
Story
সবই আল্লাপাকের দান …
বাঙালি ঘরে কনে দেখার দিনটিও যেন এক অলিখিত নাট্যমঞ্চ – যেখানে প্রতিটি সংলাপ, প্রতিটি অঙ্গভঙ্গি আগে থেকেই নির্ধারিত, তবু প্রতিবার নতুন করে অভিনীত হয় সেই পুরনো নাটক। ভোর থেকেই উঠোনে সাজ সাজ রব; ঘরের ভেতর মেয়েরা ব্যস্ত মিষ্টির থালা সাজাতে, শরবতের গ্লাসে বরফ কুচি ফেলতে, আর প্রবীণারা ব্যস্ত নিজেদের মধ্যে ফিসফিসিয়ে পাত্রপক্ষের বংশ-পরিচয়, দ্বীনদারি আর সামাজিক অবস্থান যাচাই করতে। কনেকে সাজানো হয় যেন সে কোনো জীবন্ত প্রতিমা – তার নিজস্ব ইচ্ছার চেয়ে পরিবারের সম্মান আর সমাজের দৃষ্টিই যেন সেখানে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
রোডের কাঁচা ধুলো উড়িয়ে একটা চকচকে লাল গাড়ি এসে থামল উঠোনে। কনে দেখার সেই চিরায়ত সামাজিকতা অনুযায়ী আজ অঙ্কিতাকে সাজানো হয়েছিল মেরুন রঙের শাড়িতে, মাথায় সযত্নে বসানো ওড়না, কপালে কোনো টিপ নেই, হাতে শুধু মেহেদির হালকা আঁচড়। পাত্রপক্ষের আসার পর সালাম বিনিময়, শরবত-মিষ্টি দিয়ে আপ্যায়ন, বৈঠকখানায় প্রবীণদের কুশল বিনিময়, ট্রে হাতে নতমুখে অঙ্কিতার ঘরে প্রবেশ, আর অনুরোধে একটি ছোট্ট দোয়া কিংবা কুরআনের আয়াত তেলাওয়াতের ফরমায়িশ – সব পর্বই শেষ হলো যথারীতি ধুমধাম আর জড়তা মিশ্রিত এক অস্বস্তিকর আনুষ্ঠানিকতায়।
পাত্রপক্ষ বিদায় নিলো। পাত্রের চকচকে গাড়ির ওপর গ্রামের কাঁচা রাস্তার আস্তরণ জমা দেখে ছোট ভাই বলে উঠল –
ছোট ভাইঃ আপু, পাত্রের যা গাড়ি না! একদম আয়নার মতো চকচকে ছিল, অথচ দ্যাখ, গ্রামের ধুলোয় বেচারার গাড়িটা একেবারে ধূসর হয়ে গেছে। মনে হচ্ছে যেন কালো আস্তরন জড়িয়ে ধরেছে ওটাকে।
অঙ্কিতাঃ (মুচকি হেসে, তবে চোখে এক অদ্ভুত গভীরতা নিয়ে) গাড়ি ধুয়ে ফেলা যায় রে, একটুখানি পানি আর কাপড় হলেই চলে। কিন্তু মনের গায়ে যে ধুলো একবার জমে, সেটা মোছা বড় কঠিন কাজ। চল, ভেতরে আয়, রাত হয়ে যাচ্ছে।
পরদিন সকালে, ভোরের আলো ফোটার তিন ঘন্টা পর, অঙ্কিতার মোবাইলে হঠাৎ একটি মেসেজের টুং শব্দ বেজে উঠল – ‘৫০০ টাকা রিচার্জ সফল হয়েছে।’ অঙ্কিতা তখনও ঘুমে, অনেকদিন পর বাবা-মায়ের কাছে ফিরে একটু বিশ্রাম নেয়ার সুযোগ মিলেছে। সে প্রথমে কিছু বুঝতেই পারল না, চোখ কচলে বার্তাটা আবার পড়ল। ব্যালান্স চেক করলো, আসলেই ৫০০ টাকা যোগ হয়েছে। কেউ হয়তো ভুল করে টাকা পাঠিয়েছে, ভাবল সে। কিছুক্ষণ পরই একটি অপরিচিত নম্বর থেকে ফোন এল – রিংটোনের শব্দটা যেন এক অচেনা উৎকণ্ঠা নিয়ে ঘরের নিস্তব্ধতা ভেঙে দিল।
ফয়সালঃ (ফোনে অস্বাভাবিক রকম নিচু ও রহস্যময় গলায়) আসসালামু আলাইকুম… শুনছেন?
অঙ্কিতাঃ (একটু সতর্ক হয়ে) ওয়ালাইকুম আসসালাম। কে বলছেন?
ফয়সালঃ আমাকে আপনি চিনবেন না, আপনার কাছে কি একটা মেসেজ এসেছে? পাঁচশো টাকার একটা ব্যাপার নিয়ে বলছি।
অঙ্কিতাঃ (একটু সতর্ক হয়ে) হ্যাঁ, একটা রিচার্জের মেসেজ এসেছে বটে। কিন্তু আপনি কে বলছেন, আর আপনি কীভাবে জানলেন যে আমার কাছে ওই মেসেজ এসেছে?
ফয়সালঃ (কণ্ঠে এক অদ্ভুত হাসির আভাস, কিন্তু কথাগুলো এড়িয়ে যাওয়ার মতো) সে কথা পরে বলছি। আগে বলুন তো, টাকাটা পেয়ে আপনার প্রথম কী মনে হয়েছিল? অনেকে তো স্বীকার করে না, আপনি স্বীকার করলেন।
অঙ্কিতাঃ (কিছুটা অবাক হয়ে) কী অদ্ভুত প্রশ্ন! স্বীকার না করার কী আছে? যে টাকার মালিক আমি নই, সেটা দাবী করার মতো আমি না। অন্যরা কেমন সেটা আমি বলতে পারবো না। আমি তো ভাবছিলাম হয়তো কারো ভুল হয়েছে, আমি ওটা ফেরৎ দিয়ে দিবো। কিন্তু এভাবে অচেনা একজন মানুষ ফোন করে এসব জিজ্ঞেস করছে কেন, সেটাই তো বুঝতে পারছি না, টাকাটা কি আপনার?
ফয়সালঃ মানুষ যখন হঠাৎ অপ্রত্যাশিত কিছু পায়, তখনই তার আসল রূপটা বেরিয়ে আসে, অঙ্কিতা। কেউ কেউ লুকিয়ে ফেলে, কেউ কেউ ফিরিয়ে দেওয়ার কথা ভাবে, আবার কেউ কেউ… থাক, সেসব কথা এখন বলার সময় নয়।
অঙ্কিতাঃ (নামটা শুনে চমকে উঠে) আপনি আমার নাম জানলেন কীভাবে? আমি তো নিজের নাম বলিনি!
ফয়সালঃ (এড়িয়ে গিয়ে) সবকিছুর উত্তর এক নিঃশ্বাসে পাওয়া যায় না। কিছু জিনিস সময় হলেই স্পষ্ট হয়। আপাতত এইটুকু জেনে রাখুন – আপনার প্রতিটি সিদ্ধান্ত এই মুহূর্তে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ আপনার সততা।
অঙ্কিতাঃ (গলায় স্পষ্ট বিরক্তি ও দুশ্চিন্তার মিশেল) আপনি ঠিক কী বলতে চাইছেন, স্পষ্ট করে বলুন তো! এভাবে ধাঁধার মতো কথা বললে আমি কিছুই বুঝতে পারছি না, আর সত্যি বলতে একটু ভয়ও পাচ্ছি।
ফয়সালঃ (হঠাৎ স্বর পাল্টে, প্রায় স্বাভাবিক সুরে, তবু হাসির রেশ রয়ে গেল) আচ্ছা আচ্ছা, ভয় পাবেন না। আসল কথাটা বলি তাহলে। দোকানদার ভুল করে আপনার নম্বরে ফ্ল্যাক্সিলোডের ৫০০ টাকা পাঠিয়ে দিয়েছে। টাকাটা কি একটু ফেরত দেওয়া যাবে?
অঙ্কিতাঃ (স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে, তবু মনে খচখচানি রয়েই গেল) ওহ্, তাই বলুন! আমি তো ভাবছিলাম হঠাৎ কে এত টাকা পাঠাল, আর তার ওপর আপনার কথাবার্তা শুনে তো আমার গা ছমছম করছিল। যাক, আমি তো একবারে এত টাকা লোড করি না নিজের জন্য। অবশ্যই ফেরত দেব, কিন্তু কীভাবে দেব বলুন তো? বিকাশ করে দেব?
ফয়সালঃ বিকাশ হলে তো খুবই ভালো হয়। তবে… আপনার তো অসুবিধা হচ্ছে না? গ্রামে তো চাইলেই বিকাশের দোকান পাবেন না।
অঙ্কিতাঃ (একটু হেসে, তবে কণ্ঠে দৃঢ়তা) না না, অসুবিধা কেন হবে? আপনার নম্বরটাই কি বিকাশ করা?
ফয়সালঃ (হঠাৎ প্রাণখোলা হাসিতে ফেটে পড়ে) আর কষ্ট করতে হবে না অঙ্কিতা! আসল কথা বলি তাহলে – আমি আসলে কাল আপনাকে দেখতে যাওয়া পাত্র, ফয়সাল। ওই যে লাল গাড়িটা দেখেছিলেন, ওটাতেই ছিলাম আমি।
অঙ্কিতাঃ (স্তম্ভিত হয়ে, প্রথমে কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে গেল) আপনি! তাহলে এতক্ষণ ধরে এই যে রহস্যময় কথাবার্তা বলছিলেন, ভয় দেখাচ্ছিলেন প্রায়, তার মানে কী? এভাবে অন্য পরিচয়ে ফোন করে ভুল করে টাকা পাঠানোর নাটক সাজানোর মানেটা কী?
ফয়সালঃ পরীক্ষা করছিলাম! বুঝতেই তো পারছেন, আজকাল চারপাশের দুনিয়াটা কেমন। চেনা নেই জানা নেই, মানুষ অমনি ৫০০-১০০০ টাকা হজম করে ফেলে, একটা কথাও বলে না। আমি দেখতে চাইছিলাম আমার হবু বউ লোভী নাকি সৎ, আর সেই সঙ্গে এটাও দেখছিলাম যে চাপের মুখে আপনি কতটা স্থির থাকতে পারেন। আপনার সততা আর সাহস দুটোই দেখে সত্যি মুগ্ধ হলাম!
অঙ্কিতাঃ (হালকা বিরক্তি চেপে রেখে, কিন্তু কণ্ঠে শীতল তীক্ষ্ণতা) বাহ্, কাল পাত্রী দেখতে এলেন, দেখলেন, আর আজ আমাকেই উল্টো সততা আর সাহসের পরীক্ষায় ফেলে দিলেন, এটা তো উল্টো হওয়ার কথা ছিল! তা এই ‘পরীক্ষা’ নেওয়ার এমন নাটকীয় বুদ্ধিটা কি আপনার নিজের মাথা থেকে বেরিয়েছে, নাকি আপনার পরিবারের সবাই মিলে ছক কষে তৈরি করেছেন?
ফয়সালঃ আরে রাগ করছেন কেন এত? বাস্তববাদী হতে হয় অঙ্কিতা, স্বপ্নের ঘোরে বাঁচলে সংসার চলে না। সংসার চালাতে গেলে বিশ্বাস থাকা দরকার, আর বিশ্বাসটা যাচাই না করে গড়ে তোলা যায় না।
অঙ্কিতাঃ তা ঠিক আছে। যাক, এখন বলুন তো, টাকাটা কীভাবে ফেরত দিলে আপনার সুবিধা হবে? আজই পাঠিয়ে দিচ্ছি, এভাবে অন্যের টাকা নিজের কাছে রাখতে আমার ভালো লাগছে না।
ফয়সালঃ (একটু ইতস্তত করে) আরে থাক না, এত তাড়া কীসের! আপনার কাছে থাকা আর আমার কাছে থাকা একই কথা।
অঙ্কিতাঃ (মনে মনে একটু অবাক হয়ে, তবে মুখে স্বাভাবিক থেকে) আচ্ছা, আমি আজইা পাঠিয়ে দিচ্ছি, একটু সময় লাগবে, এই যা। যাক, এই ফাঁকে একটা কথা জিজ্ঞেস করি? বাবা বলছিলেন আপনার নাকি নিজের গাড়ি আছে, আর ঢাকার প্রজেক্টে তিন বিঘার ওপর তৈরি একটা ফ্ল্যাটও আছে। আমাকে নাকি ৩০ ভরি গহনা দিবেন শুনলাম। সরকারি একজন অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার এত অল্প বয়সে এসব সম্পত্তি বানানো তো চাট্টিখানি কথা নয়। আপনি নিশ্চয় খুব করিৎকর্মা?
ফয়সালঃ (কণ্ঠে সামান্য দ্বিধা, কথাটা যেন এড়িয়ে যেতে চাইছে) ও নিয়ে… থাক না অঙ্কিতা, এসব কথা ফোনে বলার মতো না। পরে সামনাসামনি কথা হবে। সবই আল্লাপাকের ইচ্ছা।
অঙ্কিতাঃ (হালকা চাপ দিয়ে, তবু বিনয়ী স্বরে) না না, আমি তো এমনি জিজ্ঞেস করলাম, খারাপ কিছু ভাবার জন্য না। আপনি নিশ্চয়ই খুব পরিশ্রমী মানুষ, তাই একটু জানতে ইচ্ছে হলো।
ফয়সালঃ (একটু থেমে, তারপর গম্ভীর সুরে) দেখুন অঙ্কিতা, রিজিকের ব্যাপারে বেশি প্রশ্ন করা ঠিক না। যা কিছু আছে, সবই আল্লাহপাকের দান। তাঁর ইচ্ছা ছাড়া তো একটা পাতাও নড়ে না, তাহলে এত সম্পদ কি এমনি এমনি হয়ে যায়? সব তাঁরই রহমত।
অঙ্কিতাঃ (কিছুটা থমকে গিয়ে, তবু নরম গলায়) আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহর রহমত তো অবশ্যই সবকিছুর ওপরে। কিন্তু আল্লাহ তো বান্দাকে হালাল পথেই রিজিক দেন, তাই না? তাহলে আপনার কাজের ক্ষেত্রে ঠিক কোন পথে এত বরকত এলো, সেটা তো একটু বুঝিয়ে বললে ভালো হতো।
ফয়সালঃ (একটু হেসে, কথা ঘুরিয়ে) আরে, এত হিসেব করে কী হবে বলুন তো! আমার যা হয়েছে, হবে সবই তো আপনার থাকবে। আমার যে এসব হয়েছে, আপনার হবে – সেটাকেও তো আল্লাহর একটা নিয়ামত বলাই যায়, তাই না? বোঝেনই তো যেখানে জব করি – সেখানে সবাই …
অঙ্কিতাঃ (মনে মনে খটকা লাগলেও মুখে স্বাভাবিক রেখে) হুম, বুঝলাম। তা ঠিকাদার বা অন্য কেউ কি প্রায়ই খুশি হয়ে কিছু দিয়ে যায়?
ফয়সালঃ (হালকা গর্বের সুরে, তবু সতর্ক) মাঝেমধ্যে দেয় বৈকি! আমি তো আর কারো কাছে হাত পাতি না, মানুষ নিজে থেকেই খুশি হয়ে সম্মান জানায়। এখন এসব নিয়ে বেশি কথা বলার দরকার নেই, আল্লাহ যা দিয়েছেন তা নিয়ে শুকরিয়া করাই তো ঈমানদারের কাজ। আপনি এলে তো একেবারে রাজরানীর মতো থাকবেন, কোনো অভাব-অভিযোগ থাকবে না জীবনে ইনশাআল্লাহ।
অঙ্কিতাঃ (গলা ধীরে ধীরে গম্ভীর হয়ে গেল, মনে মনে একটা অস্বস্তির ছায়া জমতে শুরু করল) আচ্ছা, বুঝলাম। আজ তাহলে রাখি, আমি বিকাশের দোকানের দিকে যাচ্ছি, টাকাটা এক্ষুনি পাঠিয়ে দিচ্ছি।
ফয়সালের শেষ কথা না শুনেই অঙ্কিতা ফোনটা রেখে দিল। পরে ফয়সাল কয়েকবার কল দিলেও অঙ্কিতা আর রিসিভ করেনি। তার মনটা কিছুতেই শান্ত হচ্ছিল না। প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া, রিজিকের নাম করে কথা ঘুরিয়ে দেওয়া, ‘মানুষ খুশি হয়ে দেয়’ বলে আসলে কী বোঝাতে চাইলেন তিনি – এই সব প্রশ্ন অঙ্কিতার মাথায় ঘুরপাক খেতে লাগল। বিকাশে টাকা পাঠানোর সময় তার হাত কাঁপছিল, তবে টাকার জন্য নয়, একটা অজানা অস্বস্তির জন্য।
সেদিন বিকেলে প্রতিবেশী এক খালা এসে গল্পচ্ছলে বলে গেলেন, ফয়সাল সাহেবের অফিসে নাকি ফাইল তাড়াতাড়ি সই করানোর জন্য মানুষজন রীতিমতো লাইন ধরে, আর তার হাতে টাকা না দিলে ফাইল নাকি মাসের পর মাস আটকে থাকে। কথাটা শুনে অঙ্কিতার বুকের ভেতর একটা শীতল স্রোত বয়ে গেল। ফয়সালের সেই এড়িয়ে যাওয়া উত্তর, রিজিকের নাম করে কথা ঘোরানো, আর এই প্রতিবেশীর কথা – সব মিলিয়ে একটা স্পষ্ট ছবি ফুটে উঠতে লাগল তার চোখের সামনে। কেউ তাকে সরাসরি কিছু বলেনি, কিন্তু নীরবতা আর এড়িয়ে যাওয়ার মধ্যেই যেন লুকিয়ে ছিল আসল সত্যিটা।
রাতে খাবার টেবিলে বাবা যখন খুশি মনে বললেন সামনের সপ্তাহেই আকদের কথা এগিয়ে রাখা হবে, অঙ্কিতা আর চুপ করে থাকতে পারল না।
অঙ্কিতাঃ আব্বা, আমার মনে হয় এই বিয়েটা নিয়ে আরেকটু ভাবা দরকার।
আব্বাঃ (অবাক হয়ে) কেন মা? ছেলে তো সরকারি চাকরি করে, নিজের গাড়ি-বাড়ি আছে। এমন সম্বন্ধ তো হাতছাড়া করার মতো না!
অঙ্কিতাঃ আব্বা, আমি ফোনে যখন ওনার সঙ্গে কথা বলছিলাম, উনি নিজের সম্পদের কথা জিজ্ঞেস করলে সরাসরি কোনো উত্তর দেননি। শুধু বলেছেন সব আল্লাহর দান, রিজিকের ব্যাপারে বেশি প্রশ্ন করা ঠিক না। আর বলেছেন, মানুষ খুশি হয়ে যা দেয়, সেটা ফেরানো নাকি বেয়াদবি। এসব শুনে আমার কেমন যেন খটকা লাগছে।
মাঃ (চিন্তিত মুখে) কিন্তু মা, আল্লাহর দান বললেই তো আর খারাপ কিছু বোঝায় না। মানুষ তো এভাবেই কথা বলে।
অঙ্কিতাঃ আম্মা, আল্লাহ তো হালাল রিজিকেরই ওয়াদা করেছেন, হারামের না। কেউ যদি সৎপথে রোজগার করে, সে তো নির্দ্বিধায় সেই কথা বলতে পারে, গর্ব করেই বলতে পারে। কিন্তু উনি প্রশ্ন এড়িয়ে গেলেন, কথা ঘুরিয়ে দিলেন, আর আজ বিকেলে রহিমা খালাও বলে গেলেন যে অফিসে ফাইল সই করানোর জন্য নাকি টাকা না দিলে কাজ হয় না। এই সবকিছু একসাথে মেলালে বোঝা যায়, এই সম্পদের পেছনে সৎ পথ নেই। আমি এমন কারো সঙ্গে জীবন কাটাতে চাই না।
আব্বাঃ (গম্ভীর হয়ে, তবে কণ্ঠে সংশয়) তুই কি শুধু একটা প্রতিবেশীর কথায় আর কয়েকটা এড়িয়ে যাওয়া উত্তরে এত বড় সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলছিস মা?
অঙ্কিতাঃ আব্বা, প্রমাণ হাতে নেই ঠিকই, কিন্তু একজন মানুষ যখন নিজের রোজগারের কথা বলতে গিয়ে বারবার আল্লাহর নাম দিয়ে প্রশ্ন এড়িয়ে যায়, তখন বুঝতে হয় সেখানে লুকানোর মতো কিছু একটা আছে। সৎ মানুষ নিজের হালাল রোজগারের কথা লুকায় না, বরং গর্ব করে বলে। এই লুকোচুরিই তো সবচেয়ে বড় প্রমাণ।
মাঃ (চোখে জল, তবু নরম স্বরে) তুই বড় হয়ে গেছিস মা, নিজের বিচারবুদ্ধি দিয়েই বুঝিস। কিন্তু এত ভালো সম্বন্ধ হাতছাড়া হয়ে গেলে সমাজে কী বলবে মানুষ?
অঙ্কিতাঃ আম্মা, মানুষ কী বলল তাতে আমার কিছু যায় আসে না। কিন্তু আমি যদি এমন একজনকে স্বামী হিসেবে মেনে নিই যার রোজগারের ভিত্তি হারামের ওপর দাঁড়িয়ে থাকতে পারে, তাহলে আমার নিজের সংসারই তো বরকতহীন হয়ে যাবে। রাসূলুল্লাহ (সা.) তো বলেছেন, হারাম দিয়ে গড়া শরীর জান্নাতে যাবে না। আমি এমন একটা ভিতের ওপর নিজের জীবন গড়তে চাই না, যেখানে প্রতিটা ইট হারামের সন্দেহে ভরা।
আব্বাঃ (দীর্ঘশ্বাস ফেলে, তবে চোখে মেয়ের প্রতি এক অন্যরকম শ্রদ্ধা) তুই যা বলছিস তাতে যুক্তি আছে মা। আচ্ছা, আমি নিজে গিয়ে আরেকটু খোঁজখবর নিয়ে দেখব। যদি সত্যিই এমন কিছু থাকে, তাহলে আমরাও এই সম্বন্ধে এগোব না, আল্লাহর ওপর ভরসা রেখেই।
অঙ্কিতা মৃদু হেসে বাবার হাতটা ধরল। জানালার বাইরে তখন সন্ধ্যার আজান ভেসে আসছিল, দূরের মসজিদ থেকে। বাতাসে ওড়া গ্রামের সেই ধুলো ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে মাটিতে মিশে যাচ্ছিল – ঠিক যেমন সন্দেহ আর অনিশ্চয়তার মেঘ কেটে গিয়ে সত্যের আলো একটু একটু করে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, ধৈর্য আর প্রজ্ঞার হাত ধরে। অঙ্কিতা হাতে ফোন নিলো, একটা টেক্সট ড্রাফট করে কয়েকবার কাঁটাছেড়া করলো, এরপর ফয়সালকে পাঠিয়ে দিলো।
“ফয়সাল সাহেব, আপনি আমার সততার পরীক্ষা নিচ্ছিলেন, কিন্তু আপনার নিজের অসততার পরিচয় আপনি নিজেই অজান্তে দিয়ে ফেললেন। যে মানুষ হারাম আর ঘুষের টাকায় নিজের রাজপ্রাসাদ গড়ে, সে একজন চোর ছাড়া আর কিছুই নয়, তা যতই সরকারি পদমর্যাদা আর চকচকে গাড়ি থাকুক না কেন। আপনার মতো চোর ও দুর্নীতিবাজকে বিয়ে করা আমার পক্ষে অসম্ভব। এই বিয়ে করা আমার পক্ষে সম্ভব না, আমাকে ক্ষমা করবেন।”
Related Posts

Everything is a Gift from Allah …
The day of bride-seeing in a Bengali household is like an unwritten stage play—where everyRead More

When a Loved One Suddenly Feels Like a Stranger: What Causes This Neglect?
Siam met Liza in the second year of university. For the first six months, SiamRead More

যখন প্রিয় মানুষটা হঠাৎ অচেনা হয়ে যায়ঃ অবহেলার পেছনের কারণ কী?
লিজার সাথে সিয়ামের পরিচয় হয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় বর্ষে। প্রথম ছয় মাস সিয়াম যেন পুরো পৃথিবীRead More

Comments are Closed