Muslims

The Protocols and the Muslims

এক মিথ্যা চাবিতে ইসলামী বিশ্ব ঘুরছে ১২৫ বছর ধরে!

একবার প্রফেসর মুফতি কাজী ইব্রাহীম হুজুরের বয়ানে শুনছিলাম ‘রথচাইল্ড ব্রাদার্স’দের কথা। উনার বয়ান অনুযায়ী ইউরোপের এই প্রভাবশালী ইহুদী পরিবার বিশ্বের সকল রাজনীতি, অর্থনীতি নিয়ন্ত্রন করে, এবং তাদের মূল নিশানা মুসলমানরা, তারাই নাকি বিশ্বের সকল অশান্তির জন্য দায়ী, তারা শয়তানের উপাসক, ইত্যাদি, ইত্যাদি। মুফতি ইব্রাহীমকে অনেকে পাত্তা না দিলেও বা তার কথাকে কৌতুক মনে করলেও বাংলাদেশের ইসলামী অঙ্গনে উনার অবস্থান অনেক উঁচুতে। বড় বড় হুজুর, মুফতি, মুহাদ্দিসদের শিক্ষক উনি। সেই সূত্রে কোন হুজুর তার কথাকে কৌতুককর হিসাবে নেন না, সিরিয়াসলিই নেন। দুঃখের বিষয় হলো বিশ্বের অনেক মুসলমান স্কলার, রাজনীতিবিদ, সাধারন অনেক মুসলমান এই তত্ত্বকে মেনে নিয়েছে। ধর্মীয়ভাবে কোরান-হাদিসে ইহুদী বিদ্বেষ আছে, সেইসঙ্গে এই অপতথ্যের মাত্রা যোগ করে অনেক মুসলমানের মনে স্থায়ীভাবে ইহুদীদের ঘৃনা করতে শিখিয়েছে, অনেকে চায় ইহুদীরা ধ্বংস হয়ে যাক।

মুফতি কাজী ইব্রাহীম একজন প্রভাবশালী ধর্মীয় কর্তৃত্বসম্পন্ন ব্যক্তি, এবং শ্রোতারা স্বাভাবিকভাবেই তার কথাকে যাচাই না করেই বিশ্বাস করে নেন। কিন্তু এই বিশ্বাসের উৎস খুঁজলে পাওয়া যায় এক বিস্ময়কর সত্য – এটি মুসলিম বিশ্বের নিজস্ব কোনো পর্যবেক্ষণ বা গবেষণার ফসল নয়, বরং ১২৫ বছর আগে জারের রাশিয়ায় তৈরি একটি রাজনৈতিক জালিয়াতির আমদানিকৃত সংস্করণ। অর্থাৎ, ১২৫ বছর আগে রাশিয়ার গোয়েন্দারা তাদের শাসক জারের স্বার্থ রক্ষার জন্য একটা প্রমানিত ভুয়া দলিল তৈরি করেছিল – যা এখনো বিশ্বের কোটি কোটি মুসলমানের মাথা কিনে রেখেছে। রাশিয়া সেই যে চাবি দিয়েছে, এখনো মুসলিম বিশ্ব ঘুরছে ঘূর্নিবাকে।

চলুন দেখি কীভাবে “দ্য প্রোটোকলস অব দ্য এল্ডার্স অব জায়ন” নামক একটি প্রমাণিত জাল দলিল রাশিয়া থেকে আরব বিশ্বে প্রবেশ করে, কীভাবে তা ইসলামি রাজনৈতিক আন্দোলনের সাথে মিশে যায়, এবং কীভাবে আজও তা বাংলাদেশসহ বিশ্বব্যাপী মুসলিম জনমানসে ইহুদী-বিদ্বেষের একটি স্থায়ী উৎস হয়ে আছে।

প্রোটোকলসের জন্মঃ একটি প্রমাণিত রাষ্ট্রীয় জালিয়াতি

ইতিহাসবিদ ও গবেষকদের মধ্যে এ বিষয়ে বিস্তৃত ঐকমত্য রয়েছে যে প্রোটোকলস একটি সম্পূর্ণ বানোয়াট দলিল। গবেষকরা সাধারণভাবে একমত যে রাশিয়ান সাম্রাজ্যের গোপন পুলিশ ওখরানা ১৮৯০-এর দশকের শেষ দিকে বা ১৯০০-এর দশকের শুরুতে এই টেক্সট তৈরি করেছিল।

এই জালিয়াতির পদ্ধতিটিও স্পষ্ট। ঐতিহাসিকরা একমত যে এটি আগের ফ্রান্সে লেখা একটি রাজনৈতিক ব্যঙ্গরচনা ও কল্পকাহিনী থেকে চৌর্যবৃত্তি করে তৈরি – বিশেষভাবে মরিস জোলির ১৮৬৪ সালের “মেকিয়াভেলি ও মন্তেস্কুর নরকে কথোপকথন” নামক রচনা থেকে। এছাড়াও ১৮৬৮ সালের একটি অস্পষ্ট জার্মান উপন্যাস “বিয়ারিৎজ” থেকেও উপাদান নেওয়া হয়েছিল, যেখানে প্রাগের এক কবরস্থানে রহস্যময় ইহুদি নেতাদের সাক্ষাতের কাল্পনিক বর্ণনা ছিল।

ব্র্যান্ডেইস বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা অনুযায়ী, ওখরানা – রুশ ভাষায় যার অর্থ “সুরক্ষা” – তৎকালীন ইউরোপের সবচেয়ে শক্তিশালী ইহুদি-বিদ্বেষী শাসনব্যবস্থার অধীনে কাজ করত এবং জারের প্রতিক্রিয়াশীল নীতির বিরোধী বিপ্লবী শক্তিগুলোকে কলঙ্কিত করতে এই প্রতারণা ব্যবহার করতে চেয়েছিল।

জুইশ ভার্চুয়াল লাইব্রেরির বিবরণ অনুযায়ী, এই জালিয়াতির পেছনের ব্যক্তি সম্পর্কেও স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়ঃ প্যারিসে ওখরানার শাখার প্রধান পিয়ের ইভানোভিচ রাচকভস্কি নিজেই বোমা হামলার পরিকল্পনা করে পরে তা নস্যাৎ করতেন, ব্যক্তিগত শত্রুদের হত্যার ব্যবস্থা করতেন, এবং বেনামী প্রচারপত্র প্রকাশ করে সেগুলোকেই বিপ্লবী কার্যকলাপের প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করতেন।

এই দলিলের ভিত্তিহীনতা শুধু আধুনিক গবেষণার সিদ্ধান্ত নয় – এটি বিচারিকভাবেও প্রমাণিত। ১৯৩৫ সালের বার্ন বিচারে একজন খ্রিস্টান বিচারক ওয়াল্টার মেয়ার রায় দিতে গিয়ে বলেছিলেন, তিনি আশা করেন এমন একটা সময় আসবে যখন কেউ বুঝতেই পারবে না যে ১৯৩৫ সালে প্রায় এক ডজন সুস্থ-বিবেচক ও দায়িত্বশীল মানুষ দুই সপ্তাহ ধরে এই তথাকথিত প্রোটোকলসের সত্যতা নিয়ে বার্ন আদালতের বুদ্ধিমত্তাকে উপহাস করেছিলেন – যে প্রোটোকলস ক্ষতিকর হলেও আসলে নিছক হাস্যকর বাজে কথা।

১৯৬১ সালে মার্কিন সিনেট কমিটির শুনানিতে সিআইএ-র তৎকালীন সহকারী পরিচালক রিচার্ড হেলমস স্পষ্টভাবে বলেছিলেন, রাশিয়ানদের জালিয়াতির একটা দীর্ঘ ঐতিহ্য আছে – ৬০ বছরেরও বেশি আগে জারের গোয়েন্দা সংস্থা “দ্য প্রোটোকলস অব দ্য এল্ডার্স অব জায়ন” নামক একটা প্রতারণা তৈরি ও বিতরণ করেছিল।

সারকথাঃ এটি কোনো অনুমান বা একপক্ষীয় দাবি নয় – শতাধিক বছরের স্বাধীন গবেষণা, সাংবাদিকতা ও আদালতের রায়ে এই দলিল বারবার জাল প্রমাণিত হয়েছে। অথচ এই প্রমাণিত মিথ্যাই আজও মুসলিম বিশ্বে “ইতিহাসের গোপন সত্য” হিসেবে প্রচারিত হয়।

রাশিয়া থেকে আরব বিশ্বেঃ জালিয়াতির অভিবাসন

এই দলিল কীভাবে রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক হাতিয়ার থেকে মুসলিম বিশ্বের ধর্মীয়-রাজনৈতিক বয়ানের অংশ হয়ে উঠল, তার একটা স্পষ্ট ঐতিহাসিক সূত্র আছে।

নিউ ওয়ার্ল্ড এনসাইক্লোপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, প্রথম আরবি অনুবাদগুলো ফরাসি থেকে করেছিলেন আরব খ্রিস্টানরা – প্রথম অনুবাদটি জেরুজালেমের রোমান ক্যাথলিক সম্প্রদায়ের একটি সাময়িকীতে ১৯২৬ সালে প্রকাশিত হয়। আরেকটি অনুবাদ কায়রোতে ১৯২৭ বা ১৯২৮ সালে বই আকারে প্রকাশিত হয়। আর কোনো আরব মুসলিম কর্তৃক প্রথম অনুবাদ প্রকাশিত হয় ১৯৫১ সালে, কায়রোতেই।

হলোকাস্ট এনসাইক্লোপিডিয়ার তথ্যমতে, ১৯২৫ সালের মধ্যেই সিরিয়ায় একটি আরবি অনুবাদ পাওয়া যাচ্ছিল।

কিন্তু প্রকৃত বিস্ফোরণ ঘটে ১৯৪৮ সালের পরে। উইকিপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল প্রতিষ্ঠার পর মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে ইসরায়েল-বিরোধী জনমত ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথে অনেক আরব সরকার প্রোটোকলসের নতুন নতুন মুদ্রণে অর্থায়ন করে এবং স্কুলে ঐতিহাসিক সত্য হিসেবে শেখানো শুরু করে।

অর্থাৎ এটি শুধু কোনো প্রান্তিক চক্রের প্রচারণা ছিল না – রাষ্ট্রীয় পর্যায়েই একে শিক্ষাব্যবস্থায় ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছিল। MEMRI-র গবেষণা অনুযায়ী, বিগত অর্ধ শতাব্দীতে আরব বিশ্বে প্রোটোকলস সম্ভবত পৃথিবীর অন্য যেকোনো অঞ্চলের চেয়ে বেশি প্রকাশিত ও বিতরণ করা হয়েছে। বর্তমানে প্রোটোকলসের অন্তত নয়টি ভিন্ন আরবি অনুবাদ আছে – জার্মান ছাড়া অন্য যেকোনো ভাষার চেয়ে বেশি সংস্করণ – এবং এটি পাকিস্তান, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়াসহ অন্যান্য মুসলিম দেশেও ছড়িয়ে পড়েছে। সিরিয়ায় এটি একটি বেস্টসেলার।

মাই জুইশ লার্নিং-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী আজকের চিত্র আরও স্পষ্টঃ ইরাক থেকে ফিলিস্তিনি অঞ্চল, মিশর থেকে ইরান, তুরস্ক থেকে ইন্দোনেশিয়া – এমন একটি মুসলিম দেশও নেই যেখানে সাম্প্রতিক বছরগুলোতেও প্রোটোকলস প্রকাশিত বা বিতরণ করা হয়নি। বিশ্ব ইহুদি কংগ্রেসের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০০২ সালে মিশরের বড় প্রকাশনা সংস্থা আখবার আল-ইয়াওম থেকে প্রকাশিত একটি আরবি সংস্করণে ৩৭টি দেশের তালিকা রয়েছে যেখানে এটি রপ্তানি করা হয় – জার্মানি, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, এমনকি যুক্তরাষ্ট্রও।

লক্ষণীয়ঃ এই বিশ্বাস শুধু কট্টরপন্থী ইসলামি গোষ্ঠীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বিশ্ব ইহুদি কংগ্রেসের গবেষক কারমেন মাতুসেকের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, আরব বিশ্বে প্রোটোকলসের জনপ্রিয়তা মোটেও শুধু ইসলামপন্থী মহলে সীমাবদ্ধ নয় – ইহুদি বিশ্ব-ষড়যন্ত্রে বিশ্বাস মধ্যপ্রাচ্যের অধিকাংশ এলাকার সাধারণ ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক চেতনার বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ এই বিষবৃক্ষ শুধু মাদ্রাসা বা মসজিদের মিম্বরে নয় – সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থা, গণমাধ্যম, রাজনীতি – সবখানে শিকড় গেড়েছে।

ধর্মীয় বয়ান হিসেবে রূপান্তরঃ কীভাবে রাজনৈতিক জালিয়াতি “ধর্মীয় সত্যে” পরিণত হলো

প্রোটোকলসের আরব বিশ্বে প্রবেশের প্রাথমিক পর্যায়ে এটি ছিল মূলত রাজনৈতিক প্রচার – জায়নবাদ-বিরোধী জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের হাতিয়ার। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে এটি ধর্মীয় বয়ানের সাথে মিশে এক নতুন রূপ নেয়, যা একে আরও বেশি স্থায়ী ও গভীর করে তোলে।

গবেষক ম্যাথিয়াস কুন্টজেলের কাজ অনুসারে, ১৯৩০-৪০-এর দশকে মিশরের মুসলিম ব্রাদারহুড ইউরোপীয় ফ্যাসিস্ট মতাদর্শ থেকে ষড়যন্ত্র-কেন্দ্রিক ইহুদি-বিদ্বেষ গ্রহণ করে তা ইসলামি ধর্মতাত্ত্বিক কাঠামোর সাথে মিশিয়ে দেয়। এই প্রক্রিয়ার সবচেয়ে কুখ্যাত উদাহরণ হলো ফিলিস্তিনের মুফতি হাজ আমিন আল-হুসেইনি, যিনি ১৯৪১ সালে বার্লিনে গিয়ে স্বয়ং হিটলারের সাথে সাক্ষাৎ করেন এবং নাজি যুদ্ধ প্রচেষ্টায় সক্রিয়ভাবে সহায়তা করেন।

এই মিশ্রণের পরিণত রূপ দেখা যায় ১৯৮৮ সালের হামাস চার্টারে, যেখানে প্রোটোকলসের ষড়যন্ত্র তত্ত্বকে সরাসরি ধর্মীয় টেক্সটের সাথে জুড়ে দেওয়া হয় – ইহুদিদের ফরাসি বিপ্লব, উভয় বিশ্বযুদ্ধ, এমনকি জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার পেছনের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে দেখানো হয়। মাই জুইশ লার্নিং নিশ্চিত করে যে হামাস, যারা এখন গাজা শাসন করে, প্রোটোকলসের অংশবিশেষকে তাদের চার্টারের প্রকৃত ধারা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেছে।

ফলে যা শুরু হয়েছিল একটি ইউরোপীয় রাষ্ট্রের গোপন পুলিশের রাজনৈতিক চাল হিসেবে, তা ধীরে ধীরে – এবং বিপজ্জনকভাবে – অনেকের কাছে “ধর্মীয় সত্য”-এর মর্যাদা পেয়ে যায়। এখানেই সমস্যার গভীরতাঃ একটি রাজনৈতিক জালিয়াতি যখন ধর্মীয় আবেগের সাথে মিশে যায়, তখন তাকে প্রশ্ন করা আরও কঠিন হয়ে পড়ে – কারণ প্রশ্নকারীকে তখন শুধু “ভুল তথ্যে বিশ্বাসী” নয়, বরং “ধর্মের প্রতি সন্দেহপ্রকাশকারী” হিসেবে দেখা হতে পারে।

কেন এই মিথ্যা এত দীর্ঘজীবী?

ব্র্যান্ডেইস বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসবিদ স্টিফেন হুইটফিল্ডের পর্যবেক্ষণ এই দীর্ঘজীবিতার একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যা দেয়ঃ প্রোটোকলসকে যা টিকিয়ে রাখে তা টেক্সটের ভাষা নয় – কট্টরপন্থীদের অধিকাংশই এর সম্পূর্ণ পাঠ পড়েননি – বরং এই জালিয়াতি যা ইঙ্গিত করতে চায়, অর্থাৎ আধুনিক ইতিহাসে ইহুদিদের বিস্ময়কর সুকৌশলী প্রভাবের ধারণা। এই দলিলের নিজস্ব কোনো গুরুত্ব নেই, কারণ এটি ভুয়া – কিন্তু এটি বিভ্রান্তিকর ভয়কে একটা নির্দিষ্টতা দেয়, যা ছাড়া এই ভয় টিকে থাকতে পারত না।

অর্থাৎ মানুষ আগে থেকেই এক ধরনের অবিশ্বাস, ক্ষোভ বা ব্যাখ্যাহীন রাজনৈতিক হতাশা নিয়ে বসে থাকে – প্রোটোকলস তাকে একটা “নাম” আর “প্রমাণ” দেয়। আরব-ইসরায়েল সংঘাত, ঔপনিবেশিকতা, অর্থনৈতিক পশ্চাৎপদতা – এই জটিল বাস্তবতাগুলোর একটা সরল, এক-শব্দের উত্তর দেয় প্রোটোকলসঃ “ইহুদি ষড়যন্ত্র।” মাই জুইশ লার্নিং-এর ভাষায়, প্রোটোকলস জায়নবাদকে আরব ভূখণ্ডের সকল সমস্যার উৎস হিসেবে নিন্দা জানানোর একটা মাধ্যম দেয়, আরব সেনাবাহিনীর পরাজয়ের অজুহাত দেয়, আর তাদের ধীরগতির অর্থনৈতিক উন্নয়নের একটা কারণ দেখায়।

এটাই এই মিথ্যার আসল বিপজ্জনক শক্তি – এটি জটিল প্রশ্নের সহজ উত্তর জোগায়, আর সেই সহজ উত্তরই প্রজন্মের পর প্রজন্ম মুখস্থ হয়ে যায়, প্রশ্নবিহীনভাবে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটঃ একটি আমদানিকৃত মিথ্যার স্থানীয়করণ

একজন প্রভাবশালী আলেমের বয়ানে রথচাইল্ড পরিবার নিয়ে দাবি, এবং তা প্রশ্নাতীতভাবে গ্রহণযোগ্যতা পাওয়া – এটি আসলে একটি বৃহত্তর বৈশ্বিক প্যাটার্নের স্থানীয় সংস্করণ মাত্র। এই প্যাটার্নটি কাজ করে কয়েকটি স্তরেঃ

প্রথমত, কর্তৃত্বের স্তরায়ন। ধর্মীয় শিক্ষাব্যবস্থায় জ্ঞান প্রায়ই উপর থেকে নিচে প্রবাহিত হয় – শিক্ষকের কথা ছাত্র সাধারণত যাচাই না করেই গ্রহণ করে। যখন একজন উচ্চপদস্থ মুফতি বা মুহাদ্দিসের শিক্ষক কোনো দাবি করেন, তখন তার নিচের স্তরের আলেমরা সেটাকে চ্যালেঞ্জ করাকে শুধু বুদ্ধিবৃত্তিক নয়, সামাজিকভাবেও ঝুঁকিপূর্ণ মনে করতে পারেন।

দ্বিতীয়ত, পূর্ব-বিদ্যমান কাঠামোর সাথে মিল। যেহেতু ইতিমধ্যে একটি ধর্মীয়-রাজনৈতিক বয়ান (যা ইতিহাসের নির্দিষ্ট অংশের সাথে সম্পর্কিত, যেমন মধ্যযুগীয় আরব-ইহুদি সম্পর্কের জটিল ইতিহাস) বিদ্যমান থাকে, প্রোটোকলসের মতো একটা “আধুনিক প্রমাণ” সহজেই সেই কাঠামোর মধ্যে বসে যায় – এটাকে নতুন কিছু মনে হয় না, বরং পুরনো বিশ্বাসেরই “নিশ্চিতকরণ” মনে হয়।

তৃতীয়ত, যাচাইয়ের অভাব। প্রোটোকলস বা রথচাইল্ড সংক্রান্ত দাবিগুলো মূলধারার ঐতিহাসিক গবেষণা, সাংবাদিকতা বা আদালতের রায়ের বিপরীতে যাচাই করার মতো অভ্যাস বা সুযোগ অনেক শ্রোতার কাছে সীমিত – বিশেষত যখন তথ্যের উৎস আরবি বা উর্দু-ভাষী ধর্মীয় সাহিত্য, যা মূলধারার পশ্চিমা বা ইংরেজি গবেষণার নাগালের বাইরে থেকে যায়।

একটি ভুয়া দলিল, একটি বাস্তব ক্ষতি

প্রোটোকলস অব দ্য এল্ডার্স অব জায়ন নিয়ে ঐতিহাসিক রেকর্ড সম্পূর্ণ স্পষ্ট – এটি জারের রাশিয়ার গোপন পুলিশ কর্তৃক তৈরি একটি প্রমাণিত জালিয়াতি, যা পরবর্তীতে নাজি জার্মানি ব্যবহার করেছে, এবং যা আজও বিশ্বব্যাপী ইহুদি-বিদ্বেষের প্রধান উৎসগুলোর একটি হিসেবে টিকে আছে।

কিন্তু এই দলিলের জালিয়াতি প্রমাণিত হওয়া সত্ত্বেও এর প্রভাব মুছে যায়নি – কারণ এটি শুধু একটা টেক্সট নয়, এটি এখন একটা বিশ্বাস-কাঠামোর অংশ হয়ে গেছে, যা রাজনৈতিক হতাশা, ঔপনিবেশিক ইতিহাস, এবং কিছু ক্ষেত্রে ধর্মীয় বয়ানের সাথে জড়িয়ে গেছে। একে ভাঙা তাই শুধু “এটা মিথ্যা” বলে দেওয়ার বিষয় নয় – এর জন্য প্রয়োজন ইতিহাসের প্রকৃত উৎস বোঝা, এবং সাহস করে প্রশ্ন তোলা, এমনকি যখন সেই দাবির উৎস প্রশ্নাতীত কর্তৃত্বের আসনে বসা কেউ হন।


তথ্যসূত্র (নির্বাচিত):
  • ADL, “A Hoax of Hate: The Protocols of the Learned Elders of Zion”
  • US Holocaust Memorial Museum, Holocaust Encyclopedia
  • MEMRI, “A European Plot on the Arab Stage: The Protocols of the Elders of Zion in the Arab Media”
  • My Jewish Learning, “Protocols of the Elders of Zion”
  • World Jewish Congress, Carmen Matussek বিশ্লেষণ
  • Matthias Küntzel, Jihad and Jew-Hatred (2007)
  • Brandeis University, Stephen Whitfield সাক্ষাৎকার

Related Posts

For 125 years, the Islamic world has been spinning on the basis of a single false key!

Once I was listening to a sermon by Professor Mufti Kazi Ibrahim Huzur where heRead More

Muhammad and Khadiza

Why did the Prophet Muhammad not marry anyone else while Khadija was alive?

The prophet Muhammad had 9–13 wives and 4+ sex slaves. There are also historical accountsRead More

Muhammad and Khadiza

খাদিজা বেঁচে থাকতে নবী মুহাম্মদ আর কোন বিয়ে করেননি কেন?

নবী মুহাম্মদের ৯-১৩ স্ত্রী, ৪+ যৌনদাসী ছিল। তথাকথিত জিহাদের সময় কারো বাবা-ভাই-স্বামী-আত্মীয়দের হত্যা করে ঐRead More

Comments are Closed