Society
Are All Social Customs Beneficial?

Are All Social Customs Beneficial?

‘হেফাজতে সমাজ’ – গ্রুপ সমাচার! আপনার চারিদিকে আপনি এদের দেখা পাবেন

আমি তখন ক্লাস এইটে পড়ি। সেদিন স্কুল ছিল না, সম্ভবত বাড়ির জন্য বাজার করে সাইকেলে ফিরছিলাম। পথে একটা বাঁক আছে, প্রায় ৭০ ডিগ্রির মতো হবে। মুখোমুখি না হলে বোঝা যায় না ওপাশ থেকে কী আসছে। তো আমিও টের পাচ্ছিলাম না, আবার ছোট রাস্তা, বাস-ট্রাকের এক্সিডেন্ট হওয়ারও রেকর্ড আছে ঐ স্থানে। কাছে গিয়ে দেখলাম হাইস্কুলের এক শিক্ষক আসছেন বিপরীত দিক থেকে। ঐ পর্যন্ত সবই ঠিক ছিল।

পরদিন স্কুলে গেলে উক্ত শিক্ষক আমাকে ডেকে পাঠালেন। যাওয়ার পর পরই অন্য শিক্ষক, ছাত্রদের সামনে আমাকে কড়া ভাষায় তিরস্কার করা শুরু করলেন। আমি নাকি অনেক বড়লোক হয়ে গেছি তাই গরিব শিক্ষকদের সম্মান করি না। বিষয় হলো, উনাকে দেখে আমি সাইকেল থেকে নেমে দাঁড়িয়ে সালাম দেইনি, সেটাই আমার অপরাধ। উনি আমার সরাসরি শিক্ষক ছিলেন না কখনো। আমি ক্লাসে ফার্স্ট থাকায় সবসময় বিজোড় শাখায় পড়তাম, উনি পড়াতেন খ শাখায়, জোড় রোলের ছাত্রদের।

বহু বছর পর বুঝেছি, সেদিনের বিচারসভায় আমার আসল অপরাধ সালাম না দেওয়া ছিল না। আসল অপরাধ ছিল, একটা দুর্ঘটনাপ্রবণ বাঁকে সাইকেল সামলাতে সামলাতে আমি ঠিক করতে পারিনি কোনটা আগে জরুরি – নিজেকে বাঁচানো, নাকি সামনের ভদ্রলোকের পদমর্যাদা চিনে যথাযথ ভঙ্গিতে থেমে যাওয়া। আমাদের সমাজে ব্রেক কষা আর সালাম দেওয়া একসাথে করাটাই বোধহয় প্রকৃত ভদ্রতার সংজ্ঞা, আমি সেই পরীক্ষায় ফেল করেছিলাম। সম্মান এখানে মাপা হয় না আচরণ দিয়ে, মাপা হয় ঘাড় কতটুকু নুইয়েছে তা দিয়ে। যিনি কোনোদিন আমাকে পড়াননি, আমার নামটাও যার জানার কথা ছিল না, তিনি নিজেকে অপমানিত বোধ করলেন কারণ আমি থামিনি। অথচ ঠিক একই সমাজে প্রতিদিন কত মানুষ প্রকৃত অন্যায় করে অনায়াসে পার পেয়ে যান, শুধু এই কারণে যে তারা কেতাদুরস্ত ভাষায় কথা বলতে জানেন, ঠিকঠাক সালাম-আদাব করতে জানেন।

এই “ঠিক প্রথা”র শিকড় অনেক গভীরে প্রোথিত। বাংলার সমাজ-ইতিহাসে সম্মান দেখানোর নিয়মকানুন কখনোই নিছক নম্রতার প্রকাশ ছিল না, বরং ছিল ক্ষমতার মানচিত্র এঁকে দেওয়ার একটা কৌশল। জমিদারি আমলে প্রজাকে জমিদারের সামনে মাথা নত করতে হতো, জুতা হাতে নিয়ে দাঁড়াতে হতো, কথা বলতে হতো নিচু স্বরে – এই রীতিগুলো সরাসরি জমির মালিকানা আর ক্ষমতার সম্পর্ক থেকে জন্ম নিয়েছিল, শ্রদ্ধা থেকে নয়, ভয় থেকে। মুঘল ও নবাবি দরবারের কেতাদুরস্ত কুর্নিশ-সংস্কৃতি, তারপর ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক প্রশাসনের নিজস্ব সেলাম-প্রথা – এই দুই স্তর মিলেমিশে একটা সামাজিক অভ্যাস তৈরি করেছে, যেখানে ক্ষমতাধরের সামনে শরীরী ভাষায় বিনয় দেখানোটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যোগ্যতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেই অভ্যাস থানার দারোগা থেকে গ্রামের মাতব্বর, স্কুলের হেডমাস্টার থেকে অফিসের বড়বাবু পর্যন্ত হাত বদল হয়ে আজও টিকে আছে।

ধর্মীয় অনুষঙ্গও কম দায়ী নয়। ইসলামি সংস্কৃতিতে সালাম মূলত একটা বরকতময় দোয়া, ডান হাতের ব্যবহার পবিত্রতার প্রতীক, প্রবীণদের প্রতি আদব একটা নৈতিক শিক্ষা। হিন্দু সমাজে পা ছুঁয়ে প্রণাম করা কিংবা মুরুব্বিদের সামনে চুপ করে থাকা একই রকম শ্রদ্ধার ভাষা। এসবের পেছনের অভিপ্রায় খারাপ ছিল না। সমস্যা হলো, সময়ের সাথে সাথে প্রথাগুলোর আসল অর্থ হারিয়ে গিয়ে শুধু খোলসটাই টিকে গেছে। আদব এখন আর ভেতরের শ্রদ্ধার স্বতঃস্ফূর্ত বহিঃপ্রকাশ নয়, এটা এখন একধরনের পরীক্ষা, যেখানে পাস করলেই আপনি “ভদ্র” আর ফেল করলেই “বেয়াদব” – ভেতরে আপনি আসলে কেমন মানুষ, সেই প্রশ্ন প্রায় কেউ তোলে না।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার সারাজীবনের লেখালেখিতে বারবার এই ফাঁপা প্রথাসর্বস্বতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন। তার আপত্তি প্রথায় ছিল না, আপত্তি ছিল প্রথাকে মানবিকতার বিকল্প বানিয়ে ফেলায়। প্রায় একই সময়ে রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন আরও কঠিন একটা সত্য সামনে এনেছিলেন। তার “অবরোধবাসিনী” বইয়ে এমন কিছু ঘটনার কথা আছে, যেখানে পর্দা প্রথা রক্ষা করতে গিয়ে নারীরা সাপের কামড়ে, আগুনে পুড়ে বা পানিতে ডুবে মারা গেছেন – কারণ অপরিচিত পুরুষের সামনে বেরিয়ে আসাটাকে মৃত্যুর চেয়েও লজ্জাজনক বলে ধরে নেওয়া হতো। এখানেই প্রথা আর চরিত্রের আসল ফারাকটা সবচেয়ে নির্মমভাবে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একটা প্রথা মানুষকে বাঁচাতে ব্যর্থ হলেও, প্রথা রক্ষা করাটাই যদি একমাত্র মাপকাঠি হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে সেই প্রথার নামে একটা মানুষকে মরে যেতে দেওয়াটাও সমাজের চোখে “শালীন” কাজ হয়ে যায়।

এই একই বৈসাদৃশ্য হালের একটা ভাইরাল ভিডিওতেও ধরা পড়ে, যা অনেকেই দেখে থাকবেন। সরকারি অফিসে এক কর্মকর্তা তখন ভাত খাচ্ছেন। বহুদিন হয়রানির শিকার হওয়া গ্রামের এক বৃদ্ধ কৃষক সেদিন ঘুষ নিয়ে হাজির হয়েছেন। কর্মকর্তা টাকাটা নিচ্ছেন ঠিকই, কিন্তু যেহেতু নিয়ম আছে ডান হাতে নেওয়ার, তাই ভাত খাওয়া না থামিয়েই বাম হাত দিয়ে ডান হাতের উল্টো পিঠ ছুঁইয়ে সেই ভঙ্গিতে টাকাটা গ্রহণ করলেন। সামাজিক শিষ্টাচারের প্রতি এমন নিখুঁত যত্ন! অথচ বাঙালি সমাজে কাউকে বাম হাতে কিছু দেওয়া-নেওয়া চরম অভদ্রতা হিসেবে গণ্য হয়, সেটা ঘুষ হোক বা অন্য কিছু। মানুষটা একজন অসহায় কৃষকের কষ্টার্জিত টাকা পকেটে ভরছেন, অথচ তার শিষ্টাচারবোধ অক্ষুণ্ণ থেকে যাচ্ছে। এখানেই প্রথার আসল স্বভাব ধরা পড়ে— এটা বিবেকের বিকল্প নয়, বিবেকের অনুপস্থিতিতেও দিব্যি সহাবস্থান করতে পারে। ভয়ংকর অন্যায় করেও যদি সেটা “সঠিক” হাতে, “সঠিক” ভাষায় করা হয়, সমাজ সহজেই মাফ করে দেয় – অথচ যে ছেলেটা বিব্রত হয়ে সাইকেল থেকে নামতে ভুলে গিয়েছিল, তাকে বছরের পর বছর “বেয়াদব” তকমা বয়ে বেড়াতে হয়।

ছোট ছোট আরও উদাহরণ চারপাশে ছড়িয়ে আছে। বড়দের সামনে সিগারেট খাওয়া অভদ্রতা – এই নিয়মটা আসলে কাউকে ধূমপান ছাড়তে শেখায় না, শুধু লুকিয়ে খেতে শেখায়। বাবার সামনে সিগারেট নিভিয়ে ফেলে ছেলে একটু পরে বন্ধুর আড়ালে ঠিকই সেটা শেষ করে। প্রথা এখানে আচরণ বদলায় না, শুধু আচরণকে দৃষ্টির আড়ালে সরিয়ে দেয়। বাসার কাজের মানুষটির সাথে আচরণেও একই রাজনীতি কাজ করে। তাকে ডাকা হয় নাম ধরে, সম্বোধন করা হয় তুই-তুমিতে, খাবার দেওয়া হয় আলাদা থালায়, বসতে দেওয়া হয় মেঝেতে – অথচ তার কাছ থেকেই দাবি করা হয় নিখুঁত “আপা” বা “ভাইজান” সম্বোধন, মাথা নিচু করে বিনীত ভাষা। যে মানুষটা বছরের পর বছর সন্তানের মতো যত্ন করে বড় করেছেন বাড়ির শিশুদের, সেই বাড়িতেই তাকে একই টেবিলে বসে খেতে দেওয়া হয় না। প্রথা এখানেও অভিন্ন – সম্মান একমুখী রাস্তা, ওপর থেকে নিচে নামে না।

এইরকম হাজারটা “সামাজিকতা” আমাদের চারপাশে ঘুরছে – কোনোটা সত্যিই প্রয়োজনীয়, শৃঙ্খলা আর সৌজন্য রক্ষা করে; কোনোটা নিতান্তই অপ্রয়োজনীয়, শুধু ভয় আর লজ্জার সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখে। সমস্যা হলো, এই দুইয়ের মধ্যে ফারাক করার বিচারবুদ্ধি সমাজ প্রায়ই হারিয়ে ফেলে, আর তখনই প্রথা বাড়াবাড়িতে গিয়ে ঠেকে। আর এই বাড়াবাড়ির ভার সবচেয়ে বেশি বহন করতে হয় নারীদের। একজন একা মা – স্বামী মারা গেছেন কিংবা ছেড়ে চলে গেছেন – সংসার টানতে দিনরাত পরিশ্রম করেন। তার সন্তানদের পেটে ভাত জুটছে কিনা, সেই খোঁজ প্রতিবেশী রাখেন না। তাকে বাজার করে দেওয়ার মতো একজন মানুষও সহজে এগিয়ে আসেন না। কিন্তু তিনি যদি একটু জোরে হাসেন, একটু রঙিন কাপড় পরেন, বা কোনো পুরুষ প্রতিবেশীর সাথে দাঁড়িয়ে দুই মিনিট কথা বলেন – তাহলেই পান থেকে চুন খসার মতো ছুটে আসে হাজারটা মন্তব্য আর ফিসফাস। সমাজ তার বেঁচে থাকার সংগ্রামে পাশে দাঁড়ায় না, কিন্তু তার “শালীনতা” মাপার বেলায় সবচেয়ে সক্রিয় প্রহরী হয়ে ওঠে। এখানেও একই প্যাটার্নের পুনরাবৃত্তি – প্রথা পালিত হচ্ছে কিনা তা দেখার লোকের অভাব নেই, প্রথার আড়ালে মানুষটা আদৌ বেঁচে থাকতে পারছেন কিনা তা দেখার লোক পাওয়া যায় না।

বিয়ের অনুষ্ঠানেও একই কাহিনি ভিন্ন পোশাকে হাজির হয়। যৌতুকের অঙ্ক, গায়ে হলুদের আয়োজন, কোন পক্ষ আগে কার বাড়িতে যাবে, উপহার কেমন হলো – এসব নিয়ে “মানসম্মানের” প্রশ্ন তুলে কত বিয়ে ভেঙে যায় অনুষ্ঠানের আগেই, কত সংসার ভাঙে অনুষ্ঠানের পরে। কখনো কখনো এই “সম্মান” রক্ষার লড়াই গড়ায় মারামারি পর্যন্ত, এমনকি খুনোখুনি পর্যন্ত। প্রশ্ন করলে অবশ্য কেউ ঠিকঠাক বলতে পারবেন না কবে, কোন যুক্তিতে এই নিয়মগুলো তৈরি হয়েছিল। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এগুলো টিকে আছে শুধু এই কারণে যে “সবাই করে”, আর যে করবে না তাকে গুনতে হবে সামাজিক মূল্য।

তাহলে সমাধান কী? আচার পুরোপুরি ফেলে দেওয়া, নাকি প্রশ্নাতীতভাবে মেনে চলা? দুটোর কোনোটাই না। প্রথা মানুষকে সংযুক্ত রাখে, একটা সংস্কৃতির পরিচয় তৈরি করে – এটা অস্বীকার করার উপায় নেই। বিপদ শুরু হয় সেদিন থেকে, যেদিন থেকে আমরা প্রথা-পালনকেই চরিত্রের একমাত্র প্রমাণ ধরে নিতে শুরু করি। যে কর্মকর্তা ডান হাতে ঘুষ নেন, তিনি প্রথা মেনেছেন কিন্তু চরিত্র হারিয়েছেন। যে ছেলেটা বিপজ্জনক বাঁকে সাইকেল সামলাতে ব্যস্ত থাকায় সালাম দিতে ভুলে গিয়েছিল, তার প্রথা ভেঙেছে কিন্তু চরিত্রে কোনো খুঁত নেই। বাঙালি সমাজ যেদিন এই দুটো জিনিসকে আলাদা চোখে দেখতে শিখবে, সেদিন হয়তো আর কোনো শিক্ষক ছাত্রদের সামনে দাঁড়িয়ে একটা না-দেওয়া সালামের জন্য কাউকে “বড়লোকের বেয়াদব ছেলে” বলে ডাকবেন না – বরং জিজ্ঞেস করবেন, ছেলেটা নিরাপদে বাড়ি পৌঁছেছিল তো।

Related Posts

Are All Social Customs Beneficial?

Custody of Society” – Group News! You will find them all around you

I was in class eight then. That day there was no school, I was probablyRead More

Morality without Religion

The Birth of Conscience: How Humans Became Moral Without Allah or Religion

It was almost seventy-five thousand years ago. A group of Neanderthals lived in the ShanidarRead More

Morality without Religion

বিবেকের জন্মঃ আল্লাহ ও ধর্ম ছাড়াই মানুষ কীভাবে নৈতিক হয়ে উঠল?

প্রায় পঁচাত্তর হাজার বছর আগের কথা। ইরাকের শানিদার গুহায় বাস করত এক দল নিয়ান্ডারথাল। সেইRead More

Comments are Closed