
The Tyranny of Superstition
১২০০ বছর আগে হারিয়ে যাওয়া এক শিশুর নামে দমন পীড়ন চালিয়ে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি শায়িত হলেন!
আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির দাফন-অনুষ্ঠান ঘিরে যে রাষ্ট্রীয় জাঁকজমক এখন বিশ্ব দেখছে, তার আড়ালে লুকিয়ে আছে একটি শাসনতান্ত্রিক কাঠামো, যা ধর্মীয় বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে গড়া রাষ্ট্রক্ষমতাকে নাগরিক জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে স্থাপন করেছে – সেই শাসন কাঠামোর মূলে আছে ১২০০ বছর আগে হারিয়ে যাওয়া এক শিশু। ইরানের ইসলামী শাসকদের সব নৃশংস দমন পীড়নকে সেই হারিয়ে যাওয়া ‘গায়েব ইমাম’-এর নামে বৈধতা দেয়া হয়। সেই শিশুই প্রকারেন্তরে লক্ষ লক্ষ মানুষকে হত্যার জন্য দায়ী।
সংবিধানে গায়েব ইমাম ও ওলায়াতে ফকীহর উল্লেখ
১৯৭৯ সালে গৃহীত ইরানের সংবিধানে এই ধারণাটি একাধিক জায়গায় স্পষ্টভাবে লিপিবদ্ধ আছেঃ
প্রস্তাবনা (Preamble): সংবিধানের শুরুতেই “ইসলামে শাসনপদ্ধতি” (Method of Governance in Islam) শীর্ষক অংশে বলা হয়েছে যে বিপ্লবের আদর্শগত ভিত্তি হলো “ওলায়াতে ফকীহ” – অর্থাৎ গায়েব ইমামের অনুপস্থিতিতে যোগ্য ফকীহর (ইসলামি আইনবিদ) হাতে শাসনভার ন্যস্ত থাকা। প্রস্তাবনায় খোমেনিকে সরাসরি “ইমাম” সম্বোধন করা হয়েছে এবং তাঁর প্রস্তাবিত এই শাসনতত্ত্বকেই সংবিধানের কেন্দ্রীয় ভিত্তি হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।
অনুচ্ছেদ ৫ (Article 5) – এটিই মূল ধারা, যেখানে সরাসরি লেখা আছেঃ গায়েব ইমাম (যাঁকে “হজরত ওলি-ই আসর” নামে অভিহিত করা হয়) অন্তর্হিত থাকাকালে, উম্মাহর শাসন ও নেতৃত্বের দায়িত্ব বর্তায় এমন এক ন্যায়পরায়ণ, খোদাভীরু, যুগসচেতন, সাহসী ও প্রশাসনিক সক্ষমতাসম্পন্ন ফকীহর ওপর, যিনি অনুচ্ছেদ ১০৭ অনুযায়ী নিযুক্ত হবেন। অর্থাৎ, রাষ্ট্রক্ষমতার সাংবিধানিক বৈধতার উৎসই হলো এক অন্তর্হিত ধর্মীয় ব্যক্তিত্বের অনুপস্থিতিতে তাঁর প্রতিনিধিত্ব করা।
অনুচ্ছেদ ৪ স্পষ্ট করে দেয় যে দেশের সকল আইন, বিধি ও নির্দেশনা অবশ্যই ইসলামি মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে – এবং যেহেতু এই অনুচ্ছেদ প্রস্তাবনার অংশ, তাই সংবিধানের অন্য যেকোনো ধারার ওপর এটি প্রাধান্য পায়।
অনুচ্ছেদ ১০৭–১১২ সুপ্রিম লিডার নির্বাচনের পদ্ধতি এবং তাঁর ক্ষমতার তালিকা নির্ধারণ করে – সামরিক বাহিনী, বিচার বিভাগ, রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার মাধ্যম ও নির্বাচনী প্রার্থী-বাছাই প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণ তাঁর হাতে ন্যস্ত।
খোমেনি নিজে ১৯৮৮ সালে আরও এক ধাপ এগিয়ে “ওলায়াতে মোতলাকায়ে ফকীহ” (ফকীহর নিরঙ্কুশ কর্তৃত্ব) তত্ত্ব প্রবর্তন করেন, যেখানে বলা হয় – জনস্বার্থের প্রয়োজনে ফকীহর সিদ্ধান্ত এমনকি ইসলামি বিধিবিধানের ঊর্ধ্বেও যেতে পারে। খামেনি নিজেও পরবর্তীতে বলেছেন, সুপ্রিম লিডারের সিদ্ধান্ত জনগণের ইচ্ছার বিপরীতে গেলেও তা অগ্রাধিকার পাবে।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, শিয়া ইসলামের সবচেয়ে প্রভাবশালী কেন্দ্র নাজাফ (ইরাক) ও কোমের (ইরান) অনেক জ্যেষ্ঠ আয়াতুল্লাহ – যেমন আয়াতুল্লাহ আলী সিস্তানি – এই রাজনৈতিক ব্যাখ্যার সঙ্গে একমত নন। ফলে এই তত্ত্বটি শিয়া ধর্মতত্ত্বের সর্বসম্মত ব্যাখ্যা নয়, বরং খোমেনির নিজস্ব রাজনৈতিক পুনর্গঠন বলেই বহু গবেষক মনে করেন।
ঐতিহাসিক গণহত্যা – ১৯৮৮ সালের কারাগার হত্যাকাণ্ড
১৯৮৮ সালের গ্রীষ্মে, ইরান-ইরাক যুদ্ধের শেষ পর্যায়ে, খোমেনির সরাসরি ফতোয়ার ভিত্তিতে হাজার হাজার রাজনৈতিক বন্দিকে গোপনে বিচারবহির্ভূতভাবে হত্যা করা হয়। এই ঘটনার প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন সূত্রে ভিন্নতা আছেঃ
- হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ও অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের রক্ষণশীল অনুমান অনুযায়ী ২,৮০০ থেকে ৫,০০০ জন নিহত হয়েছিলেন, অন্তত ৩২টি শহরে।
- তৎকালীন উপ-সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ হোসেইন-আলী মোন্তাজেরি তাঁর স্মৃতিকথায় সংখ্যাটি ২,৮০০ থেকে ৩,৮০০র মধ্যে বলে উল্লেখ করেছেন।
- বিরোধী সংগঠন পিপলস মুজাহিদিন (এমইকে/এনসিআরআই) দাবি করে সংখ্যাটি ৩০,০০০ থেকে ৩৪,০০০ পর্যন্ত হতে পারে – যদিও এই সর্বোচ্চ অনুমানগুলো মূলত বিরোধী রাজনৈতিক সংগঠনের নিজস্ব হিসাব, স্বাধীন মানবাধিকার সংস্থার নথিভুক্ত সংখ্যা নয়।
জাতিসংঘের বিশেষ র্যাপোর্টিয়ার জাভেদ রেহমান ২০২৪ সালের এক প্রতিবেদনে এই হত্যাকাণ্ডকে মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। উল্লেখযোগ্য যে, এই “মৃত্যু কমিশন”-এর সদস্যদের একজন ছিলেন এব্রাহিম রাইসি, যিনি পরবর্তীতে ইরানের প্রেসিডেন্ট হন। নিহতদের পরিবারকে আজও তাদের প্রিয়জনদের কবরস্থান দেখতে দেওয়া হয় না; তেহরানের খাভারান কবরস্থানের একটি অংশ ভেঙে গাড়ি পার্কিং বানানো হয়েছে বলে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে জানিয়েছে।
সাম্প্রতিক মৃত্যুদণ্ড – সংখ্যায় উদ্বেগজনক ঊর্ধ্বগতি
মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী মৃত্যুদণ্ডের ব্যবহার সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নাটকীয়ভাবে বেড়েছেঃ
- ২০২৪ সালেঃ অন্তত ৯৭২–৯৭৫ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় (অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ও ইরান হিউম্যান রাইটস/ইসিপিএমের যৌথ প্রতিবেদন)।
- ২০২৫ সালেঃ বিভিন্ন সংস্থার হিসাবে সংখ্যাটি ভিন্ন হলেও সবগুলোই “১৯৮৯ সালের পর সর্বোচ্চ” বলে চিহ্নিত করেছে – ইরান হিউম্যান রাইটস ও ইসিপিএমের হিসাবে অন্তত ১,৬৩৯ জন (২০২৪ সালের তুলনায় ৬৮% বৃদ্ধি), অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের হিসাবে অন্তত ২,১৫৯ জন, আর ইরানভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা HRANA-র হিসাবে ১,৯২২ জন। এই ভিন্নতার কারণ হলো ইরান সরকার নিজে থেকে সরকারি তথ্য প্রকাশ করে না – HRANA-র হিসাবে প্রায় ৯৫% মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার খবর রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রকাশই করা হয় না।
- ২০২৫ সালে নিহতদের মধ্যে অন্তত ৪৮ জন নারী ছিলেন – গত দুই দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ। এছাড়া অন্তত ৮৪ জন আফগান নাগরিক ও ৩ জন ইরাকি নাগরিককেও মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।
- ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে একমাসেই অন্তত ৩৩৬ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় -— গত ৩৭ বছরের মধ্যে একক মাসে সর্বোচ্চ।
- জাতিসংঘের মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, মৃত্যুদণ্ডের এই ব্যবহার এখন আর শুধু ফৌজদারি বিচার নয়, বরং প্রতিবাদ দমনের একটি রাষ্ট্রীয় হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে।
বিক্ষোভ দমন – সংখ্যায় নৃশংসতা
২০২২ সালের “নারী, জীবন, স্বাধীনতা” আন্দোলন
২২ বছর বয়সী মাহসা (জিনা) আমিনি হিজাব ঠিকমতো না পরার অভিযোগে “নৈতিকতা পুলিশ” কর্তৃক আটক হওয়ার পর হেফাজতে মারা যান (সেপ্টেম্বর ২০২২)। এরপর যে আন্দোলন শুরু হয়, তাতেঃ
- মানবাধিকার সংস্থাগুলোর হিসাবে অন্তত ৫৫১ জন (শিশুসহ) নিহত হন।
- প্রথম ২০ দিনেই HRANA-র হিসাবে প্রায় ৫,৫০০ জন গ্রেপ্তার হন; সামগ্রিকভাবে হাজার হাজার মানুষ গ্রেপ্তার হয়েছিলেন বলে বিভিন্ন সংস্থা জানিয়েছে।
- এই আন্দোলনের সঙ্গে সম্পর্কিত অভিযোগে অন্তত ৮–১০ জনকে পরবর্তীতে মৃত্যুদণ্ড দিয়ে হত্যা করা হয়েছে।
- জাতিসংঘের একটি স্বাধীন তদন্ত কমিশন (Fact-Finding Mission) ৩০০ জনের সাক্ষ্য ও ৩৮,০০০-এরও বেশি প্রমাণ পর্যালোচনা করে জানিয়েছে যে নিরাপত্তা বাহিনী আটক নারীদের বিরুদ্ধে ধর্ষণসহ যৌন সহিংসতা ব্যবহার করেছে, এমনকি ১২ বছর বয়সী শিশুদের বিরুদ্ধেও।
২০২৫-২৬ সালের অর্থনৈতিক বিক্ষোভ ও দমন
২০২৫ সালের ডিসেম্বরে মুদ্রার দরপতন ও মূল্যস্ফীতির প্রতিবাদে যে বিক্ষোভ শুরু হয়, তা ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে ইরানের ইতিহাসে সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী দমন-অভিযানে রূপ নেয় বলে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল জানিয়েছেঃ
- HRANA-র হিসাবে অন্তত ২,৬১৫ জন নিহত হয়েছেন (এর মধ্যে ২,৪৩৫ জন বিক্ষোভকারী, ১৫৩ জন সরকার/সামরিক বাহিনী-সংশ্লিষ্ট, ১৪ জন বিক্ষোভে অংশ না নেওয়া সাধারণ নাগরিক)।
- নরওয়েভিত্তিক সংস্থা ইরান হিউম্যান রাইটস (IHR) জানিয়েছে নিহতের সংখ্যা অন্তত ৩,৪২৮ জন।
- ১৮৭টি শহরে ৬১৭টি বিক্ষোভের ঘটনায় অন্তত ১৮,৪৭০ জন গ্রেপ্তার হয়েছেন বলে HRANA নথিভুক্ত করেছে।
- ইরানি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন নিহতের সংখ্যা মাত্র ৩০০ বলে দাবি করেছে – অর্থাৎ প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে তীব্র বিরোধ আছে, তবে একাধিক স্বতন্ত্র মানবাধিকার সংস্থা হাজার হাজার নিহতের কথা বলছে।
- এই সময়ে দীর্ঘতম ইন্টারনেট বন্ধ রাখার ঘটনা ঘটে, যা তথ্য যাচাই আরও কঠিন করে তুলেছে।
নারীদের ওপর হিজাব আইনের শাস্তি
২০২২ সালের আন্দোলনের পর হিজাব-বিরোধিতার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন বরং তীব্রতর হয়েছে:
- ২০২৪ সালের এপ্রিলে চালু হওয়া “নূর পরিকল্পনা” (Noor Plan) কার্যকর হওয়ার প্রথম দিনেই ইরানি গণমাধ্যম অনুযায়ী প্রায় ৫০০ জন নারী ও কিশোরী হিজাব না পরার কারণে গ্রেপ্তার হন।
- শুধু কোম প্রদেশেই, ২০২৩ সালের মার্চ থেকে হিজাব-সম্পর্কিত অন্তত ১,৯৮৬টি ফৌজদারি মামলা রুজু হয়েছে বলে প্রাদেশিক পুলিশপ্রধান নিজেই জানিয়েছেন।
- একটি আইনি সহায়তা প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরের পর থেকে একেকটি আদালতেই মাসে ২,০০০–৩,০০০টি হিজাব-সংক্রান্ত মামলা আসছে, যেখানে আগে এই সংখ্যা ছিল হাতে গোনা।
- ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে কার্যকর হওয়া নতুন “হিজাব ও চেষ্টিটি আইন” (৭৪টি ধারাবিশিষ্ট) অনুযায়ী শাস্তির মধ্যে আছে: জরিমানা (২৪ থেকে ২,৩৮০ মার্কিন ডলার সমতুল্য), সর্বোচ্চ ৫ বছর কারাদণ্ড, ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা, ইন্টারনেট ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা, এবং হিজাব-বিরোধী সক্রিয়তার (activism) ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত।
- একাধিক নারীকে বেত্রাঘাতের (৭৪টি বেত্রাঘাত) শাস্তি দেওয়া হয়েছে হিজাব-বিরোধী প্রকাশ্য কার্যক্রমের জন্য – যেমন গায়িকা পারাস্তু আহমাদি ও তাঁর সহশিল্পীদের ক্ষেত্রে, যাঁরা হিজাব ছাড়া একটি ভার্চুয়াল কনসার্টে অংশ নেওয়ার জন্য ২০২৬ সালে দণ্ডিত হন।
- জাতিসংঘের তথ্যানুসন্ধান কমিশন এই সামগ্রিক প্রবণতাকে “লিঙ্গের ভিত্তিতে নিপীড়ন” (persecution on grounds of gender) নামক মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
নির্বাসন ও দেশত্যাগ – কত মানুষ পালিয়েছে
জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থার (UNHCR) তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮০ সাল থেকে (ইসলামি বিপ্লবের প্রায় এক বছর পর থেকে হিসাব শুরু) এ পর্যন্তঃ
- ৫০ লক্ষেরও বেশি ইরানি নাগরিক শরণার্থী বা আশ্রয়প্রার্থী হিসেবে নিবন্ধিত হয়েছেন – যা তুলনামূলকভাবে যুদ্ধবিধ্বস্ত নয় এমন একটি দেশের জন্য অস্বাভাবিক উচ্চ সংখ্যা।
- ১৯৮০-এর দশকে (বিপ্লব-উত্তর প্রথম দশক) ৩ লক্ষ ১২ হাজারের বেশি ইরানি শরণার্থী হিসেবে নিবন্ধিত হন; একক বছরে সর্বোচ্চ ছিল ১৯৮৫ সালে, প্রায় ৮৮,০০০ জন।
- ১৯৯০-এর দশকে (রাফসানজানি সরকারের অর্থনৈতিক সংকটের সময়) প্রায় ১০ লক্ষ ৬০ হাজার ইরানি শরণার্থী নিবন্ধিত হন।
- ২০০০-২০০৯ সময়কালে আরও প্রায় ১১ লক্ষ।
- ২০০৯ সালের গ্রিন মুভমেন্ট বিক্ষোভের পর শরণার্থী নিবন্ধন সেই দশকের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়।
- ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের তথ্য অনুযায়ী বিশ্বব্যাপী ১৬ লক্ষ ইরানি আশ্রয়প্রার্থী হিসেবে নিবন্ধিত আছেন (যদিও বিদেশে বসবাসরত সব ইরানিই আশ্রয়প্রার্থী নন)।
- ইরান সরকারের নিজস্ব পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ২০২১ সালের তথ্য অনুযায়ী বিদেশে বসবাসরত ইরানির মোট সংখ্যা প্রায় ৪০ লক্ষ, যদিও এর মধ্যে বিপ্লবের বহু আগে থেকে বিদেশে বসবাসকারী পরিবারও অন্তর্ভুক্ত।
- এছাড়া, ১৯৭৯ সালের পরপরই ইরানের ৮০,০০০ সদস্যবিশিষ্ট ইহুদি সম্প্রদায়ের প্রায় ৩০,০০০ জন কয়েক মাসের মধ্যেই দেশত্যাগ করেন; বর্তমানে দেশটিতে মাত্র প্রায় ৯,০০০ ইহুদি অবশিষ্ট আছেন।
- মেধা পাচারের (brain drain) দিক থেকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (IMF) হিসাবে ইরান বিশ্বে শীর্ষস্থানীয়, বার্ষিক প্রায় দেড় থেকে দুই লক্ষ উচ্চশিক্ষিত পেশাজীবী দেশত্যাগ করেন বলে বিভিন্ন সময়ে জানানো হয়েছে।
বিপরীত দৃষ্টিভঙ্গি – কী বলেন সমর্থক ও ভিন্নমতাবলম্বীরা
নিরপেক্ষতার স্বার্থে এটি উল্লেখ করা জরুরিঃ
- এই ব্যবস্থার সমর্থকরা মনে করেন, “ওলায়াতে ফকীহ” পশ্চিমা উদারনৈতিক গণতন্ত্রের বিকল্প একটি বৈধ ইসলামি শাসনতত্ত্ব, যেখানে সীমিত নির্বাচনী প্রক্রিয়া (রাষ্ট্রপতি ও পার্লামেন্ট নির্বাচন) ধর্মীয় নেতৃত্বের সঙ্গে সহাবস্থান করে।
- অনেক ধর্মপ্রাণ ইরানি নাগরিক প্রকৃতপক্ষে সুপ্রিম লিডারকে শ্রদ্ধা করেন — যদিও ২০২৪ সালে মেরিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এক জরিপ দেখিয়েছে, হিজাব-বলবৎকরণ নিয়ে ইরানি জনমত ক্রমেই বিভক্ত হচ্ছে (২০২৪ সালে প্রায় ৪২% মনে করেন হিজাব-অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত, আবার প্রায় ৩৮% মনে করেন অমান্য করলেও তাদের বিরুদ্ধে মুখোমুখি হওয়া উচিত নয়)।
- সমর্থকদের যুক্তি, পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোর ঐতিহাসিক হস্তক্ষেপ (যেমন ১৯৫৩ সালের মোসাদ্দেগবিরোধী অভ্যুত্থান) ও চলমান নিষেধাজ্ঞা-সামরিক আগ্রাসনের প্রেক্ষাপটে ইরানের রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে বিচার করা উচিত।
- ইরান সরকার নিজে থেকে মানবাধিকার সংস্থাগুলোর প্রকাশিত সংখ্যাকে বহুক্ষেত্রে “অতিরঞ্জিত” ও “বিভ্রান্তিমূলক প্রচারণা” বলে প্রত্যাখ্যান করেছে, এবং স্বাধীন সাংবাদিকতা ও তথ্য যাচাইয়ের সুযোগ ইরানের অভ্যন্তরে সীমিত থাকায় প্রকৃত সংখ্যা নিরূপণ কঠিন – এই সীমাবদ্ধতা মাথায় রাখা জরুরি।
এই যুগেও এমন মিথের উপরে দাঁড়িয়ে একটি শাসন!
সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৫-এ স্পষ্টভাবে লিপিবদ্ধ গায়েব ইমামের ধারণা এবং তার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা ফকীহর নিরঙ্কুশ কর্তৃত্ব – এই তাত্ত্বিক কাঠামোই ইরানের শাসনব্যবস্থাকে অন্যান্য আধুনিক রাষ্ট্র থেকে পৃথক করে তোলে। আর সংখ্যাগুলো যা বলছে – ১৯৮৮ সালের হাজার হাজার রাজনৈতিক বন্দির গোপন হত্যা, ২০২৫ সালে রেকর্ড পরিমাণ মৃত্যুদণ্ড, ২০২২ ও ২০২৫-২৬ সালের বিক্ষোভে হাজার হাজার নিহত ও গ্রেপ্তার, লক্ষ লক্ষ নারীর বিরুদ্ধে হিজাব-সংক্রান্ত ফৌজদারি মামলা, এবং পঞ্চাশ লক্ষাধিক মানুষের চার দশক ধরে দেশত্যাগ – এসবই একটি প্রশ্নের দিকে ইঙ্গিত করে: একটি রাষ্ট্র যখন তার বৈধতার উৎস হিসেবে একটি অযাচাইযোগ্য ধর্মীয় দাবিকে বেছে নেয়, তখন জনগণের প্রতি তার জবাবদিহিতা কতটা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত থাকে।
তথ্যসূত্রঃ এই প্রবন্ধের পরিসংখ্যানগুলো অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, ইরান হিউম্যান রাইটস (IHR/Oslo), Human Rights Activists News Agency (HRANA), জাতিসংঘের মানবাধিকার-বিষয়ক তথ্যানুসন্ধান কমিশন (UN FFMI), UNHCR এবং সংবিধানের ইংরেজি সরকারি অনুবাদ থেকে সংগৃহীত। যেহেতু ইরান সরকার নিজে থেকে অনেক তথ্য প্রকাশ করে না, তাই প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই প্রকৃত সংখ্যা প্রকাশিত সংখ্যার চেয়ে বেশি হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো সতর্ক করেছে। বিভিন্ন সংস্থার সংখ্যায় পার্থক্য থাকায় প্রতিটি ক্ষেত্রে একাধিক সূত্র উল্লেখ করা হয়েছে।
Related Posts

Ayatollah Ali Khamenei was laid to rest after carrying out repression in the name of a child who disappeared 1,200 years ago
Around Ayatollah Ali Khamenei’s funeral, the world is now witnessing a grand display of stateRead More

From Somnath to Joypurhat – The Shadow of a Thousand‑Year‑Old Destruction Still Exists Today
The first blow On the Saurashtra coast of Gujarat, where the waves of the ArabianRead More

সোমনাথ থেকে জয়পুরহাট – এক সহস্রাব্দের পুরনো ধ্বংসের ছায়া আজও বিদ্যমান
প্রথম আঘাত গুজরাটের সৌরাষ্ট্র উপকূলে, যেখানে আরব সাগরের ঢেউ এসে আছড়ে পড়ে পাথুরে তটে, সেখানেRead More

Comments are Closed