Pseudoscience
Islamic Pseudoscience

Islamic Pseudoscience

বিষ্ময়কর ইসলামিক সায়েন্স! জিনদের অসীম ক্ষমতা ও তাদের ব্যবহার করে মানব সভ্যতা উন্নয়নের ইসলামি ফর্মুলা

জেনারেল জিয়াউল হকের আমলে পাকিস্তানে ইসলামিক সায়েন্সের বাম্পার ফলন হয়েছিল। ১৯৮৭ সালে পাকিস্তানের সরকারি অর্থায়নে এবং সরকারি সংস্থা ‘পাকিস্তান কাউন্সিল ফর সায়েন্টিফিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিসার্চ’ (PCSIR) ও আন্তর্জাতিক ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ উদ্যোগে ইসলামাবাদে একটি আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক সেমিনারের আয়োজন করা হয়। এই সেমিনারের মূল বিষয়বস্তু ছিল “কোরআনিক বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা”। সেই সেমিনারে বৈজ্ঞানিক নাম দিয়ে অনেক ইসলামিক গবেষনাপত্র ও প্রস্তাব জমা পড়ে। বেশিরভাগ গবেষণা ও প্রস্তাব ছিল জিন নিয়ে। এই সেমিনারে ও পরবর্তীতে সরকারের কাছে জিন দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিষয়ে একটি প্রস্তাব দিয়েছিলেন পাকিস্তানের একজন শীর্ষস্থানীয় পারমাণবিক বিজ্ঞানী! তার নাম সুলতান বশিরুদ্দিন মাহমুদ (Sultan Bashiruddin Mahmood), তিনি পাকিস্তান এটমিক এনার্জি কমিশনের (PAEC) একজন শীর্ষস্থানীয় নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন এবং একটি প্রকল্পের প্রধান পরিচালক (Director) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তিনি দাবী করেন, জিন বন্দি করে তাদের শক্তি কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব।

এই মাহমুদ সাহেব কিন্তু যে সেই লোক ছিলেন না। তিনি লাহোরের প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (UET) এবং যুক্তরাজ্যের লিডস বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তড়িৎ প্রকৌশলে (Electrical Engineering) উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৬০-এর দশকে তিনি ‘পাকিস্তান এটমিক এনার্জি কমিশন’ (PAEC)-এ যোগ দেন। দেশটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরমাণু কেন্দ্র “খুশাব-১” (Khushab-I) নিউক্লিয়ার রিঅ্যাক্টর প্রকল্পের ডাইরেক্টর হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন করেছিলেন। পারমাণবিক ক্ষেত্রে অবদানের জন্য পাকিস্তান সরকার তাকে দেশের অন্যতম সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা ‘সিতারা-ই-ইমতিয়াজ’-এ ভূষিত করেছিল। মাহমুদ সাহেবের গবেষণার মূল ছিল কোরআন। তার দাবি, যেহেতু জিন এক প্রকার “বিশুদ্ধ শক্তি বা অগ্নিশিখা”, তাই শক্তির রূপান্তর সূত্র অনুযায়ী এই শক্তিকে বিদ্যুৎ শক্তিতে (Electrical Energy) রূপান্তর করা সম্ভব। তিনি প্রস্তাব করেন যে, বিশেষ প্রযুক্তির মাধ্যমে জিনদের বন্দি বা নিয়ন্ত্রণ করে তাদের ভেতরের সেই অফুরন্ত শক্তি আহরণ করা যাবে। তিনি বলেন, এই প্রকল্প সফল হলে পাকিস্তানের চিরস্থায়ী বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট এক নিমেষেই সমাধান হয়ে যাবে।

জিন নিয়ে ইসলামিস্টদের ফেটিশের অন্ত নেই। সবগুলোর উৎস কোরআন, হাদিস। কোরআনে এত্তগুলো জিন সম্পর্কিত আয়াত ও সম্পুর্ণ সূরা আছে – ৬:১০০, ৬:১১২, ৬:১২৮, ৬:১৩০, ৭:৩৮, ৭:১৭৯, ১৫:২৭, ১৭:৮৮, ১৮:৫০, ২৭:১৭, ২৭:৩৯, ৩৪:১২, ৩৪:১৩, ৩৪:১৪, ৪১:২৫, ৪৬:২৯, ৪৬:৩০, ৪৬:৩১, ৪৬:৩২, ৫১:৫৬, ৫৫:১৫, ৫৫:৩৩ এবং সম্পূর্ণ ৭২ নম্বর সূরা (সূরা আল-জিন, আয়াত ১-২৮)। আমি আর বিস্তারিত উল্লেখ করলাম না, যাদের প্রয়োজন মিলিয়ে নিতে পারেন। শুধু কি কোরআন? সহিহ মুসলিম ৪৫০a-৪৫০b (লাইলাতুল-জিন/নবীর জিনদের কাছে কুরআন তিলাওয়াত), সহিহ মুসলিম ৩০৩০d (জিনদের ইবাদত করা নিয়ে), সহিহ বুখারি ৭৩১/৩২৮৪ (ইফরিত জিন নামাজে বাধা দিতে এসেছিল), সহিহ বুখারি ৭৭৩/৪৯২১ (সূরা আল-জিন অবতীর্ণ হওয়ার প্রেক্ষাপট), সহিহ বুখারি ৫৮৩ (আযান মানুষ ও জিন উভয়েই শোনে), সহিহ মুসলিম ২৯৯৬ (জিনদের খাদ্য হিসেবে হাড় ও পশুর বিষ্ঠার উল্লেখ), সহিহ মুসলিম ৭৬৮a-৭৬৮c (নবীর জিনদের সঙ্গে সাক্ষাৎ ও কুরআন পাঠ), সহিহ মুসলিম ৫৩২ (জিন ও শয়তান প্রসঙ্গ)। এছাড়া জিনের সৃষ্টি, প্রকারভেদ ও বৈশিষ্ট্য নিয়ে আরও বর্ণনা বিভিন্ন হাদিসগ্রন্থে রয়েছে।

শুধু কি পাকিস্তান? বাংলাদেশসহ সবগুলো ইসলামিক দেশেই এই জিন নিয়ে ঘটে যায় অসংখ্য ঘটনা। এই জিন নিয়ে লেনদেন হয় শত কোটি টাকা, প্রতারনা হয়, ধর্ষণ হয়। বাংলাদেশের প্রখ্যাত ইসলামিক সায়েন্টিস্ট মাওলানা তারেক মনোয়ার বলেছিলেন, আমেরিকার ওয়াশিংটনের বেলেডোনা ব্রীজসহ অসংখ্য স্থাপনা বানিয়েছিল জিনেরা – youtu.be/JTTSa7Nd-kU । শুধু কি তারেক মনোয়ার? ইসলামিস্ট মাওলানাদের কেউ বাদ যান না জিনদের অস্তিত্ব ও শক্তি সম্পর্কে জানান দিতে। কিন্তু ইসলামিক সায়েন্সে বর্নিত এই জিন-ভূত-প্রেত আসলে কি?

জিন সম্পর্কিত বিশ্বাস ইসলামি ধর্মতত্ত্বের একটি কেন্দ্রীয় উপাদান হিসেবে কুরআন ও হাদিসে উল্লেখিত, এগুলোই গত ১৪০০ বছর ধরে ইসলামিস্টদের জিনবিদ্যার মূল উৎস। এই সত্তাগুলোকে অদৃশ্য, ধোঁয়াবিহীন আগুন থেকে সৃষ্ট এবং মানুষের সমান্তরাল এক জগতে বসবাসকারী হিসেবে বর্ণনা করা হয়। সমস্যা হলো, এই দাবিগুলো এমনভাবে গঠিত যা পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে যাচাই করা প্রায় অসম্ভব – না প্রমাণ করা যায়, না খণ্ডন করা যায়। বার্ডেন অফ প্রুফ অনুযায়ী বিজ্ঞানের ঠেকা পড়েনি জিনের অস্তিত্ব বা অনুপস্থিতি প্রমান করবে, সেটা অপ্রয়োজনীয়। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির একটি মৌলিক শর্ত হলো falsifiability বা খণ্ডনযোগ্যতা, যা জিন সংক্রান্ত দাবিতে অনুপস্থিত। এই কারণেই লক্ষ লক্ষ ডলারের চ্যালেঞ্জ ঘোষিত থাকা সত্ত্বেও কেউ পরীক্ষাগারে বা নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে জিনের অস্তিত্ব প্রমাণ করতে পারেননি। উন্নত দেশের শিক্ষা পাওয়া কেউ নয়, একমাত্র বিশ্বাসীরাই জিনের দেখা পান, সেগুলোও আবার সাইকোলজির দৃষ্টিতে বিভিন্ন মানবীয় সমস্যা হিসাবে চিহ্নিত।

এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন ওঠে, কেন মুসলিম দেশগুলোর অনেক ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার বা প্রফেসরের মতো পেশাদাররাও এই ধরনের বিশ্বাস আঁকড়ে ধরে থাকেন? এর একটি ব্যাখ্যা হতে পারে শৈশব থেকে গড়ে ওঠা সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়া। ধর্মীয় শিক্ষা প্রায়শই এমন বয়সে শুরু হয় যখন শিশুর সমালোচনামূলক চিন্তাশক্তি পরিপক্ব হয়নি, এবং ধর্মগ্রন্থের কর্তৃত্বকে প্রশ্নাতীত হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা যত উচ্চস্তরেই পৌঁছাক না কেন, তা নির্দিষ্ট বিষয়ে যুক্তিবাদী পদ্ধতি শেখালেও ধর্মীয় পরিমণ্ডলে অর্জিত বিশ্বাসকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পুনর্মূল্যায়ন করে না – এই দুই ক্ষেত্র মানুষের মনে প্রায়ই পৃথক বগিতে সংরক্ষিত থাকে। এই সমস্ত ইসলামিস্টদের বদ্ধমূল ধারনা বিজ্ঞান ভিন্ন কথা বললেও, ভিন্ন যুক্তি ও প্রমান উপস্থাপন করলেও কোরআন, হাদিসের বয়ান অকাট্য, তা ভুল হতেই পারে না। ইসলাম যেভাবে মুসলিমদের শ্রেষ্ঠ জাতি, কোরআনকে শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ ও নবী মুহাম্মদকে শ্রেষ্ঠ মানুষ হিসাবে চিত্রিত করে, শত অপরাধ করলেও, মানব সভ্যতায় কোন অবদান না রাখলেও শুধুমাত্র মুসলিমরাই জান্নাতে যাবে – এসব বলা হয়, তাতে শৈশব থেকেই এদের ভিতর এই সুপিরিওরিটি কমপ্লেক্স সিনড্রোম কাজ করে। তখন বিজ্ঞানকেও এদের কাছে মিথ্যা মনে হয়।

এই বিশ্বাসের সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিণতিও উপেক্ষণীয় নয়। আগেই বলেছি এই নিয়ে শত কোটি টাকার লেনদেন হয়। জিনে ধরা বা “ঝাড়ফুঁক” এর নামে বাংলাদেশ ও অন্যান্য মুসলিম-প্রধান সমাজে একশ্রেণীর ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব আর্থিক প্রতারণা চালান, এবং কিছু ক্ষেত্রে এই অজুহাতে যৌন নিপীড়নের মতো গুরুতর অপরাধও সংঘটিত হয়েছে বলে সংবাদমাধ্যমে বহুবার উঠে এসেছে। একটি অপ্রমাণিত অতিপ্রাকৃত বিশ্বাস যখন প্রাতিষ্ঠানিক কর্তৃত্ব ও সামাজিক আস্থার সাথে মিশে যায়, তখন তা শোষণের একটি কার্যকর হাতিয়ারে পরিণত হতে পারে – বিশেষত এমন সমাজে যেখানে ধর্মীয় নেতাদের প্রশ্ন করার সংস্কৃতি দুর্বল। সুতরাং প্রশ্নটি হয়তো ইসলাম নিজেই নয়, বরং জিন বা এই জাতীয় অতিপ্রাকৃত বিশ্বাসকে যখন প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতা বা নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ার সাথে মিশিয়ে ফেলা হয়, তখন যে বিপদ তৈরি হয় – এই প্রবণতা কেবল একটি নির্দিষ্ট ধর্মে সীমাবদ্ধ নয়, বরং বিশ্বের বিভিন্ন ধর্ম ও সংস্কৃতিতে বিভিন্ন মাত্রায় পরিলক্ষিত হয়।

সুলতান বশিরুদ্দিন মাহমুদের “জিন দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন”-এর এই ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, উচ্চ প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বা বড় কোনো বৈজ্ঞানিক পদের অধিকারী হলেই কেউ প্রকৃত বৈজ্ঞানিক চেতনার অধিকারী হন না। বিজ্ঞান যখন যুক্তি ও প্রমাণ ছেড়ে অন্ধবিশ্বাস ও রাজনৈতিক এজেন্ডার দাসত্ব করে, তখন পারমাণবিক বিজ্ঞানীর মস্তিষ্ক থেকেও এমন আজগুবি ও হাস্যকর তত্ত্বের জন্ম হতে পারে। পাকিস্তানের বিজ্ঞান ইতিহাসের এই কালো অধ্যায়টি আজ বিশ্বজুড়ে ছদ্মবিজ্ঞানের (Pseudoscience) কুফল বোঝাতে একটি অন্যতম প্রধান উদাহরণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

মাহমুদ সাহেব কিন্তু মানসিকভাবে ছিলেন ইসলামিক চরমপন্থী। এক সময় বশিরুদ্দিন মাহমুদের চরমপন্থী মানসিকতা আরও উগ্র রূপ নেয়। ১৯৯৯ সালে পারমাণবিক কমিশন থেকে অবসর নেওয়ার পর তিনি ‘উম্মা তামিফ-ই-নাও’ (UTN) নামের একটি উগ্রপন্থী সংগঠন গড়ে তোলেন। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের (9/11) সন্ত্রাসী হামলার পর, ওসামা বিন লাদেন ও আল-কায়েদার কাছে পাকিস্তানের পারমাণবিক গোপন নথিপত্র ও প্রযুক্তির তথ্য পাচারের চেষ্টার অভিযোগে বশিরুদ্দিন মাহমুদকে গ্রেফতার করা হয়। পরবর্তীতে জাতিসংঘ (UN) তাঁকে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসীদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে তাঁর সমস্ত সম্পত্তি ও ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করে দেয়। ২০২০ সালে এই বিতর্কিত ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করেন।

কিন্তু এই এক ব্যক্তিই তো শেষ নয়, ইসলামিক সায়েন্সের নামে এই সমস্ত অসংখ্য সিউডো সায়েন্সের (Pseudoscience) বলি হয় কোটি কোটি মানুষ। আমরা যারা এই সমস্ত সিউডো সায়েন্সকে এ্যাভয়েড করে পিওর সায়েন্সের প্রসারের জন্য সংগ্রাম করি তাদের জীবনও হুমকির মধ্যে পড়ে যায়। বাংলাদেশ, পাকিস্তানের মতো দেশে ইসলামিক সায়েন্সের নামে সিউডো সায়েন্সের প্রচার-প্রসার দিন দিন বাড়ছে। আমার এই লেখার নীচেই হয়তো এমন কিছু লোকের দেখা পেয়ে যেতে পারেন যারা এই সমস্ত সিউডো সায়েন্সকে ডিফেন্ড করার জন্য এক জীবন পার করে দেয়, আমাদের মতো মানুষদের জীবন নিতেও দ্বিধা করে না – কারন আমরা এই অন্ধকারের বিপরীতে আলো হাতে দাঁড়িয়েছিলাম।

Related Posts

Islamic Pseudoscience

Amazing Islamic Science! The infinite powers of jinn and the Islamic formula for using them to advance human civilization

During General Zia-ul-Haq’s era, there was a bumper harvest of Islamic science in Pakistan. InRead More

Is Allah the Most Merciful?

Allah’s hatred toward Jews and Christians – the cruel, genocidal Allah who is supposedly also Rahmanur Rahim, the Most Merciful!

Sahih Muslim 2767’s hadiths clearly state: From Abu Musa (ra): On the Day of ResurrectionRead More

Is Allah the Most Merciful?

আল্লাহর ইহুদি-খ্রিস্টান বিদ্বেষ – নিষ্ঠুর গণহত্যাকারী আল্লাহ নাকি আবার রহমানুর রাহীম, পরম দয়ালু!

সাহিহ মুসলিম ২৭৬৭-এর হাদিসগুলো স্পষ্টভাবে বলে: আবু মুসা (রা) থেকেঃ কিয়ামতের দিন আল্লাহ প্রত্যেক মুসলমানকেRead More

Comments are Closed