
Islamic Scientists
ইসলাম একদা বিজ্ঞানীদের অপদস্থ করেছে, এখন তাদের নিয়ে গর্ব করে। ইসলামিক হিপোক্রেসি!
বিজ্ঞান কোনো ধর্ম, জাতি বা ভৌগোলিক সীমানা মানে না। ল্যাবরেটরি বা টেলিস্কোপে কোনো ধর্মীয় গ্রন্থের বাণী লেখা থাকে না—শুধু সত্যের অনুসন্ধান থাকে। নিউটন, গ্যালিলিও, আইনস্টাইন বা হকিংকে আমরা খ্রিস্টান/ইহুদি/নাস্তিক বিজ্ঞানী বলে ট্যাগ দিই না। কিন্তু “ইসলামী স্বর্ণযুগ”- নাম দিয়ে এর বিজ্ঞানীদের ক্ষেত্রে প্রায়ই “মুসলিম বিজ্ঞানী” ট্যাগ লাগিয়ে ধর্মীয় মালিকানা দাবি করা হয়।
আজকের দিনে অনেক মুমিন, ধর্মীয় বক্তা বা লেখক বুক ফুলিয়ে ‘মুসলিম বিজ্ঞানী’ নাম দিয়ে ইবনে সিনা, আল-রাজি বা ইবনে রুশদের নাম নেন। কিন্তু ইতিহাস বলে, এই মানুষগুলো তাদের বৈজ্ঞানিক ও দার্শনিক চিন্তার জন্য তৎকালীন কট্টরপন্থী ইসলামী ধর্মীয় শক্তির চক্ষুশূল ছিলেন। ইমাম গাজ্জালীর মতো প্রভাবশালী ধর্মীয় তাত্ত্বিকেরা এদের অনেকের দর্শন ও বৈজ্ঞানিক চিন্তাকে ‘কুফর’ (ইসলামের পরিপন্থী) বলে অভিহিত করেছিলেন। শুধু কুফর বলেই তারা ক্ষ্যান্ত দেননি – অপমানিত করেছে, লাঞ্চিত করেছে, তাদের পিটিয়ে রক্তাক্ত করেছে, পাগল বলে গৃহবন্দি করেছে, নির্বাসনে পাঠিয়েছে, জেলেও ভরেছে, হত্যাও করেছে। ইমাম গাজ্জালীর তাহাফুত আল-ফালাসিফা (দার্শনিকদের অসংগতি) এই দ্বন্দ্বের একটি বড় উদাহরণ। যে ইসলাম এক সময় তাদের পথে কাঁটা বিছিয়েছে, এখন সেই ইসলাম দাবী করে তারা নাকি ‘মুসলিম বিজ্ঞানী!’ কি হিপোক্রেসী ইসলামের!
জীবদ্দশায় নির্যাতন, মৃত্যুর পর গর্বঃ ঐতিহাসিক হিপোক্রেসী
ইবনে সিনা (Avicenna, ৯৮০–১০৩৭): চিকিৎসা বিজ্ঞানের বাইবেল খ্যাত ‘আল-কানুন ফি আল-তিব’ এর রচয়িতা ইবনে সিনা। মানবদেহের সঠিক অ্যানাটমি বোঝার জন্য তাকে রাতের অন্ধকারে কবর খুঁড়ে লাশ চুরি করতে হয়েছিল, কারণ তৎকালীন ইসলামী ধর্মীয় সমাজ ময়নাতদন্ত বা শব ব্যবচ্ছেদকে পাপ মনে করত। নাস্তিকতার অভিযোগে তাকে ইস্পাহানের জেলে বন্দি জীবনও কাটাতে হয়েছিল।
ইবনে রুশদ (Averroes, ১১২৬–১১৯৮): অ্যারিস্টটলের দর্শনকে পুনরুজ্জীবিত করা এই মহান দার্শনিক ও বিজ্ঞানীকে তৎকালীন ইসলামী খেলাফতের কট্টরপন্থী খলিফা মনসুরের আদেশে নির্বাসনে পাঠানো হয়। শুধু তাই নয়, রাজকীয় ফরমান জারি করে তার লেখা প্রায় সমস্ত দর্শন ও বিজ্ঞানের বই প্রকাশ্যে পুড়িয়ে ফেলা হয়েছিল।
আল-কিন্দী (Al-Kindi, ৮০১–৮৭৩): “আরবদের দার্শনিক” খ্যাত এই গণিতবিদ ও জ্যোতির্বিজ্ঞানী গ্রিক দর্শন ও বিজ্ঞান চর্চা করার অপরাধে কট্টরপন্থী খলিফা আল-মুতাওয়াক্কিলের আমলে চরম নির্যাতনের শিকার হন। তাকে প্রকাশ্য রাজপথে ৬০ ঘা চাবুক মারা হয়, তার বিশাল লাইব্রেরিটি বাজেয়াপ্ত করা হয় এবং বৃদ্ধ বয়সে চরম অবমাননার মধ্যে তাকে মরতে হয়।
আল-ফারাবী (Al-Farabi): যুক্তিবিদ্যা ও সমাজবিজ্ঞানের এই পণ্ডিতকে তৎকালীন কট্টর মোল্লারা ‘কাফের’ ও ‘নাস্তিক’ ফতোয়া দিয়েছিলেন। ইমাম গাজ্জালী তার বইতে আল-ফারাবীকে ইসলামের শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করায় তাকে প্রায় সারা জীবন এক শহর থেকে অন্য শহরে পালিয়ে বেড়াতে হয়েছিল। সেই যুগেও ইসলাম অবমাননার অযুহাত তুলে তাদের জীবনকে এখনকার মতোই ভুগিয়েছে ইসলাম!
ওমর খৈয়াম (Omar Khayyam, ১০৪৮–১১৩১): গণিতবিদ, জ্যোতির্বিজ্ঞানী (ক্যালেন্ডার সংস্কার, ঘন সমীকরণ সমাধান) এবং রুবাইয়াতের কবি। তার কবিতায় ধর্মীয় ভণ্ডামি ও নিয়তির প্রশ্ন তুলে ধরা হয়েছে, যা অনেককে সন্দেহবাদী বানিয়েছে। তিনি তার রুবাইয়াতে তৎকালীন প্রাতিষ্ঠানিক ইসলাম ধর্মের ভণ্ডামিকে যেভাবে কটাক্ষ করেছেন, তাতে তাকে কোনোভাবেই প্রথাগত ধার্মিক বলা চলে না।
আল-রাজি (Rhazes, ৮৬৫–৯২৫): চিকিৎসাবিজ্ঞানের পথিকৃৎ, গুটিবসন্ত-হামের পার্থক্যকারী। যুক্তিবাদী চিন্তার জন্য সমালোচিত। শেষ জীবনে অন্ধত্বের একটি কাহিনি প্রচলিত—যেখানে তার পৃষ্ঠপোষক বই দিয়ে মাথায় আঘাত করে অন্ধ করে দেন বলে অভিযোগ (যদিও কারণ নিয়ে বিতর্ক আছে, চোখের রোগও হতে পারে)। তিনি প্রচলিত ধর্মীয় কর্তৃত্ব ও অন্ধবিশ্বাসের সমালোচনা করেছিলেন।
ইবনে আল-হাইথাম (Alhazen, ৯৬৫–১০৪০): আধুনিক আলোকবিজ্ঞানের জনক, বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির প্রবক্তা। ফাতেমীয় খলিফা আল-হাকিমের রোষে পড়ে প্রায় ১০ বছর গৃহবন্দি থাকেন “পাগল” সেজে।
ইবনে আল-রাওয়ান্দি (Ibn al-Rawandi): ধর্মীয় অনুশাসন ও নবুয়তের তীব্র সমালোচক। অনেকে তাকে নাস্তিকতার অভিযোগে আক্রমণ করেন।
আবু বকর আল-আসাম বা অন্যান্য মু’তাজিলা চিন্তাবিদঃ যুক্তিবাদের জন্য পরবর্তীকালে দমনের শিকার।
সুহরাওয়ার্দী (শহীদ): দার্শনিক চিন্তার জন্য আলেপ্পোতে মৃত্যুদণ্ড (যদিও রাজনৈতিক কারণও জড়িত)।
এসব ক্ষেত্রে নির্যাতন প্রায়ই ইসলাম নিয়ন্ত্রিত রাজনৈতিক-ক্ষমতার সাথে জড়িত ছিল, কিন্তু ধর্মীয় অর্থোডক্সি (বিশেষ করে আশ‘আরি মতবাদের উত্থান) বড় ভূমিকা রেখেছে।
বিজ্ঞানের উদ্দেশ্য ছিল মানবতার উন্নয়ন, ধর্মীয় এজেন্ডা নয়
আল-খোয়ারিজমি (বীজগণিতের জনক), আল-রাজি, ইবনে আল-হাইথাম—তারা প্রকৃতির নিয়ম আবিষ্কার করতে চেয়েছিলেন। আল-রাজি অন্ধবিশ্বাসের সমালোচনা করেছিলেন। এরা ধর্মীয় গ্রন্থের “প্রমাণ” করার জন্য কাজ করেননি।
বৈশ্বিক চিত্রঃ ধর্মীয় কর্তৃত্ব বনাম বিজ্ঞান
এটি শুধু ইসলামী সমাজের নয়। অন্য ধর্মের কট্টরপন্থাও বিজ্ঞানের অগ্রগতিকে বাঁধাগ্রস্থ করেছে।
হাইপেশিয়াঃ আলেকজান্দ্রিয়ার এই মহান নারী গণিতবিদ ও জ্যোতির্বিজ্ঞানীকে কট্টর ধর্মীয় উন্মাদ খ্রিস্টান জনতা চার্চের ভেতর নির্মমভাবে টুকরো টুকরো করে হত্যা করেছিল।
জিওর্দানো ব্রুনোঃ মহাবিশ্ব অসীম এবং পৃথিবী মহাবিশ্বের কেন্দ্র নয়—এই বৈজ্ঞানিক সত্য প্রচার করার অপরাধে রোমান ক্যাথলিক চার্চ ১৬০০ সালে তাকে খুঁটিতে বেঁধে জীবন্ত পুড়িয়ে মারে।
গ্যালিলিও গ্যালিলিইঃ কোপার্নিকাসের সূর্যকেন্দ্রিক তত্ত্ব সমর্থন করায় চার্চের রোষানলে পড়েন, তাকে মৃত্যুদণ্ডের ভয় দেখিয়ে ক্ষমা চাইতে বাধ্য করা হয় এবং জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তাকে গৃহবন্দি হয়ে কাটাতে হয়।
সক্রেটিসঃ তরুণ সমাজকে যুক্তি শেখানো এবং প্রচলিত দেবতাদের নিয়ে প্রশ্ন তোলার অপরাধে তৎকালীন শাসক ও সমাজ তাকে হেমলক বিষ পানে আত্মহত্যা করতে বাধ্য করে।
এমনকি চার্লস ডারউইন, যাকে তার পরিবার চার্চের যাজক বানানোর জন্য জাহাজে তুলে দিয়েছিল, তিনি প্রকৃতির সত্যকে আড়াল করতে পারেননি। তার রচিত ‘অন দ্য অরিজিন অব স্পিসিজ’ বইটি জীববিজ্ঞানের মোড় ঘুরিয়ে দিলেও আজ পর্যন্ত প্রথাগত ধর্মীয় শক্তিগুলো ডারউইনের বিবর্তনবাদকে মেনে নিতে পারেনি এবং প্রতিনিয়ত এর বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছে।
প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম প্রায়ই নতুন সত্যকে ভয় পেয়েছে।
আধুনিক উদাহরণঃ ড. আব্দুস সালাম
ধর্মীয় অন্ধত্ব এবং বিজ্ঞানীদের প্রতি এই বৈরী আচরণ যে কেবল মধ্যযুগেই সীমাবদ্ধ ছিল, তা নয়; এটি আধুনিক সমাজকেও গ্রাস করে রেখেছে। এর সবচেয়ে বড় এবং জীবন্ত উদাহরণ পাকিস্তানের একমাত্র নোবেলজয়ী পদার্থবিজ্ঞানী ড. আব্দুস সালাম।
পদার্থবিজ্ঞানে অনন্য অবদানের জন্য ১৯৭৯ সালে তিনি নোবেল পুরস্কার পান। কিন্তু তার অপরাধ ছিল—তিনি ‘আহমদিয়া’ বা কাদিয়ানী সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।
দেশটির রাষ্ট্র ও কট্টরপন্থী সমাজ তাকে আপন করে নেয়নি। তাকে পদে পদে অপমানিত হতে হয়েছে, দেশ ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছে। এমনকি মৃত্যুর পর তার কবরের ফলক থেকে ‘মুসলিম’ শব্দটি সরকারি নির্দেশে আইনিভাবে মুছে দেওয়া হয়। অথচ তার আবিষ্কৃত ‘ইলেকট্রোউইক থিওরি’ আজ সারা পৃথিবীর পদার্থবিজ্ঞানের অন্যতম ভিত্তি। বিজ্ঞানের আলো দিয়ে তিনি বিশ্বকে আলোকিত করলেও, নিজ দেশের ধর্মীয় অন্ধকারের কাছে তিনি পরাজিত হয়েছেন।
বিজ্ঞান সবার, বিজ্ঞানী বিশ্বনাগরিক
বিজ্ঞানীদের অবদান কোনো ধর্মের সম্পত্তি নয়। অনেক ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম তাদের বিরুদ্ধে ফতোয়া, নির্যাতন ও অবহেলা দিয়েছে। আজ যারা বিজ্ঞানের কুৎসা করেন, তারাই ইবনে সিনার চিকিৎসা, ফ্লেমিংয়ের পেনিসিলিন, আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করেন।
বিজ্ঞানের পথ কুসুমাস্তীর্ণ নয়। যারা সত্যের অনুসন্ধান করেন, তাদের একমাত্র পরিচয়—মানুষ। তাদের সাধনা পুরো মানবতার জন্য। ধর্মীয় ট্যাগ লাগিয়ে ইতিহাসকে বিকৃত করা সুবিধাবাদ ছাড়া কিছু নয়। ইসলামের সৈনিকদের দেখা যায় এই হিপোক্রেসীর শীর্ষে।
রেফারেন্স হিসাবে যেগুলো পড়তে পারেন
Tahafut al-falasifa (The Incoherence of the Philosophers) – Imam Al-Ghazali.
The Rise of Early Modern Science: Islam, China, and the West – Toby E. Huff.
The Life of Ibn Sina: A Critical Edition and Annotated Translation – William E. Gohlman.
Islamic Science and the Making of the European Renaissance – George Saliba.
Al-Bayan al-Mughrib – Ibn Idhari.
Averroes: His Life, Works and Influence – Majid Fakhry.
Kitab al-Fihrist – Ibn al-Nadim.
Tarikh al-Hukama (History of Philosophers) – Ibn al-Qifti.
Risala fi Fihrist Kutub Muhammad ibn Zakariya al-Razi – Al-Biruni.
Kitab A’lam al-Nubuwwah (The Signs of Prophecy) – Abu Hatim al-Razi.
Uyun al-Anba fi Tabaqat al-Atibba – Ibn Abi Usaibia.
Ecclesiastical History – Socrates Scholasticus.
Vatican Secret Archives: Trials of the Roman Inquisition.
Giordano Bruno and Renaissance Science – Hilary Gatti.
The Galileo Affair: A Documentary History – Maurice A. Finocchiaro.
Apology & Crito – Plato.
The Post-Darwinian Controversies – James R. Moore.
Cosmic Anger: Abdus Salam – The First Muslim Nobel Scientist – Gordon Fraser.
Salam, The First ****** Nobel Laureate (Netflix Documentary).
A History of the Warfare of Science with Theology in Christendom – Andrew Dickson White.
The Venture of Islam (Volume 2): The Expansion of Islam in the Middle Periods – Marshall G.S. Hodgson.
Defenders of Reason in Islam: Mu’tazilism from Medieval School to Modern Symbol – Richard C. Martin & Mark R. Woodward.
Related Posts

Two hundred years of the camera have passed, and although we all enjoy its priceless benefits, how many of us actually know this?
In 2012 I bought a DSLR camera. Of course, long before that, around 2000, IRead More

ক্যামেরার ২০০ বছর চলে এখন, আমরা সবাই এর অমূল্য উপকার ভোগ করলেও ক’জন জানি এটা?
২০১২ সালে আমি একটা ডিএসএলআর ক্যামেরা কিনেছিলাম। অবশ্য তার অনেক আগে ২০০০ সালের দিকে আমারRead More

The fate of Salton City teaches that trying to control nature can lead to the opposite of what is intended
Salton Sea: The Story of a Haunted Dream After almost a 300‑kilometer drive in threeRead More

Comments are Closed