Can women stop rape

Can women stop rape ?

নারীরা চাইলেই ধর্ষন প্রতিরোধ করতে পারেন ?

একটা কাজ নিয়ে বসলেও এসব সামনে চলে আসে। কাজে কিভাবে মনোযোগ দেই এত শত অমানবিক মানুষের সমাজে বাস করে ? লেখাটি অনেক বড়। তাই অনেক অংশে ভাগ করেছি। কারো পুরোটা পড়তে ইচ্ছা না হলে সে কোন অংশ পড়তে পারে।

# চিন্তা করা কঠিন, আর তাই বেশীরভাগ মানুষ আগে বিচার করতে বসে, চিন্তা করতে নয়

কার্ল গুস্তাভ ইয়ুং ( Carl Gustav Jung ) একজন নামকরা সুইস মনোবিজ্ঞানী। মনোবিজ্ঞানে তিনি একজন ডন, এতটাই প্রভাবশালী। তার একটা উক্তি এমন, “চিন্তা করা কঠিন, আর তাই বেশীরভাগ মানুষ আগে বিচার করতে বসে, চিন্তা করতে নয়।” আমরা মূল সমস্যা চিহ্নিত না করে আগেই ফাঁসি চাই। এত এত ক্রসফায়ার, ফাঁসি, জেল এসবে কি ধর্ষনের মত অপরাধ কমেছে ? একজন অপরাধী তার প্রাপ্য শাস্তি জেল, ফাঁসি এগুলো পাবে। সভ্য সমাজে শাস্তি পেতেই হয় প্রত্যেক অপরাধীকে। কিন্তু অপরাধ কমানোর কোন ব্যবস্থা করা গেলে অপরাধীর সংখ্যাও কমে যায়, কেউ ভিক্টিম হয়ে পৃথিবী ত্যাগ করে না বা সারাজীবন পৃথিবীকে ঘৃনা করে বেঁচে থাকা লাগেনা। সেজন্য অপরাধের কারন খোঁজা জরুরী। ফাঁসি, জেল হবে, পাশাপাশি দেশে কেন এত ধর্ষন বেড়ে গেছে তাও বের করতে হবে। পৃথিবীতে ধর্ষন ও ধর্ষকের মনস্তত্ত্ব নিয়ে গবেষণা খুব কম হয়েছে। উন্নত দেশগুলোতেও খুব কম।

# যাদের সাজা হয়েছে, তারা আসলে ‘জেনারেলিস্ট’। যারা অপরাধ করেও পার পেয়ে গিয়েছে, তারা এ বিষয়ে ‘স্পেশালিস্ট’

আমাদের সমাজে এই স্পেশালিস্ট এর সংখ্যাই বেশী। যে দু-একটা আমরা জানি সেগুলো ঐ জেনারেলিস্ট ক্যাটাগরির।

ধর্ষণ বিষয়ে আমাদের সমাজে প্রচলিত ধারণাগুলো প্রায়শই ভুল এবং অতিকথনে ভরা। যদিও নারী শিক্ষা, নারী আন্দোলন ও এতদসংশ্লিষ্ট অন্যান্য কার্যক্রমের ফলে ধর্ষণ বিষয়ে আগের চেয়ে অনেক বেশি খোলামেলা কথা বলা হচ্ছে, তবে সেগুলোর বেশিরভাগটাই আবেগতাড়িত। আশার কথা হলো, ধর্ষণ বিষয়ে মানুষের মাঝে সচেতনতা বেড়েছে; গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ধর্ষণ বিষয়ে আগের চেয়ে অনেক বেশি আলোচনা হয়; এমনকি আইনও পরিবর্তন করা হয়েছে। কিন্তু এতোকিছুর পরেও ধর্ষণ রয়ে গিয়েছে পৃথিবীর সবচেয়ে কম রিপোর্টিং হওয়া অপরাধের শীর্ষের দিকে। যুক্তরাষ্ট্রের মত দেশেও মাত্র ৩৪.৮ শতাংশ ধর্ষণের রিপোর্ট হয়। বাংলাদেশে ধর্ষণের কোন সরকারী পরিসংখ্যন নেই। কিন্তু এটা নিশ্চিত করে বলা যায় যে, আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে, যেখানে ধর্ষণের সাথে ভয়াবহ ভিকটিম শেইমিং (shaming) জড়িত, সেখানে এ ধরণের অপরাধে না-হওয়া রিপোর্টের হার আরো অনেক বেশি। মানে আমরা যে ধর্ষণ সম্পর্কে জানি, বাস্তবে ঘটছে তার চেয়ে অনেক গুণ বেশী।

ধর্ষণের কারণ ও ধর্ষকের মনঃস্তত্ব বিষয়ে আমাদের বেশিরভাগ মানুষের চিন্তা-চেতনা এখনও কিছু বাঁধাধরা (stereotyped) ধারণায়ই সীমাবদ্ধ। এর জন্য কিছুটা হলেও দায়ী ধর্ষকের আচরণজনিত গবেষণার অপ্রাচুর্যতা। উন্নত বিশ্বে এ বিষয়ে কিছু গবেষণা হলেও তা ছিল অসম্পূর্ণ, কারণ গবেষকরা কেবল সেই সব অপরাধীর কাছেই পৌঁছাতে পারতেন যারা বিচারে দোষী সাব্যস্ত হয়েছে। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নেইল মালামুথ (Neil Malamuth) এ বিষয়ে বলেন, “যাদের সাজা হয়েছে, তারা আসলে ‘জেনারেলিস্ট’। যারা অপরাধ করেও পার পেয়ে গিয়েছে, তারা এ বিষয়ে ‘স্পেশালিস্ট’।” সম্প্রতি দু’একটি গবেষণায় গবেষকরা বেনামী সার্ভের মাধ্যমে এসব ‘স্পেশালিস্টদের’ কাছে পৌঁছেছেন এবং তাদের কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য নিয়েছেন।

পশ্চিমা বিশ্বের সমাজ ও সমাজব্যবস্থার সাথে আমাদের সমাজের রয়েছে বিস্তর পার্থক্য, তাই সেখানকার অপরাধ-প্যাটার্ন ও অপরাধী-মনস্তত্ব আমাদের সাথে খুব কমই মিলবে। কিন্তু তাদের গবেষণার অনেকাংশ সব সমাজের ও সব দেশের জন্যই প্রযোজ্য।

# ধর্ষণ কি ?

ধর্ষনের সংজ্ঞা-সূচক হল অসম্মতি। অসম্মতিসূচক যৌনমিলন – সে চাপ প্রয়োগে হোক আর শক্তি প্রয়োগেই হোক, ভিকটিম-এর শারীরিক ক্ষতি হোক বা না হোক, যার অসম্মতিতে যৌনকার্য করা হচ্ছে সে বিবাহিত স্ত্রী হোক, রাস্তার পতিতা হোক, নিজে স্ত্রী হোক বা অন্য কোন নারী হোক – শারীরিক আক্রমন (physical assault) বলে বিবেচিত এবং তা ধর্ষণ।

একজন পুরুষ একজন নারীর যৌনতায় তিন ভাবে অভিগমন লাভ করতে পারেঃ সম্মতি, চাপ প্রয়োগ ও শক্তি প্রয়োগ।

সম্মতিসূচক যৌনতায় উভয়ে আলোচনার মাধ্যমে সাগ্রহে অংশগ্রহণ করে থাকে। ধরুন আপনি একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষের সঙ্গে তার সম্মতি নিয়ে যৌনতা করলেন। সেটা ধর্ষণ নয়। আবার আপনি যৌনকর্ম করার জন্য আপনার অফিসের কর্মী বা কোন বন্ধুর অসহায়ত্ব বা অরক্ষিত অবস্থাকে কাজে লাগিয়ে তার অনিচ্ছায় যৌনতা করলেন। সে বাঁধা দেয়নি । তাহলে সেটা কি হবে ? এটা চাপ প্রয়োগে ধর্ষণ। শক্তি প্রয়োগের ক্ষেত্রে ভিকটিম-এর রাজী হওয়ার প্রশ্ন নেই, রয়েছে তার শারীরিক ও মানসিকভাবে ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা, এমনকি জীবননাশের হুমকিও। আর অপ্রাপ্তবয়স্ক বা শিশুর সঙ্গে তার সম্মতি নিয়ে তার ইচ্ছায় বা সম্মতি না নিয়ে শক্তি প্রয়োগ করে যৌনকর্ম করাও ধর্ষণ।

# ভিক্টিমের সাজ পোশাক কি ধর্ষনের কারন ?

ধর্ষক সম্পর্কে বেশিরভাগ মানুষের একটি সাধারণ ধারণা যে ধর্ষক একজন কামুক পুরুষ যে ভিকটিমের উত্তেজক অঙ্গভঙ্গি বা সাজ-পোশাকে উত্তেজিত হয়ে ধর্ষণের মতো অপরাধ করে থাকে । সাম্প্রতিক বিভিন্ন গবেষণা ও ধর্ষণের পরিসংখ্যান বলে ধর্ষণের সঙ্গে ভিক্টিমের সাজ পোশাকের কোন সম্পর্ক নেই। ৫ মাস বয়সী শিশু থেকে ৯৯ বছরের বৃদ্ধা, রাস্তার পতিতা থেকে পর্দানশীন নারী কেউ বাদ যাচ্ছে না ধর্ষণ থেকে। বরং এই দোষারোপ করে ধর্ষণের পক্ষে সাফাই গাওয়া হয়। যারা সাফাই গায় তারা সবাই সম্ভাব্য ধর্ষক, উপযুক্ত পরিবেশ ও সুযোগের অভাবে তারাও ওৎ পেতে থাকে। তাদের টার্গেটকে সঠিক পরিবেশে, সঠিক জায়গায় পেলে তারা তাদের দায়িত্ব সম্পাদন করে।

# ধর্ষণ হলো শক্তি ও ক্রোধের যৌন বহিঃপ্রকাশ

জেনে রাখুন, যৌনতা কোন ধর্ষকের প্রাথমিক বা প্রধান লক্ষ্য থাকে না। এটাই গবেষণায় প্রমান হয়েছে। দূর্বলের উপরে শক্তি প্রয়োগের ক্রোধ দেখিয়ে ধর্ষক উল্লাসিত হয়। দূর্বল নারীর উপর পুরুষের শক্তি প্রয়োগ, শিশুর উপর শিক্ষকের বলাৎকারের শক্তি প্রয়োগ এসব। ২/৫ মিনিটের যৌনতার জন্যই শুধু একজন মানুষ এতটা নীচে নামে না। তাহলে ধর্ষক কি একজন হতাশ পুরুষ যে ধর্ষণের মাধ্যমে যার অবদমিত কাম প্রকাশ করে, অথবা সে একজন বিকৃত মানসিকতার (perverted) কামোন্মত্ত পুরুষ যে স্বাভাবিক যৌনতায় সন্তুষ্ট নয় ? এই সবগুলো দৃষ্টিভঙ্গিতেই ধর্ষকের আচরণ সম্পর্কে যে সাধারণ ভুলটি করা হয় তা হল- ধর্ষক ‘যৌনতাড়িত’ হয়ে ধর্ষণ করে এবং ধর্ষণের মাধ্যমে সে তার ‘যৌন চাহিদা’ পূরণ করে। কিন্তু ধর্ষণ সম্পর্কিত ক্লিনিক্যাল স্টাডি বলে যে, ধর্ষণের সাথে আর যা-ই থাকুক, যৌনতা তার প্রাথমিক বা প্রধান লক্ষ্য নয়। ধর্ষণ হলো শক্তি ও ক্রোধের যৌন বহিঃপ্রকাশ। জবরদস্তিমূলক যৌনকার্যের প্ররোচনা কোনভাবেই যৌন চাহিদা থেকে আসে না, এটা আসে প্রতিশোধ ও প্রতিহিংসা থেকে। ধর্ষণ করে ধর্ষক একটা পৈশাচিক আনন্দ পায় যা তাকে শক্তিমান হিসাবে তুষ্ট করে। ধর্ষণকে যৌনকামনার প্রকাশ হিসেবে দেখা কেবল অসঠিকই নয়, এটা এক প্রকার প্রতারণাও, কারণ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ধর্ষণের দায় ধর্ষিতার ওপরে ঠেলে দেয়ার প্রচেষ্টা হয়। ধর্ষণের সাথে যে যৌনতার প্রাথমিক কোন সম্পর্ক নেই, সেটা আরো স্পষ্ট হয় ভিকটিমকে শারীরিকভাবে ক্ষত-বিক্ষত করা কিংবা হত্যা থেকে। ধর্ষণের সঙ্গে তার জীন পরবর্তী প্রজন্মে রেখে যাওয়ার বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞানও ধোপে টিকে না। ধর্ষণ যৌন উত্তেজনার ফল এবং যার ভিত্তি হতাশা অথবা অবদমিত কাম – এই জনপ্রিয় কিন্তু ভুল বিশ্বাস ধর্ষণ, ধর্ষক এবং ভিকটিম – এই সম্পর্কিত সকল বিষয়গুলোতেই ভুল ধারণার জন্ম দিয়েছে এবং তা যুগ যুগ ধরে চলে আসছে।

# ভিকটিম সম্পর্কিত ভুল ধারণা ও ভিকটিম কে দোষারোপের যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে দেশে – এটাই ধর্ষণ বেড়ে যাওয়ার সবচেয়ে বড় কারন

কি ? নিজেকে সভ্য দাবী করছেন ? মোশারফ করিম কে কত গালিই তো দিয়েছিলেন মেয়ের পোশাক পরার স্বাধীনতা নিয়ে কথা বলায়। আপনাদের সংখ্যা কিন্তু বেশী। সম্ভাব্য ধর্ষক সবাই। ধর্ষণ সম্পর্কে সবচয়ে প্রচলিত ভুল ধারণা হলো ভিকটিমের ধর্ষককে প্ররোচিত করা। ভাবটা এমন যে, নারীটি ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃতভাবে তার অঙ্গভঙ্গি বা এরকম কিছুর মাধ্যমে পুরুষটির যৌনতাকে জাগিয়ে তুলেছিল বলেই পুরুষটি ধর্ষণ করতে বাধ্য হয়েছে।

ধর্ষণের ক্ষেত্রে প্রলোভন (seduction) বা প্ররোচনা (provocation) খুবই হাস্যকর, কারণ ধর্ষকের শিকারের তালিকায় কেবল নারী থাকে না, থাকে বালক এবং শিশু থেকে বৃদ্ধ সব বয়সের নারী। গত কয়েক মাসে বাংলাদেশের পত্রিকাগুলোতে যে সকল শিশু ধর্ষণের খবর এসেছে, তাদের মধ্যে বেশ উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ছিল বালক। আর সর্বনিম্ন বালিকাটির বয়স ছিল দেড় বছর। শিশু ধর্ষনের খবর আজকাল এতোই নিয়মিত যে, এগুলো এখন আর মানুষের নজর কাড়ে না। এ প্রসঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের আলোচিত নান ধর্ষণ কেসটি উল্লেখ করার দাবি রাখে। রানাঘাটের সেই হতভাগ্য নানের বয়স ছিল ৭২ বছর। একটি নয় মাসের শিশু কিংবা একজন ৭২ বছরের বৃদ্ধাকে দেখে কোন পুরুষ যৌন উত্তেজনা লাভ করতে পারে, এটা কেবল একজন উন্মাদের পক্ষেই ভাবা সম্ভব।

হ্যাঁ, যারা ধর্ষণের জন্য নারীর সাজ-পোশাক, অঙ্গভঙ্গি বা চলাফেরাকে দায়ী করেন, তারাও ধর্ষকের মতোই অশিক্ষিত এবং বিকৃত-মস্তিষ্কের মানুষ। তারাও তাদের অভ্যন্তরে ধর্ষকের মতোই ‘সাপ’ বহন করে চলেন এবং সুযোগ পেলে তারাও ছোবল মারবেন। মনোবৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গেছে, সত্যিকারার্থেই প্রতিটি ধর্ষক এক প্রকার মানসিক অস্বাভাবিকতা (mental dysfunction) নিয়ে চলে। যারা ধর্ষণের জন্য নারীকে দোষারোপ করে, ধর্ষকদের সাথে তাদেরও মানসিক চিকিৎসা প্রয়োজন, কারণ তারা প্রত্যেকেই একেকজন সম্ভাব্য ধর্ষক (sexually dangerous person).

# নারীরা চাইলেই ধর্ষন প্রতিরোধ করতে পারেন ?

ব্যাগে ব্লেড রেখে লিঙ্গ কর্তন ? শিশু, বৃদ্ধা এরা কিভাবে করবে সেটা ? অনেকে এটা মনে করেন যে, নারীরা যদি সত্যিই চায়, তাহলে ধর্ষিত হওয়ার হাত থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারে। যারা এমনটা বলেন, তারা এটা ভেবে দেখেন না যে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ধর্ষণ করা হয় অস্ত্রের মুখে ভীতি প্রদর্শন করে, শারীরিক ক্ষতির হুমকি দিয়ে অথবা দানবিক শক্তি ব্যবহার করে। এক্ষেত্রে আক্রমণকারীকে প্রতিহত করতে চাওয়া তাকে আরো আক্রমনাত্মক করে তুলতে পারে। ভিকটিমের প্রতিরোধ হয় তো দু’একজনকে ফিরাতে পারে, কিন্তু বিপরীতটা হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। তার চিৎকারে একজন হয় তো পালাবে, কিন্তু অন্যজন যে তার গলায় ছুরি বসাবে না এমন নিশ্চয়তা নেই। মা’কেই যেখানে বলতে হয়, “বাবারা তোমরা এক এক করে আসো, আমার মেয়েটে ছোট, ও মারা যাবে,” সেখানে প্রতিরোধের চিন্তা অবাস্তব কল্পনা।

# কলঙ্ক বা ভিকটিম শেমিং (Victim Shaming)

এটা দেশে ধর্ষণ বাড়িয়েছে অনেক। স্বল্প পোশাক নয়, মেয়েদের উগ্র চলাফেরা নয়। সমাজে মেয়েদের এই কলঙ্কের ভয় অনেক ধর্ষক বাড়িয়েছে। যৌন অপরাধের সবচেয়ে খারাপ দিক হলো ধর্ষন-পরবর্তী কলঙ্ক বা শেমিং-এর ভয়। ধর্ষণের পরে ভিকটিম এক ভয়ংকর শারীরিক ও মানসিক আঘাত (trauma) পান। তাঁর এই ট্রমা আরো বাড়িয়ে দেয় শেমিং-এর ভয়। ভিকটিমের জন্য যখন প্রয়োজন সহানুভূতি ও সহমর্মিতা, তখন মানুষ কলঙ্কের বোঝা চাপিয়ে তাঁর কষ্টকে আরো বাড়িয়ে তোলে। ভিকটিম শেমিং কেবল বাইরের মানুষদের থেকে আসে না, নিজ পরিবার এবং আত্মীয়-স্বজনও এতে সমানতালে অংশগ্রহণ করে। ভিকটিম যদি বিবাহিত হন কিংবা বাগদত্তা হন, তবে ভয় থাকে স্বামী কর্তৃক পরিত্যাগ বা বিয়ে ভেঙে যাওয়ার। আর অবিবাহিত হলে অনিশ্চিৎ হয়ে পড়ে ভবিষ্যতে ভাল কোথাও বিয়ে হওয়া। এবং ভিকটিম যদি পারিবারের সদস্য বা নিকট আত্মীয়দের দ্বারা যৌন নিগ্রহের শিকার হন, তবে শেমিং-এর ভয়ে মুখ খুলতেই সাহস পান না।

যুক্তরাষ্ট্রে পারিবারিক যৌন নিগ্রহের শিকার হওয়াদের নিয়ে কাজ করে এমন একটি সংস্থার নাম Laura’s House. লরা’স হাউজের সিইও ও নির্বাহী পরিচালক মার্গারেট বেস্টন (Margaret Bayston) বলেন, “ভিকটিম শেমিং এর একমাত্র কারণ অজ্ঞতা। আর এর সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো, ভিকটিম মনে করে যে, কেউ তাকে বিশ্বাস করবে না। তাই সে কাউকে জানায় না। আর পরবর্তীতে এই না-জানানোর জন্যও তাকে দোষ দেয়া হয়।“

ভিকটিম শেমিং-এ একটি বহুল ব্যবহৃত শব্দ ‘পতিতা বা বেশ্যা’—নারীটি পতিতার মতো আচরণ করেছেন বলেই যৌন নিগ্রহের শিকার হয়েছেন। পতিতা-কলঙ্কের ভয়ে বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে ঘটা অধিকাংশ যৌন অপরাধই অপ্রকাশিত থেকে যায়। ধর্ষনের অপরাধীরা ঠিক এই সুযোগটাই নেয় এবং তাদের অপকর্ম চালিয়ে যায়। বেশিরভাগ অপরাধীকে বিচারের কাঠগড়ায় নিতে না পারার কারণও এটি। আর যে সকল ঘটনা প্রকাশিত হয়ে যায়, কলঙ্কের হাত থেকে বাঁচতে তাদের মধ্যে অনেকই বেছে নেন আত্মহত্যার পথ।

ভিকটিম শেমিং-এর ভয়াবহ রূপ দেখা যায় আদালতেও। বিপক্ষ উকিলের প্রচেষ্টা থাকে নারীটিকে ‘দুশ্চরিত্রা’ প্রমাণ করানোর, যেন ভিকটিমকে বহুগামী প্রমাণ করতে পারলেই অপরাধীটি ধর্ষণের অপরাধ থেকে মুক্ত হয়ে যাবে। ধর্ষণ বিষয়ক বাস্তবতা এমন নয়। নারীটি বহুগামী হোক কী পতিতা হোক, তাতে ধর্ষকের অপরাধ একটুও কমে না, কারণ পতিতারাও ধর্ষণের শিকার হন।

# ধর্ষকের মনস্তত্ব বোঝাটা জরুরী, আগামী প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য পৃথিবীর জন্যই এই গবেষণা দরকার

দেখুন একজন ধর্ষক কে শাস্তি দেয়াটা বড় কোন সমাধান নয়। একজন ধর্ষক উৎপাদন কমানোটা সাফল্য। তাহলে একজন শিশু সামিয়া ধর্ষনের শিকার হয়ে পৃথিবী ছেড়ে যাবে না। ঐ ধর্ষক যদি উৎপাদিত না হতো এ সমাজে তাহলে সামিয়া আজ হেসে খেলে পৃথিবীতে থাকত। যুক্তরাষ্ট্রের গবেষকরা দেখেছেন যে, ধর্ষণ প্রতিরোধে কেবল অপরাধ-বিচার ব্যবস্থা (criminal conviction system)-এর ওপর নির্ভরশীলতা, মানে অপরাধীকে কারাগারে প্রেরণ, যথেষ্ট নয়। সাথে প্রয়োজন রয়েছে অপরাধীর মনস্তত্বকে বোঝা ও সে-অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ যেন সমাজের এই ক্যান্সারগুলো নিরাময় করা যায়। যুক্তরাষ্ট্রের সাইকোলোজি অব ভায়োলেন্স সাময়িকীর সম্পাদক প্রফেসর শেরি হ্যামবি (Sherry Hamby) এ ব্যাপারে বলেন, “তুমি যদি অপরাধীকে না বুঝতে পার, তবে যৌন হিংস্রতাকে কখনোই বুঝতে পারবে না।” বাংলাদেশের মনোবিজ্ঞানীদের এই ধর্ষকদের নিয়ে গবেষণা করা উচিৎ। সরকারকেই সেই সুযোগ সুবিধা করে দিতে হবে।

# ধর্ষক, দূর্নীতিবাজ, ঘুষখোর, খুনি সহ সব অপরাধীই মারাত্মক রকমের মানসিক সমস্যার মধ্য দিয়ে যায়

অপরাধীর মনস্তত্ব বোঝার চেয়ে ধর্ষণকে প্রায়শই পরিস্থিতি-ফ্যাক্টর হিসেবে দেখা হয় এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বিচারব্যবস্থার মাধ্যমে নিস্পত্তি করা হয়। ফলে এটি একদিকে যেমন মানসিক চিকিৎসকের নজর কাড়েনি, তেমনি মানসিক চিকিৎসকগণও এ বিষয়ে প্রশিক্ষণ বা দক্ষতা কোনটাই অর্জন করেননি। ধর্ষণের কেস স্টাডি থেকে দেখা গেছে, সত্যিকারার্থে ধর্ষকের খুব মারাত্মক রকমের মানসিক সমস্যা রয়েছে যার কারণে সে নারীকে সহজ-দৃষ্টিতে দেখতে পারে না। তাদের অনেকেই অন্য মানুষদের সাথে ভালবাসা, বিশ্বাস, সহানুভূতি বা সমবেদনা পাওয়ার মতো কোন সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারে না। যদি কোন সম্পর্ক থাকেও, সে সম্পর্কের মধ্যে পারস্পরিক আদান-প্রদান বা আন্তরিক ভাগাভাগি (genuine sense of sharing) থাকে না। এক কথায়, প্রতিটা অপরাধীই এক প্রকার মানসিক অস্বাভাবিকতার (mental dysfunction) মধ্য দিয়ে যায়, যা কখনও সাময়িক, কখনও দীর্ঘস্থায়ী এবং পূনরাবৃত্তিমূলক।

# ধর্ষকেরা উন্মাদ নয়। উন্মাদেরা অন্যায় কাজ করার জন্য সুযোগের অপেক্ষায় থাকে না, কিন্তু ধর্ষকেরা সময় ও সুযোগের অপেক্ষায় থাকে

যদিও ধর্ষক তার মানসিক বিশৃঙ্খলার (psychiatric disorder) বিভিন্ন স্তরে অপরাধ সংঘটিত করে থাকে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সে উন্মাদ (insane) নয়। উন্মাদেরা অন্যায় কাজ করার জন্য সুযোগের অপেক্ষায় থাকে না, কিন্তু ধর্ষকেরা সময় ও সুযোগের অপেক্ষায় থাকে। অনেকক্ষেত্রেই কে তার শিকার হবে, সেটি সে নির্দিষ্ট করে নেয় এবং অপরাধটি (ধর্ষণ) করার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে। সে এটা ভেবে দেখে না যে, সে যা করতে যাচ্ছে তার ফল কী হবে। অপরাধ পরবর্তী শাস্তি, তার নিজ পরিবারের অসম্মান, ভিকটিমের শারীরিক আঘাত, ইত্যাদি কিছুই তার মাথায় থাকে না। Men Who Rape: The Psychology of the Offender বইয়ের একটি সাক্ষাৎকারে একজন অপরাধীর বক্তব্য এমনঃ “আমার মনে হয়েছিল আমাকে বাইরে যেতেই হবে এবং এটা করতেই হবে। আমি বুঝতে পারছিলাম যে একদিন না একদিন আমি ধরা পড়বোই। আমি এটাও বুঝতে পারছিলাম যে, এর ফলে আমার বিয়ে, আমার চাকুরি, আমার স্বাধীনতা, সবকিছু নষ্ট হবে। তবুও আমাকে বেরুতেই হলো, যেন এক অদম্য শক্তি আমাকে নিয়ন্ত্রন করছিল তখন।”

# জীবনে একবার হলেও যে যৌন নিপীড়ন করেছে তাকে সারাজীবন নজরদারীতে রাখা দরকার

সম্প্রতি ধর্ষণ করেও পার পেয়ে যাওয়া ‘স্পেশালিস্টদের’ ওপরে গবেষণা করেন ওয়েন (Wayne) স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক মনোবিজ্ঞানী Antonia Abbey। তিনি দেখেছেন, যারা ধর্ষণ করে, তারা প্রথম যৌবন থেকেই দু’একটা যৌন অপরাধ (sexual assault) করতে শুরু করে, বিশেষ করে হাইস্কুল (বাংলাদেশের ক্ষেত্রে কলেজ) অথবা কলেজের (বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়) প্রথম দুই-এক বছরের মধ্যে, এবং তারা এটা শুরু করে পরিচিত কারো সাথে কিছুটা সীমা অতিক্রম (line crossing)-এর মাধ্যমে। এদের মধ্যে কিছুসংখ্যক একটা দু’টো অপরাধ করেই থেমে যায়। কিন্তু বাকিদের (কত শতাংশ তা জানা নেই) আচরণে হয় কোন পরিবর্তন ঘটে না, অথবা অপরাধ করার হার বেড়ে যায়।

উপরোক্ত গবেষণায় Antonia Abbey একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পর্যবেক্ষণ করেছেন, যে সকল পুরুষ প্রথমবার যৌন অপরাধ করার পরে অনুতপ্ত হয়েছে, তারা এটা বন্ধ করে দিতে পেরেছে। কিন্তু যারা উল্টো ভিকটিমকে দোষারোপ করেছে, তারা বন্ধ করতে পারেনি। পূনরায় অপরাধ করা এরকম একজনের উক্তি: “আমার মনে হয়েছে আমাকে যৌন উত্তেজিত করার শোধ তুলছি।“

Antonia Abbey-এর গবেষণা থেকে প্রাপ্ত ফল বাংলাদেশে ধর্ষণ বৃদ্ধির কারণটাকে খুব স্পষ্ট করে তোলে। যারা ধর্ষণের দায় ভিকটিমের ওপর চাপাচ্ছে, তারা খুব সহজেই, কোন রকম অনুতাপ বা ভিকটিমের প্রতি সহানুভূতি ব্যতীত, ধর্ষণ করতে পারে। যেহেতু আমাদের সমাজে ভিকটিমের ওপর দোষ-চাপানো মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, তাই ধর্ষকও বাড়ছে। এ ব্যাপারে আগেই বলেছি, এ ধরণের দোষারোপকারী প্রত্যেকেই একেকজন সম্ভাব্য ধর্ষক। তাদের সবাইকে সামাজিকভাবে, রাষ্ট্রীয়ভাবে নজরদারিতে রাখা প্রয়োজন।

বিশ্বের অনেক দেশেই ‘যৌনাচরণে ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তি আইন (Sexually Dangerous Persons Act)’ নামে একটি আইন আছে। যারা কোন যৌন অপরাধে একবার দণ্ডিত হয়েছে, তাদেরকে এই আইনের মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে চিহ্নিত করে নজরদারিতে রাখা হয়। প্রয়োজনে যারা অনলাইন ও অফলাইনে ভিকটিম দোষারোপ ও ভিকটিম শেমিং-এর অপপ্রচার চালায়, তাদেরকেও এই আইনে ঝুঁকিপূর্ণ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। ধর্ষক ও ধর্ষণে প্ররোচনা দেয়া ব্যক্তিদের আইনি, সামাজিক ও সাংস্কৃতিকভাবে মোকাবিলা করতে হবে।

# পতিতালয় দায়ী নাকি পতিতালয় না থাকা দায়ী ?

যেহেতু ধর্ষণ সম্পর্কে প্রচলিত ধারণা যৌনতার সাথে সম্পর্কিত, এর প্রতিরোধে যে সকল ব্যবস্থা সুপারিশ করা হয় তার বেশিরভাগই যৌনতাকে ঘিরে। অনেকে পতিতালয় বাড়ানোর কথা বলেন। বেশিরভাগ দেশেই পতিতালয় আছে, কিন্তু এটা কোন সমাধান দিচ্ছে না, কারণ আক্রমণকারী যৌন সন্তুষ্টির জন্য ধর্ষণ করছে না, আগেই বলেছি এটি একটি শক্তি প্রয়োগের ক্রোধ যা তার চেয়ে দূর্বল কোন নারীর উপরে প্রয়োগ করে। অনেকসময় পতিতারাও ধর্ষণের শিকার হচ্ছেন। একজনের কথা বলে ডেকে ১০ জন যৌনতা করছে বা ৫০০ টাকার কথা বলে ১০০ টাকা দিচ্ছে। পুলিশ, মাস্তান, নেতা এদের ফ্রিতে যৌনতা দিতে হচ্ছে বাধ্য হয়ে, এটাও পতিতাদের উপর ধর্ষণ।

# ধর্ষণের জন্য পর্নোগ্রাফির দায় কতটুকু ?

ধর্ষণের সাথে পর্নোগ্রাফির সহজলভ্যতাকেও দায়ী করা হয়। ধর্ষণের পিছনে রয়েছে ক্রোধ ও প্রতিহিংসা যা ভয়ংকর কোন মানসিক সমস্যার ফসল। পর্নোগ্রাফি যৌন উত্তেজক হতে পারে, কিন্তু নিশ্চয়ই তা ক্রোধ উত্তেজক নয়। গবেষণায় দেখা গেছে, ধর্ষকরা স্বাভাবিক পুরুষদের চেয়ে কম পর্নোগ্রাফি দেখে থাকে। (অবশ্য পর্নোগ্রাফিকেও উৎসাহ দেয়া উচিত না। সাংস্কৃতিক দৃষ্টিতে পর্নোগ্রাফি কেবল নারীর জন্য অপমানজনকই নয়, এটা পুরুষের সেক্সিস্ট দৃষ্টিভঙ্গিরও প্রমাণ।) পাকিস্তান বিশ্বে গে পর্নো দেখায় শীর্ষে, জানিনা বালক ধর্ষণে পাকিস্তান শীর্ষে কিনা। পর্ণোগ্রাফি কুতত্ত্ব অনুযায়ী পাকিস্তান, আরব দেশগুলোর বালক ধর্ষণে শীর্ষে থাকার কথা।

ধর্ষণ সম্পর্কে ভুল ধারণাগুলো ধর্ষণের দায়কে ধর্ষক থেকে অন্যদিকে সরিয়ে দেয়। ধর্ষকও আসলে তাই চায়। সে নিজের দোষকে ঢাকতে মদ, মাদক, পোশাক, পর্নোগ্রাফি এবং ভিকটিমের আচরণের ওপর দোষ চাপিয়ে দেয়। সে স্বীকার করতে চায় না যে তার নিজের খুব বড় ধরণের মানসিক সমস্যা আছে।

# মা, বোন ডাকাও ধর্ষণপ্রবন সমাজের অন্যতম লক্ষন

যে সব দেশের পুরুষেরা যতো বেশী বদমাশ, সে সব দেশে নারীদেরকে ‘মা’ আর ‘বোন’ সম্মোধন করার প্রচলনও ততো বেশী, সে সব দেশেই নারীরা পুরুষদের কাছে অনিরাপদ ততো বেশী। শিক্ষিত দেশে বা সমাজে নিজের পরিবারের বাইরে নারীদেরকে ‘মা’ বা ‘বোন’ সম্বোধন করার প্রচলন নেই। কারন শিক্ষিত দেশের পুরুষেরা নারীদের সম্মান করতে জানে। তারা জানে নারীকে কিভাবে সম্মোধন করতে হয়, নারীর শরীরের কোথায় তাকিয়ে কথা বলতে হয়। আর তাই একটা শিক্ষিত দেশে নারীর প্রতি সেক্সিষ্ট মন্তব্য করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এই অপরাধে অনেক রাজনীতিবিদ বা উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাকে তাদের চাকরী বা গুরুত্বপূর্ণ পদ হারানোর ইতিহাস আছে অনেক শিক্ষিত দেশেই।

ভারতীয় উপমহাদেশের কথা আলাদা। ভারতীয় উপমহাদেশে সকল নারীকে সারাক্ষণ ‘মা’ বা ‘বোন’ বা ‘দিদি’ সম্মোধন করা হলেও এই অঞ্চলে নারীর শরীর নিয়ে কৌতুক বা সেক্সিষ্ট মন্তব্য হচ্ছে পুরুষের জীবনের সবচেয়ে বড় বিনোদন। এই অঞ্চলে শিক্ষিত আর প্রগতিশীল পুরুষেরাও নারীর প্রতি তাদের নোংরা দৃষ্টি বা সেক্সিষ্ট মন্তব্য করেন অহরহ, প্রকাশ্যে, এমন কি দলবেঁধে বা সমষ্টিগতভাবেও।

এই মা বোন ডেকে নারীর গায়ে হাত দিয়ে ধর্ষণের সূচনা হয়, চাপ প্রয়োগে ধর্ষণ।

# শিশুদের গায়ে হাত দিয়ে আদর করা কঠিনভাবে বন্ধ করতে হবে

বামা-মা ছাড়া অন্য কারো শিশুর গায়ে হাত দিয়ে আদর করতে হলে, কোলে নিতে হলে বাবা মায়ের অনুমতি নিতে হবে। এই স্পর্শের ধরন থেকেই একটি শিশু শিখবে কোনটি ভাল স্পর্শ ও কোনটি পটেনশিয়াল ধর্ষকের স্পর্শ। অন্যদের শরীর থেকে রোগ জীবানু ছড়ায় সেটা না হয় বাদই দিলাম, এদেশে অনেক বুইড়া খাট্টাসকেও ছোট্ট ছোট্ট বাচ্চা মেয়ের গোপন অঙ্গে হাত দিতে দেখেছি কত। বাবা-মা ছাড়া অন্য সকল আত্মীয়, বন্ধু-বান্ধব, সহকর্মীকে চোখে চোখে রাখতে হবে। শিশুদের গায়ে যার তার হাত দেয়ার এই অধিকার বন্ধ করা গেলে এই প্রজন্মে না হলেও নেক্সট প্রজন্ম থেকে ধর্ষন অনেক কমে যাবে। ছেলে-মেয়ে আলাদা না ভেবে সবাই মানুষ ভাববে সবাইকে। বিদেশে কিন্তু অন্যের বাচ্চার গায়ে হাত দেয়ে দন্ডনীয় অপরাধ। এটা এমনি এমনি হয়নি, প্রয়োজনের তাগিদেই তারা সেটা করেছে। আপনি সুন্দর একটি বাচ্চা দেখে তাকে আদর করতে পারবেন না তার বাবা-মায়ের অনুমতি ছাড়া।

# ভিকটিমদের এগিয়ে আসার পরিবেশ দরকার

ধর্ষণ কমাতে সবচেয়ে বেশি জরুরী ভিকটিমদের এগিয়ে আসা। কিন্তু তারা এমনি এমনি আসবেন না, কারণ তাঁদের শেমিং-এর ভয় আছে। তাঁদেরকে বুঝাতে হবে যে, অপরাধ তাঁরা করেননি, অপরাধ করেছে ধর্ষক, এবং অপরাধীকে শাস্তি দিতে হলে তাঁদেরকেই এগিয়ে আসতে হবে। পারিবারিক যৌন নিগ্রহের ব্যাপারে মুখ খুললে অনেক ভিকটিমের পরিবার-ত্যাগ প্রয়োজন হতে পারে। সেক্ষেত্রে তাঁদের পূনর্বাসনের জন্য সরকার ও এনজিওদের এগিয়ে আসতে হবে।

# আইনের তৎপরতা ও সঠিক প্রয়োগ জরুরী

এমনিতেই বেশিরভাগ যৌন অপরাধ অপ্রকাশিত থেকে যায়, তার ওপর আইনের সঠিক প্রয়োগ না হওয়া ও বিচারে বিলম্ব এই অপরাধকে আরো বাড়িয়ে তুলেছে। বাংলাদেশে যৌন অপরাধ বিষয়ক আইনে কোন ঘাটতি নেই, কিন্তু অন্য অনেক আইনের মতো এরও নেই সঠিক প্রয়োগ। আইনানুযায়ী ধর্ষণের বিচার হয় দ্রুত বিচার আইনে, যাতে মামলা হওয়ার ১৮০ দিনের মধ্যে মামলাটি নিস্পন্ন হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, মামলাগুলো বছরের পর বছর ধরে চলতে থাকে, আর অপরাধীরা বিভিন্ন অজুহাতে আইনের ফাঁক গলে জামিনে বেরিয়ে আসে। প্রথম আলো পত্রিকার ২০১৭ সালের একটি প্রতিবেদনে দেখা যায় নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে মাল্টিসেক্টরাল প্রোগ্রামের আওতায় ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম, সিলেট, বরিশাল, খুলনা, রংপুর ও ফরিদপুর জেলায় যে ওয়ান–স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার (ওসিসি) চালু করা হয়েছে, ষোল বছরে তার অনিস্পত্ত মামলার সংখ্যা ৩,৩১২টি, যা ঐ সময়ের মোট মামলা সংখ্যার ৭৩%। আরো ভয়াবহ পরিসংখ্যন হলো নিস্পত্তি হওয়া ১,২২৯টি মামলার মধ্যে মাত্র ৬০টিতে অপরাধীদের শাস্তি হয়েছে।

সারা বাংলাদেশের চিত্র আরো ভয়াবহ। বিচারহীনতার পাশাপাশি রয়েছে পুলিশি হয়রানী, সময়মতো ডাক্তারি পরীক্ষার রিপোর্ট না পাওয়া, ফরেনসিক ডিপার্টমেন্টের ‘টু-ফিঙ্গারস টেস্ট’-এর লাঞ্চনা, আলামত সংরক্ষণ ও সাক্ষ্যের অভাব, ইত্যাদি। ধর্ষণের অভিযোগ নিয়ে থানায় আসা ভিকটিমের অভিযোগ নেয়ার জন্য একজন নারী পুলিশের থাকার কথা থাকলেও সবসময় তা থাকে না। পুরুষ পুলিশরা অভিযোগ নিতে গিয়ে বিভিন্ন অবজ্ঞাসূচক মন্তব্য করেন। ‘টু-ফিঙ্গারস টেস্ট’ নামক পরীক্ষাটি করা হয় ভিকটিম যৌনকার্যে অভ্যস্ত কিনা তা জানার জন্যে। ভিকটিম যৌনকার্যে অভ্যস্ত কী অনভ্যস্ত তার সাথে ধর্ষণের যোগসূত্র খোঁজা যদি কোন রাষ্ট্রীয় আইন হয়, তবে সেই রাষ্ট্রের আইন-প্রণেতাদের মানসিক চিকিৎসা নেয়া জরুরী।

ধর্ষণের মামলার বিচারে আলামত বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে বাংলাদেশে একটি ন্যাশনাল হেল্পলাইন আছে। ১০৯ ডায়াল করে যে কেউ এ ব্যাপারে সাহায্য চাইতে পারেন। অপরাধ ঘটার পর ভিকটিম বা অন্য কেউ যদি ১০৯-এ ডায়াল করে, তবে আলামত নষ্ট হয়ে যাবার পূর্বেই পুলিশ তা সংগ্রহ করতে পারে। বর্তমানে জরুরী হেল্পলাইন ৯৯৯ ডায়াল করেও সাহায্য নেয়া যায়। বাংলাদেশের বেশিরভাগ মানুষ এই সেবাগুলোর খবরই রাখেন না। এছাড়া আরো যেসব সামাজিক সমস্যা রয়েছে, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ধর্ষক বা ধর্ষকের পরিবার তুলনামূলক প্রভাবশালী হলে ভিকটিম বা ভিকটিমের পরিবারকে হুমকি ও ভয় প্রদর্শনের মাধ্যমে মামলা তুলে নিতে বাধ্য করা, সাক্ষীকে মিথ্যা স্বাক্ষ্য দিতে বাধ্য করা এবং প্রভাব খাটিয়ে বা ঘুষ খাইয়ে পুলিশের তদন্তকে প্রভাবিত করা, ডাক্তারি রিপোর্টে পরিবর্তন আনা, আলামত নষ্ট করে ফেলা, ইত্যাদি।

# ধর্ষণ প্রতিরোধে প্রথম ও প্রধান কাজ বলে বিবেচিত হওয়া উচিত ভিকটিম দোষারোপ ও ভিকটিম শেমিং বন্ধ করা

ধর্ষণ প্রতিরোধে প্রথম ও প্রধান কাজ বলে বিবেচিত হওয়া উচিত ভিকটিম দোষারোপ ও ভিকটিম শেমিং বন্ধ করা। আমাদের দেশে ধর্ষনসহ অন্যান্য যৌন অপরাধ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ বিচারহীনতা। জাতিসংঘের Multi-country Study on Men and Violence এর ২০১৩ সালে প্রকাশিত পরিসংখ্যন অনুযায়ী বাংলাদেশে ধর্ষণ সংক্রান্ত অপরাধের ৯৫.১ শতাংশেরই কোন বিচার হয় না। বিচারহীনতার প্রধাণ কারণ অপরাধ প্রকাশ্যে না আসা। আর অপরাধ অপ্রকাশ্য থাকার প্রথম কারণ যে ভিকটিম দোষারোপ ও ভিকটিম শেমিং তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

ভিকটিম দোষারোপ ও ভিকটিম শেমিং বন্ধ করতে এ জাতীয় প্রচার বন্ধ করতে হবে। মোশাররফ করিমের অনুষ্ঠানটির পরপরই আমরা অনলাইনে আরেকটি ভিডিও দেখতে পাচ্ছি, যেখানে এক বক্তা মোশাররফ করিমের উল্লেখিত সাত বছরের শিশু ধর্ষণের সাফাই গাইছে এই বলে যে, ঐ ধর্ষক অন্য নারীদের দেখে যৌন উত্তেজিত হয়ে তা দমন করতে না পেরে শিশু ধর্ষণ করেছে। এ ধরণের মানুষ একজন দু’জন নয়, হাজার হাজার। আর তাদের কথা তাদের অনুসারীরা অক্ষরে অক্ষরে মানে। আইন করে হলেও এ ধরণের অপপ্রচার থামাতে হবে। এ ধরণের অডিও, ভিডিও, লেখালেখি নিষিদ্ধ করতে হবে এবং অনলাইন ও অফলাইন থেকে তা সরিয়ে ফেলতে হবে। ইউটিউব ও অন্যান্য সাইটের সাথে যোগাযোগ করে যাতে এ জাতীয় প্রচারের ভিডিওগুলো বাংলাদেশে প্রদর্শন না হয়, তার ব্যবস্থা করতে হবে। টেলিভিশনে এ ধরণের কোন বক্তব্য প্রচার আইন করে বন্ধ করতে হবে। আমরা এর আগে দেখেছি জঙ্গিবাদের প্রচারক হিসেবে অনেকের প্রচার বন্ধ করা হয়েছে। ধর্ষণের প্রচারও জঙ্গিবাদের মতো শক্ত হাতে মোকাবিলা করতে হবে।

# চাই সঠিক যৌন শিক্ষা, সহশিক্ষা, উপযুক্ত শিক্ষা

শিক্ষার কোন বিকল্প নেই। শিক্ষক নিয়োগের সময় তার ঘুষের, ফোনের জোর না দেখে মেধা, দক্ষতা, মানবিক দিক, সু-আচরন এগুলোকে গুরুত্ব দিতে হবে। মনে রাখবেন, আগুন লাগলে আপনার ঘরও রেহাই পাবে না। দেশে যে ধর্ষণের উৎসব শুরু হয়েছে তাতে আপনি যতো বড় ঘুষখোর কর্তাই হোন, আপনার কেউ না কেউ যে শিকার হবে না তার কোন নিশ্চয়তা নেই। বাবা-মা কে সকল ফালতু লজ্জা ভেঙ্গে শিশুদের ছোট থাকতেই বোঝাতে হবে প্রজনন স্বাস্থ্য, যৌনতা এসব বিষয় নিয়ে। একটি বাচ্চা আকাশের বৃষ্টির সঙ্গে পড়ে না, মায়ের পেট থেকেই যে আসে এই সত্যগুলো শিশুদের সঙ্গে লুকিয়ে শিশুদের একটা জ্ঞানের জগৎ কে পঙ্গু করে দেয়া হয়। কোন স্পর্শ ভাল আর কোনটা নোংরা, কাকে কিভাবে কি বিষয়ে প্রতিক্রিয়া দেখাতে হবে, কিভাবে কেন প্রতিবাদ করতে হবে এগুলো শিশুদের শেখান। যৌনতা কোন গোপন, অপবিত্র বা নোংরা বিষয় নয়। এটা মানুষের পৃথিবীতে আসার প্রক্রিয়া। এই বিষয়গুলো সম্পর্কে ছোট থেকে সবাই সঠিক জ্ঞান পেলে যৌনতা নিয়ে বিকৃত রুচি, বিকৃত চিন্তা চেতনা কমই আসবে তাদের।

ছেলে-মেয়ে আলাদা স্কুলে নয়। একই স্কুলে পড়ানো উচিৎ। আমি গুগলে সার্চ দিলাম কিন্তু অনেক সভ্য দেশে আলাদা কোন গার্লস স্কুল খুঁজে পেলাম না। সহশিক্ষা ও সঠিক শিক্ষা শিশুদের প্রথম থেকেই বিপরীত লিঙ্গের মানুষের প্রতি সহানুভূতিশীল হতে শেখায়। স্কুলে এমনকি ছেলে-মেয়েদের বসার বেঞ্চও আলাদা হওয়া উচিৎ নয়। এতে করে আমাদের দেশের একটা বড় অংশ যে এখন পেডোফেলিক ( শিশুকামী ), পরবর্তী প্রজন্ম হয়ত এই মারাত্মক সামাজিক ব্যাধি থেকে মুক্তি পাবে কারন তারা তাদের পাশেই অসংখ্য ছেলে-মেয়েকে দেখে বড় হয়েছে এবং বন্ধুত্ব, ভালোবাসা, সম্প্রীতি শিখেছে। গলির মুখে দাঁড়িয়ে ছেলে-মেয়ে গল্প করা বা পার্কে এক বেঞ্চে বসে আড্ডা দেয়া কোন অপরাধ নয়, বরং এ সমস্ত সুস্থ সম্পর্কগুলোকে অসুস্থ মানসিকতা নিয়ে দেখা সমাজে ধর্ষণমনস্ক মানুষদের ক্রোধকে বাড়িয়ে দেয়।

# চাই ব্যক্তিক, সামাজিক, ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক, আইনগত এবং রাজনৈতিক উদ্যোগ

ধর্ষণ একটি মারাত্মক সামাজিক ব্যধি। এটাকে দূর করতে হলে এ সম্পর্কে সমাজে প্রচলিত ভুল ধারণাগুলোকে দূর করতে হবে। প্রচলিত ধারণাগুলো খুব সরল, কিন্তু ধর্ষণ কোন সরল অপরাধ নয়। একটি বহুমাত্রিক ও সমন্বিত প্রতিরোধ ও প্রতিকার ব্যবস্থাই আমাদেরকে এ ব্যধি থেকে উপশম দিতে পারে। ধর্ষণ এমন একটি সমস্যা যার সমাধান করতে ব্যক্তিক, সামাজিক, ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক, আইনগত এবং রাজনৈতিক পর্যায়ে কাজ করে যেতে হবে। সবার আগে প্রয়োজন মানবিক সমাজ গড়ার জন্য মানবিক মানুষ। মানবিক মানুষ তখনই আসবে যখন সমাজ পরিচালনাকারীরা, শিক্ষকেরা, অভিভাবকেরা মানবিক হবে।

[ কৃতজ্ঞতঃ রতন কে সমাদ্দার ( সন্যাসী ) ]

Related Posts

A child should not give birth a child

বাল্যবিবাহের পক্ষে কথা বলা, আন্দোলন করা মূলত ইতর প্রকৃতির মানুষের কাজ

বাংলাদেশে বাল্যবিবাহের পক্ষে কথা বলার মতো অসংখ্য মানুষ আছে, এমনকি কিছু মানুষ আন্দোলনও করেছে। এরাRead More

Public Toilet and the Women

২০১৪ সালে ভারতে ১১০০০ ধর্ষণ কম হতো যদি তাদের টয়লেট থাকতো

“এখানে প্রশ্রাব করবেন না” নোটিশের সংখ্যার তুলনায়, পাবলিক টয়লেটের সংখ্যা কত ? এইযে এখানে প্রশ্রাবRead More

does death penalty deter rape

ধর্ষণের ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ড আরো ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে – গবেষণাও তাই বলে

আমরা যে কোন ক্রাইমের প্রতিবাদ করার সময় অপরাধীর মৃত্যুদন্ড চাই। এখন যেমন ধর্ষণের প্রতিবাদের সময়ওRead More

Comments are Closed