Microbes
Microbes own Earth

Microbes own Earth

অনুজীব, ভাইরাস আর ব্যাকটেরিয়ার এই গ্রহে মানুষ আসলে কতটা “সেরা”?

আমরা পরজীবি, না তারা?

পৃথিবীর বয়স প্রায় সাড়ে চারশো কোটি বছর। মানুষের আবির্ভাব মাত্র তিন-চার লক্ষ বছর আগে। আর সভ্যতার কথা যদি বলি — সেটা মাত্র দশ হাজার বছরের গল্প। কিন্তু অনুজীবেরা? ব্যাকটেরিয়া এই পৃথিবীতে আছে প্রায় তিনশো পঞ্চাশ কোটি বছর ধরে। ভাইরাস হয়তো আরও আগে থেকে। এই পরিপ্রেক্ষিতে দাঁড়িয়ে আমরা যদি দাবি করি যে পৃথিবী আমাদের এবং অনুজীবেরা এখানে পরজীবি — তাহলে সেটা ইতিহাসের সবচেয়ে হাস্যকর দাবিগুলোর একটি হয়ে দাঁড়ায়।

সত্যিকার অর্থে এই পৃথিবী অনুজীবের। আমরা তাদের গ্রহে এসে বসতি গড়েছি, তাদের তৈরি পরিবেশে শ্বাস নিচ্ছি, তাদের রেখে যাওয়া সম্পদ পুড়িয়ে গাড়ি চালাচ্ছি — এবং তবুও ভাবছি আমরাই সৃষ্টির সেরা।

অক্সিজেনের আসল দাতা কে?

“গাছ লাগাও, পরিবেশ বাঁচাও” — এই স্লোগান আমরা প্রতিদিন শুনি। কিন্তু এই বাক্যটিতে একটা বিশাল অসততা আছে। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে যে অক্সিজেন আমরা শ্বাসের সাথে টেনে নিচ্ছি, তার প্রায় ৭০ শতাংশ আসে সমুদ্র থেকে — সুনির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে, সামুদ্রিক ফাইটোপ্ল্যাংকটন ও অন্যান্য সামুদ্রিক শৈবাল থেকে। এই ক্ষুদ্র এককোষী প্রাণীগুলো সমুদ্রের উপরিভাগে ভেসে সূর্যালোকের সাহায্যে সালোকসংশ্লেষণ করে চলেছে নিরন্তর, যুগ যুগ ধরে।

আমাজন বনকে আমরা বলি পৃথিবীর ফুসফুস। কিন্তু বাস্তবে, সমগ্র স্থলজ বনভূমি — আমাজন থেকে কঙ্গো অববাহিকা, বোরিয়াল বন থেকে সুন্দরবন — সবকিছু মিলিয়ে পৃথিবীর অক্সিজেনের বাকি মাত্র প্রায় ২৮-৩০ শতাংশ সরবরাহ করে। আমাজন একা করে তার কিছু অংশ। আর আমাদের বাড়ির উঠানে লাগানো দশটি গাছ? সেটা এত ক্ষুদ্র যে সংখ্যায় প্রকাশ করতে গেলে দশমিকের পর শূন্যের মিছিল।

তাহলে বুঝুন — যে অক্সিজেন ছাড়া আপনি বাঁচতে পারবেন না, তার সিংহভাগ তৈরি করছে সেই অনুজীব, যাদের আমরা “পরজীবি” বলে তাচ্ছিল্য করি।

পৃথিবীর প্রকৃত মালিক – অনুজীব সামুদ্রিক ফাইটোপ্ল্যাংকটন পৃথিবীর মোট অক্সিজেনের ~৭০% সমুদ্রের অনুজীব সরবরাহ করে সমস্ত স্থলজ বনভূমি আমাজন থেকে সুন্দরবন মিলিয়ে ~২৮% সকল গাছপালা মিলে সরবরাহ করে জীবাশ্ম জ্বালানির উৎস কোটি বছর আগে মৃত সামুদ্রিক অনুজীবের দেহ → সমুদ্রতলে জমা → টেকটনিক চাপে → তেল ও গ্যাস মানুষের বুদ্ধিমত্তা ও ভাইরাস প্রাচীন রেট্রোভাইরাস সংক্রমণ → মানব DNA-তে অন্তর্ভুক্তি → Syncytin প্রোটিন, নিউরাল বিকাশ, উন্নত মস্তিষ্ক গঠন

যে জ্বালানিতে সভ্যতা দাঁড়িয়ে

আধুনিক সভ্যতার মেরুদণ্ড হলো জীবাশ্ম জ্বালানি। তেল, গ্যাস, কয়লা — এই তিনটি উপাদান ছাড়া আজকের পৃথিবীর অর্থনীতি, যানবাহন, বিদ্যুৎ, শিল্পকারখানা — কিছুই কল্পনা করা সম্ভব নয়। এই জ্বালানির প্রাথমিক উৎস কী?

কোটি কোটি বছর আগে সমুদ্রের তলদেশে বসবাসকারী ক্ষুদ্র সামুদ্রিক অনুজীব এবং শৈবালের মৃতদেহ জমতে জমতে পুরু স্তর তৈরি করেছিল। সমুদ্রতলের পলিমাটির নিচে ঢাকা পড়ে, প্রচণ্ড তাপ ও চাপের মধ্যে কোটি বছরের ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়ায় সেই জৈব পদার্থ রূপান্তরিত হয়েছে পেট্রোলিয়ামে, প্রাকৃতিক গ্যাসে। পরে টেকটোনিক প্লেটের নড়াচড়ায় সমুদ্রের তলদেশ স্থলভাগের নিচে চলে যাওয়ায় এই তেল-গ্যাসের ভাণ্ডার আজ স্থলে বা উপকূলের কাছে পাওয়া যাচ্ছে।

অর্থাৎ, সৌদি আরবের তেলক্ষেত্র, রাশিয়ার গ্যাসপাইপলাইন, মধ্যপ্রাচ্যের সম্পদ — এসব আসলে মৃত অনুজীবের দেহের উপর দাঁড়িয়ে থাকা সাম্রাজ্য। যে সভ্যতাকে আমরা মানুষের বুদ্ধিমত্তার চূড়ান্ত প্রকাশ বলে গর্ব করি, সেটি আসলে কোটি বছর আগে মরে যাওয়া অণুজীবের দেহসম্পদের উপর পরগাছার মতো বেঁচে আছে।

ভাইরাস কি দিয়েছে আমাদের বুদ্ধি?

মানুষের বিবর্তনের সবচেয়ে রহস্যময় প্রশ্নগুলোর একটি হলো — শিম্পাঞ্জি, গরিলা, বনোবো, ওরাংওটাং সবাই মানুষের নিকট আত্মীয়, একই পূর্বপুরুষ থেকে বিবর্তিত। তবুও কেন শুধু মানুষই এত জটিল ভাষা তৈরি করল, বিমূর্ত চিন্তা করতে পারল, সভ্যতা গড়ল? শুধু জিনগত পার্থক্য দিয়ে এই বিশাল বুদ্ধিমত্তার ব্যবধান ব্যাখ্যা করা যায় না।

বিজ্ঞানীরা একটি চমকপ্রদ অনুকল্পের দিকে দৃষ্টি দিয়েছেন — প্রাচীন রেট্রোভাইরাস। লক্ষ লক্ষ বছর আগে আমাদের পূর্বপুরুষদের কিছু ভাইরাস সংক্রমিত করেছিল এবং নিজেদের জেনেটিক উপাদান মানব DNA-তে স্থায়ীভাবে গেঁথে দিয়েছিল। এই “এন্ডোজেনাস রেট্রোভাইরাস” (ERV) আজ মানব জিনোমের প্রায় আট শতাংশ জুড়ে আছে।

এই ভাইরাল জিনগুলোর মধ্যে কিছু জিন মস্তিষ্কের সিনাপটিক সংযোগ তৈরিতে ভূমিকা রাখে বলে গবেষণায় দেখা গেছে। Arc জিন নামে একটি জিন — যা স্মৃতি গঠন ও শিক্ষার জন্য অপরিহার্য — এর গঠন ভাইরাল ক্যাপসিড প্রোটিনের মতো। এছাড়া Syncytin প্রোটিন, যা প্লাসেন্টা গঠনে কাজ করে এবং মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট কোষগুলোকে প্রভাবিত করে, সেটিও এসেছে ভাইরাস থেকে। সম্পূর্ণ প্রমাণিত না হলেও এই ধারণাটি ক্রমশ বৈজ্ঞানিক গুরুত্ব পাচ্ছে যে, ভাইরাসের দেওয়া জিনই হয়তো মানুষকে অন্য বনমানুষদের চেয়ে আলাদা পথে নিয়ে গেছে।

তাহলে পরজীবি কে?

পরজীবি বলতে আমরা বুঝি এমন একটি প্রাণী যে অন্যের শরীর বা পরিবেশকে একতরফা ব্যবহার করে, নিজে শুধু নেয়, বিনিময়ে কিছু দেয় না বরং ক্ষতি করে। এই সংজ্ঞা দিয়ে বিচার করলে মানুষ এবং অনুজীব — কোনো দলটি আসলে পরজীবি?

অনুজীবেরা মাটিকে উর্বর করে, মৃত জিনিসকে পচিয়ে পুনর্ব্যবহারযোগ্য করে, বায়ুমণ্ডলে অক্সিজেন যোগ করে, নাইট্রোজেন চক্র বজায় রাখে — এমনকি আমাদের পাকস্থলীতে বাস করে আমাদের হজমে সাহায্য করে। মানুষ ছাড়া অনুজীবেরা বহু কোটি বছর বেঁচে থাকত। কিন্তু অনুজীব ছাড়া মানুষ কয়দিন?

অন্যদিকে মানুষ পৃথিবীর বনভূমি ধ্বংস করেছে, সমুদ্র দূষিত করেছে, বায়ুমণ্ডলে কার্বন ঢেলেছে, অসংখ্য প্রজাতিকে বিলুপ্ত করেছে — এবং অনুজীবের রেখে যাওয়া জীবাশ্ম সম্পদ অতি দ্রুততার সাথে নিঃশেষ করে চলেছে। এই বিশেষণটি আমাদের জন্যই যথাযথ নয় কি?

মানুষ হয়তো বুদ্ধিমান প্রাণী। কিন্তু সেই বুদ্ধিমত্তাও যদি ভাইরাসের অবদান হয়, সেই অক্সিজেনও যদি অনুজীবের দান হয়, সেই জ্বালানিও যদি অনুজীবের দেহের উত্তরাধিকার হয় — তাহলে “সৃষ্টির সেরা জীব” দাবিটি কেবল অহংকার, প্রমাণ নয়।

পৃথিবী আসলেই অনুজীবের। আমরা কেবল অতিথি — এবং অতিথি হিসেবেও মোটেই আদর্শ নই।

Related Posts

200 Years of Photography!

Two hundred years of the camera have passed, and although we all enjoy its priceless benefits, how many of us actually know this?

In 2012 I bought a DSLR camera. Of course, long before that, around 2000, IRead More

200 Years of Photography!

ক্যামেরার ২০০ বছর চলে এখন, আমরা সবাই এর অমূল্য উপকার ভোগ করলেও ক’জন জানি এটা?

২০১২ সালে আমি একটা ডিএসএলআর ক্যামেরা কিনেছিলাম। অবশ্য তার অনেক আগে ২০০০ সালের দিকে আমারRead More

Saltan City – The Dead Dream

The fate of Salton City teaches that trying to control nature can lead to the opposite of what is intended

Salton Sea: The Story of a Haunted Dream After almost a 300‑kilometer drive in threeRead More

Comments are Closed