Phycology
Why do loved ones drift away?

Why do Loved Ones Drift Away?

যখন প্রিয় মানুষটা হঠাৎ অচেনা হয়ে যায়ঃ অবহেলার পেছনের কারণ কী?

লিজার সাথে সিয়ামের পরিচয় হয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় বর্ষে। প্রথম ছয় মাস সিয়াম যেন পুরো পৃথিবী ভুলে গিয়েছিল। সকালে ঘুম ভাঙার আগেই “গুড মর্নিং” মেসেজ, রাতে ঘুমানোর আগে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফোনে কথা, লিজার প্রতিটা ছোট্ট সমস্যাতেও সিয়ামের অস্থিরতা – সবকিছুতেই মনে হতো, এই মানুষটার জগতে লিজাই একমাত্র নক্ষত্র। কিন্তু সাত মাসের মাথায় হঠাৎ করেই বদলে গেল সবকিছু। মেসেজের রিপ্লাই আসতে শুরু করল ঘণ্টার পর ঘণ্টা পর, ফোনকল কমে গেল, “ব্যস্ত আছি” শব্দটা হয়ে উঠল সবচেয়ে পরিচিত উত্তর। লিজা প্রথমে ভেবেছিল হয়তো পড়াশোনার চাপ। কিন্তু কয়েক সপ্তাহ পর জানতে পারল, সিয়ামের জীবনে নতুন একজন এসেছে – ক্লাসের নতুন বন্ধু, যার সাথে এখন তার সব সময় কাটে।

লিজার গল্পটা আসলে অসংখ্য মানুষের গল্প। লিজা এবং সিয়ামের গল্পের চরিত্ররা উল্টো আচরনও করতে পারে, দেখা গেল লিজা সিয়ামকে অবহেলা করা শুরু করলো, একসময় সিয়াম আবিষ্কার করলো লিজার জীবনে এমন কেউ এসেছে যে তার চেয়ে অনেক বেশি যোগ্য। প্রায় প্রত্যেকেই জীবনের কোনো না কোনো পর্যায়ে এই অনুভূতির মধ্য দিয়ে গেছেন – হঠাৎ করে প্রিয় মানুষটা দূরে সরে যাওয়া, গুরুত্ব কমে যাওয়া, অবহেলার শিকার হওয়া। কিন্তু কেন এমন হয়? এটা কি শুধুই ভালোবাসার অভাব, নাকি এর পেছনে আছে গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও স্নায়ুবৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা?

নতুনত্বের প্রতি মস্তিষ্কের আসক্তি

মনোবিজ্ঞানে একটি পরিচিত ধারণা আছে – “নভেলটি সিকিং” বা নতুনত্বের প্রতি আকর্ষণ। মস্তিষ্কের পুরস্কার ব্যবস্থা (reward system), বিশেষত ভেন্ট্রাল টেগমেন্টাল এরিয়া ও নিউক্লিয়াস অ্যাকুম্বেন্স, নতুন উদ্দীপনার প্রতি অস্বাভাবিক রকম সাড়া দেয়। যখন কেউ নতুন মানুষের সংস্পর্শে আসে, তখন মস্তিষ্কে ডোপামিনের ক্ষরণ বেড়ে যায় – ঠিক যেমনটা হয় নতুন কোনো অভিজ্ঞতা, নতুন জায়গা বা এমনকি নতুন কোনো জিনিস কেনার সময়। এই ডোপামিন-চালিত উত্তেজনা মানুষকে সাময়িকভাবে নতুন সম্পর্কের প্রতি অতিরিক্ত মনোযোগী করে তোলে, আর পুরনো, পরিচিত সম্পর্ক তুলনামূলক “কম উত্তেজনাপূর্ণ” মনে হতে থাকে – যদিও তার গভীরতা বা মূল্য কমে না।

গবেষক হেলেন ফিশারের গবেষণাও এই ধারণাকে সমর্থন করে। তার মতে রোমান্টিক আকর্ষণের প্রাথমিক পর্যায়ে মস্তিষ্কে যে রাসায়নিক প্রতিক্রিয়া হয়, তা অনেকটা আসক্তির মতো আচরণ তৈরি করে। এই পর্যায়ে মানুষ পুরনো সম্পর্কের প্রতি মনোযোগ কমিয়ে দেয়, কারণ নতুন সম্পর্কের উত্তেজনা মস্তিষ্ককে প্রায় সাময়িকভাবে “দখল” করে ফেলে।

অ্যাটাচমেন্ট থিওরিঃ কেন কিছু মানুষ সহজেই সরে যায়

মনোবিজ্ঞানী জন বাউলবি ও মেরি আইনসওয়ার্থের অ্যাটাচমেন্ট থিওরি অনুযায়ী, শৈশবে গড়ে ওঠা সম্পর্কের ধরন প্রাপ্তবয়সেও সম্পর্ক গঠনের ধরন নির্ধারণ করে। যাদের মধ্যে “অ্যাভয়ডেন্ট অ্যাটাচমেন্ট স্টাইল” থাকে, তারা সম্পর্কে গভীরভাবে জড়িয়ে পড়ার পর একধরনের অস্বস্তি অনুভব করে, এবং অবচেতনভাবে দূরত্ব তৈরি করার উপায় খোঁজে। নতুন কারো আগমন তাদের জন্য এক ধরনের “পালানোর পথ” হয়ে ওঠে – পুরনো সম্পর্কের দায়বদ্ধতা থেকে সাময়িক মুক্তি।

অন্যদিকে, যাদের মধ্যে উদ্বিগ্ন-অ্যাম্বিভ্যালেন্ট অ্যাটাচমেন্ট থাকে, তারা প্রায়ই সম্পর্কের শুরুতে অতিরিক্ত তীব্রতা দেখায় – দ্রুত গভীর হয়, দ্রুত ভালোবাসা প্রকাশ করে, কিন্তু সেই তীব্রতা ধরে রাখার মতো মানসিক স্থিতিশীলতা তাদের থাকে না। ফলে সম্পর্ক যত পরিণত হয়, তত তারা সেটাকে ভারী মনে করতে শুরু করে।

“হেডোনিক অ্যাডাপ্টেশন”: পরিচিতির মূল্য কমে যাওয়া

আচরণগত অর্থনীতি ও মনোবিজ্ঞানে একটি প্রতিষ্ঠিত ধারণা হলো হেডোনিক অ্যাডাপ্টেশন – অর্থাৎ, কোনো কিছু যত পরিচিত হয়ে ওঠে, তার প্রতি আমাদের উত্তেজনা তত কমে যায়, এটি মস্তিষ্কের স্বাভাবিক অভিযোজন প্রক্রিয়া। নতুন গাড়ি, নতুন চাকরি, এমনকি নতুন সম্পর্ক – সবকিছুর প্রতিই প্রাথমিক উচ্ছ্বাস সময়ের সাথে সাথে কমে আসে। এটি কোনো ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়, বরং মানব মস্তিষ্কের একটি সহজাত বৈশিষ্ট্য। তবে সমস্যা তখনই হয়, যখন কেউ এই স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার প্রচেষ্টার বদলে নতুন উত্তেজনা খোঁজার অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে।

অবহেলার মানসিক প্রভাবঃ মস্তিষ্ক কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায়

আকর্ষণীয় বিষয় হলো, সামাজিক প্রত্যাখ্যান বা অবহেলার অভিজ্ঞতা মস্তিষ্কের সেই একই অংশে সক্রিয়তা তৈরি করে, যা শারীরিক ব্যথার সময় সক্রিয় হয় – বিশেষত অ্যান্টেরিয়র সিঙ্গুলেট কর্টেক্স। গবেষক নাওমি আইজেনবার্গারের এফএমআরআই গবেষণায় এটি স্পষ্টভাবে দেখা গেছে। এই কারণেই অবহেলা শুধু “মানসিক কষ্ট” নয়, বরং মস্তিষ্ক একে অনেকটা শারীরিক আঘাতের মতোই অনুভব করে। তাই কারো অবহেলায় বুকের ভেতর সত্যিকারের যন্ত্রণা অনুভব করাটা মোটেও অতিরঞ্জিত কিছু নয় – এটি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক এক জৈবিক প্রতিক্রিয়া।

দীর্ঘমেয়াদী অবহেলা আত্মসম্মানবোধের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। মনোবিজ্ঞানী মার্ক লিয়ারির “সোশিওমিটার থিওরি” বলে, আত্মসম্মান আসলে একটি অভ্যন্তরীণ পরিমাপক যন্ত্র, যা আমাদের সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার মাত্রা পরিমাপ করে। যখন কেউ বারবার অবহেলিত হয়, তখন এই “মিটার” নিচে নামতে থাকে, এবং মানুষ নিজের মূল্য নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করে – যদিও প্রকৃতপক্ষে সমস্যাটা অন্য মানুষটির সিদ্ধান্তে, নিজের যোগ্যতায় নয়।

কেন কিছু মানুষ চলে যাওয়ার সময় পেছনে ফিরে তাকায় না

গবেষণা বলছে, যারা সম্পর্কে সহজে “এক্সিট” নেয়, তাদের মধ্যে প্রায়ই সহমর্মিতার (empathy) এক ধরনের সাময়িক সংকোচন দেখা যায় সিদ্ধান্ত নেওয়ার মুহূর্তে। মনোবিজ্ঞানে একে বলা হয় “মোরাল ডিসএনগেজমেন্ট” – নিজের কাজের নৈতিক ফলাফল থেকে মানসিকভাবে দূরত্ব তৈরি করা, যাতে অপরাধবোধ কম অনুভূত হয়। এটি সচেতন নিষ্ঠুরতা নয়; বরং মস্তিষ্কের এক ধরনের প্রতিরক্ষা কৌশল, যা কাউকে কষ্ট দেওয়ার অস্বস্তি থেকে বাঁচায়। কিন্তু যিনি অবহেলার শিকার হচ্ছেন, তার জন্য এই ব্যাখ্যা কষ্ট কমায় না – তবে বোঝা সহজ করে দেয় যে, এটা তার ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়।

নিজেকে রক্ষা করার মনস্তাত্ত্বিক কৌশল

মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, অবহেলার মুখোমুখি হলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো নিজের আবেগকে যাচাই করা কিন্তু তাতে ডুবে না যাওয়া। কগনিটিভ বিহেভিয়ারাল থেরাপির একটি মূলনীতি হলো – কোনো ঘটনার প্রতি আমাদের অনুভূতি নির্ভর করে আমরা সেই ঘটনাকে কীভাবে ব্যাখ্যা করি তার ওপর। “সে আমাকে ছেড়ে গেছে মানে আমি অযোগ্য” আর “সে হয়তো তার নিজের মানসিক টানাপোড়েনে আমাকে ঠিকভাবে মূল্যায়ন করতে পারেনি” – এই দুটি ব্যাখ্যা সম্পূর্ণ ভিন্ন মানসিক ফলাফল তৈরি করে।

এছাড়া “সেলফ-কম্প্যাশন” বা আত্ম-সহানুভূতির চর্চা – নিজের প্রতি কঠোর সমালোচক না হয়ে একজন সহানুভূতিশীল বন্ধুর মতো আচরণ করা – গবেষণায় প্রমাণিত যে এটি মানসিক পুনরুদ্ধারের গতি বাড়ায়।

যিনি অবহেলিত হয়েছেন, তার উচিত নিজেকে দোষারোপ না করে বুঝতে শেখা যে, সম্পর্কের ভাঙন সবসময় একপক্ষের ব্যর্থতা নয়।

শেষ কথা

কেউ যখন আপনাকে অবহেলা করে, তখন সেটা প্রায়শই তার নিজের মানসিক অস্থিরতা, আসক্তিসুলভ নতুনত্বপ্রিয়তা, কিংবা সম্পর্কে দায়বদ্ধতার ভয়ের প্রতিফলন – আপনার মূল্যহীনতার প্রমাণ নয়। বিজ্ঞান বলছে, মানুষের মস্তিষ্ক নতুনত্বের প্রতি সহজাতভাবে আকৃষ্ট হয়, আর অবহেলা যতটা মানসিক, ততটাই জৈবিক এক অভিজ্ঞতা। এই বোঝাপড়া কষ্ট পুরোপুরি দূর করে না, কিন্তু এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি দেয় – নিজেকে দোষারোপ করার বদলে, নিজের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়ার, এবং যে সম্পর্কে নিজের মূল্য নেই, সেখান থেকে সরে আসার সাহস রাখার।

Related Posts

Everything is a gift from Allah

Everything is a Gift from Allah …

The day of bride-seeing in a Bengali household is like an unwritten stage play—where everyRead More

Everything is a gift from Allah

সবই আল্লাপাকের দান …

বাঙালি ঘরে কনে দেখার দিনটিও যেন এক অলিখিত নাট্যমঞ্চ – যেখানে প্রতিটি সংলাপ, প্রতিটি অঙ্গভঙ্গিRead More

Why do loved ones drift away?

When a Loved One Suddenly Feels Like a Stranger: What Causes This Neglect?

Siam met Liza in the second year of university. For the first six months, SiamRead More

Comments are Closed