা শিশুদের পড়ার দক্ষতা ও মনোযোগ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ভোরে ঘুম ভাঙলে শিশুর পরের দিনের মনোযোগ ও মেজাজে প্রভাব পড়া স্বাভাবিক।
বৃদ্ধ ও অসুস্থ মানুষঃ বয়স্কদের ঘুম এমনিতেই হালকা। হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ বা মানসিক সমস্যায় আক্রান্তদের ক্ষেত্রে হঠাৎ উচ্চ শব্দ উদ্বেগ ও রক্তচাপ বাড়াতে পারে। হাসপাতালের পাশের মসজিদগুলোর ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও স্পর্শকাতর।
পরীক্ষার্থীঃ এসএসসি-এইচএসসি বা বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষার সময়ে ভোরবেলা ও সন্ধ্যায় পড়াশোনার সময় সবচেয়ে মূল্যবান। যে সময়টি আজানে ভরে যায়, তা ঠিক সেই সময়। প্রতিবেদনে ঢাকার একজন বাসিন্দা জানিয়েছেন, তার বাসার পাশের মসজিদে মাসব্যাপী মাহফিল চলে এবং রাতে পড়াশোনা করাই কঠিন হয়ে পড়ে। thedailystar
সাধারণ মানুষঃ শব্দদূষণ দীর্ঘমেয়াদে ঘুমের সমস্যা, ক্লান্তি, উদ্বেগ ও মনোযোগ কমে যাওয়ার সঙ্গে জড়িত। দীর্ঘ সময় উচ্চ শব্দের সংস্পর্শে এলে জ্ঞানীয় ক্ষমতা কমে এবং ঘুমের ব্যাঘাত ও দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি দেখা দেয়। thedailystar
পশ্চিমে বিতর্কঃ মিশিগান ও নিউ ইয়র্ক
যুক্তরাষ্ট্রে এই বিতর্ক নতুন নয়। ১৯৮০-র দশকের শুরুতে মিশিগানের ডিয়ারবর্নের একটি মসজিদ আদালতের আদেশে লাউডস্পিকারে আজান দেওয়ার অনুমতি পায়, প্রতিবেশীদের আপত্তি অগ্রাহ্য করে। এটিই ছিল আমেরিকার প্রথম এমন মসজিদ। ২০২৩ সালে নিউ ইয়র্ক সিটি ঘোষণা করে, শুক্রবার এবং রমজানে সূর্যাস্তের সময় মসজিদগুলোকে আজান সম্প্রচারের জন্য আর বিশেষ অনুমতি নিতে হবে না। পুলিশ জানিয়েছে, শব্দমাত্রা যেন যথাযথ থাকে সেদিকে নজর রাখা হবে। Wikipediaabc17news
এই সিদ্ধান্তের পর বিরোধিতাও বেড়েছে। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে ইন্ডিয়ানার লেফটেন্যান্ট গভর্নর মাইকে দিনে পাঁচবার আজান নিষিদ্ধ করার আহ্বান জানান। এখানে একটি সতর্কতা দরকার। এই বিরোধিতার একটি অংশ শব্দ ও আইনের প্রশ্ন, কিন্তু একটি অংশ এটিকে ইসলামবিদ্বেষ মনে করেন, যা তাদের সাধারন ভাষা। তবে যারা শুধু শব্দ-নিয়ন্ত্রণ চান আর যারা মুসলমানদের উপস্থিতিতেই আপত্তি করেন, তাঁদের এক করে দেখা ঠিক নয়। উল্লেখযোগ্য যে নিউ ইয়র্কে অনুমোদিত সময় সীমিত, বাংলাদেশের মতো প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নয়। redstate
শেষের কথা
সোনু নিগমের ঘটনা থেকে যে শিক্ষা পাওয়া যায় তা হলো, শব্দ নিয়ে প্রশ্ন তোলা আর ধর্মের বিরোধিতা করা এক নয়। তাঁকে হুমকি দেওয়া ছিল যুক্তির জবাবে ভয়ের ব্যবহার, যা কোনো সভ্য সমাজে গ্রহণযোগ্য নয়।
আবার বাংলাদেশে বিষয়টি শুধু আজান-বিরোধী বা আজান-পক্ষ হওয়ার প্রশ্ন নয়। প্রশ্ন হলো, আমাদের নিজস্ব আইন (৫০/৪০ ডেসিবেল) কেন সব ক্ষেত্রে কার্যকর হয় না, এবং একটি ঘনবসতিপূর্ণ দেশে কীভাবে ধর্মীয় স্বাধীনতা ও ঘুমের, পড়ার, সুস্থ থাকার অধিকারের মধ্যে ভারসাম্য আনা যায়। সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ সম্ভবত মাঝামাঝিঃ ডেসিবেল-সীমাসহ নিয়ন্ত্রিত মাইক, হাসপাতাল ও স্কুলের আশেপাশে কড়াকড়ি, এবং সব ধর্ম ও সব ধরনের শব্দের জন্য একই নিয়ম। আইন মানে আইন, যা সবাইকে মেনে চলতে হবে, অনুভূতির দোহাই দিয়ে পিছিয়ে থাকা আর কত?
Related Posts

How long will a civilized society continue to silently tolerate this serial noise‑terrorism in the name of Azan?
In May of this year you saw how in Satkhira a Hindu mathematics teacher, Mr.Read More

Spiritual powers, occult rituals, black magic, Satan worship, jinn‑ghosts, ruqyah – Islam’s box of superstitions
At that time I was in class seven, the school was closed for a fewRead More

আধ্যাত্মিক শক্তি, তন্ত্র-মন্ত্র, কালো জাদু, শয়তানের পুজা, জিন-ভূত, রুকাইয়া – ইসলামের কুসংস্কারের ডিব্বা
তখন আমি ক্লাস সেভেনে পড়ি, গ্রীষ্মের ছুটিতে কিছুদিন স্কুল বন্ধ ছিল। জয়পুরহাটের কালাইয়ের এক প্রত্যন্তRead More

Comments are Closed