
কেউ কোনদিন জানেনা, কেউ কোনদিন বুঝেনা, এই শহরের বেশিরভাগ ছাদের নিচেই লেখা থাকে আমাদের করুণ মৃত্যু ! সৎ মানুষটিও জানে না, টাকার নেশায় মত্ত নিখুঁত দুচোখ ওয়ালা অন্ধ মানুষটিও জানে না।
তাই বারবার মৃত্যুর মিছিল নিয়ে ফিরে আসে এক একটি নিমতলী, রানা প্লাজা অথবা চকবাজার। কখনো অসুস্থ স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থা পাকাপোক্ত করে রাখা দেশে আসে করোনা নামক বিশ্বমহামারি। আজ ২৪ এপ্রিল। সেই ২০১৩ সালের রানা প্লাজা ট্রাজেডির দিন। যে রানা প্লাজার স্তুপের নীচে আজো কোন দুখিনী মা ছবি বুকে নিয়ে খুঁজে ফেরে তার নাড়ি ছেড়া ধন আদরের ছেলে বা মেয়েকে। আজো কত স্ত্রী কাঁদে তার স্বামীকে হারিয়ে, কত শিশু মায়ের চেহারা মনে রাখার আগেই তাদের মা’কে হারিয়েছে মানুষের লোভের স্তুপের নীচে।
২৪ শে এপ্রিল ২০১৩ তে আমি আশংকা করেছিলাম যে মৃত্যুর সংখ্যা ১০০০ ছাড়িয়ে যাবে তবে প্রত্যাশা করেছিলাম আমার এই আশংকা যেন সত্য না হয়। সেই আশংকাও কম হয়ে গিয়েছিল। ভূপাল দূর্ঘটনার পর এশিয়ায় এটাই সবচেয়ে বড় বিপর্যয় যা মানুষ সৃষ্ট। সাভার থেকেও আমরা শিক্ষা নেইনি। আরো বড় কোন বিপর্যয়ের অপেক্ষা করি আমরা প্রতিদিন আর মানুষ আকাশের দিকে চোখ তুলে আকুতি জানায় বেঁচে থাকার।

এক পাগলের নাম ছিল হিমু। গতবছর ২৪ শে এপ্রিল ছিল ভয়াবহ রানা প্লাজা ট্রাজেডির ষষ্ট বার্ষিকী। ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল সাভারে রানা প্লাজা ধসের ঘটনায় আটকেপড়াদের উদ্ধারে প্রথম দিন থেকে অন্যতম কর্মী ছিলেন নওশাদ হাসান হিমু (২৭)। ঐদিন রাতে নিজ শরীরে আগুন দিয়ে আত্নহত্যা করেন তিনি। তিনি ছিলেন একজন কবি, হিমালয় হিমু নামে তিনি লিখতেন। রানা প্লাজায় চাপা পড়া মানুষের হাত-পা করাত দিয়ে কেটে বের করার কাজের যে অসহনীয় অভিজ্ঞতা তা প্রায়ই হিমুকে ঘুমাতে দিত না। বিভিন্ন সময় তিনি বলতেন, মানুষের রক্তাক্ত শরীরের কাটা টুকরোগুলো ঘুমের ভেতর হাজির হয়! এই দুঃসহ স্মৃতি প্রতিদিন পীড়া দেয়, তাড়া করে বেড়ায়। ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল রানা প্লাজার সেই ভয়াবহ ধসের ছয় বছর পর সেই একই দিনেই নিজেকে পুড়িয়ে ফেললেন হিমু!
কায়কোবাদ, এই ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার মানবতার টানে ছুটে আসেন রানা প্লাজায় উদ্ধার করার জন্য। সরকারী বাহিনীগুলো যেখানে ঢোকার সাহস করেনি সেখানে তিনি ঢুকে উদ্ধার করেছিলেন অনেককে। শেষে এক মহিলাকে উদ্ধার করতে গিয়ে আগুন লেগে তার ( মহিলার ) মৃত্যু হয়। উনি তাকে বাঁচাতে না পেরে মানসিক যন্ত্রনায় শেষে নিজেও মারা যান।
ঢাকার উত্তরায় সেক্টর ১০-এর ১২ নম্বর রোডের ২৮ নম্বর বাড়ির বাড়ির সপ্তম তলার ভাড়া বাসায় স্ত্রী এবং দুই সন্তান মারিয়া আক্তার তিথি (১০) ও তিহাদ চৌধুরীকে (৭) নিয়ে কায়কোবাদের সংসার চলছিল। কায়কোবাদ ঝাঁপিয়ে পড়েন রানা প্লাজার হতাহতদের উদ্ধারের দুঃসাহসী অভিযানে। শেষতক কায়কোবাদ কথা রাখতে পারেননি। সবাইকে উদ্ধার করার কথা ছিল তাঁর। সেই কথাটি তিনি পুরোপুরি রেখে যেতে পারেননি। কথা ছিল সবাইকে উদ্ধার করে প্রিয় স্ত্রী, দুটি শিশুসন্তানের কাছে ফিরবেন তিনি। কিন্তু সেই কথা তিনি রাখতে পারেননি।

রানা প্লাজায় উদ্ধারে অংশ নেয়া গাজীপুরের সামছুল হক বাবু। অভাবের সংসারের কথা চিন্তা না করে তিনি কাজ ফেলে ছুটে গিয়েছিলেন অপরিচিত মানুষদের উদ্ধার করতে।
রফিক মিয়ার বয়স পঁয়ত্রিশের কাছাকাছি। হালকা-পাতলা দেহের গড়ন। সব ফেলে ছুটে গিয়েছিলেন রানা প্লাজায় উদ্ধারে অংশ নিতে। রানা প্লাজায় সবাইকে বাঁচাতে না পেরে এখন উনি মানসিক বিকারগ্রস্থ, হাসপাতালে ভর্তি।
মোঃ মাইনুদ্দিন বাদল । রানা প্লাজায় কয়েক’শ জীবিত ও মৃত মানুষকে উদ্ধার করেছিলেন তিনি। ধ্বংসস্তূপের ভেতর হাত-পা কেটে বের করে এনেছিলেন অনেককে। মানসিক দুঃশ্চিন্তায় ভুগে তার এখন অন্যের উপর নির্ভর করে চলতে …
আব্দুর রহমান ওরফে তোতা মিয়া এনজিও’র চাকুরি হারিয়েছেন মানসিক যন্ত্রনায় ভুগে। তিনিও রানা প্লাজায় দুঃসাহসিক উদ্ধারে অংশ নিয়েছিলেন।
এক রানা প্লাজার সঙ্গেই জড়িয়ে আছে আরো অনেক বাঙালি হিরোর নাম। মুহিদ, মাহবুবা পারভীন, আবুল কালাম আজাদ, হাসান মাহমুদ ফোরকান, জিন্নাতুল ইসলাম, দারোগা আলী, রাসেল আলম, মো. রফিক মিয়াসহ শত শত সাধারণ মানুষ।
রানা প্লাজার উদ্ধারকারী নায়কদের অনেকেই অকালে মারা গেছেন না হয় মানসিক অস্থিরতায় ভূগে নিজে নিজে শেষ হচ্ছেন। পরিবারের বোঝা হয়ে কেউ কেউ বেঁচে আছেন মানুষের লাথি খেয়ে। এই রাষ্ট্র তাদের আর্থিক পুরুষ্কার তো দূরে থাক, সামান্য মানসিক কাউন্সেলিং এর ব্যবস্থাও করেনি। আমরা, মানু্যেরা স্যালুট দিয়েছি, ‘সারাজীবন মানুষ মনে রাখবে’, ‘চিরদিন স্মরণ করবে’ – এসব মিথ্য কথা বলেছি। কি লাভ হয়েছে তাদের ? তাদের কথা, তাদের পরিবারগুলোর কথা কয়জন মনে রেখেছে ?
এদেশে মনে হয় এ সমস্ত পাগলেরা অনভিপ্রেত। আমাদের মত সৎ, নিরীহ, নির্মোহ মানুষদের এদেশে প্রতি পদে পদে বাঁধা, অপমান, যন্ত্রনা। কারন আমরা পাগল এদেশে। চারিদিকে তাকিয়ে দেখুন, কারা দ্রুত উঠে যাচ্ছে ? আপনার আমার বিপরীতে গিয়ে যারা লুটপাট, দূর্নীতি করতে পারছে তারা। তারাই এখানে চালাক, বুদ্ধিমান। ওটাই এখন মূল স্রোত , অনেক বছর ধরে। আমরা, আপনি যারা একটু সৎ উপায়ে আত্মসম্মান নিয়ে বেঁচে থাকতে চাই তাদের জন্য এদেশে কোন উপায় নেই, সত্যি নেই। যদিও এ দেশটা আমাদের ও তাদের দিয়ে গেছে আমাদের মতই ৩০ লক্ষ শহীদ ও লক্ষ পাগল মুক্তিযোদ্ধা যারা এমনি আধাপেটা খেয়ে নিজের জীবন হাতে তুলে নিয়েছিল। এদেশে আজ তাদের সেই আদর্শ, আত্মত্যাগ, জীবনদান, মানবতা ও সততার মূল্য কোথায় ?

[ Photos: (Edited/Unedited) Weronika, SETCa BBTK, Times Asi, Solidarity Center | CC 2.0 ]
Related Posts

Under the caliphate rule of Caliph Umar, did all people – even non‑believers – drown in an ocean of peace?
When asked to show where Islam and Prophet Muhammad’s Sharia have been successfully implemented anywhere,Read More

খলিফা ওমরের খিলাফতী শাসনে কি সব মানুষ, এমনকি বিধর্মীরাও শান্তির সাগরে হাবুডুবু খেত?
ইসলাম, নবী মুহাম্মদের শরীয়া সফলভাবে কোথাও প্রয়োগ হয়েছে কিনা দেখাতে বললে মুমিন ভাইরা পিছলাতে থাকে।Read More

The story of a child who returned alive from darkness – a child who had been a victim of the inhumanity of Islam
In a military base in the Negev Desert, it was midnight. On the Israeli commander’sRead More

Comments are Closed