
California and Bangladesh
জনগণের জন্য সুযোগ বাড়ালে সেটা ক্ষতি হয় না, দেশেরই কাজে লাগে
ক্যালিফোর্নিয়ায় এখন এই ফুলের মৌসুম। নামটা ঠিক জানি না, তবে তিন বছর আগে সেখানে গিয়ে আমি যে ছবিটি তুলেছিলাম, সেই দৃশ্য আজও মনে পড়ে। ক্যালিফোর্নিয়ার প্রতি আমার আলাদা এক আবেগ আছে – কারণ আমার বাবা চিরনিদ্রায় শুয়ে আছেন সেখানকার ধু-ধু পাথুরে মরুভূমিতে, লস অ্যাঞ্জেলেস থেকে প্রায় ২০০ কিলোমিটার দূরে। জীবিত থাকতেই তিনি বলে গিয়েছিলেন, মৃত্যুর পর যেন তার লাশ বাংলাদেশে না নেওয়া হয়। গরিব মানুষের বাস্তবতা – বড় খরচ, অযথা ঝামেলা – এসব তিনি এড়াতে চেয়েছিলেন। আর জন্মভূমির প্রতি তার এক ধরনের আক্ষেপ তো ছিলই। দেশে একসময় হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক হিসেবে তিনি পুরো একটি স্কুল শূন্য থেকে দাঁড় করিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি বা তার মতো সৎ মানুষরা এই দেশে সম্মানের সঙ্গে বাঁচার মতো প্রেরণা বা সুযোগ পাননি – এই বেদনা তিনি সারাজীবন বয়ে বেড়িয়েছেন।
আজকের প্রসঙ্গ অবশ্য ভিন্ন। ক্যালিফোর্নিয়া যদি একটি স্বাধীন দেশ হতো, তবে তাদের অর্থনীতির আকার হতো বিশ্বের তৃতীয় বা চতুর্থ – যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের পরেই। ভারত তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি বলে দাবি করলেও সেই দাবি অনেকটাই ফাঁপা; সুপিরিওরিটি কমপ্লেক্সের ফুঁটা বেলুনের মতো। বাস্তবে এই অবস্থান জাপান ও জার্মানির সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে ক্যালিফোর্নিয়াই ধরে রেখেছে।
মাইক্রোসফট, অ্যাপল, গুগল, ফেসবুক, এনভিডিয়া, এ্যাডোবি – বিশ্বের প্রায় সব বড় টেক জায়ান্টের সদর দপ্তর ক্যালিফোর্নিয়ায়। কিন্তু শুধু প্রযুক্তিই নয়, ক্যালিফোর্নিয়ার অর্থনীতির আরেকটি বড় স্তম্ভ হলো প্রতিবেশী মেক্সিকো ও লাতিন আমেরিকার দেশগুলো থেকে আসা আনডকুমেন্টেড অভিবাসীরা। আমি “অবৈধ” বলতে চাই না – মানুষ কখনো অবৈধ হয় না। এরা কৃষি, নির্মাণ, ফুড চেইন, রিটেইল, ছোট ইঞ্জিনিয়ারিং, সার্ভিস – সব ক্ষেত্রেই শ্রম দিয়ে অর্থনীতিকে সচল রাখে। জনসংখ্যার বড় অংশই ঐতিহাসিকভাবে এদেরই আত্মীয়-স্বজন। তাই সেখানে স্প্যানিশ ভাষা প্রায় ইংরেজির সমান ব্যবহৃত হয়। স্কুল, অফিস, হাসপাতাল – সব জায়গায় ডকুমেন্ট থাকে ইংরেজি ও স্প্যানিশ দুই ভাষায়। কেউ যদি ক্যালিফোর্নিয়ায় ক্যারিয়ার গড়তে চান, স্প্যানিশ শেখা নিঃসন্দেহে কাজে লাগবে।
ক্যালিফোর্নিয়াকে বলা হয় গোল্ডেন স্টেট – আমেরিকার সবচেয়ে ধনী ও মানবিক স্টেট। বহু বছর ধরেই সেখানে ১৯ বছরের কম বয়সী শিশু, ৪৯ বছরের বেশি বয়সী প্রাপ্তবয়স্ক এবং যেকোনো বয়সের গর্ভবতী নারীর চিকিৎসা প্রায় সম্পূর্ণ ফ্রি। পরিবারের আয় কম হলে স্টেট মেডিক্যাল ইন্সুরেন্স ওষুধ, ভ্যাকসিন, ডাক্তার দেখানো, ল্যাব টেস্ট, হাসপাতালের খরচ, এমনকি যাতায়াতের ট্যাক্সি ভাড়া পর্যন্ত বহন করে। একসময় ক্যালিফোর্নিয়া আমেরিকার প্রথম স্টেট হিসেবে ১৯–৪৯ বছর বয়সীদেরও, ডকুমেন্টেড বা আনডকুমেন্টেড – সবার জন্য ফ্রি চিকিৎসা চালু করেছিল। পরে ট্রাম্প প্রশাসন ফেডারেল মেডিক্যাল বাজেট কমিয়ে দিলে গ্রিন কার্ড ও সিটিজেন ছাড়া এই বয়সী মানুষের সুবিধা বন্ধ হয়ে যায়। তবে এ বছর তারা আবার ২০২৭ সাল থেকে সেই সুবিধা পুনরায় চালুর জন্য বিল এনেছে, এবং ধারণা করা হচ্ছে বিলটি পাস হবে।
ক্যালিফোর্নিয়া হিসাব করে দেখেছে – ফ্রি চিকিৎসা দিলে যে লাভ হয়, না দিলে তার ক্ষতি আরও বেশি। শ্রমজীবী মানুষই অর্থনীতির মেরুদণ্ড; তাদের সুস্থ রাখা মানে উৎপাদনশীলতা বাড়ানো। তাই ফেডারেল বাজেট কমে গেলেও তারা নিজেদের তহবিল দিয়ে এই সুবিধা ফিরিয়ে আনতে চায়। জনগণকে একটু বেশি সুবিধা দেওয়া – এমনকি ফ্রি সুবিধা দেওয়া – শেষ পর্যন্ত দেশেরই লাভ। সরকারের খরচ বাড়লেও দীর্ঘমেয়াদে তা অর্থনীতিকে শক্তিশালী করে – এটাই তাদের অর্জিত অভিজ্ঞতা।
বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী বলেন – ট্যাক্স বাড়াতে হবে। কিন্তু বাংলাদেশ শুধু ট্যাক্স বাড়াতেই চায়; জনসেবার নামে তেমন কিছুই হয় না। আমি একসময় লিখেছিলাম – ঢাকার নিম্ন আয়ের শ্রমজীবী মানুষের জন্য পরিবহন ফ্রি করে দেওয়ার কথা। ক্যালিফোর্নিয়ার বেশিরভাগ শহরে মেট্রো বাস ও ট্রেন বৃদ্ধ, ছাত্র, নিম্ন আয়ের মানুষদের প্রায় ফ্রি রাইড দেয়। কুয়ালালামপুরসহ বিশ্বের অনেক দেশেই এমন সুবিধা আছে। এটি দিলে মানুষের পারচেজিং ক্যাপাসিটি বাড়বে, অর্থনীতি চাঙ্গা হবে, ট্রাফিক কমবে। ধরো ২০০ বাস সারাদিন চলবে, ফ্রিতে যাত্রী নেবে – এতে ক্ষতি নয়, বরং শহর ও দেশেরই লাভ। একইভাবে শ্রমিকদের চিকিৎসাকে ইন্সুরেন্সের আওতায় এনে ফ্রি করা জরুরি। কিন্তু প্রশ্ন হলো – এমন চিন্তা কে করবে? এমন উদ্যোগ নেবে কে?
Related Posts

People’s Arabic names are not the property of Allah or Muhammad. Stop demanding that others change their names
One fine morning you log into Facebook and see that everyone—from Mokhles, the tea sellerRead More

মানুষের আরবি নাম আল্লাহ বা মুহাম্মদের সম্পত্তি না, নাম পাল্টে রাখার আবদার বাদ দিন
ওয়ান ফাইন মর্নিং ফেসবুকে ঢুকে দেখলেন, ভুরুঙ্গামারির চায়ের দোকানদার মোখলেস থেকে শুরু করে বুয়েটের ডিগ্রিRead More

Chinmoy Krishna Prabhu or Enayetullah Abbasi?
From Bonn in Germany, I reached a local station to catch the last train toRead More

Comments are Closed