
The Ongoing Aggression of Islam
সোমনাথ থেকে জয়পুরহাট – এক সহস্রাব্দের পুরনো ধ্বংসের ছায়া আজও বিদ্যমান
প্রথম আঘাত
গুজরাটের সৌরাষ্ট্র উপকূলে, যেখানে আরব সাগরের ঢেউ এসে আছড়ে পড়ে পাথুরে তটে, সেখানে দাঁড়িয়েছিল ভারতের অন্যতম প্রাচীন ও মানুষের কাছে পবিত্রতম শিবমন্দির – সোমনাথ। কিংবদন্তি বলে, এই মন্দির বহুবার নির্মিত হয়েছিল – প্রথমে সোনা দিয়ে, পরে রুপা ও চন্দনকাঠ দিয়ে। বাস্তব ইতিহাসেও এই মন্দির ছিল অপরিসীম সম্পদ ও ভক্তির কেন্দ্র, যেখানে হাজার হাজার তীর্থযাত্রী আসতেন পশ্চিম ভারতের নানা প্রান্ত থেকে।
১০২৫ সালে গজনীর সুলতান মাহমুদ – যিনি ইতিমধ্যে ভারতবর্ষে ষোলোটি অভিযান চালিয়েছিলেন – বিশাল সৈন্যবাহিনী নিয়ে রওনা দিলেন সোমনাথের দিকে। মরুভূমি পেরিয়ে, কঠিন পথ ডিঙিয়ে তাঁর বাহিনী পৌঁছাল মন্দির প্রাঙ্গণে। ইতিহাস বলে, মন্দির রক্ষায় ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন স্থানীয় হিন্দুরা – প্রায় পাঁচ হাজার মানুষ প্রাণ দিয়েছিলেন সেই প্রতিরোধে। কিন্তু শেষরক্ষা হয়নি। ১০২৬ সালের জানুয়ারিতে মন্দির সুলতানের হাতে চলে যায়। মূর্তি ভাঙা হয়, মন্দির লুণ্ঠিত হয়, আর সুলতান মাহমুদ নিয়ে যান প্রায় দুই কোটি স্বর্ণমুদ্রাসহ অগণিত ধনরত্ন।
যুক্তির আড়ালে লুণ্ঠন
ইতিহাসবিদদের মধ্যে এই অভিযানের প্রকৃত উদ্দেশ্য নিয়ে দীর্ঘ বিতর্ক আছে। সমসাময়িক ও পরবর্তী ফারসি ইতিহাসবিদরা একে উপস্থাপন করেছেন ইসলাম নির্দেশিত “মূর্তিপূজা ধ্বংসের পবিত্র যুদ্ধ” হিসেবে – যেন এটি নিছক ধর্মীয় কর্তব্যপালন। কিন্তু আধুনিক ঐতিহাসিকদের একটা বড় অংশ, যেমন মুহাম্মদ হাবীবের মতো গবেষকরা দেখিয়েছেন, এই অভিযানের পেছনে মূল চালিকাশক্তি ছিল অর্থনৈতিক লোভ – সোমনাথের কিংবদন্তিতুল্য সম্পদের লোভ। ধর্মীয় ভাষ্য এখানে কাজ করেছিল লুণ্ঠনের নৈতিক বৈধতা হিসেবে, যা একই সঙ্গে সৈন্যদের উদ্দীপ্ত করত আর ইতিহাসে অভিযানটিকে “পুণ্যকর্ম” হিসেবে চিহ্নিত করার সুযোগ দিত।
এই দ্বৈততা গুরুত্বপূর্ণ – কারণ এটি দেখায় কীভাবে ধর্মীয় অনুভূতি আর রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক স্বার্থ ইতিহাসে বারবার একসঙ্গে জড়িয়ে গেছে, আর পরবর্তীতে কেবল ধর্মীয় ব্যাখ্যাটাই টিকে থেকেছে স্মৃতিতে, লুণ্ঠনের দিকটা ঢাকা পড়ে গেছে “বিজয়ের গৌরব”-এর আড়ালে। সোমনাথ ধ্বংসের পর শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই ঘটনা ব্যবহৃত হয়েছে দুই বিপরীত আখ্যান তৈরিতে – একদিকে এটি হয়ে উঠেছে “ইসলামি বীরত্বের” প্রতীক, অন্যদিকে হিন্দু সমাজে এটি থেকে গেছে এক গভীর সাংস্কৃতিক ক্ষতের স্মৃতি হয়ে, যা মন্দিরটি বারবার পুনর্নির্মিত হওয়ার পরও মুছে যায়নি।
একটি প্যাটার্নের জন্ম
সোমনাথ একা ছিল না। মধ্যযুগের ভারত জুড়ে – কনৌজ, মথুরা, এবং পরবর্তীতে দিল্লি সালতানাত ও কিছু মুঘল শাসকের আমলে – মন্দির ধ্বংস, মূর্তি ভাঙা ও লুণ্ঠনের অসংখ্য ঘটনা নথিভুক্ত আছে। তবে এখানে ইতিহাসের প্রতি সুবিচার করতে গেলে এটাও স্মরণ করা জরুরি যে এই একই উপমহাদেশে বহু মুসলিম শাসক মন্দির সংস্কারে অর্থ দিয়েছেন, হিন্দু মন্দির রক্ষা করেছেন, এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে ধ্বংসের পর পুনর্নির্মাণেও সহায়তা করেছেন। ইতিহাস কখনোই একরৈখিক নয়। কিন্তু যেটা অস্বীকার করা যায় না, তা হলো – একটি নির্দিষ্ট প্যাটার্ন বারবার ফিরে এসেছে: বিজয়ী শক্তি যখন পরাজিতের পবিত্রতম প্রতীককে ভাঙে, তখন সেটি কেবল সম্পদ দখল নয়, এটি পরাজিতের আত্মপরিচয় ও মনোবলের ওপর একটি সুপরিকল্পিত আঘাত। মন্দির বা মূর্তি ভাঙা তাই কখনো নিছক “ধর্মীয় শুদ্ধি” ছিল না – এটি ছিল ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার এক প্রতীকী ভাষা, যেখানে পরাজিতকে বোঝানো হতো তার দেবতাও তাকে রক্ষা করতে পারেনি।
সহস্রাব্দ পেরিয়েঃ একই ভাষা, নতুন মুখ
আজ, সোমনাথ আক্রমণের প্রায় হাজার বছর পর, এই একই ভাষা – মূর্তি ভাঙার ভাষা – এখনও জীবন্ত, কেবল রূপ বদলেছে। রাষ্ট্রীয় বাহিনীর বদলে এখন কাজ করে বিচ্ছিন্ন উগ্রপন্থী দল বা ব্যক্তি, রাজকীয় সৈন্যবাহিনীর বদলে রাতের অন্ধকারে নেমে আসা দুর্বৃত্তরা, তৌহিদী জনতা নামের উন্মত্ত দানবেরা। কিন্তু কাঠামোটা আশ্চর্যজনকভাবে অপরিবর্তিত থেকে গেছে।
পাকিস্তানে এই প্যাটার্ন বহু পুরনো ও সুপরিচিত। দেশভাগের পর থেকেই সেখানে হিন্দু জনসংখ্যা ক্রমাগত কমেছে, আর যে কয়েকশো মন্দির অবশিষ্ট ছিল, সেগুলোর একটি বড় অংশ ভাঙচুর, দখল বা পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। সিন্ধু প্রদেশে একাধিকবার মন্দির ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে, আর মানবাধিকারকর্মীরা বহুবার জানিয়েছেন, পাকিস্তানে শত শত মন্দির হয় ধ্বংস হয়েছে নয়তো দখল হয়ে গেছে স্বাধীনতা-পরবর্তী দশকগুলোতে।
বাংলাদেশেও এই ধারা থেমে নেই – বরং সাম্প্রতিক সময়ে তা যেন আরও ঘনঘন মাথাচাড়া দিচ্ছে। ২০২৫ সালেই দেশজুড়ে অসংখ্য প্রতিমা ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে – হালুয়াঘাটে কালী মন্দিরে, পাবনায়, সিরাজগঞ্জে, এলেঙ্গায় রাধাগোবিন্দ মন্দিরে, নগরকান্দায় রাধা-কৃষ্ণের মূর্তিতে, সিরাজদিখানে লক্ষ্মী প্রতিমায় – তালিকাটা দীর্ঘ। আর ২০২৬ সালের জুনেও, এই লেখা যখন লিখছিলাম তার মাত্র কিছুদিন আগে, বগুড়ার মোকামতলায় একসঙ্গে তিনটি মন্দিরে প্রতিমা ভাঙচুরের খবর এসেছে। এর আগে জয়পুরহাটে হাজার বছরের পুরনো শিবলিঙ্গ আগুনে পুড়িয়ে, হাতুড়ির আঘাতে ভেঙে ফেলা হয়েছিল।
একই কাঠামো, ক্ষুদ্র পরিসরে
এই দুটি ঘটনার মধ্যে স্কেলের বিস্তর ফারাক আছে – একদিকে রাষ্ট্রীয় শক্তির সংগঠিত সামরিক অভিযান, অন্যদিকে রাতের অন্ধকারে কয়েকজন ব্যক্তির হাতুড়ি বা আগুন। কিন্তু অন্তর্নিহিত যুক্তিকাঠামোটা একই থেকে যায়। উভয় ক্ষেত্রেই অনুমান করে নেওয়া হয়, এক ধর্মের প্রতীক ধ্বংস করার অধিকার অন্য ধর্মের কারো আছে। উভয় ক্ষেত্রেই বার্তাটা থাকে এক – তোমার উপাসনার বস্তুর কোনো নিরাপত্তা নেই, কারণ তা আমার বিশ্বাসে অগ্রহণযোগ্য। উভয় ক্ষেত্রেই ভুক্তভোগী সম্প্রদায়ের জন্য এই ঘটনা কেবল একটি মূর্তির ক্ষতি নয় – এটি একটি বার্তা যে তারা নিরাপদ নয়, তাদের উপাসনাস্থল যে কোনো সময় আক্রান্ত হতে পারে, আর রাষ্ট্র বা সমাজ তাদের রক্ষা করতে ব্যর্থ বা অনিচ্ছুক।
জয়পুরহাটের হাজার বছরের শিবলিঙ্গ যখন হাতুড়ির আঘাতে ভাঙে, তখন তা সোমনাথের ধ্বংসের প্রতিধ্বনি বহন করে – একই অহংকার, একই অনুমান যে ইসলাম নিজের বিশ্বাস অন্যের পবিত্র বস্তু ধ্বংসের অধিকার দেয়। ফারাক শুধু এই – এক হাজার বছর আগে এই কাজ করত রাষ্ট্রের সেনাবাহিনী প্রকাশ্য দিবালোকে, খোলাখুলি গৌরব প্রচার করে; আজ তা ঘটে রাতের অন্ধকারে, পরিচয় গোপন রেখে বা তৌহিদী জনতার নামে উন্মত্ত মব, এবং প্রায়ই বিচারহীনতার মধ্য দিয়েই উপসংহার ঘটে।
যে ধারাবাহিকতা ভাঙা দরকার
সোমনাথ ধ্বংসের ইতিহাস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ধর্মীয় ন্যায্যতার আড়ালে ধ্বংস ও দখলের যুক্তি কতটা পুরনো, কতটা গভীরে প্রোথিত। কিন্তু এই প্যাটার্নকে কেবল “ইতিহাস” বলে সরিয়ে রাখার সুযোগ নেই, কারণ তা আজও জীবন্ত – বাংলাদেশের গ্রামে গ্রামে, পাকিস্তানের সিন্ধু প্রদেশে, প্রতি বছর পূজার মৌসুমে।
একটি সভ্য রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো এই ধারাবাহিকতা ভাঙা – প্রতিটি প্রতিমা ভাঙচুরের ঘটনায় প্রকৃত তদন্ত করা, অপরাধীদের চিহ্নিত করে শাস্তি দেওয়া, আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, এই বার্তা স্পষ্ট করা যে কোনো ধর্মীয় অনুভূতি অন্যের উপাসনার অধিকার হরণের অজুহাত হতে পারে না। যতদিন না এই দায়িত্ব পালিত হচ্ছে, ততদিন সোমনাথের সেই হাজার বছর আগের ধ্বংসযজ্ঞের ছায়া জয়পুরহাটের ভাঙা শিবলিঙ্গ আর বগুড়ার ভাঙা প্রতিমার ওপর দিয়ে নতুন করে দীর্ঘায়িত হতেই থাকবে।
ধর্মীয় উপাসনালয় – তা মন্দির, মসজিদ, চার্চ, প্যাগোডা কিংবা সিনাগগ যাই হোক না কেন – আমার কোন স্পেশাল ফ্যাসিনেশান নেই। এগুলো কোনো ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক ও নৃতাত্ত্বিক মূল্যের কারণেই বেশি তাৎপর্যপূর্ণ; তাই কোনো এক সুদূর ভবিষ্যতে এগুলো যদি মানবকল্যাণে জ্ঞানচর্চার লাইব্রেরি বা ল্যাবরেটরিতে রূপান্তরিত হয়, তবে তা হবে মানবসভ্যতার এক অনন্য অগ্রগতি, আমি তেমনটাই চাই। তবে বর্তমান বাস্তবতায় যতদিন পর্যন্ত এর অনুসারীরা এই স্থাপনাগুলোর মালিকানা ধারণ করছেন এবং যতদিন এগুলো মানুষের জীবন ও মানবতার জন্য কোনো হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছে না, ততদিন পর্যন্ত কোনো পক্ষেরই এসব ঐতিহাসিক ও আবেগীয় স্মারক ধ্বংস করার বা ক্ষতিসাধন করার বিন্দুমাত্র অধিকার নেই।
Related Posts

অপারেশান এন্টেবে – এক রাতের গল্প এবং নজরুল ইসলাম ও সুইটি আক্তারের ইসলামি হত্যার শিকার হওয়া!
একটি রাষ্ট্র বিদেশে তার নাগরিকদের জীবন বাঁচাতে কী করতে পারে? এর কোন টেক্সটবুক উদাহরণ আছে?Read More

A random page from Muhammad’s self‑made book Qur’an and its unscientific statements
Sometimes I flip through random pages of Muhammad’s self‑made book Qur’an, and today this pageRead More

মুহাম্মদের বানানো কোরআন বই এর একটা র্যান্ডম পৃষ্ঠা ও সেখানকার অবৈজ্ঞানিক বক্তব্য
আমি মাঝে মাঝে মুহাম্মদের বানানো কোরআন বই এর র্যান্ডম পৃষ্ঠা উল্টাই, আজ এই পৃষ্ঠা হাতেRead More

Comments are Closed